পরিবেশকর্মী হত্যা : একটি আলেখ্য। পর্ব ২। লিখছেন অনির্বাণ সিসিফাস ভট্টাচার্য

0

(গত পর্বের পর)

‘আই অ্যাম ভালনারেবল’: বার্টা ক্যাসেরেস, হন্ডুরাস ও রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত পরিবেশকর্মী-হত্যা

 

(ছবিসূত্র – রেডিও হাভানা কিউবা)

২০০৬ সালে হন্ডুরাসের রিও ব্ল্যাঙ্কো অঞ্চলে গুয়ালকার্ক নদীর আশেপাশে একদিন স্থানীয় লেনকা আদিবাসীদের মধ্যে অন্ধকার নেমেছিল। হঠাৎ একদিন সকালে, এবং তার পরপর কয়েকদিন বিশালাকার ক্রেন, ট্রাক, কন্সট্রাকশন ইকুইপমেন্ট। কেন? জিজ্ঞেস করলে সদুত্তর নেই। লেনকা-রা কী করবেন? কোনও দরকারে যাকে বলা যায়, সেই নারী – বার্টা, বার্টা ক্যাসেরেস। বার্টা এই লেনকা কমিউনিটি থেকেই উঠে আসা মানবাধিকার এবং পরিবেশকর্মী। ১৯৯৩ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘কোপিন’ বা ‘কাউন্সিল অফ পপুলার অ্যান্ড ইন্ডিজেনাস অর্গানাইজেশনস অফ হন্ডুরাস’-এর সক্রিয় কাজ করার প্রায় তেরো বছর হয়ে গেছে। সেদিনের ১৯ বছরের বার্টা এখন পঁয়ত্রিশ ছুঁচ্ছেন। সেই বার্টাকে ডাকলেন লেনকারা। বার্টার নেতৃত্বে তদন্ত। যা দেখা গেল, তা বীভৎস। ২১ মেগাওয়াটের একটি বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যার যৌথ দায়িত্বে পৃথিবীর বৃহত্তম ড্যাম ডেভেলপার চিনের সাইনোহাইড্রো, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স কর্পোরেশন এবং হন্ডুরাসের কোম্পানি দেসারোল্লোস এনার্জেটিকোস এস.এ., সংক্ষেপে ‘দেসা’। এবং সেই বাঁধ দেওয়া হচ্ছে লেনকাদের কাছে পবিত্র নদী গুয়ালকার্কের ওপরে লেনকাদের মতামত ছাড়াই। ২০০৬ সাল থেকে বার্টা ক্যাসেরেসের নেতৃত্বে হন্ডুরাসের তীব্রতম পরিবেশ সংগ্রাম আন্দোলনের শুরুটা এরকমই।

চার সন্তানের সঙ্গে তরুণী বার্টা (ছবিসূত্র – ‘ডেমোক্রেসি নাও’ পত্রিকা)

পরের ক্রনোলজি? তার আগে একটু বার্টার কথা হোক। লেনকা কমিউনিটির মেয়ে, বার্টা ইসাবেল ক্যাসেরেস ফ্লোরিজ – মা অস্ট্রার থেকে পাওয়া লেগ্যাসি, এল সালভাদোরের রিফিউজিদের জন্য প্রাণান্তকর সেবা, স্থানীয়দের চিকিৎসায় ছুটে যাওয়া – অস্ট্রা থেকে বার্টা, গল্পের কোথায় শেষ, কোথায় শুরু! ১৯৯৩ সালে কোপিনের জার্নি শুরু, ২০০৬ সাল থেকে টানা বাঁধবিরোধী আন্দোলন এবং ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্ডেজের সময় থেকে ডিরেক্ট কনফ্রন্ট। মেসোআমেরিকান এলাকার দেশগুলির পরিবহণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও এনার্জি লিবারেলাইজেশনের মধ্যে দিয়ে দারিদ্র দূরীকরণের মরীচিকা ধরিয়ে ২০০৭-এ শুরু হয় মার্কিন অনুপ্রাণিত মেক্সিকান প্রোজেক্ট প্ল্যান পানামা পুয়েবলা (পিপিপি) বা পরবর্তীকালীন মেসোআমেরিকা প্রোজেক্ট, যার পথ দেখিয়েছিল ২০০১-এর ২০-২২ এপ্রিলে কানাডার কুইবেকে ফ্রি ট্রেড এরিয়া অফ দ্য আমেরিকাজ বা এফটিএএ চুক্তি। খোলাবাজারি বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে, পুলিশি টিয়ার গ্যাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কুইবেকে স্বামী সালভোদরকে সঙ্গে নিয়েছিলেন সেই বার্টা, ২০০১-এই দূরদর্শী বার্টা পিপিপি-কে বলে এসেছেন মধ্য আমেরিকার আদিবাসীদের মৃত্যুফাঁস। এই পিপিপি-র ব্রেনচাইল্ড ‘দেসা’। ২০১৩ থেকেই বার্টার নেতৃত্বে দীর্ঘ প্রতিবাদ, ইন্টার আমেরিকান কমিশন অফ হিউম্যান রাইটসে দেসা-বিরোধী আন্দোলনকে নিয়ে যাওয়া, সরকার বিরোধী ফাইল রেডি করা – যার পরিণতি ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি, কোপিন-কর্মী টমাস গার্সিয়ার ঝাঁজরা বুক এবং আরও তিনজন মারাত্মক আহতের ভেতর অন্যতম টমাসের ১৭ বছরের ছেলে অ্যালান। ২০১৪ সালে আরও দুটি ঘটনায় দুজন নিহত, তিনজন আহত। লোকবল কমছে, অন্যদিকে জেতার রাস্তাও চওড়া হচ্ছে। একে একে প্রোজেক্ট থেকে হাত তুলে নিচ্ছে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, সাইনোহাইড্রো। একা হয়ে যাওয়া আরও ভয়ঙ্কর দেসা-র নিয়ন্ত্রণে চোরাগোপ্তা যথেচ্ছাচার। বার্টার গাড়ির ভেতর অস্ত্র ঢুকিয়ে দিয়ে মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে দেশের বাইরে বেরোতে বাধা দেওয়ার খারিজ হয়ে যাওয়া কেস। গ্রেপ্তারির হুমকি। পাশে থাকা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পরিষ্কার বলে দিয়েছিল, বার্টাকে জেলবন্দী করা হলে তা প্রিজনার্স অফ কনসায়েন্সের আওতায় আসবে।

লেনকা কমিউনিটির সঙ্গে আলোচনারত বার্টার কিছু মুহূর্ত (ছবিসূত্র – গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ)

এইসবের মাঝে বার্টা নিজে কতটা শান্ত ছিলেন? ২০০৯ সালে হিউম্যান রাইটস কমিশনের বিচারে বার্টা সেবছর থেকেই পিপল আন্ডার থ্রেটের তালিকায় থাকা অন্যতম। তারপর থেকে ক্রমশ থ্রেট, শারীরিক নির্যাতনের চেষ্টা একাধিকাবার। ২০১৩-য় আল-জাজিরা টিভিকে বার্টা বলছেন – ‘ইন দ্য কান্ট্রি, হোয়্যার দেয়ার ইজ টোটাল ইমপিউনিটি, আই অ্যাম ভালনারেবল। হোয়েন দে ওয়ান্ট টু কিল মি, দে উইল ডু ইট …’ নিজের গ্রাম লা এসপারেঞ্জায় দেসা’র গানম্যান। বার্টার গতিবিধির ওপর তীব্র নজরদারি। চার সন্তানকে স্কলারশিপের জন্য পাঠিয়ে দিচ্ছেন কখনও মেক্সিকো, কখনও আর্জেন্টিনায়। স্টেশনে, এয়ারপোর্টে কান্না, ভয় – মা’কে দেখতে পাবে তো ফিরে এসে?

২০১৫-য় বন্ধু গ্যারিফুনা আদিবাসীভুক্ত অক্লান্ত পরিবেশকর্মী মিরিয়াম মিরান্ডার সঙ্গে যৌথভাবে অস্কার রোমেরো অ্যাওয়ার্ড, সেবছরই গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ বা গ্রিন নোবেল। ১৯ এপ্রিল সানফ্রান্সিসকো ওয়ার মেমোরিয়াল অপেরা হাউজে হাজার তিনেক শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে বার্টার ভাষণ –‘ওয়েক আপ! ওয়েক আপ হিউম্যানিটি! উই আর আউট অফ টাইম।’ সাংবাদিক নিনা লাখানির লিখছেন – ‘দ্য অ্যাপ্লজ ওয়াজ ডিফেনিং, দ্য অডিয়েন্স অন ইটস ফিট। ইন হন্ডুরাস, নাথিং চেঞ্জড …’। এখানেই আয়রনি। দেশে কিছুই বদলায় না। পুরস্কারের পরে থ্রেট, ক্ষোভ বাড়তে থাকল দেসা-র। দেসা থেকে কোপিনের কর্মীদের চোরাগোপ্তা মেসেজ, বলা হল, আন্দোলন থেকে নিজের নাম ভাঙিয়ে প্রাইজ জিতে নিয়েছেন বার্টা। ২০১৬-র ২০ ফেব্রুয়ারি গুয়ালকার্ক নদীর কাছে বাঁধবিরোধী জমায়েতে হেনস্থা করা হল, প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হল। রিও ব্ল্যাঙ্কো জুড়ে, বার্টার অফিসে, যাতায়াতের রাস্তায়, যেখানে সেখানে দেসার সিকারিও বা হিটম্যানদের গাড়ি দেখা যাচ্ছিল। বহুদিনের বন্ধু, মেক্সিকান পরিবেশকর্মী গুস্তাভো ক্যাস্ত্রোকে লেনকাদের সঙ্গে একটি বিকল্প শক্তি সংক্রান্ত কর্মশালা করতে আহ্বান জানালেন বার্টা। ২ মার্চ, ২০১৬। কোপিনের অফিস ইউটোপিয়া থেকে লা এসপারেঞ্জায় নিজের ঘরে ফিরলেন। বুকের ভেতর মৃত্যুভয়। বার্টার সঙ্গে থেকে গেলেন ক্যাস্ত্রো। রাত এগারোটা পঁয়ত্রিশ। দুজনে দুটো ঘরে ল্যাপটপ খুলে কাজ করছেন। কয়েকটি মৃদু শব্দের পর হঠাৎ জোরালো ব্লাস্ট। বার্টার চিৎকারের পর ভয়ঙ্করতম কিছু আঁচ করেছিলেন ক্যাস্ত্রো। হিটম্যানের গুলিতে ততক্ষণে ভেসে গেছেন বন্ধু। কোনওক্রমে আহত বুলেট মুখের একপাশে লেগে, নিখুত অভিনয়ে বেঁচে গেলেন ক্যাস্ত্রো। তাঁর কোলের ওপর শেষ সময়ের বার্টা, ৪৫ তম জন্মদিনের ঠিক একদিন আগে। শেষ উচ্চারণে সহযোদ্ধা প্রাক্তন স্বামীর নাম – ‘কল সালভাদোর, কল সালভাদোর!’

আরও অনেক কিছু হয়েছে। কোপিনের নেতৃত্ব পাওয়ার গোষ্ঠীকোন্দল বলে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বন্ধুস্থানীয় অনেককেই। বাদ যাননি ক্যাস্ত্রো নিজেও। রক্তাক্ত পোশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল প্রায় টানা একটা দিন। অটোপসির ভিডিও, রিপোর্ট কিছু দেখাতে দেওয়া হয়নি বাড়ির লোকেদের। হত্যাকেন্দ্র থেকে বেশ কিছু জিনিস লোপাট, আততায়ীর মোবাইল ফোন ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট। এইসব রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও গোটা বিশ্বব্যাপী চাপ, বার্টার পরিবার ও বন্ধুদের লড়াই। দীর্ঘ মামলার পর ২০১৯-এ সাতজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, দুবছর পর ৪৯ দিনের ট্রায়ালের পর হত্যার মাস্টারমাইন্ড দেসার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডেভিড ক্যাস্টিলোর সাড়ে বাইশ বছরের কারাদন্ডের রায়।

 

লা এসপারেঞ্জায় বার্টা ক্যাসেরেসের সেই বাড়ি (ছবিসূত্র – আল জাজিরা)

লা এসপারেঞ্জায় বার্টার সমাধি (ছবিসূত্র – ব্লুমবার্গ পত্রিকা)

হন্ডুরাস। বার্টার নিজের ক্রাইসিসের মাঝে প্রায় প্রাসঙ্গিক বার্টার দেশের ক্রাইসিস। ক্রনোলজি। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতি ম্যানুয়েল জেলিয়ার দেশের নতুন সংবিধান রচনার সিদ্ধান্তে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে বিবাদ, যার পরিণতি আদালতের আদেশে কুখ্যাত মিলিটারি অভ্যুত্থানে জেলিয়াকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরানো এবং দেশ থেকে বিতারণ। তারপর? একের পর এক দক্ষিণপন্থী পুতুল সরকার, মার্কিন ও কানাডীয় আর্থিক আনুকূল্য, এবং ২০১৪ সাল থেকে রাষ্ট্রপতি জুয়ান অর্লান্ডো হার্নান্ডেজের নেতৃত্বে হন্ডুরাসকে ‘ফ্রি ফর ওপেন বিজনেস’-এর খুল্লামখুল্লা তকমা দিয়ে সরাসরি পরিবেশবিরোধী, প্রো-কর্পোরেট রাষ্ট্রব্যবস্থা। টার্গেট দেশের নদী, অরণ্য, আদিবাসী অংশ, মানবাধিকার ও পরিবেশকর্মী। অধিকাংশ বড় বড় কোম্পানিগুলির উচ্চপদস্থ কমিটিতে দেশের মিলিটারি, ইন্টেলিজেন্স, বিচারব্যবস্থা এবং ব্যাঙ্কিং সেক্টরের প্রধান। ঠিক যেমন বার্টার হত্যাকারী ‘দেসা’-র প্রেসিডেন্ট, ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি দেশের ইন্টালিজেন্স, ব্যাঙ্কিং ও বিচারবিভাগীয় সেক্টরের অন্যতম তিনজন মুখ ছিলেন। অর্থাৎ, সমস্ত দিক দিয়ে ঘেরা একটা বীভৎস রাজনৈতিক নেক্সাস। ২০১৬ সালের গ্লোবাল উইটনেস রিপোর্ট বলছে আমেরিকা থেকে বার্ষিক ১০০ মিলিয়ন ডলার আসে হন্ডুরাসে, যা সহজেই দেশের দারিদ্র দূরীকরণে পাথেয় হতে পারত, অথচ তার অনেকটাই চলে যাচ্ছে মিলিটারি এবং ইন্টালিজেন্সের দপ্তরে, এবং দীর্ঘমেয়াদী ছাপ ফেলছে পরিবেশে। অন্যতম উল্লেখ্য কানাডীয় আনুকূল্যের ভয়ঙ্কর দিকটিও। নয়ের দশকের শেষ দিক থেকে দেশের সান-আন্দ্রেজ গোল্ড মাইনের মালিকানা হস্তান্তরিত হয়েছে তিনটি কানাডীয় কোম্পানি যথাক্রমে গ্রিনস্টোন রিসোর্সেস, ইয়ামানা গোল্ড ও অরা মিনারেলসের ওপর, এবং এই হস্তান্তর মূলত পরিবেশ-বিরোধী কার্যকলাপ থেকে নিজেদের দায়মুক্তির ছুতো খুঁজতে। খনির জন্য ঘরহারা সান মিগুয়েল কমিউনিটির শতাব্দীপ্রাচীন সমাধিক্ষেত্রের ওপরে অমানবিক নজর বসিয়ে কবর, পাথরফলক ভেঙে মাইনিং-এর কাজ চলেছে পুরোদমে। পুনর্বাসনের বদলে স্থানীয় কমিউনিটির মানুষের ঘরবাড়ি কম পয়সায় কিনে দায় সেরেছে কোম্পানি। সোনা নিষ্কাশনের জন্য টক্সিক সায়ানাইড পন্ড থেকে সায়ানাইড স্পিল করে সান্টা রোজা ডি কোপান অঞ্চলের লারা এবং হিগুইতো নদীতে রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার কুখ্যাত ঘটনা ঘটেছিল ২০০৩ ও ২০০৯-য়, মারা যায় ৪০,০০০-এর ওপর মাছ, জলজ প্রাণী। অবশ্যই কোম্পানি থেকে প্রায় কোনও ক্ষতিপূরণ ছাড়াই।

নিহত পরিবেশকর্মীদের স্মরণে বার্টা ও কোপিনের অন্যান্য সহকর্মীরা (ছবিসূত্র – গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ)

মানবাধিকারকর্মী, পরিবেশকর্মী ও আদিবাসী জমি অধিকার রক্ষার্থে আন্দোলনরত কর্মী – হন্ডুরাস শব্দটাই তাঁদের কাছে ত্রাস। স্পেনীয় ভাষায় ‘হন্ডুরাস’-এর অর্থ গভীরতা। আয়রনি। অসম্ভব প্রাকৃতিক সম্পদের গভীরে সন্ত্রাস। ২০১৭-র গ্লোবাল উইটনেস রিপোর্ট বলছে পার ক্যাপিটা নিরিখে পরিবেশকর্মীহত্যায় হন্ডুরাস একে, এবং মোট হত্যার নিরিখে পাঁচে। ২০২০ সালে হত্যার সংখ্যা ১৭। ২০১৬ থেকে ২০২২-এর ভেতর ৪৮ জন কর্মী নিহত। ২০২১-এ ইউনাইটেড নেশনস হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস-এর রিপোর্ট বলছে, ২০২১-এই ১০ জন পরিবেশকর্মী খুন হয়েছেন এবং লাঞ্ছিত ও প্রহৃত হয়েছেন ১৯৯ জন কর্মী, যার ভেতর ৮০ শতাংশই পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। ২০২১ সালের নভেম্বরে অর্গানাইজেশন ফর পার্টিসিপেশন সিটিজেনশিপ বা ‘এসিআই-পার্টিপা’ আন্দোলন-সংস্থার নেত্রী হেডমে ক্যাস্ত্রোর বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হল, ২০২২-এর জুলাইয়ে রাজধানী তেগুচিগালপায় এসিআইয়ের অফিসের সিকিওরিটি ক্যামেরা কেড়ে নিতে গুন্ডা লাগানো হল। নিয়ার-ফেটাল থেকে ফেটাল। ২০১৫-র অক্টোবরে লা পাজে লস এনসিনোজ হাইড্রোইলেকট্রিক প্রোজেক্টের সোচ্চার বিরোধিতা করায় প্রহৃত হলেন সন্তানসম্ভবা আনা মিরিয়াম রোমেরো এবং তাঁর আরেক আত্মীয়া, যার মধ্যে দ্বিতীয়জনের আঘাতের পরেই সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। সেবছরই এই লস এনসিনোজ প্রোজেক্টের বিরোধিতায় খুন হন তিন আদিবাসী, শরীর চেনা যাচ্ছিল না নৃশংসতায়। এই তিনজনের অন্যতম ফ্রান্সিসকো মার্টিনেজ মার্কেজ। ফ্রান্সিসকোর বিধবা স্ত্রী জুলিয়া স্মৃতিতে আনেন স্বামীর সেইসব কথা – ‘এটা আমার নিজের লড়াই। আমার যদি কিছু হয়, আমার বন্ধুরা তোমার পাশে দাঁড়াবেই’। গোটা দেশের অসংখ্য আদিবাসীর সঙ্গে বিন্দুমাত্র আলোচনা না করে যত্রতত্র উচ্ছেদ এবং ক্রিমিনালাইজেশন, যাদের মধ্যে অন্যতম প্রায় লাখ দুয়েক আফ্রো-হন্ডুরান আদিবাসী গ্যারিফুনারা। বারা ভিয়েজা অঞ্চলের ক্যারিবিয়ান সমুদ্রসৈকতের কাছে কুখ্যাত এক দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত দেসারেল্লোস টুরিস্টিকো বাহিয়া ডি টেলা কোম্পানির লাক্সারি প্রোজেক্ট ইন্দুরা বিচ অ্যান্ড গলফ রিসর্ট তৈরিতে গ্যারিফুনা উচ্ছেদ প্রকল্প, দাগিয়ে দেওয়া দখলদারি তকমা এবং প্রতিবাদী আন্দোলন থামাতে অ্যাবডাকশন, যার অন্যতম ২০১৮-র ১৮ জুলাই অতর্কিত আক্রমণে চার গ্যারিফুনা তরুণকে অপহরণ এবং সম্ভাব্য হত্যা, যে ঘটনার এখনও পর্যন্ত কোনও কিনারা হয়নি। বার্টার লেগ্যাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও অনেক মুখ। যেমন ১৯৯৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নিহত পরিবেশকর্মী পঁয়তাল্লিশ বছরের ব্লাঙ্কা জেনেট কাওয়াস, যিনি গোটা দেশ ঘুরে ৪৪৯টি ফ্লোরা এবং ফনা সংরক্ষণ করেছিলেন। ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট বেলা ভিস্টা অ্যান্টিমনি মাইনিংয়ের বিরুদ্ধে স্থানীয় টোলুপান আদিবাসীদের ১৩ দিন ধরে চলা পথ অবরোধে গুলি চালায় কোম্পানির ভাড়াটে খুনেরা, নিহত হন আন্দোলনকর্মী আর্মান্ডো মেডিনা, রিকার্ডো সোটো ফুনেজ ও নিজের রান্নাঘরের ভেতর গুলিতে ঝাঁজরা হওয়া ৭১ বছরের বৃদ্ধা মারিয়া এনরিকেটা ম্যাটুটে। ২০১৭-র ১৭ ফেব্রুয়ারি আরেক টোলুপান নেতা জোসে স্যান্টোস সেভিল্লাকে বাড়ির ভেতর ঢুকে হত্যা করা হয়। ২০১৪-র ২৭ আগস্ট সন্ধেবেলা বাড়ি ফেরার পথে খুন করা হয় পরিবেশকর্মী ও কৃষক-অধিকার আন্দোলনকর্মী বছর ছাপ্পান্ন’র মার্গারিটা মুরিল্লোকে। ২০১৬-র ৬ জুলাই মারকাল্লা অঞ্চলের মাটা মুলা ল্যান্ডফিল সাইটে পড়ে থাকতে দেখা যায় পরিবেশকর্মী বছর উনপঞ্চাশের কোপিন-সদস্য লেসবিয়া ইয়ানেথ উরকুইয়ার নিথর গুলিবিদ্ধ শরীর। তিন সন্তানের মা লেসবিয়ার অপরাধ ছিল লা-পাজ এলাকার ‘অরোরা ওয়ান’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতা করা। ২০২০ সালের ২৬ ডিসেম্বর খুন হন বার্টাখ্যাত সেই লেনকা কমিউনিটি থেকেই আরেক নেতা ও শিক্ষক ফেলিক্স ভেলাসকেজ। এই স্বতন্ত্র কয়েকটি নাম ছাড়াও থেকে যায় পাম-অয়েল প্ল্যান্টেশন ও মনোকালচারে নিহত আন্দোলনকর্মীদের নাম। ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশনের রিপোর্ট বলছে ২০০৯ থেকে ২০১২-র মধ্যে দেশের পাম ওয়েল প্ল্যান্টেশনজনিত বিক্ষোভে নিহত হন প্রায় ৯২ জন। প্রসঙ্গত এই কুখ্যাত পাম ওয়েল প্ল্যান্টেশনের নেপথ্যে ছিল সেন্ট্রাল আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ পাম অয়েল কোম্পানি ডিনান্ট, আর্থিক আনুকূল্য সেই ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স কর্পোরেশন।

২০১৮-র চারজন গ্যারিফুনা তরুণের অপহরণের বিচারের দাবিতে আদিবাসী কর্মীদের মিছিল (ছবিসূত্র – গ্লোবাল উইটনেস)

‘গুয়াপিনোল এইট’-এর অন্যতম এক অভিযুক্ত আন্দোলনকর্মীর একবছর পর তাঁর মেয়ের সঙ্গে দেখা (ছবিসূত্র – শেয়ার ফাউন্ডেশন)

ভয়-আশার দোলাচলের মাঝে অন্যতম টুইস্ট ২০০৯ সালের সেই বিতর্কিত মিলিটারি অভ্যুত্থানে নির্বাসিত রাষ্ট্রপতি ম্যানুয়েল জেলিয়ার স্ত্রী জায়োমারা ক্যাস্ত্রোর ২০২২-এর জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরা। এবং এসেই ঘোষণা করা সমস্ত ওপেন পিট মাইনিং-এ সরকারি নিষেধাজ্ঞা। অবশ্য আশার ভেতর অন্ধকার, নতুন ওপেন পিট প্রোজেক্টগুলির ওপর তালা পড়লেও কাস্ত্রো সরকার থেকে ২০২২-এর আগের বিতর্কিত প্রোজেক্টগুলি নিয়ে কোনও কথা বলা হল না। যেমন, ইনভারসনের লস পিনারেস বা এককালের হন্ডুরান এমকো মাইনিং কোম্পানির কুখ্যাত আয়রন অক্সাইড মাইনিং প্রোজেক্ট চলছিল কার্লোস এসক্যারেলস ন্যাশনাল পার্কের ভেতর। অরণ্য, বৃক্ষ, জীববৈচিত্র ছাড়াও শেষ হচ্ছিল গুয়াপিনোল নদীর পরিবেশ। খনির আপস্ট্রিম অবস্থানের জন্য নদীকে ক্রমশ বাদামি হতে দেখছিলেন বাসিন্দারা। ২০১৪ সালে ২০০ হেক্টর জমিতে মাইনিং কনসেশন দেওয়া রাষ্ট্রপ্রণোদিত এই প্রোজেক্টের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ৭ সেপ্টেম্বর জমায়েত হয় আন্দোলনকর্মীরা, এককথায় নাম হয় গুয়াপিনোল রেসিস্তে। শান্তিপূর্ণ থেকে ক্রমশ টেনশন এবং কোম্পানির বিরুদ্ধে কিচ্ছুটি না বলে ৩২ জনের বিরুদ্ধে সরকার থেকে নোটিশ, যার ভেতর ৮ জন কারারুদ্ধ। হাই কোর্টের নির্দেশে ৯১৪ দিন পর খালাস হন এই আটজন বা ‘গুয়াপিনোল এইট’। জীবন থেকে বেকসুর শেষ ৯১৪ দিন, ২৯ মাস। আন্দোলনের পর আন্দোলনে কিছু না পেয়ে ক্লান্ত, রিক্ত আদিবাসী কর্মীরা। গুয়াপিনোল কমিটির ৩২ জনের অন্যতম সদস্য  আর্নল্ড জোয়াকিন এরাজো-কে ২০২০-র অক্টোবরে টোকোইয়ার বাড়িতে খুন করা হল। ২০২২-এর কাস্ত্রো সরকারের তুলনামূলক ‘আশা’র ভেতর আবার ভয়ের পর্দা। ২০২৩-এর ৮ জানুয়ারি গুয়াপিনোল নদী অধিকার আন্দোলনের সেই ৩২ জনের অন্যতম বছর আটত্রিশের আলি ডমিঙ্গেজ এবং দশ বছরের ছোট জাইরো বোনিল্লা কেবলটিভির বিলের টাকা ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করে রাতে বাড়ি ফিরছিলেন। সন্ধে সাতটা পঁয়তাল্লিশে নিহত দুজনকে বাইকের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পাঁচ মাস পরে জুন মাসে আলির ভাই ওকেলি ডমিঙ্গেজকে বাড়ির ভেতর ঢুকে হত্যা করা হল। অর্থাৎ, শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েও প্রতিহিংসার কর্পোরেট ট্র্যডিশন থামল না তো!

 

বার্টার মেয়ে বার্থা ইসাবেল জুনিগা তাঁর মায়ের রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছেন (ছবিসূত্র – গ্লোবাল ইনিসিয়েটিভ)

বার্টা ক্যাসেরেসের গ্রাম লা এসপ্যারেঞ্জার নামের অর্থ – ‘আশা’। সমাপতন? শুধুই অন্ধকার? কোথায় সামান্য হলেও আশা? এখনও একজোট হয়ে থাকা অসংখ্য কোপিন-কর্মী। বার্টা বলতে এখনও ভালোবাসায় উজাড় করা হন্ডুরাসের আদিবাসী অংশ, লেনকা, গ্যারিফুনা-দের লাখ লাখ প্রজন্ম। বার্টার সন্তানদের তাঁর মায়ের রাস্তায় চলার আশ্চর্য ভয়হীন চোখ এবং তাঁদের অন্যতম বার্থা ইসাবেল জুনিগার ওপর চলে আসা থ্রেট, লড়াই, কোপিনের জেনারেল কোঅর্ডিনেটরের লেগ্যাসি – যেন খোদ মা বার্টা ক্যাসেরেসের রেজারেকশন। পাশাপাশি সামান্য হলেও বদলানো দেশের মসনদ। এবং অবশ্যই ২০১৫-য় বুয়েন্স আয়ারসের নিজের শেষ ট্যুরে এক সাক্ষাৎকারে ‘আপনার মৃত্যুভয় হয় না?’ প্রশ্নের সামনে বার্টা ক্যাসেরেসের নিজের সেইসব প্রত্যুত্তর – ‘হ্যাঁ, আমরা ভয় পাই। তবে এই ভয় আমাদের পঙ্গু করে দেবে না। আমাদের যদি কিছু হয়েও যায়, লেনকা কমিউনিটি এবং হন্ডুরাস এই লড়াই চালিয়ে যাবে, এবং আমি নিশ্চিত, ভালো দিন আসবে …’

 

গুয়ালকার্ক নদীর সামনে অ্যাগুয়া জারকা বাঁধের বিরুদ্ধে লেনকাদের মানবপ্রাচীর (ছবিসূত্র – ওয়াইল্ডারইউটোপিয়া)

ঋণস্বীকার

১. Berta Cáceres: Faces of assasination. Global Initiative. March, 2016.

২. Carillo, Silvio. The story of Berta Cáceres: how her fight for indigenous, environmental and gender rights cost her her life. The Beam Magazine. May 2, 2019.

৩. Chavkin, Sasha. ‘Bathed in Blood’: World Bank’s business lending arm backed palm oil producer amid deadly land war. Huffington Post. June 9, 2015.

৪. Cuffe, Sandra. Honduran politicians, US aid implicated in killings of environmentalists.  Mongabay. February 1, 2017.

৫.  Cuffe, Sandra. ‘We came back to struggle’ – Indigenous communities in Honduras are fighting against new mining projects. Earth Island Journal. 2014.

৬. Eidt, Jack. Berta Cáceres: Rebel guardian of the rivers; presente! Wilderutopia. March 12, 2016.

৭. Ferrucci, Giada. Environmental Activists are being killed in Honduras over their opposition in mining. The Conversation. March 6, 2021.

৮. Honduras: the deadliest country in the world for environmental activism. Global Witness. January 31, 2017.

৯. Jung, Maximilian. Berta Cáceres: New rules for banks could help stop defender killings. Global Witness. January 23, 2023.

১০. Lakhani, Nina. Honduras elites blamed for violence against environmental activists. The Guardian. January 31, 2017.

১১. Lakhani, Nina. Who killed Berta Cáceres? Dams, death squads, and an indigenous defender’s battle for the planet. Verso. June 2, 2020.

১২. Letter from Human Rights Watch to President Xiomara Castro. Human Rights Watch. June 30, 2022.

১৩. Reel, Monte. A murder in Honduras reveals the dark side of clean energy. Bloomberg. September 14, 2020.

১৪. Spring, Karen & Russell, Graham. Military coupes, mining and Canadian Involvement in Honduras. Rights Action. September, 2010.

১৫. Stuardo, Francisca. Honduras: new faces, old challenges. Global Witness. July 29, 2022.

১৬. Stuardo, Francisca. Remembering Berta Cáceres: Seven years on, the fight for justice continues. Global Witness. March 2, 2023.

 

 

 

 

 

Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *