কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৫৫। শোভন সরকার

গত পর্বে: জগৎ সিং খুঁজে পেলেন সারনাথের ধ্বংসাবশেষ। উদ্ধার হল অতি প্রাচীন এক অস্থি মঞ্জুষা। 

জগৎ সিং সারনাথের ধ্বংসাবশেষে খননকার্য চালাতে গিয়ে নিজের অজান্তে উন্মোচিত করলেন কয়েকশো’ বছরের হারিয়ে যাওয়া গৌরবের ইতিহাস। জানা যায়, সবুজ মার্বেলের মঞ্জুষা ছাড়াও তিনি সেই একই স্থানে এক বুদ্ধমূর্তি খুঁজে পান। তিনি এখানকার ধর্মীয় গুরুত্ব অনুমান করে সঙ্গে সঙ্গে খননের কাজ বন্ধ করে দেন। বেলে পাথরের সেই বাক্স ঠিক যেখানে পেয়েছিলেন সেখানেই রেখে দিয়ে যতটা সম্ভব সেই স্তূপ আবার মাটিচাপা দিয়ে ফিরে এলেন। সেই থেকে স্থানীয়রা একে জগৎ সিং স্তূপ নামেই পরিচয় দিতে শুরু করে। বহুদিন পর্যন্ত এই নাম চালু থাকার পর যখন জানা গেল স্তূপটির আসল প্রকৃতি, তখন এর নাম হল ‘ধর্মরাজিকা স্তূপ’। আজও আমরা সারনাথে জগৎ সিংয়ের স্মৃতিবিজড়িত ধর্মরাজিকা স্তূপের ভগ্নাবশেষ দেখতে পাই। 

জগৎ সিং বুদ্ধমূর্তিখানি নিজের সঙ্গে জগৎগঞ্জে নিয়ে যান। আর সবুজ মার্বেলের মঞ্জুষাখানি তিনি বেনারসের তৎকালীন রেসিডেন্ট জনাথন ডানকানের হাতে তুলে দেন। ডানকান তা কোলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গলের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। দুঃখের বিষয় এই যে, এশিয়াটিক সোসাইটির সংগ্রহ থেকে মঞ্জুষাটি পরবর্তীতে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ক্যানিংহ্যামের মতে, এটি ১৮৩৪ সালের আগেই নিখোঁজ হয়ে যায়। 

যাই হোক, ডানকান এক ছোট রিপোর্টে সারনাথে জগৎ সিংয়ের এই আশ্চর্য আবিষ্কারের কথা লিখলেন। লিখলেন যে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া সেই অস্থিগুলি সম্ভবত গৌতম বুদ্ধের কোনো উপাসকের হবে; যুক্তি দিলেন যে তাঁদের মধ্যে গঙ্গায় অস্থি বিসর্জনের রীতি ছিল না, বরং তা মাটির নিচে সমাধিস্থ করা হত। 

এই প্রসঙ্গে বলি, ডানকানের রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে জগৎ সিংয়ের উৎখননের ঘটনা ১৭৯৪ সালে ঘটে। তাঁকে অনুসরণ করে পরবর্তী প্রায় সকল ঐতিহাসিকই এই সালকে সারনাথের পুনরুত্থানের সূচনা বলে ধরে থাকেন। অতি সাম্প্রতিক গবেষণায় ‘জগৎগঞ্জ রাজপরিবার গবেষণা সমিতি’ প্রমাণ করেছেন যে ঘটনাটি ১৭৯৪ সালের নয়, বরঞ্চ ১৭৮৭ সালের। 

১৭৯৮ সালে ডানকানের রিপোর্টটি প্রকাশ পেতেই সাড়া পড়ে গেল। জানা যায়, এরপর প্রায় সময়ই দেখা যেত কোনো না কোনো ইংরেজ সাহেব এখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে দু’একটা যা বুদ্ধের মূর্তি বা ভগ্নাংশ খুঁজে পেত তা উঠিয়ে নিয়ে চলে যেত নিজের সাথে নিজের দেশে। 

ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের রিপোর্ট অনুসারে, ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রথম ১৮১৫ সালে কর্নেল কলিন ম্যাকেঞ্জি সারনাথে এসে অনুসন্ধান চালান। তবে তাঁর কাজ নিয়ে কোনো বিস্তারিত রিপোর্ট পাওয়া যায় না। এরপর ১৮৩৫-৩৬ সাল নাগাদ সারনাথে আসেন বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ও পরবর্তীকালে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের প্রথম ডিরেক্টর-জেনারেল আলেকজাণ্ডার ক্যানিংহ্যাম।

মেজর ক্যানিংহ্যামের কাজ নিয়ে বলার আগে আরও একজন বানারসির গল্প বলি। তার নাম শংকর। সারনাথের কাছে সিংপুর গ্রামে থাকত সে। ছোটবেলা থেকেই উৎসাহী মন, কৌতূহলী উদ্যম। অনেক বছর আগে ঘটে যাওয়া এক বিশেষ ঘটনা তাকে ভীষণ নাড়া দিয়ে গিয়েছিল। রাজা জগৎ সিং নতুন মহল্লা বানাচ্ছেন, সেই কাজে অনেক লোক চাই। নিতান্ত কিশোর বয়সে সেও ভিড়ে গিয়েছিলো সেই ভিড়ে। সারনাথ থেকে ইট-পাথর তুলে দিয়ে আসতে হত। একদিন সেই হৈ-হৈ কাণ্ড। খাজানা পাওয়া গেছে নাকি! আরও অনেকের সাথে শংকরও ছুটল সেদিকে। সে দেখল একে একে কত কিছু বেরিয়ে এলো পাথরের বাক্স থেকে — কত রকম গয়না আর মানুষের অস্থি। নিশ্চয়ই কোনো রানির হবে। কল্পনায় কত কিছু ভেসে ওঠে তার। সত্যিটা কী তাহলে? কখনও কি জানা যাবে? 

সেদিন গঙ্গায় সেই অস্থি বিসর্জনের পর মাঝে প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে। শংকর এখনও সত্যের সন্ধানে। কত প্রশ্ন তার মনে উঁকি দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে গেছে। হঠাৎ একদিন শুনতে পেল কে এক সাহেব এসেছে। বুড়ো বুড়ো লোকদের সাথে কথা বলতে চাইছে। 

কতই তো সাহেব এলো আর গেলো, এ আবার নতুন কী। কিন্তু তবুও শংকরের কৌতূহল তাকে শান্ত হয়ে বসতে দিল না। গিয়ে দেখল এক অল্প বয়সী সাহেব, কতই বা বয়স, ওই কুড়ি কি একুশ। ক্যানিংহ্যাম তার নাম, পুরোনো কিছু একটা খুঁজছে। রাজার আমলের সেই খোঁড়াখুঁড়ির কথা জিজ্ঞেস করছে। শংকর এগিয়ে গেল ভিড় ঠেলে। জানালো যে সে রাজার শ্রমিক দলে কাজ করেছে, সেই সব পাথরের বাক্স, গয়নাগাটি নিজের চোখে দেখেছে। সাহেবের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন তাকেই তারা খুঁজছিল। 

শংকর ক্যানিংহ্যামকে নিয়ে গেল সেই পুরোনো জায়গায়। দেখিয়ে দিল ঠিক কোন জায়গায় জগৎ সিং খোঁড়াখুঁড়ি করিয়েছিলেন। সেখানে আবার খোঁড়া শুরু হল। 

মেজর ক্যানিংহ্যাম জনাথন ডানকানের সারনাথের উপর লেখা প্রতিবেদন পড়ে এখানে আসার উৎসাহ পান। তাঁর ধারণা ছিল, এখানে সুপরিকল্পিত অনুসন্ধান চালালে অনেক প্রত্নসম্পদের খোঁজ পাওয়া সম্ভব। পেলেনও। সেই বেলে পাথরের বাক্স — কয়েক দশক আগে জগৎ সিং আর তাঁর লোকেরা খুঁজে পেয়ে আবার আগের জায়গায় এটাকে রেখে দেন। শংকর না থাকলে হয়তো এতো তাড়াতাড়ি এসব পাওয়া যেত না। এছাড়াও এই শংকরের কাছে পাওয়া তথ্যের সূত্রেই সারনাথ থেকে তিনি প্রায় ষাটটি মূর্তি উদ্ধার করেন। ক্যানিংহ্যামের পরামর্শে পরে মেজর কিটো জগৎগঞ্জে গিয়ে এক পুরাতন বুদ্ধমূর্তির ভগ্নাবশেষ খুঁজে পান। এটিই সেই বুদ্ধমূর্তি যেটি জগৎ সিংয়ের লোকেরা ধর্মরাজিকা স্তূপ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। এই মূর্তিটির সঙ্গের লিপি থেকে জানা যায় এটি পাল যুগে গৌড়বঙ্গের সম্রাট মহীপালের সময়ের। 

জগৎ সিং স্তূপ ছাড়া ক্যানিংহ্যামের কাজ মূলত সারনাথের আরও দুটি প্রধান স্তূপ নিয়ে — চৌখণ্ডী স্তূপ ও ধামেক স্তূপ। চৌখণ্ডী স্তূপে বিশেষ কিছু না পাওয়ায় তিনি তা নিয়ে আর উৎসাহ দেখাননি। অন্যদিকে, ধামেক স্তূপের প্রকৃতি বোঝার জন্য তিনি এর উপর দিক থেকে মাঝ বরাবর খাড়াভাবে এক কূপ খনন করেন। এখানে ‘ইয়ে ধর্ম্ম হেতু প্রভবা’ ইত্যাদি লেখা একটি পাথরের ফলক উদ্ধার করেন। এর সূত্রেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সম্ভবত এই স্থানেই বুদ্ধ প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন করেন। 

ক্যানিংহ্যামের পর ১৮৫১-৫২ সালে সরকারি উদ্যোগে মেজর মার্কহ্যাম কিটো সারনাথে খননকাজ চালিয়ে যান। তিনি বেশ কিছু চৈত্য ইত্যাদি আবিষ্কার করেন। তাঁর অনুসন্ধান থেকে তিনি এও অনুমান করেন যে এই বিহার আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়েছিল। 

সারনাথের খননকাজের সঙ্গে সঙ্গে মেজর কিটো কুইন্স সংস্কৃত কলেজের গথিক শৈলীতে সুন্দর ভবনটি নির্মাণের কাজও সামলাচ্ছিলেন। শেরিংয়ের লেখায় জানা যায়, এই কাজের জন্য তিনি সারনাথের পাথর যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেছিলেন। ইংল্যাণ্ডের জাদুঘরের জন্য বেশ কিছু নমুনাও তাঁর সাহায্যে সাগরপাড়ে স্থানান্তরিত করা হয়। 

আমার মনে প্রশ্ন আসে, সারনাথের পাথর ও মূর্তি তুলে এনে ব্যবহার করেছেন বলে জগৎ সিংকে ব্রিটিশ ইতিহাসে যথেচ্ছ তুলোধোনা করা হয়; কিন্তু যখন সেই একই রকম কাজ কিটোর মতো কিছু সাহেব করলেন, সেটা ইতিহাস ততটা গম্ভীরভাবে নিল না! আমাদের দেশের শিল্প-কলার নিদর্শন উঠিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি যেন অত্যন্ত স্বাভাবিক! শুধু কি তাই? বরুণা নদীর উপর সাঁকো তৈরি হবে, জলে বাঁধ দেওয়া দরকার। সে কাজের জন্য পাথর প্রয়োজন। চুনার থেকে আনতে গেলে অনেক ঝক্কি। উপায় তো হাতের কাছেই আছে — সারনাথ! ওঠাও ওখানকার ইট-পাথর, মূর্তি — ওসব কেউ চায় না। প্রথমবার গুণে গুণে আটচল্লিশ খানা মূর্তি ও খোদাই করা ভাস্কর্য; পরে অন্য একটি লোহার ব্রিজ নির্মাণের জন্য দ্বিতীয়বার প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটি ঘোড়া বা গরুর গাড়ি বোঝাই করে পাথর সারনাথ থেকে এনে নদীতে ফেলা হল। লজ্জায় নদী তার গতি কমালো, ব্রিজ তৈরি হল। এরপর ১৮৯৪ সাল। রেলের লাইন পাতা হবে। লাইনের নীচে দেওয়ার জন্য তো প্রচুর পাথর চাই। আবার নজর গেলো সারনাথের ইট-পাথরে, তৈরি হল রেল লাইন। এভাবে উন্নয়নের নামে বহুবার সারনাথকে হারাতে হয়েছে কতশত স্মৃতিচিহ্ন আর গরিমা। 

আবার দেখুন, শংকরের মতো মানুষদের কথা। আমরা ক’জনই বা তাঁদের কথা জানি? সারনাথ আবিষ্কারের গৌরবগাথায় এঁদের কোনো ভাগ নেই, সে কৃতিত্ব পুরোটাই সাহেবরা এসে নিয়ে চলে গেছেন। 

কিটোর পর আরও বেশ কিছু সাহেব সারনাথ উৎখননে নিজেদের কমবেশি অবদান রেখে যান। কোনো এক নীলকর ফার্গুসন সাহেবের কাছ থেকে ১৮৫৬ সালে সারনাথের প্রত্নস্থল অধিগ্রহণ করে নেয় ব্রিটিশ সরকার। তবে প্রকৃত অর্থে এলাকাটির দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণ শুরু হয় ১৯০০ সালের নভেম্বর মাস থেকে। 

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ১৯০৪-০৫ সালে সরকারি উদ্যোগে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অন্যতম উল্লেখযোগ্য উৎখননের কাজ করেন ফ্রিড্রিখ অস্কার ওরটেল। তিনি ৪৭৬ খানি ভাস্কর্য ও স্থাপত্যচিহ্ন ছাড়াও ৪১-টি লিপি উদ্ধার করেন। আবিষ্কার করেন মূলগন্ধকূটী বিহার, কণিষ্কের আমলের এক বোধিসত্ত্ব মূর্তি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিদর্শন। ইনিই আমাদের জাতীয় প্রতীক সিংহশীর্ষ ও ভাঙা অশোকস্তম্ভটি উদ্ধার করেন। ওরটেল সাহেব সারনাথের প্রেমে পড়ে যান। তিনি কখনোই নিজেকে সারনাথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাননি — অবসর গ্রহণের পর দেশে ফিরে গিয়ে তিনি নিজের টেডিংটনের বাড়িটির নাম ভালোবেসে রাখেন ‘সারনাথ’। 

ওরটেলের পর তাঁর কাজ এগিয়ে নিয়ে যান স্যার জন মার্শাল। তাঁরই উদ্যোগে ১৯১০ সালে সারনাথের জাদুঘরটি নির্মিত হয়। দয়ারাম সাহানি জাদুঘরটির সমস্ত সংগ্রহের ক্যাটালগ তৈরির কাজ করেন। এর কয়েক বছর পর ১৯১৪-১৫ সালে সারনাথে আরও কিছু উৎখননের কাজ করেন হ্যারল্ড হারগ্রিভস। তাঁর পর সারনাথে উৎখননের চেয়েও জোর দেওয়া হয় উদ্ধারকৃত নিদর্শনের রক্ষণাবেক্ষণের উপর। 

কত হাজার বছরের পুরোনো এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান বর্তমানে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত। এই স্বীকৃতির অর্থ হল সারনাথের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কোনো একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এখন সমগ্র মানবজাতি এই ঐতিহ্যের এক সমান ভাগীদার।

(ক্রমশ)

প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব

তৃতীয় অধ্যায় ‘ফিরে দেখতে যাওয়া’ প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Leave a Reply