কাগজের নৌকো। পর্ব ৫। ধারাবাহিক উপন্যাস। লিখছেন সায়ন্তন ঠাকুর

রাঢ়বঙ্গের এইসব নিঝুম গ্রামাঞ্চলে গাজনের মেলা বেশ কদিন ধরেই চলে, গর্ভফুল নষ্ট হয়ে যাওয়া সোমত্থ যুবতীর মতো মাঠে সারি সারি অস্থায়ী দোকানপাট-হাঁড়ি কড়াই বঁটি হেঁসো আলতা সিঁদুর আয়না চুলের ফিতা পমেটম গন্ধতেল কী না পাওয়া যায়, অদূরে জিলিপি আর শুকনো গজার দোকানে দুপুর হলেই বড়ো কাঠের আখায় লোহার কড়াইয়ে ময়রা চিনির রস গাঢ় করতে থাকে, রসের স্রোতে চিট ধরলে পাশের উনান থেকে গরম জিলিপি তুলে ভাসিয়ে দেওয়া হবে কড়ায়-সব মিলিয়ে সে-এক হইহই কাণ্ড!

দেশের প্রধানমন্ত্রী ক’দিন হল বঙ্গে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন কিন্তু তার কোনও ছায়া এখানে পড়েনি, প্রিয়দর্শিনীকে কেউ কখনও দেখেইনি শুধু গ্রামের দু-একজন বুড়া মাতব্বর গোছের লোক জানে তিনি হলেন পণ্ডিতজীর বিটি!

তারা গম্ভীরমুখে নিজেদের মধ্যে কথা-চালাচালি করে, অবশ্য রাজার কন্যাকে কে-ই বা কবে দেখেছে, এ কি গাঁ ঘরের বিষয়, সেই দূর দিল্লীর রাজপ্রাসাদে তাঁদের বাস, তবে হাঁ, কদিন থেকেই একদল বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো লোক বলতে শুরু করেছে-জমির ভাগ ভাগীদারের, এমন অনাসৃষ্টির কথা কেউ কখনও শুনেছে, জমি নাকি নারান মণ্ডলের নয়, জমি হল গে মণ্ডলবাবুর ক্ষেত নিড়েন দেওয়া হাড়-হাভাতে পরাণ বাগদির! বোঝো কাণ্ড! অবশ্য নারান মণ্ডলের দাদু সেই কোনকালে বলত, জমি বাপের নয়-জমি দাপের,তখন ছিল সাহেব আমল, বুড়া গান্ধি তাদের তাড়াতে উঠে পড়ে লেগেছে, তখনকার কথা আর এখনকার সময় কি এক! যতই হোক বিটিছেলা নিজের ক্ষমতায় দেশের মাথা হয়েছে, তা সে যা ভালো বোঝে তাই তো করবে। দেশ কি তার সতীনকাঁটা!

 

এভাবেই শুখা নদ দ্বারকার নিস্তরঙ্গ স্রোতধারার মতো ধিকিধিকি বয়ে চলে রাঢ় দেশের গ্রাম-জীবন, তারই মাঝে এমন মেলাখেলা কয়েকদিনের জন্য যেন চাঁপা ফুলের সুবাস বয়ে আনে, কাছারির মাঠে এবার গাজনের মেলায় কোন দূর দেশ থেকে এক জাদুকর এসে তাঁবু ফেলেছেন, খালি হাতে জাদুর খেলায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার, চার আনা টিকিট কেটে তাই দেখতে প্রতিদিন গাঁ ভেঙে পড়ছে, দুটি মাত্র শো-দুপুর তিনটে আর সন্ধ্যা ছ’টা, সন্ধ্যার শোয়ে ভিড় বেশি-হ্যাজাকের শোঁ শোঁ ঝড় তোলা আলোয় থমথমে তাঁবুর মধ্যে একটি কাঠের তক্তার উপর কালো আলখাল্লার মতো পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকেন জাদুকর গণপতি, ন্যাড়া মাথা, মুখে দাড়ি-গোঁফের চিহ্নমাত্র নাই, হাতে একখানি রহস্যময়ী আড়বাঁশি, সেই বাঁশির দ্রিমিদ্রিমি সুরের সঙ্গেই শুরু করেন তাঁর বিচিত্র ভোজবাজি।

 

আজ ক’দিন হল গণপতির পিছু পিছু ঘুরছে ধীরেন, ধীরেন ভটচায চাষবাস করে, একলপ্তে নিজের জমিও আছে বিঘা চারেক, লোকে বলে ধীরু বদ্যি, অসুখবিসুখে ওষুধ টোটকা দেয়-সাপে কাটা মানুষের বিষ নামাতে পারে, অনেকসময় হাত দেখে গ্রহের ফের কাটানোর জন্য শিকড় বাকড়ের কথা বলে, মাঝবয়সি মানুষটির গুণের যেন শেষ নাই!

যৌবন বয়স থেকেই সাধু সন্নিসিদের উপর খুব টান ধীরেনের, কতবার ঘর-বাড়ি ছেড়ে সাধুসঙ্গের নেশায় পথে তীর্থে দিন কাটিয়েছে, পাখমারা বেদের দলেও ছিল কিছুদিন, অট্টহাসের শ্মশানে এক প্রেতসিদ্ধের কাছে শিখেছিল জ্যোতিষ, সেই সিদ্ধ সাধক তাকে আরও কিছু সিদ্ধাই দিতে চেয়েছিল কিন্তু ভয়ে ও-পথে আর এগোয়নি, হাজার হলেও সংসার বাসনা তো তার যায় নাই-তখন বাপের চাষজমি, ছায়াচ্ছন্ন মাটির দাওয়া, দুবেলা দুমুঠি অন্ন, দীঘির শীতল জলে স্নানান্তে যুবতি নারীর মৃদু কলহাস তাকে খুব টানছিল, সেই যে যৌবনাগ্নি নিভুনিভু দিনে ফিরে এসে বিবাহ করে থিতু হল গ্রামে তারপর থেকে পথের ডাক যেন মুছে গেছে তবে ওই ধুলাপথ যাকে একবার টান দেয় তার পক্ষে সব ভুলে থাকা কি সম্ভব ? সম্ভব হয় নাই, মাঝে মাঝেই আজকাল ধীরেনের মনে হয় কে যেন ফিসফিস করে তাকে ডাকছে, নিশুত রাতে বাড়ির উঠানে বকুল গাছের উঁচু ডালে পাখা মেলে হয়তো বলতে চাইছে, কালনাগিনীর বিষে বড়ো নেশা রে ধীরেন, বাঁধা পড়ে গেরস্ত জীবন কাটালে কি তোর চলে!

কাছারির মাঠে গণপতিকে দেখে অলীক সেই কণ্ঠস্বর পুনরায় ধীরেনের মন-দীঘির জলে ঘন ছায়া বিছিয়ে দিয়েছে,এই মায়াখেলা তার পূর্বপরিচিত, ইচ্ছা না থাকলেও ডাকিনী আলোর মতো জাদুকরের নেশা তাকে অহোরাত্র ইশারায় ডেকে চলেছে।

 

রাত্রির প্রায় দ্বিতীয় প্রহর, কাছারির নিঝুম মাঠ মেলা ভেঙে গেছে অনেকক্ষণ, সারাদিন পরিশ্রমের পর দোকানিরা ঝাঁপ ফেলে ঘুমিয়ে পড়েছে, জনহীন মাঠে অশ্বত্থ গাছের উঁচু কোটরে মাঝে মাঝে আতুড়ে ছেলের গলায় ডেকে উঠছে শকুনশাবক, অদূরে দক্ষিণে দ্বারকা নদের শীর্ণ স্রোতধারা স্পর্শ করে ছুটে আসা বাতাসের কণ্ঠে কে যেন পরিয়ে দিয়েছে বেলিফুলের মালা, নদের পূর্বে শ্মশানও আজ কোলাহলশূন্য, নিথর-শিবাদল উচ্চৈঃস্বরে প্রহর ঘোষণান্তে নিশ্চুপ হতেই হিরন্ময় নৈঃশব্দ্য সহস্রকোটি নক্ষত্রে সাজানো নির্মেঘ আকাশতলে নিদ্রাতুর বিস্তীর্ণ চরাচরে যেন বাঙ্ময় হয়ে উঠল। অমানিশা বড়ো মধুর, অন্ধকারাচ্ছন্ন নিশীথে মায়াদেবী যেন জগতের নয়নে তাঁর অলীককৃষ্ণ কাজল সযত্নে পরিয়ে দিয়েছেন, কী এক আশ্চর্য কারণে ঝিল্লীদলও আজ মৌন, গহিন আঁধারে শুধু জাদুকরের তাঁবুর মধ্যে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের ক্ষীণ শ্বাসবায়ুর মতো একটি আলোকচিহ্ন জেগে রয়েছে-দূর থেকে দেখলে মনে হয় আলোর নৌকো গহিন কৃষ্ণসাগরে ভেসে কোন দূর দেশে যেন ভেসে চলেছে।

গণপতি ধীরেনের দিকে মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গোত্র গণ রাশি এবং লগ্ন কী?’

ধীরেন শান্ত স্বরে উত্তর দিল, ‘দেবগণ, মকর রাশি, তুলা লগ্ন আর গোত্র কাশ্যপ’

প্রায়ান্ধকার তাঁবুর একপাশে খেলা দেখানোর তক্তাপোষটির নিচে খড় বিছানো ভূমির উপর একটি কুশাসনে বসে আছেন গণপতি, অল্প কিছুটা দূরে ধীরেন, প্রায় নিরাভরণ হলেও অস্থায়ী কক্ষটি আয়তনে প্রশস্ত-শুধুমাত্র একটি কালো ট্রাঙ্ক তক্তাপোষের উপর রাখা, বামদিকে কাঠের ছোট পিঁড়ির উপর একটি হ্যারিকেন জ্বলছে, গণপতির পরনে কালো আলখাল্লা, মুখের ভাব কোমল কিন্তু চোখদুটি খর চৈত্রের বালুচরের মতোই রুক্ষ, ঈষৎ রক্তবর্ণ, ধীরেনের দিকে তাকিয়ে মিহি সুরেলা কণ্ঠে বললেন, ‘ত্রাসং রোগং ভ্রমণঞ্চ সঙ্কটং চৌরতো ভয়ম্‌/ চন্দঃ করোতি নিয়তং রবিপ্রত্যন্তরে গতঃ’

ধীরেন সংস্কৃত অতি সামান্য জানে কিন্তু সেই বিদ্যায় এই শ্লোকের স্পষ্ট অর্থ নিরুপণ সম্ভব হল না, শুধু বুঝতে পারল ভয় রোগ ভ্রমণে সঙ্কট এবং চোরের ভয় রয়েছে, নিজের জন্মছক বহুবার দেখেছে বলেই জানে রবির স্থান একেবারেই মন্দ, জিজ্ঞাসা করল, ‘আজ্ঞা, রবি খুব লিচে লয়? দৃষ্টি দিঁছে শনি!’

মৃদু হাসলেন গণপতি, ‘পুত্র সন্তান রহিয়াছে, অষ্টম বর্ষীয়, তাহার কী নাম রাখিয়াছ? আদ্যাক্ষর অ হইলে জাতক সুখী হইবে না।’

বহু সাধুসঙ্গের অভিজ্ঞতা থাকায় যথেষ্ট বিস্মিত হল না ধীরেন, শুধু চিন্তান্বিত কন্ঠে বলল, ‘অ দিয়া নাম রাখছে উঁয়ার দাদামশাই, অবিনাশ, এর পিতিকার কী কিছু লাই?’

–উপনয়ন হইয়াছে?

–আসছে চোতে ন’বছর পুরলে দেব বঁলে ভাবছি।

চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা করলেন গণপতি, ‘উহার লগ্নের ষষ্ঠ স্থানে চন্দ্র রহিয়াছেন, চন্দ্রের প্রতি শুভগ্রহ শুক্রের দৃষ্টি, অষ্টম বর্ষে মৃত্যু নিশ্চিত…শুধুমাত্র একটি কথা জানিতে হইবে।’

অমানিশায় কাছারি মাঠের জনহীন ভুবনে একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর কথা শুনে ধীরেনের মন ক্ষণিকের জন্য শঙ্কাচ্ছন্ন হল, বিচিত্র জীবন অভিজ্ঞতার জন্যই হয়তো মুখে সে-কথা প্রকাশ না করে ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী কথা?’

–শুক্লা একাদশী নিশীথে কি উহার জন্ম হইয়াছিল?

–আজ্ঞা হাঁ, আষাঢ় মাসে পুন্নিমের তিনদিন আগ, গভীর রেতে জনমো লিছে।

ধীরেনের কথায় গণপতির মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল, ‘তাহা হইলে বিপদ নাই, ষষ্টস্থ চন্দ্র উহাকে আজীবন পিতার ন্যায় সর্ব্ববিপদে পরিত্রাণ করিবেন।’

একটি পাষাণভার যেন ধীরেনের বুক থেকে নেমে গেল, অদূরে রাত্রির নৈঃশব্দ্য ভেঙে একটি প্যাঁচা ডেকে উঠল সেই মুহূর্তে, কোনও কুটুরে ব্যাঙের ডাকও ভেসে এল, ধীরেন কিছু বলার আগেই গণপতি পুনরায় বললেন, ‘জাতক মহাবৈদ্য হইবে, একাদশ বর্ষে উপনয়ন উত্তম, উপনয়নকালে স আদ্যাক্ষর লইয়া নামকরণ করিবে, নাম রাখিবে সরোজ।’

–আজ্ঞা, তাই করবক বটে, কিন্তু উর অগগে আমার একটো গতি করি দ্যান।

–যাহার আশায় আসিয়াছ তাহা হইবে না, ভোজবাজি তুমি শিখিতে পারিবে না। অপর একটি কথা বলিতেছি, পিশাচসিদ্ধের নিকট হইতে যাহা শিখিয়াছিলে তাহা মন্দ অভ্যাস, মধ্য নিশীথে দ্বারকা তীরবর্তী শ্মশানে প্রেত আহ্বানের ক্রিয়া অতীব অমঙ্গলজনক-ইহার কুফল তোমার পরিবারকে ভোগ করিতে হইবে। ইতোমধ্যে স্ত্রীর ব্যাধি আসিয়াছে, ইহা কালব্যাধি, পাঁচ বৎসরের মধ্যে তাঁহার মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী।

এই প্রথম ধীরেনের শরীর ভারী হয়ে উঠল, সর্বাঙ্গে পদ্মকাঁটা, স্পষ্ট বুঝতে পারল গণপতি শুধুমাত্র একজন জাদুকর নন, স্ত্রীর অসুখের কথা আগে কখনও শোনেনি, দিব্যি হাসিখুশি শক্ত মানুষ, বয়সও খুব বেশি নয়, অজানা শঙ্কায় পাণ্ডুর কণ্ঠে শুধোল, ‘কী অসুখ? কোনও কুথা তো কয় লাই, দ্যাঁখেও ভালাপারা বলি মনে হয়।’

–অদ্যাবধি ব্যাধির প্রকোপ কেহ, এমনকি স্বয়ং রোগিনীও বুঝিতে পারে নাই, আশ্বিন গত হইলে লক্ষণ সুস্পষ্ট হইবে,কর্কটব্যাধি,স্বয়ং মহাকাল ইহার নিয়ন্ত্রক, বৈদ্যগণ তাঁহার নিকট পরাজিত হইবেন।

কী বলবেন বুঝে না পেয়ে চুপ করে রইল ধীরেন, প্রেতচর্চার জন্যই কি তবে এমন কাল-অসুখ ঘরে এল?

 

নদীর শুকনো চর থেকে সহসা হাহাকরময় বাতাস যেন ছুটে এল, নিঃস্তব্ধ চরাচরে দূরে হরিধ্বনি শোনা যাচ্ছে-বোধহয় শ্মশানবন্ধুর দল মৃতদেহ নিয়ে এসেছে, আশেপাশের বিশ তিরিশটি গ্রামে শ্মশান বলতে এই একখানি, প্রতিদিনই চিতার কাঠ জ্বলে ওঠে-বহ্নিচিতার ধূম্রজালে আকাশ বাতাস আচ্ছন্ন না হলে শ্মশানকালীর ভোগ ওঠে না উনানে, প্রায় শতবৎসর পূর্বে একবার কোনও মৃতদেহ নাকি আসেনি, মা উপবাসী ছিলেন সেদিন, তার কয়েকদিন পরেই বসন্ত মহামারীর প্রকোপে এই রাঢ় অঞ্চল প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়।

 

অল্পক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর গণপতি বললেন, ‘শ্মশানবাসিনী ভৈরবী সঙ্গও তোমার পক্ষে অতীব অমঙ্গলদায়ী, তাহার হাস্যকালে গণ্ডদেশ কূপবৎ লক্ষিত হয়, স্বর চক্রবাকীর তুল্য, বামকর্ণে শনিদেব অবস্থান করিতেছেন তদুপরি অধরোষ্ঠ স্থূল এবং শ্যামবর্ণ, জিহ্বা শুক্লবর্ণ, হরিদ্রাবর্ণ দীর্ঘনয়না এই নারীর স্তন বর্তুলাকার, কেশরাজি অতি রুক্ষ ও স্থূল-আমার গণনা কহিতেছে পুত্র সন্তানটি তোমার স্ত্রীর গর্ভজাত নহে, এই পাপাত্মা তাহাকে আনিয়া দিয়াছিল, কয়েক বৎসর পূর্বে নিজ ভৈরবকে হত্যা করিয়া এইস্থলে আসিয়াছে, সে ডাকিনীসিদ্ধা, তাহার মায়াপাশ কাটিয়া বাহির না হইলে জীবনে মহাসর্বনাশ আসিয়া উপস্থিত হইবে। মূর্খ, সাধনা দূরস্থান আজ বহু বৎসর তুমি তাহার অঙ্গলোভে পড়িয়া রহিয়াছ, সাধনার নাম করিয়া এইরূপ পাপকর্ম তোমাকে সমূলে ধ্বংস করিবে।

গণপতির নির্মম কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়ে তাঁর পা জড়িয়ে ধরতে যেতেই ধীরেন অবাক হয়ে দেখল, সামনে জাদুকর নাই! অত্যন্ত ভয় পেয়ে পেছন ফিরতেই দেখতে পেল তাঁবুর পশ্চিমদিকে একই আসনে গণপতি বসে রয়েছেন, ধীরেনের ভয়ার্ত মুখ দেখে ধীর স্বরে বললেন, ‘আমাকে স্পর্শ করিও না, তাহাতে উভয়েরই অমঙ্গল হইবে।’

কান্নামাখা জড়ানো গলায় ধীরেন বলল, ‘একটো উপায় কঁরি দ্যান বাবা, উয়ার থিকা মুক্তির পথটো বলি দ্যান।’

–উপায় নাই, অঙ্গলক্ষণ পড়িতে পারার ক্ষমতা থাকা স্বত্ত্বেও ভৈরবীর অশ্বক্ষুরাকৃতি বহুলোমাচ্ছন্ন এবং ব্যক্তমুখ যোনি দেখিয়া কেন বুঝিতে পারিলে না এই নারী মহাকুলক্ষণা ও অনর্থদায়িনী? কোন কামাগ্নি তোমাকে গ্রাস করিয়াছিল?

–ব্যাটার মুখ চাই কিছুটো বুলতে পারি নাই বাবা। বুললেই মুর লাশ লদীর জল ভাসায় দেঁবে বলছি।

দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর গণপতি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কয়মাস বয়সে পুত্রকে গৃহে আনিয়াছ?’

–আজ্ঞা, উয়ায় তখন একমাস বয়স।

–তাহা হইলে পুত্রের জন্ম-সময় কী প্রকারে আমাকে বলিলে?

–উ বলছিল মু’কে, শুক্লপক্ষে ষোলুই আষাঢ় গভীর রেতে ছ্যালার জন্ম।

–কোথা হইতে আনিয়াছে সে-বৃত্তান্ত কিছু কহিয়াছিল?

নীরবে দু-পাশে মাথা নাড়ল ধীরেন।

–বুঝিয়াছি, তবে তোমার পুত্র সৎ বংশজাত, সম্ভবত কোনও দরিদ্র পণ্ডিতের গৃহে তাহার জন্ম হইয়াছিল। গ্রামে অবিনাশকে লইয়া কোনওরূপ কথা হয় নাই?

মাথা নিচু করে ধীরেন বলল, ‘হইছিল, মু বলছি এক সাধুর কাছটো থিকে লিয়ে আনছি।’

–পরিবারকে কী কহিয়াছিলে?

–উয়াকেও তাই কইছি, সাধু দ্যাছে। বাঁজা শুনি শুনি উয়ার তখন মাতাখারাপ হয়ে যেছিল, ছ্যালা পাইয়ে খুশির লাগি আর কিছুটো শুধায় নাই।

হাতদুটি ভাঁজ করে কোলের উপর রাখলেন গণপতি, ধীরেন মৃদু আলোয় এই প্রথম দেখল বামহাতের অস্বাভাবিক দীর্ঘ বৃদ্ধাঙ্গুলের মাথায় একটি বিচিত্র লোহার টুপি পরানো রয়েছে আর সবগুলি আঙুলই কেমন যেন শ্মশানের ধারে বেড়ে ওঠা জটামাংসী গাছের পাতার মতো জীর্ণ, মৃতপ্রায়, যেন বহু বৎসর সূর্যালোকের অভাবে এরকম বিবর্ণ হয়ে গেছে। গণপতি সেই বাম বৃদ্ধাঙ্গুলটি তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার পিতা-মাতা জীবিত রহিয়াছেন?’

দু-পাশে মাথা নাড়ল ধীরেন।

–অন্যান্য আত্মীয় স্বজন?

–ইখানে কুথাও কেউ নাই, ধুলিয়ানের দিকে কাকাদের বাস রইছে, জমিনের ভাগ না-দেওয়ায় মুর বাপ এই কাছারির জমিদার বাবুর লেগে চলি আসিল, সেই থিকা ইখানেই রই যেছি।

একদৃষ্টে ধীরেনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন গণপতি, দু-এক মুহূর্ত পর ভারি শান্ত স্বরে শুধোলেন, ‘পরিবারের পিত্রালয় কোথায়?’

–আজ্ঞা, সে ম্যালা দূর, হুগলীর চাঁদহাটি গেরামে।

–পরিবারের ভ্রাতা ভগিনী কেহ রহিয়াছে?

শ্বশুরবাড়ির কথায় সামান্য অবাক হলেও মুখের ভাব পরিবর্তন না করে ধীরেন বলল, ‘একটোই বিটি, ভাই-বুন কেউ নাই উয়ার, বাপ আছি আর দু বচ্ছর আগে মা গত হইছে।’

 

কারোর মুখেই কোনও শব্দ নাই, দূর থেকে শ্মশানযাত্রীদের অস্পষ্ট গলার স্বর ভেসে আসছে, মাঝে মাঝে শকুন শাবকের ক্রন্দনধ্বনি স্থানটিকে প্রায় অপার্থিব করে তুলেছে, রাত্রির সম্ভবত তৃতীয় প্রহর, জগতের সকল মানুষ নিদ্রাচ্ছন্ন, রাত্রিদেবী তাঁর অপরূপ কৃষ্ণবর্ণের আঁচলটি যেন আজ চরাচরে বিছিয়ে দিয়েছেন আর নিঃসীম আঁধারে সেই বস্ত্রের অলঙ্কার সজ্জার মতো চোখ মেলে তাকিয়ে রয়েছে সহস্র নক্ষত্র, এমন গাঢ় অমানিশায় মুক্তিকামী মানুষের সাধনপথের রুদ্ধ দুয়ার খুলে যায় আবার এসময়েই গোপন ভোগ সমুদ্রে ডুব দেয় কত মানুষ-বড়ো বিচিত্র এই সংসার!

 

‘লোমশ, লোমশ’, গলা তুলে কাকে যেন ডাকলেন গণপতি, অবাক হয়ে ধীরেন শুনল অবিকল নারী কণ্ঠে যেন কথা বলছেন ভোজবাজির সম্রাট! বেদেদের মুখে শুনেছিল এই প্রাচীন বিদ্যার কথা, বহু পূর্বে বীতংসক ব্রাহ্মণদের এই বিদ্যা করায়ত্ত ছিল। ধীরেনের মনের ভাব বুঝতে পেরে মৃদু হাসলেন গণপতি, ‘বেদের মুখে যথার্থ শুনিয়াছ, এইরূপ বিদ্যা এখনও নষ্ট হয় নাই!’

একটি অল্পবয়স্ক ছেলে পর্দা তুলে তাঁবুর ভেতর এসে দাঁড়াল, একে আগে দেখেছে ধীরেন, মেলায় পয়সা নিয়ে এই ছেলেটিই মানুষজনকে ঢুকতে দেয়, ভারি বিচিত্র দর্শন, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, মাথার চুলগুলি কাশফুলের মতো সাদা, চোখের মণি রক্তবর্ণ, পরনে একখানি সাদা ধুতি, অনাবৃত দেহ ঘন লোমে আচ্ছন্ন, এই কারণেই কি ছেলেটির নাম লোমশ?

লোমশের দিকে চেয়ে গণপতি বললেন, ‘আজ হইতে মাসাধিকাল পর জৈষ্ঠ্য মাসের অমাবস্যায় তুমি পুনরায় এই গ্রামে আসিবে’, কথার মাঝেই ধীরেনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘পরিবার পুত্র সহ ধীরেনকে লইয়া হুগলী জেলা স্থিত চন্দ্রহাটি গ্রামে নিরাপদে পৌঁছাইয়া দিয়া আসিবে। স্মরণে রাখিও সাতিশয় ক্রুদ্ধা কোনও পিশাচিনী তোমাদিগের অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করিতে পারে, রাত্রি তৃতীয় প্রহরে কৃত্তিকা নক্ষত্র বৃষরাশিমধ্যে প্রবেশ করিবেন, উহাই যাত্রারম্ভের মাহেন্দ্রক্ষণ।’

লোমশ মাথা নেড়ে সুরেলা কন্ঠে বলল, ‘বন্ধুনাশং ধননাশং বহিশত্রুভয়ং তথা/ তমঃ করোতি সততং শনিপ্রত্যন্তরে গতঃ।’

বালকের কথায় প্রীত হয়ে ডানহাতখানি তুলে বরাভয়ের মুদ্রা দেখালেন গণপতি, তারপর ধীরেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আগামী জৈষ্ঠ্য মাসের অমাবস্যার পূর্বে এই স্থানের সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির ব্যবস্থা করিয়া চন্দ্রহাটি গ্রামে শ্বশুরালয়ে যাইয়া বসবাস করিতে শুরু করিবে, ইহা ভিন্ন তোমাকে রক্ষা করিবার দ্বিতীয় কোনও পথ নাই।’

বিস্মিত ধীরেন জিজ্ঞাসা করল, ‘আর ভৈরবী?’

কোনও কথার উত্তর না দিয়ে ধীরেনের দিকে কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন গণপতি,নদীচরের মৃদুমন্দ বাতাসের মতো নির্ভার হাসি কুসুমে ধীরে ধীরে তাঁর মুখমণ্ডল ভরে উঠল।

(ক্রমশ)

সায়ন্তন ঠাকুর
লেখক | + posts

জন্ম পৌষ মাসে, রাঢ়বাংলার এক অখ্যাত মফস্সলে। সায়ন্তন মূলত মূলত গদ্য লেখেন। প্রকাশিত বইপত্তর-- নয়নপথগামী(উপন্যাস), শাকম্ভরী(উপন্যাস), বাসাংসি জীর্ণানি(গল্প সংকলন)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *