পরিবেশকর্মী হত্যা : একটি আলেখ্য। পর্ব ১৪। লিখছেন অনির্বাণ সিসিফাস ভট্টাচার্য

0

(গত পর্বের পর)

ব্রাজিল, আমাজন, রবার ট্যাপিং, চিকো মেন্ডিস ও অন্যান্যরা

ব্রাজিলে রবার গাছের ছাল থেকে ল্যাটেক্স সংগ্রহ বা রবার ট্যাপিং (ছবিসূত্র – মোঙ্গাবে)

১৯৮০ সালের ২১ জুলাই সন্ধে সাড়ে সাতটায় ব্রাসিলিয়ার রুরাল ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের অফিসে একটি পুলিশ থ্রিলার টিভি ধারাবাহিক দেখছিলেন ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, পরিবেশকর্মী, আট সন্তানের পিতা বছর সাতচল্লিশের উইলসন পিনহেইরো। ধারাবাহিকে পুলিশি গুলি শুরু হতেই সময় মেপে উইলসনের মাথা লক্ষ্য করে গুলি করে স্থানীয় ক্যাটল র‍্যাঞ্চারের ভাড়া করা গুন্ডা। দুই বুলেটের শব্দ মিশে যায়। উইলসন কয়েকদিন আগেই ৩০০ জনের রবার ট্যাপার দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বোকা দে অ্যাকার অঞ্চলের বন্দুকধারী র‍্যাঞ্চারদের তাড়া করে ২০টি অবৈধ রাইফেল বাজেয়াপ্ত করতে। পাল্টা আঘাতে উইলসন এবং জাপুরির এক পরিবেশকর্মী নেতার (সম্ভবত ফ্রান্সিসকো ‘চিকো’ মেন্ডিস) হত্যার জন্য র‍্যাঞ্চাররা এক একজনকে ৪ লক্ষ ক্রুজেইরো দিয়ে ভাড়া করে দুজন গানম্যানকে। জাপুরির নেতারা জারুয়া ভ্যালির একটি মিটিংয়ে থাকায় বেঁচে গেলেও পারলেন না উইলসন। উইলসন হত্যার ঘটনার তদন্তে একটু বেশিই গভীরে ঢুকতে গেছিলেন রাষ্ট্রের ‘অবিশ্বস্ত’ এক পুলিশ অফিসার। বদলির নোটিশ স্টেট নিরাপত্তা মন্ত্রকের পক্ষ থেকে। ট্যাপাররা পুলিশকে সাত দিনের সময়সীমা দিলেও সেভাবে কিছুই হয়নি। বিরক্ত, ক্ষোভ জমে রবার ট্যাপারদের হাতে আইন উঠে যাওয়ার মতো তীব্রতায় চলে যায়। ২৭ জুলাই, ঠিক সাতদিনের মাথায় উইলসনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রত্যক্ষ বিবাদ থাকা সম্ভাব্য হত্যাকারী স্থানীয় র‍্যাঞ্চার নাইলো সার্গিও ডি অলিভিয়েরার র‍্যাঞ্চ ঘেরাও করে প্রতিবাদীরা। স্থানীয় একটি ট্রায়াল বসিয়ে ৩০-৪০টি বুলেটে অসম্ভব ক্ষোভের দাগ – র‍্যাঞ্চারের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছিল। এবং আশ্চর্য, হয়তো খুব স্বাভাবিক, এই পাল্টা হত্যার পর পুলিশি তৎপরতা অসম্ভব বেড়ে যায়। একশ’র ওপর ট্যাপারকে গ্রেপ্তার, বেশ কয়েকজনের থেকে মিথ্যে হত্যার বয়ান বের করানোর বলপূর্বক চেষ্টা করা হয়। জেলবন্দী পাঁচ ওপরের সারির নেতার অন্যতম ছিলেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা এবং কিংবদন্তি ফ্রান্সিসকো মেন্ডিস ফিলহো। হিটলিস্টে থাকা অন্যতম উইলসন এবং ফ্রান্সিসকোর একজন চলে যাওয়ায় কমরেড রাইমুন্ডো ব্যারোজের সঙ্গে গোপন আস্তানায় ছিলেন ফ্রান্সিসকো। তিন মাস এভাবে থাকার পর একদিন সকালে উঠে রাইমুন্ডোকে ফ্রান্সিসকো বলেছিলেন – ‘আমাদের আলাদা থেকে কাজ করতে হবে। একদিন ওরা আক্রমণ করতে আসবেই এবং দুজনে একসঙ্গে থাকলে দুজনেই মরব। বরং আলাদা জায়গায় কাজ করলে ওদের আক্রমণে তুমি কোনওভাবে চলে গেলে আমি আন্দোলন বাড়িয়ে যাবো, আর আমাকে মেরে দিলে তুমিও ঠিক তাই করো …’

পরিবেশকর্মী উইলসন পিনহেইরো (ছবিসূত্র – অ্যালকেট্রন)

ফ্রান্সিসকো আলভেজ মেন্ডিস ফিলহো – সংক্ষেপে চিকো মেন্ডিস। ‘ফাইট ফর দ্য ফরেস্ট: চিকো মেন্ডিস ইন হিজ ওন ওয়ার্ডস’ বইয়ের শেষে, ডেথ-থ্রেটের ভেতর দাঁড়িয়ে, চিকো লিখেছিলেন – ‘আমরা কিভাবে কাজ করব? কতদূরে যাব? … সমস্ত কিছুর মধ্যেই আমাদের প্রধান লক্ষ্য রবার ট্যাপার আন্দোলনকে দৃঢ় করা এবং আমাজনকে বাঁচানো’। এবং এই বাঁচানোর লেগ্যাসিতে শৈশব, পরিবেশ। পরে চিকো বলেছিলেন, ‘আমি ইকোলজিস্ট শব্দটা শোনার অনেক আগে থেকেই ইকোলজিস্ট ছিলাম।’ টাইমলাইন। জাপুরিতে পিতার সঙ্গে ৯ বছর বয়স থেকে রবার ট্যাপিং। সত্তরের দশকের মাঝবরাবর পর্যন্ত ট্যাপিং ফ্যাক্টরি মালিকরা শ্রমিকদের ভেতর অর্থজনিত কোনওরকম প্রতিবাদের ভয়ে গণিতশিক্ষা বন্ধ করে স্কুলিং নিষিদ্ধ করে দেয় জাপুরিতে। বছর পনেরো অবধি তথাকথিত শিক্ষার বাইরে থাকা কিশোর চিকোর ওপর পড়ে কিছু প্রোগেসিভ যাজক এবং রবার ট্যাপার থেকে পরে কমিউনিস্ট গেরিলাযোদ্ধা হয়ে যাওয়া ইউক্লিডেস ফার্নান্ডেজ ট্যাভোরা’র প্রভাব। স্মৃতিতে চলে আসে ১৯৬৪-র মিলিটারি অভ্যুত্থানের সময়ে গভীর অরণ্যে চিকো-ট্যাভোরার একসঙ্গে ভয়েস অফ আমেরিকা বা রেডিও মস্কো শোনা, এবং ১৯৬৫-তে ট্যাভোরার আকস্মিক নিরুদ্দেশ এবং সম্ভাব্য অ্যাসাসিনেশন। ১৯৭৫ সালে ব্রাসিলিয়ায় রাবার ট্যাপার্স ইউনিয়নের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি যথাক্রমে মেন্টর উইলসন ও চিকো নিজে। ১৯৭৭-এ জাপুরিতে রুরাল ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা সেই চিকোর হাত ধরেই, সঙ্গী সহযোদ্ধা বান্ধবী মেরিনা সিলভা। ১৯৮০-র শুরুতে আরেক সহকর্মী মেরি অ্যালেগ্রিটোর সঙ্গে প্রোজেক্ট সেরিঙ্গুয়েইরো বা রাবার ট্যাপার প্রোজেক্ট শুরু করে রবার এস্টেটগুলিতে স্কুলিং ও সমবায় প্রতিষ্ঠায় জোর দিলেন। সমবায় ব্যবস্থা যথেষ্ট ফান্ডিং এবং লোকবলের অভাবে আশান্বিত দাগ না কাটলেও সাক্ষরতা ক্যাম্পেনে অসম্ভব আলো ছড়ায় প্রোজেক্ট সেরিঙ্গুয়েইরো। ১৯৮০-তে উইলসন চলে যাওয়ার পর ব্রাসিলিয়া থেকে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সমস্ত কাজ সরে যায় চিকো’র নিজের জাপুরিতে। ১৯৮৫। ঘটনাবহুল ১৯৮৫। ব্রাসিলিয়ার প্রথম ন্যাশনাল রাবার ট্যাপার কংগ্রেসের আয়োজন এবং ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর রাবার ট্যাপার বা সিএনএস প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সেবছরই আশঙ্কার মেঘের মতো র‍্যাঞ্চার ও দক্ষিণপন্থী জোট ইউডিআর বা রুরাল ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নের মতো গণতন্ত্রবিহীন ক্যাকোফনিক লেঠেল সংগঠনের শুরু। তবু, চিকো নিজের কাজ থেকে সরে আসেননি। ১৯৮৬-তে জাপুরি ইউনিয়নের সঙ্গে জোট বাঁধলেন স্থানীয় আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা, চিরকাল পর্দার আড়ালে থাকা আদিবাসীদের চিহ্নিত করে আমাজন বাঁচাতে নিয়ে এলেন চিকো। জোট বাঁধতে গেলে অত্যাচারিত প্রত্যেকের একসঙ্গে থাকা যে দরকার! সেবছরই মে মাসে এক স্থানীয় জোতদারকে ১২৫ একর অরণ্য লিজ দেওয়ার প্রতিবাদে জাপুরি ফরেস্ট অফিসে শ’দুয়েক রবার ট্যাপারের সম্মিলিত অভিযানে নেতৃত্ব এবং খুব স্বাভাবিক পুলিশি প্রতিরোধ। ১৯৮৭-র মার্চে এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ড ও ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ ফেডারেশনের হয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভের ফান্ডিংয়ের জন্য ছুটলেন – অনুরোধ করলেন ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্টাল ব্যাঙ্ক এবং মার্কিন কংগ্রেসকে। এবং ১৯৮৮-র অক্টোবর। প্রথম সাফল্য হিসেবে চিকোর দাবি মেনে অ্যাকার-এর ৬১,০০০ একর জমি ও অরণ্যকে অবৈধ পোচারদের থেকে ছিনিয়ে সেখানে শুধুমাত্র স্থানীয়দের রবার ট্যাপিং ও অন্যান্য অরণ্যসম্পদ সংগ্রহ করতে অনুমতি দিল সরকার।

জাপুরিতে নিজের বাড়িতে শিশুপুত্র স্যান্ডিনোর সঙ্গে চিকো মেন্ডিস (ছবিসূত্র – সারাবিকম্যান্স ডট কম)

স্ত্রী ইলজামারের সঙ্গে নিজের বাড়িতে চিকো মেন্ডিস (ছবিসূত্র – মোঙ্গাবে)

ডিসেম্বরের শেষের আগে রবার ট্যাপিং, এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভ ও এমপ্যাটের কথা বলে রাখা ভালো। আদিবাসী ব্রাজিলীয় এবং পর্তুগিজ সেটলারদের ইতিহাসে রবার ট্যাপিংয়ের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। রবার গাছের কোনওরকম ক্ষতি না করে গাছের ছাল থেকে ল্যাটেক্স সংগ্রহ করে রবার শিল্পে কাজে লাগানো এবং জীবনধারণ চলে এসেছে বহুদিন ধরেই। ১৮৭৯ থেকে ১৯১২ পর্যন্ত দেশের রবার শিল্পের রমরমার ঠিক পরেই মূল্য পড়ে যাওয়া এবং উত্তর ব্রাজিল থেকে ক্রমশ অন্যান্য দিকে জীবিকার জন্য চলে যাওয়া শ্রমিক-কৃষক। ৮০,০০০ রবার ট্যাপার অ্যাকার এবং রোন্ডানিয়া রাজ্য ঘেঁষে টিকে থাকলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফের রবারের চাহিদা, দাম বৃদ্ধি এবং রবার ট্যাপারদের আলোর সময়। এইরকম আলো-অন্ধকারের লেখচিত্রের ভেতর প্রধানত দক্ষিণ ব্রাজিল থেকে আগত লেঠেল র‍্যাঞ্চারদের হানা এবং অরণ্য ধ্বংস। চিকো মেন্ডিস ব্রাজিলীয় আমাজনের তীব্র বৃক্ষচ্ছেদনে কাজে লাগিয়েছিলেন অঞ্চলের মেয়েদের, শিশুদের। ক্যাটল র‍্যাঞ্চারদের নেতৃত্বে গাছ লোপাট ও জমি অধিগ্রহণের সময় রবার ট্যাপারদের পরিবারের মেয়েরা, ছোটরা হাতে হাত ধরে সারিবদ্ধভাবে ঘিরে ধরত এলাকা। সেই বৃত্তের ভেতর থাকত পুরুষ সদস্যরা। মেয়েদের ও শিশুদের সচরাচর আক্রমণে সাহস পেত না র‍্যাঞ্চারদের লেঠেল দল। এভাবেই অহিংস ‘এমপ্যাটে’ বা ‘স্ট্যান্ড-অফ’ সিস্টেমের জন্ম। স্মৃতিকথায় চিকো লিখছেন – ‘১৯৭৫ থেকে ব্রাসিলিয়া ও জাপুরির রবার ট্যাপাররা ৪৫টি এমপ্যাটে আয়োজন করেছিল। যার ফলে ৪০০ জনের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হন, ৪০টির ওপর শারীরিক অত্যাচারের ঘটনা ঘটে এবং আমাদের বেশ কিছু কমরেড খুন হন। তবু, আমাদের সেই প্রতিরোধ বাঁচিয়েছিল ১২,০০,০০০ হেক্টর অরণ্য, যা গোটা গ্রেট ব্রিটেনের ৫ শতাংশ অঞ্চল। আমরা ৪৫টির ভেতর ১৫টিতে জিতলেও বাকি ৩০টিতে পারিনি, তবু ওই লড়াই স্মরণীয় ছিল।’ এবং এক্সট্রাক্টিভ রিজার্ভ বা রেসেক্স। পর্তুগিজ ভাষায় ‘এক্সট্র্যাক্টিজমো’ অর্থাৎ অরণ্যের কোনওরকম ক্ষতি না করে, বৃক্ষচ্ছেদন না করে স্থানীয়দের জীবনধারণ এবং বৃক্ষ-মানুষের স্থিতিশীল সহাবস্থান বা সাস্টেনেবল ফরেস্ট্রি – যার অগ্রদূত চিকো। রবারের সঙ্গে ক্যাস্টানহেইরা গাছ থেকে পাওয়া ব্রাজিলীয় বাদাম, বাবাকু গাছের বাদাম থেকে পাওয়া তেল, পর্তুগিজ উদ্যোগে ভারত থেকে নিয়ে যাওয়া পাটচাষ, টাকুমা, পাকুয়া, আকাই ইত্যাদি তালগাছের একাধিক অংশ থেকে পাওয়া তেল, স্থানীয় পানীয়, ওষধি – এভাবে অন্তত তিরিশটি ট্রি-প্রোডাক্ট শনাক্ত করে তার চাষ, যার জন্য বৃক্ষের সংরক্ষণ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন জরুরি ছিল। এবং সরকারিভাবে ব্রাজিলের প্রথম এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভ তৈরির আগেই এসে যায় ১৯৮৮-র ডিসেম্বর।

মিরান্ডা স্মিথ পরিচালিত তথ্যচিত্র ‘ভয়েস অফ দ্য আমাজন’-এর একটি দৃশ্যে বন্ধু ও পরিজনদের সঙ্গে আলোচনায় উদ্বিগ্ন চিকো মেন্ডিস

মিটিংয়ের মাঝে জাপুরির ট্রাড ইউনিয়ন নেতা ও পরিবেশকর্মীরা, ছবির বাঁদিক থেকে পঞ্চম চিকো মেন্ডিস (ছবিসূত্র – ওয়ার্ডপ্রেস)

ভয়ঙ্কর সেই ১৯৮৮-র শুরুতে ক্যাটল র‍্যাঞ্চার ও গানম্যান দারলি আলভেজ ডি সিলভা জাপুরির কোকেইরা অঞ্চলে ৬০০০ হেক্টরের একটি বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণ করেছিল। চিকোর নেতৃত্বে জোরালো এমপ্যাটে এবং দারলিদের সাময়িক সরে দাঁড়ানো। একটু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে পঞ্চাশের দশকে মিনাস গেরেইস, ষাট ও সত্তরে পারানা এবং সত্তর ও আশির দশকে জাপুরি টাউনশিপে একাধিক খুনের পেছনে প্রত্যক্ষ মদত ছিল এই কুখ্যাত আলভেজ পরিবারের, যারা পারানা থেকে জাপুরিতে আসে ১৯৭৩-এ। কোকেইরা থেকে বাধ্যতামূলক সরে আসার পর ১৯৮৮-র মে থেকে গোটা জাপুরিতে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল পঁচিশ জন গানম্যান, যাদের অন্যতম স্পনসর দারলি। প্যামফ্লেটের পর প্যামফ্লেটে সুস্পষ্টভাবে খুনের হুমকি দিয়ে লেখা ছিল চিকো, রাইমুন্ডো, এবং চিকোর বন্ধু, অ্যাগ্রোনমিস্ট, লেখক গোমেরসিন্ডো রডরিগেজের নাম। ‘৮৮র জাপুরি ফরেস্ট অফিসে শান্তিপূর্ণ ঘেরাও সত্ত্বেও নির্লজ্জ, হিংস্র বদলার নেতৃত্বে সেই আলভেজ পরিবার। ২৬ মে রাত দুটোর সময় ফরেস্ট্রি অফিসের বাইরে ঘুমে অকাতর প্রতিবাদী ট্যাপারদের ওপর দারলিপুত্র দারসি ও ওলোসির নেতৃত্বে ফায়ারিং, পনেরো বছরের এক ট্যাপারের গায়ে সাতটা বুলেট, সতেরো ছোঁওয়া আরেক কিশোরের শরীরে দুদুটি – যদিও আশ্চর্যভাবে প্রাণে বেঁচে যান প্রত্যেকেই। ’৮৮-র ১৮ জুন ভোর সাড়ে পাঁচটায় মিনাস গেরেইস অঞ্চলের ফার্মওয়ার্কার, ছাব্বিশ বছরের তরুণ নেতা ইভায়ের হিগিনো ডি আলমেইডা এবং সেপ্টেম্বরের ১১ ও ১২ তারিখ পরপর দুই রাতে জাপুরিতে ফেটাল গানশট পান একসময়ের রবার ট্যাপার হোসে রিবেইরো ও হোসে ডিসুজা স্যান্টোস। তিনটি হত্যারই সম্ভাব্য মাস্টারমাইন্ড টিম দারলি। জুন মাসে একাধিক ডেথ-থ্রেট পাওয়া পরিবেশকর্মী ওসমারিনো আমানসিও রডরিগেজের বাড়িতে রাতের অন্ধকারে তিন তিনটে গানশট, কোনওক্রমে বেঁচে যান ট্যাপার্স ইউনিয়ন লিডার। জুলাইয়ের শুরুর দিকে এভাবেই হত্যার চেষ্টা থেকে কোনওভাবে বাঁচেন দুই ট্যাপার, কর্মী ম্যানুয়েল কার্লোস ডা সিলভা এবং ফ্রান্সিসকো জর্গে ডিসুজা। গোমেরসিন্ডো রডরিগেজ নিহত সহযোদ্ধার স্মৃতিতে লেখা ‘ওয়াকিং দ্য ফরেস্ট উইথ চিকো মেন্ডিস’ বইতে লিখছেন – ‘বন্দুকধারীদের উপস্থিতির ওপর আমাদের তীব্র নজর ছিল। তাই, চিকো মেন্ডিসের হত্যার ঠিক এক সপ্তাহ আগে ওরা যখন গা ঢাকা দিল, আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম। কারণ, ওদের গতিবিধির ওপর আর নজর রাখার কোনও উপায় থাকল না আমার। আমি তখনই জানতাম কোনও একটা ভয়ঙ্কর কিছুর পরিকল্পনা চলছে ওদের। আমার ইন্দ্রিয় বুঝিয়ে দিয়েছিল’।

উত্তর পশ্চিম ব্রাজিলের জাপুরি-তে চিকো মেন্ডিসের বাড়ি (ছবিসূত্র – রিসার্চগেট)

’৮৮-র অক্টোবর থেকেই প্রেসিডেন্ট হোসে সার্নে, অ্যাকারের গভর্নর, ফেডারেল পুলিশের সুপারিন্টেন্ডেন্ট, পাবলিক সিকিউরিটির সেক্রেটারি, জাপুরির স্থানীয় জাজকে লেখা একাধিক চিঠি ও টেলিগ্রামে নিজের সম্ভাব্য হত্যার কথা আঁচ করে হত্যাকারী হিসেবে দারলি এবং আলভারিনো – দুই আলভেজ ভাই এবং কিছু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ আরও বারোজনের নাম লিখে দেন চিকো। সেবছর ইতিমধ্যেই ৮৯ জন রুরাল ওয়ার্কার নিহত হয়েছেন দেশে। ১৫ ডিসেম্বরে চুয়াল্লিশতম জন্মদিনের সেলিব্রেশন, আসন্ন মৃত্যুর সান্নাটা এবং ২১ ডিসেম্বর বোন ও এক বন্ধুকে বলা চিকোর সেই ফোরটেলিং – ‘আগামী নিউ ইয়ার পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকব না’। ২২ ডিসেম্বর। ক্রনিকল অফ আ ডেথ ফোরটোল্ড। বারবার বলার পর কোনওক্রমে দুজন নিরাপত্তা রক্ষী দেওয়া হয় চিকোর সঙ্গে। সেই দুই নিরাপত্তারক্ষী ঘরের ভেতরে ডিনার টেবিলে ডমিনোজ খেলায় মগ্ন। স্ত্রী ইলসামার ডিনার সাজাবেন। ডিনারের আগে সন্ধে ৬.৪৫ মিনিটে কিচেন দরজা খুলে বাইরে স্নান করতে গেলেন চিকো। ৮.২ মিটার দূর থেকে ০.২০ গজ শটগানের সিঙ্গল রাউন্ড গানশট। আঠেরোটা পেলেট ঢুকেছিল চিকোর কাঁধে, বিয়াল্লিশটা বুকে। নিখুঁত, পরিকল্পিত শট। ‘আমাকে ওরা গুলি করল’ – এটুকু বলে ইলসামারের শরীরে লুটিয়ে পড়লেন চিকো। চার বছরের মেয়ে এলেনিরার দিকে তাকিয়ে শেষবার মেয়ের নাম উচ্চারণ করার চেষ্টা করেও পারেননি। একটু দূরে বাকি দুই সন্তান ছোট্ট ছেলে স্যান্ডিনো, বড় মেয়ে অ্যাঞ্জেলা। নির্বাক …

জাপুরিতে চিকোর সমাধি, প্রস্তরফলকে লেখা ‘চিকো মেন্ডিস বেঁচে থাকবেন’ (ছবিসূত্র – আমাজনিয়া রিয়েল)

পরিণতি? চিকো হত্যার পর ট্রাইবুনাল অফ জাস্টিসের প্রেসিডেন্ট ইভা ইভানজেলিস্টার মেয়েকে ফোন করে শাসানো হয়, বলা হয় পরের দিন ট্রাইবুনালে গেলে চিকোর মতো অবস্থা হবে ইভার। বন্ধুর ফিউনারেলের পরের দিন শাসানি পান জাপুরির বিশপ ডম মোয়াসির গ্রেসি, বলা হয় ডম এবং চিকোকে একসাথে শেষ করার আদেশ এলেও স্রেফ ঈশ্বরের ভয়ে বিশপকে এখনও ছুঁচ্ছে না ভাড়াটে খুনেরা। একাধিক ডেথ-থ্রেট পেয়েছেন জাপুরির বিচারক ডক্টর আদাইর লংঘিনি বা চিকোর সহযোদ্ধা রাইমুন্ডো ব্যারোজ, হোসে ডা সিলভা পেরেরা, গোমেরসিন্ডো রডরিগেজ বা ওসমারিনো আমানসিও। ১৯৯০-এর মে-তে চিকো হত্যার ট্রায়ালের সঙ্গে জড়িত ২৫ জনের হিটলিস্ট লিকেজ হয় জাপুরিতে, যাদের ট্রায়ালের আগে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছিল র‍্যাঞ্চারদের তরফ থেকে, এর আগেই অবশ্য চিকো হত্যার অন্যতম এক সাক্ষীকে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৯০-এর জানুয়ারিতেই। এবং ’৯০-এর ২২ জুনের শুরু হওয়া ট্রায়াল। দারলিপুত্র গানম্যান দারসি ও ওলোসিকে উনিশ বছরের জেলের রায় – যদিও বীভৎস এই হত্যার কাছে এই সামান্য শাস্তি ঢেকে দেয় আসল মাস্টারমাইন্ডদের অনেককেই।

রবার ট্যাপিংয়ে নিযুক্ত চিকো মেন্ডিসের অন্যতম সতীর্থ পরিবেশকর্মী রাইমুন্ডো ব্যারোজ (ছবিসূত্র – মোঙ্গাবে)

পরিবেশকর্মী ওসমারিনো আমানসিও (ছবিসূত্র – জি ওয়ান নিউজ পোর্টাল)

গোটা পৃথিবীজুড়ে অবিশ্বাস্য এক নড়ে যাওয়ার স্পন্দন। ব্রাজিল সরকার থেকে পরিস্থিতি ঢাকতে উঠে পড়ে লাগা এবং হত্যার ঠিক পরেই চিকোকে দেওয়া মরণোত্তর ‘প্যাট্রন অফ ব্রাজিলিয়ান এনভায়রনমেন্ট’ সম্মান। দেশের পরিবেশমন্ত্রকের প্রশাসনিক বিভাগের নাম রাখা হয় মেন্ডিস ইন্সটিটিউট ফর বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন, সংক্ষেপে ‘আইসিএমবায়ো’। ১৯৯০-এর ১২ মার্চ চিকো’র অ্যাকারে দেশের প্রথম এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভ সরকারিভাবে চিহ্নিত হয়, নামাঙ্কিত হয় চিকো’র নামেই, যা পেরু ও বলিভিয়া সীমান্তে থাকা অ্যাকার রাজ্যেই ছড়িয়ে আছে ১ মিলিয়ন হেক্টর এলাকা জুড়ে। রিজার্ভে পঞ্চাশের কাছাকাছি ট্রি ট্র্যাক্ট এলাকা ১০,০০০ বাসিন্দার রবার ট্যাপিং ও অন্যান্য ফরেস্ট প্রোডাক্ট সংগ্রহ ও বৃক্ষ সংরক্ষণের ড্রিমল্যান্ড। ২০১৮ সালের আইসিএমবায়ো-র রিপোর্ট বলছে গোটা ব্রাজিলে ৮৭টি সংরক্ষিত এলাকা বা প্রোটেক্টেড এরিয়া আছে, যার ভেতর ৬৬টি এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভ, ১৯টি ন্যাশনাল ফরেস্ট এবং ২টি সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট রিজার্ভ। এই ৬৬টি এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভ গোটা দেশের ২৩ মিলিয়ন হেক্টর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে ৭০ হাজার পরিবারের আয়ের উৎস হিসবে কাজ করছে, অথচ তার জন্য বৃক্ষচ্ছেদনের প্রয়োজন নেই এতটুকুও। আশ্চর্য এটাই, বোলসেনারো সরকারের পর লুলা ডিসিলভার নেতৃত্বে দেশের বৃক্ষচ্ছেদনের লেখচিত্র ক্রমশ কমলেও চিকো মেন্ডিস এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভের চোরাগোপ্তা গাছ লোপাট চলছেই। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ-এর হিসেবে ইতিমধ্যেই ক্যাটল র‍্যাঞ্চিং-এ চিকো মেন্ডিস এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভের ৫ শতাংশ অরণ্য ধংস হয়েছে। ২০২৩-এ প্রায় ৩০০টি অগ্নিকান্ড ঘটলেও এবং ক্রমাগত আবেদন করলেও মেন্ডিস ইন্সটিটিউট থেকে সেভাবে কোনও সাহায্যই পাননি অন্যতম পরিবেশকর্মী, মধ্যবয়সিনী রবার ট্যাপার লুজিনিয়েডে মার্কেজ ডিসিলভা। নিজের এলাকার ৭৪৮টি রবার গাছের সবকটির অবস্থান হাতের তালুর মতো চেনা লুজিনিয়েডে বাকি ৫০০ জন রবার ট্যাপারের সঙ্গে ১,২৯২ টি রবার ট্যাপার পরিবারের সংগৃহীত রবারের একমাত্র ক্রেতা ফরাসি জুতোপ্রস্তুতকারক সংস্থা ভেজার সঙ্গে ডিল করতে করতে পরবর্তী আগুনের জন্য প্রতীক্ষায়, আশঙ্কায়। এবং পাশাপাশি আশা – ২০২৩-এর মধ্যে গোটা রিজার্ভ থেকে পাওয়া ২,৭০,০০০ টন ল্যাটেক্স রবারকে বাড়িয়ে নিয়ে যাবেন আরও, সঙ্গে বৃক্ষের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ক্ষতি হতে দেবেন না এতটুকুও।

চিকো মেন্ডিস এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভ (ছবিসূত্র – আর্থজার্নালিজম নেটওয়ার্ক)

ওপরে চিকো মেন্ডিস এক্সট্র্যাক্টিভ রিজার্ভে দাবানল, নীচে আগুনে পোড়া রিজার্ভের একটি অংশে অসহায় দাঁড়িয়ে পরিবেশকর্মী রবার ট্যাপার লুজিনিয়েডে (ছবিসূত্র – মোঙ্গাবে)

এক একটি কিংবদন্তি পরিবেশকর্মী-হত্যার সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অনেক গল্প জড়িয়ে থাকে। রবার ট্যাপার লেগ্যাসিতে পরিবারে চিরকাল অবহেলিত ছিলেন নারীরা। মূলত ব্রাজিলের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এনে মেয়েদের যৌন দাসী হিসেবে ব্যবহার করত রবার ফ্যাক্টরির মালিকেরা। ইউনিয়ন তৈরি হলে পরিবার পিছু একজন সদস্য থাকায় পেছনের সারিতেই থেকে যেত মেয়েরা। চিকো এখানেও পরশপাথর ছিলেন। সহযোদ্ধা ম্যারিনা সিলভা, মেরি অ্যালেগ্রেটি, জুলিয়া ফেইতোজাদের পাশে নিয়েই লড়েছিলেন। অ্যাকারের ওয়ার্কার্স পার্টি এবং ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল তৈরির পেছনে চিকোর সঙ্গে ছিলেন মেরিনা, জুলিয়া। প্রোজেক্ট সেরিঙ্গুয়েইরো শুরুর লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ যোগদান ছিল অ্যালেগ্রেটির। একটা ০.২০ সিঙ্গল রাউন্ড পরিবেশ-আন্দোলনের সঙ্গে একটা যুগকে থামিয়ে দেয়। কমিসাও পাস্টোরাল দ্য টেরা বা সিপিটি-র একটি সমীক্ষা বলছে, ১৯৯৭ থেকে ২০১৭-র ভেতর জমি ও পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যায় খুন হওয়া দেশের ৮১৮ জনের ভেতর ৭ শতাংশ প্রতিনিধি ছিলেন মহিলা। তবু, মেরিনা প্রেসিডেন্ট লুলার পরিবেশ-মন্ত্রকের দায়িত্বে থেকে অনেকটাই সামনের সারিতে পৌঁছে লড়াই করছেন। ১৯৯৩-এ তিনি মেরি অ্যালেগ্রিটো ও জুলিয়া ফেইতোজা র সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন আমাজনিয়ান ওয়ার্কিং গ্রুপ। অ্যাকারের রাজধানী রিও ব্র্যাঙ্কোয় ফরেস্ট স্কুল তৈরি করে প্রশিক্ষণ দেন তরুণদের। ২০০৪ সালে ক্ষমতায় এসে তীব্রতায় ওঠা ২.৭ মিলিয়ন হেক্টর বৃক্ষচ্ছেদন কমিয়ে ২০১৪ সালে আনেন ৫ লাখ হেক্টরে, যা আবার অন্ধকারে পৌঁছয় বোলসেনারো সরকারের আমলে। এখনও লড়াই করা চিকোর কন্যা, পরিবেশকর্মী অ্যাঞ্জেলা মেন্ডিস বলছেন, ব্রাজিলের আজকের প্রজন্ম আমাজনের থেকে সরে আসছে অনেক। তবু, চিকোর মৃত্যুর দিনেই তৈরি হওয়া চিকো মেন্ডিস কমিটি আঞ্জেলার নেতৃত্বে আরও দৃঢ় হয়ে ফরেস্ট ক্রাইমের প্রতি নজর রাখছে, নিচ্ছে পদক্ষেপ। দেশে এখনও চিহ্নিত না হওয়া ৫০ মিলিয়ন হেক্টর অরণ্য-জমির রেজিস্ট্রেশনের বৃহত্তর লক্ষ্যে এগোচ্ছে কমিটি। অ্যাঞ্জেলা বলছেন, আজকের সময়ে আসল ‘এমপ্যাটে’ সোশ্যাল মিডিয়া। প্রতি বছর ১৫ থেকে ২২ ডিসেম্বর চলছে চিকো মেন্ডিস সপ্তাহ। কারণ, ১৫ চিকোর জন্মদিন। এবং ২২ তথাকথিত শেষ।

চিকো-হত্যার কয়েক বছর পর জাপুরির ফরেস্ট রিজার্ভে দূরে চিকো মেন্ডিসের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে পরিবেশকর্মী ম্যারিনা সিলভা (ছবিসূত্র – ওপেন ডেমোক্রেসি)

সহযোদ্ধা মেরি অ্যালেগ্রেটির সঙ্গে চিকো মেন্ডিস (ছবিসূত্র – রিসার্চগেট)

চিকো-কন্যা পরিবেশকর্মী অ্যাঞ্জেলা মেন্ডিস (ছবিসূত্র – মোঙ্গাবে)

হ্যাঁ, তথাকথিত শেষ, কারণ ব্রাজিলীয় পরিবেশ আন্দোলনের এক নক্ষত্রপতনের ঘটনা, এবং ক্রিসমাসের আলোয়, ব্যস্ততায় ঢেকে গিয়ে স্রেফ সাধারণ একটি গ্রামীণ হত্যাকাণ্ড না হয়ে চিকো-হত্যা গোটা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দেওয়া অন্যতম এক পরিবেশ-অপরাধ হয়ে বেঁচে আছে। দীর্ঘ জেল পেরিয়ে খুনে র‍্যাঞ্চারেরা পৃথিবীতে ঘুরলেও দাপট অনেকটাই কমেছে তাদের। চিকো হত্যার দিন স্মরণীয় সতীর্থ লুলা ডিসিলভার সেই কথাগুলো –‘চিকোকে মেরে ওরা ভেবেছে লড়াই থামিয়ে দেবে, ওরা এতটাই বোকা! আমাদের তো এটাই লড়াইকে ছড়িয়ে দেওয়ার সময়!’ মনে পড়ছে ঐতিহাসিক জাপুরি লেটারের কথা। ২০১৮-র ১৫ থেকে ১৭ ডিসেম্বর চিকো-হত্যার তিরিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে অ্যাকারসহ গোটা দেশের প্রায় ৫০০ জন রবার ট্যাপার, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি এবং জাপুরির ইউনিয়ন হলের ঐতিহাসিক সমাবেশ –‘চিকো মেন্ডিস থার্টিন্থ অ্যানিভার্সারি মিটিং – আ মেমোরি টু অনার, আ লেগ্যাসি টু স্ট্যান্ড-আপ ফর’। তিরিশ বছরকে মনে রেখে তিরিশজন তরুণ এক্সট্র্যাক্টিভিস্ট এবং তিরিশজন কমিউনিটি লিডার মঞ্চে উঠে এসে হাতে হাত ধরে আগামী তিরিশ বছর ধরে চিকো মেন্ডিসের স্বপ্ন ও আমাজন অরণ্য বাঁচিয়ে রাখার শপথ নেন। ঐতিহাসিক জাপুরি লেটার চিৎকার করে পড়েন চিকোর বন্ধু, অভিনেত্রী লুসেল্লা স্যান্টোস। জাপুরি লেটার শেষ হচ্ছে এভাবে – ‘আমরা অরণ্যের বাসিন্দাদের জন্য জোটবদ্ধ হতে কখনও ভুলব না। আমরা চিকো মেন্ডিসের লেগ্যাসি থেকে কখনও সরে আসব না। আমরা একে ওপরের হাত কখনও ছেড়ে দেব না …’

 

এবং এখানেই প্রতিধ্বনি হচ্ছে চিকোর সেইসমস্ত বহু ব্যবহৃত অথচ তীব্র প্রাসঙ্গিক কথাগুলো – ‘আমি প্রথমে ভেবেছিলাম আমি রবার গাছ বাঁচাতে লড়ছি, তারপর মনে হল আমি আমাজন রেইনফরেস্ট বাঁচাতে লড়ছি। এখন আমি বুঝতে পারছি আমি আসলে মানবতাকে বাঁচাতে লড়াই করছি …’

 

 

 

 

 

 

 

 

ওপরে জাপুরি সমাবেশের দৃশ্য, নীচে সেই জাপুরি লেটার (তথ্যসূত্র – ডব্লুডব্লুএফ)

 

 

ঋণস্বীকার

 

১. Beekmans, Sarah. Chico Mendes heroes of the Amazon forest rescue. 2017. sarahbeekmans.com.

২. Brandao, Frederico. Xapuri Letter launches thirty-year commitment to fight for the forest. December 19, 2018. WWF.

৩. Brooke, James. Why they killed Chico Mendes. August 19, 1990. New York Times.

৪. Conti, Carolina (Trans. by Johnson, Maya). ‘Brazilians are not familiar with the Amazons’: Q&A with Angela Mendes. September 1, 2022. Mongabay.

৫. Dwyer, Augusta. Into the Amazon: the struggle for the rain forest. April 16, 1991. Random House Incorporation.

৬. Eliane, Brum. How a small city in the Amazon reveals the strength of the far-right in Brazil. March 7, 2024. El Pais English.

৭. Ensign, Olivia. 1977-88: Brazilian rubber tappers campaign against deforestation. February 28, 2010. Global Nonviolent Action Database.

৮. Evans, Kate. Martyr of the Amazon: the legacy of Chico Mendes. November 5, 2013. Forests News.

৯. Fearnside, Philip. Extractive reserves in Brazilian Amazonia. June, 1989. BioScience.

১০. Garcia-Navarro, Lulu.Deep in the Amazon, an unseen battle over the most valuable trees. November 4, 2015. National Public Radio.

১১. Gaworecki, Mike. NYT explores life and impact of Chico Mendes, ‘a Fighter for the Amazon’. November 28, 2016. Mongabay.

১২. Hemming, John. In defense of the last frontier. August 11, 1990. The Washington Post.

১৩. Hill, David. 25 years after Chico Mendes, killings in the Amazon are endemic. April 2, 2013. The Guardian.

১৪. Hofmeister, Naira. Conflict in the Chico Mendes Reserve threatens this pioneering Amazonian project. January 16, 2020. Mongabay.

১৫. Lillanilla, Marc. Learn about the life and death of activist Chico Mendes. October 30, 2020. Treehugger.

১৬. Maisonnave, Fabiano. Brazil slows deforestation, but in Chico Mendes’ homeland, it risks being too late. September 27, 2023. AP News.

১৭. Mendes, Chico. Fight for the forest: Chico Mendes in his own words. August 1, 1989. Latin America Bureau.

১৮. Obadowski, Bruna & Jarrah, Ahmad. Is Chico Mendes’s dream for Brazil’s Amazon still possible? August 25, 2023. Earth Journalism Network.

১৯. On trial in Brazil: rural violence and the murder of Chico Mendes. December 1, 2023. Human Rights Watch.

২০. Partlow, Joshua. An Amazon icon’s town is a shrine frozen in time. October 11, 2008.

২১. Pinto, Debora (Trans. by Rinaldi, Matt). In famed Chico Mendes reserve, Brazil nut harvesters fight to save the forest. April 22, 2020. Mongabay.

২২. Revkin, Andy. Amid Brazilian turmoil, revisit my exploration of the legacy of Amazon forest defender Chico Mendes with radio legend Studs Terkel. June 9, 2023. Sustain What.

২৩. Rocha, Jan & Watts, Jonathan. Brazil salutes Chico Mendes 25 years after his murder. December 20, 2013. The Guardian.

২৪. Rodriguez, Gomercindo (Trans. by Rabben, Linda). Walking the forest with Chico Mendes: Struggle for justice in the Amazon. September 1, 2007. University of Texas Press.

২৫. Shanley, Patricia, Cristina Da Silva, Fatima, MacDonald, Trilby &Silva, Murilo da Serra. Women in the wake: Expanding the legacy of Chico Mendes in Brazil’s environmental movement. November, 2018. Desenvolvimento e Meio Ambiente.

২৬. Shoumatoff, Alex. Murder in the rain forest. November 4, 2013. Vanity Fair.

 

(ক্রমশ)

 

 

Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *