কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৩৩। শোভন সরকার
গত পর্বে: কেদার ঘাটের পর ঢুঁ মারলাম সত্যজিতের স্মৃতিমাখা ঘাটে। এবার দশাশ্বমেধ।
বেনারসের দশাশ্বমেধ সহ সংলগ্ন ঘাটগুলিতে গেলে যে কারও চোখে পড়বে বাঁশের তৈরি বিশাল ছাতা। সত্যজিৎ রায় এই প্রসঙ্গে লিখছেন, ‘এই দশাশ্বমেধেই দেখা যায় কাশীর বিখ্যাত ছাতা। পাণ্ডারা যে তক্তপোশে বসে তারই উপর রাখা একটা পাথরের মাঝখানে একটা গর্তের ভিতর ছাতার বাঁটটা ঢুকিয়ে সেটাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ছাতাটাকে ইচ্ছামতো ঘুরিয়ে সারাদিনই ছায়ার ব্যবস্থা করা যায়। এই মার্কামারা বিশাল বাঁশের ছাতা আমি বেনারস ছাড়া আর কোথাও দেখিনি।’ আজকের বেনারসের পরিচয়ের যেন এক প্রতীক হয়ে উঠেছে এই বিশেষ ধরনের ছাতা। বেনারসে এর আগমন হয় অষ্টাদশ শতকে নারায়ণ দীক্ষিত পতনকর নামে এক মারাঠা ব্রাহ্মণের হাত ধরে।
দশাশ্বমেধ ঘাটে সারি দিয়ে একের পর এক ছাতা মেলে তার নিচে চৌকি পেতে বসে আছে পাণ্ডা, ঘাটিয়া ব্রাহ্মণ বা তীর্থ পুরোহিতের দল। চাতক পাখির মতো তারা তীর্থযাত্রীদের আশায় বসে থাকে এবং সুযোগ মতো তাদের জন্য পূজাপাঠ থেকে জামাকাপড় পাহারা দেওয়া সবই করে থাকে উপযুক্ত দক্ষিণার বিনিময়ে। পূজা, দান ইত্যাদি আচার শেষে এরা তীর্থযাত্রীদের কপালে তিলক এঁকেও দেয়।
১৭৩৫ সাল নাগাদ এই ঘাটটির পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করান পেশোয়া বাজিরাও। তিনি ছাড়াও রানি অহল্যাবাই এবং বাংলার পুঁটিয়ার রানি ভুবনময়ী এই ঘাটের জীর্ণোদ্ধার করেন। ভুবনময়ী এখানে ব্রহ্মপুরী মন্দির ও সেই মন্দিরে দুলারেশ্বর শিবেরও প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রসঙ্গে বলি, পুঁটিয়ার রানি বেনারসে প্রচুর দান-ধ্যান করতেন বলে জানা যায়। তিনি এক বিশাল সত্র শুরু করেন যেখানে প্রতিদিন প্রচুর বাঙালিকে অন্নদান করা হত। এমনও কিংবদন্তি আছে যে তিনি নাকি ৩৬৫ দিনে ৩৬৫ খানা বাড়ি দান করেছিলেন।
যাই হোক, ইতিহাসে দশাশ্বমেধ ঘাটের নাম আমরা বিশেষভাবে সর্বপ্রথম পাই খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে। এই সময় নাগ বংশের ভারশিব রাজাগণ কুষাণদের পরাজিত করার পর গঙ্গার ঘাটে শিবের আরাধনা করে দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। সম্ভবত যে ঘাটে এই যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয় তার নাম হয়ে যায় ‘দশাশ্বমেধ’ ঘাট।
কাশীখণ্ডে উল্লিখিত একটি বিশেষ ঘটনায় এই ঘাটের এরূপ নামের আরও এক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আবার সেই রাজা দিবোদাসের কাহিনি। কোনো দেবদেবীই কাশীতে বসবাস করতে পারবে না — দিবোদাস এই শর্ত দিয়ে তবেই বেনারসের রাজা হন। সবার মতই শিবও কাশী ছাড়তে বাধ্য হলেন। এক সময় অস্থির হয়ে তিনি একের পর এক দূত কাশীতে পাঠাতে লাগলেন কাশীরাজ দিবোদাসের খুঁত খুঁজে বের করতে। যখন তিনি ব্রহ্মাকে এই কাজে নিয়োগ করলেন, ব্রহ্মা এক ব্রাহ্মণের বেশে কাশীতে এসে দিবোদাসের কাছে অশ্বমেধ যজ্ঞ করার জন্য সাহায্য চাইলেন। অশ্বমেধ বড়োই কঠিন যজ্ঞ, সামান্য ভুলচুক হলেই অনর্থ হয়। ব্রহ্মা পরিকল্পনা করেছিলেন যে দিবোদাস হয় তাঁকে সাহায্য করতে অস্বীকার করবেন বা যজ্ঞের সময় কোনো ভুল করে বসবেন — ঠিক তখন রাজার সেই অপরাধে তাঁকে কাশী থেকে বিতাড়িত করা হবে। কিন্তু দিবোদাস একজন যথার্থ ও জ্ঞানী শাসক ছিলেন। তিনি নির্দ্বিধায় এবং নিখুঁতভাবে ব্রহ্মাকে কেবল একটি নয়, দশ-দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে সাহায্য করেন।
এইসব কাহিনি কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটকে আজ আলাদা এক মাত্রা দিয়েছে, অন্য সমস্ত ঘাট থেকে আলাদা করে তুলেছে। অনেক পৌরাণিক গ্রন্থে এই ঘাটকে বলা হয়েছে ‘রুদ্রসর’। মনে করা হয়, এক সময় ছোট-বড় বহু জলাশয়-খচিত বেনারসের এই স্থানে ‘রুদ্র সরোবর’ ছিল — এই ‘রুদ্র সরোবর’ থেকেই এর নাম হয়েছিল ‘রুদ্রসর’। এখনও খেয়াল করলে দেখা যায় যে এই ঘাটে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের সময় অনেক মন্ত্রে এই ঘাটকে ‘রুদ্রসর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, দশাশ্বমেধ নয়।
শুধু ধর্মীয় আচার নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই ঘাটের গুরুত্ব বহুদিন ধরেই বিদ্যমান। গোধূলিয়া মোড় থেকে এই ঘাট অবধি প্রশস্ত ও অত্যন্ত ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটলেই দেখা যায় রাস্তার দু’পাশে কত ছোট বড় দোকানের সারি — আর কী নেই সেখানে! স্থানীয় মানুষ ছাড়াও দেশ ও বিদেশের বহু মানুষ বেনারসের এই রাস্তায় আসে জিনিসপত্র কেনাবেচা করতে। ঘাটেও চলে নানা ধরনের অর্থনৈতিক কারবার।
এক সময় এই ঘাটে এসে ভিড়ত বড় বড় নৌকা, তাতে থাকত তুলা, হাতির দাঁত, চন্দন কাঠ, সুগন্ধী দ্রব্যের মত নানা রকমের সামগ্রী, চুনার থেকে কেটে আনা বেলে পাথর। নৌকার ভিড় আজও কমেনি, বরং বেড়েছে, তবে তা মূলত পর্যটককেন্দ্রিক। চাপ এত বেড়েছে যে দশাশ্বমেধ ও আশেপাশের ঘাটে কারবার চালানোর জন্য নৌকার মাঝি, ঘাটের ব্রাহ্মণরা নিজেদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক শতাব্দী আগেও গোধূলিয়া মোড় থেকে দশাশ্বমেধ ঘাট অবধি কোনো পথ ছিল না, বরং সেখানে বয়ে চলত এক জলধারা। মূলত বেনিয়া তালাও (জলাশয়) থেকে জল এই ধারা বেয়ে এসে পড়ত গঙ্গায়। এই জলধারার নাম ছিল গোদাবরী। তাই অনেকেই মনে করেন ‘গোধূলিয়া’ নামটি আসলে গোদাবরীরই বিকৃত রূপ। স্থানীয়রা অবশ্য মনে করেন, কাঁচা ধুলোময় রাস্তায় যখন গোধূলি বেলায় গরুর পাল ঘরে ফিরত, সমস্ত এলাকা ধুলোয় ভরে যেত। গরুর ক্ষুরে ওঠা ধুলো — তার থেকেই গোধূলিয়া। তবে নামের পেছনে এই ব্যাখ্যার যথার্থতা নিয়ে আমার মনে সন্দেহ থাকলেও, মনে মনে ধুলো ওঠা বিকেলের কল্পনা করতে বেশ ভালোই লাগে।
সেদিন নৌকা থেকে নেমে দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের দিকে চললাম। অঙ্কিতা আর চন্দ্রাবলী বলল যে ওরা লাল প্যাঁড়া কিনবে। এখানে নাকি বাঙালিটোলার গলির মুখে একটা অনেক পুরোনো মিষ্টির দোকান আছে, ভালো লাল প্যাঁড়া বানায়। সামান্য এগিয়ে হাতের বাঁ দিকেই বাঙালিটোলায় যাওয়ার ভূতেশ্বর গলি। গলির মুখে দশাশ্বমেধ কালী মন্দির। তারই অপর দিকে এক স্যাঁতসেঁতে, পুরোনো, বিশেষত্বহীন, একটা ছোট দোকান। একটা কাচের শো-কেসের ভিতরে বিভিন্ন রেকাবিতে কিছু মিষ্টি রাখা দেখা যাচ্ছে। তার উল্টোদিকে এক মধ্যবয়স্ক মানুষ দুই হাতের তালুতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আজব দক্ষতায় একের পর এক লাল রঙের ক্ষীরের প্যাঁড়া বানিয়ে বড় একটা রেকাবিতে ফেলছেন। দোকানে হলুদ রঙের একটা সাইনবোর্ডে লাল-নীল কালিতে বাংলায় হাতে লেখা, ‘কালীবাড়ির সামনে একমাত্র — বাঙ্গালীর প্রাচীন প্রতিষ্ঠান — কালিকা মিষ্ঠান্ন ভাণ্ডার — প্রসিদ্ধ ক্ষীরের ও লাল প্যঁড়ার বিক্রেতা’।
লাল প্যাঁড়ার এত নাম কেন? বোঝা গেল, ভদ্রলোক গল্প করতে বেশ ভালোবাসেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের সাথে উনার এমনভাবে কথা শুরু হল যেন কতদিনের পরিচয়। উনিই বললেন যে রঙ মিশিয়ে নয়, দুধ কয়লার আগুনে তিন-চার ঘন্টা জ্বাল দিয়ে ঘন করে লালচে রঙ আনা হয়, সঙ্গে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গন্ধ। খাঁটি গরুর দুধ, সঙ্গে চিনি। শীতকালে গুড়ের। সেই গুড় আবার আসে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই। বেনারসের বাঙালিটোলার লাল প্যাঁড়া যে একবার চেখে দেখে, সে মনে রাখে। ভদ্রলোকের কাছ থেকে কথায় কথায় জানলাম অনেক কিছু। কয়েক পুরুষ আগের আমলের দোকান। কোনো এক সময় বাঁকুড়া থেকে তীর্থ করতে এসে কাশীতে থিতু হলেন বিশ্বনাথের আশ্রয়ে। তারপর বহুকাল কেটে গেছে এই মিষ্টির দোকানেই। পরিবারের প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময় এই দোকানে এসে বসেছে। কিন্তু শরীর ভাঙছে।
‘কে বসবে দোকানে আপনার পর?’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘জানি না।’
এক সময় বাঙালিটোলা বেনারসের গর্ব ছিল। কত তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্ব বেনারসে নিজেদের পায়ের ছাপ এঁকে গেছেন। শিক্ষা, সাহিত্য, কলা, বাণিজ্য, কিংবা জনকল্যাণ সব ক্ষেত্রে বাঙালিরা বেনারসে এক সময় অগ্রগণ্য ছিল। আজ সেই সমস্ত গৌরবের ইতিহাস এই মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির দীর্ঘশ্বাসের মতই মিলিয়ে যেতে যেতে ক্ষীণধারা হয়ে রয়ে গেছে বলে বোধ হয়। বাঙালিটোলায় ঢুকলে স্পষ্ট বোঝা যায় বহু বাড়ি তারা বিক্রি করে দিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। কেউ কেউ বলছে তাদের কাছ থেকে কৌশলে তাদের বিষয়-সম্পত্তি হস্তগত করা হয়েছে। বিক্রির পর কী হচ্ছে সেখানে? বিশ্বায়নের দৌলতে সেসব জায়গায় তৈরি হয়ে চলেছে অসংখ্য হোটেল, খাবার রেস্তোরাঁ, দোকানপাট।
সেদিন আমরা তিনজন মিলে বেশ অনেকটা প্যাঁড়া কিনে ফেললাম। ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি। বেনারসের লাল প্যাঁড়া বাক্সবন্দী হল বাড়ির সবার জন্য।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
