সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ২৮। বরুণদেব
বারবার প্রিয়নাথ ও মতিলাল দুই ভাইয়ের মতবিরোধ হয়েছে। মতিলাল সার্কাস-সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। শেষবার ১৯০৯ সালে সে সম্পর্ক ছিন্ন হলে প্রিয়নাথ ‘প্রফেসর বোসের গ্রাণ্ড সার্কাস’ নাম দিয়ে স্বতন্ত্র দল গড়লেন। বেড়িয়ে পড়লেন ভারতববর্ষের বিভিন্ন জায়গায়। বহুমূত্রে ভোগা মতিলাল ১৯১০ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র মণিলাল বসু এক বছর ধরে মতিলালের সার্কাসদল চালালেন। সহযোগিতায় এক প্রসিদ্ধ সার্কাসশিল্পী উইলিয়াম ব্যাংকুয়ার। ‘অ্যাপোলো’স ইউরোপিয়ান সার্কাস’ নামে সে দল কিছুদিন মালয় উপদ্বীপ, সুমাত্রা ঘুরে জাভায় এসে উপস্থিত হলো। ততদিনে সে সার্কাসের এমনই দৈন্যদশা যে তা উঠে যাবার উপক্রম হলো। ১৯১২তে মণিলাল সে দলকে কলকাতায় ফিরিয়ে এনে লোকজন জোগাড় করলেন। জোগাড় করলেন জন্তু জানোয়ার, সাজসরঞ্জাম। কিন্তু উপযুক্ত কাণ্ডারীর অভাবে সে সার্কাসের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি হলো। সার্কাসের লোকজন সার্কাস ছাড়ল। জন্তু জানোয়ারগুলিকে এক বছর ধরে রাখলেন। উপায়ন্তর না দেখে কাকা প্রিয়নাথের সঙ্গে জুড়ে সার্কাস চালানোর প্রস্তাব দিলে প্রিয়নাথ ভাইপোর সঙ্গে হাত মেলালেন। শয়নে স্বপনে নিদ্রায় জাগরণে যে মানুষের শুধুই সার্কাস, সে কি সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে! একদিন স্ত্রীর মৃত্যুশোকও অবলম্বন করেছিলেন সার্কাসকে- ‘মিরেট থেকে আমি বাড়ি গিছ্লেম-প্রায় ১৫/২০ দিন ছিলেম- বাবা বিস্তর টাকা খরচ করে, বড় বড় ডাক্তার দেখালনে; সকলে যমের সহিত যুদ্ধ করলেম – কিন্তু যখন দেখ্লেম, ‘এ বিষম জ্বর আরাম করা শিবের অসাধ্য’- প্রসিদ্ধ ডাক্তার হীরালাল বাবু যখন মৃত্যু অনিবার্য্য ব’লে জবাব দিলেন, তখন সে অন্তিম দৃশ্য দেখ্বার জন্য আর কিছুতেই কলিকাতায় থাক্তে পার্ল্লেম না – বহু কষ্টে প্রবোধ দিয়ে তাকে বাপের বাড়ী পাঠাবার ব্যবস্থা ক’রে আবার পশ্চিম প্রদেশে ছুটে এলেম। কিন্তু হায় মামা! যা ভেবেছিলেম্ তাই হ’লো, অল্প দিন পরেই টেলিগ্রাম এলো- সে সোণার কমল অকালেই শুকায়ে গেছে!’
কাকা-ভাইপোর দল রওনা দিল পিনাং। তিন বছর ধরে মালয় উপদ্বীপ, জাভা, সুমাত্রার নগরে নগরে সার্কাসের তাঁবু পড়ল। ১৯১৫-র দিকে ইউরোপে মহাযুদ্ধ বাঁধল। চতুর্দিকে দুর্মূল্য, ব্যয়সঙ্কোচ। অনেক সার্কাসদল বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে গেল প্রিয়নাথের সমসাময়িক কৃষ্ণলাল বসাকের হিপোড্রোম সার্কাস। প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস কিন্তু অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলল। তিন বছর বিদেশে কাটিয়ে দেশে ফিরলেন সার্কাসদল নিয়ে। ইতিমধ্যে কাকা-ভাইপোর মধ্যে মতভেদ তীব্রতর হয়ে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মণিলাল আর বিদেশ যেতে চাইলেন না। প্রিয়নাথের হাজারো উপদেশ, সাবধান বাণী তাঁকে ফেরাতে পারল না। দ্রুত ধ্বংসের পথে এগিয়ে গেল প্রিয়নাথের সার্কাস।
প্রিয়নাথ তখন নিঃসম্বল হয়ে গিয়েছেন। বয়স থাবা গেড়েছে শরীরে। কিন্তু সার্কাসের তাঁবুই তাঁর বাণপ্রস্থ। হাত বাড়িয়ে দিলেন এক বন্ধুপুত্র। কাদি কাদের দাদ। তৈরী হলো প্রফেসর বোসের গ্রাণ্ড সার্কাস। চললেন সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুরে গিয়ে প্রিয়নাথ জণ্ডিসে আক্রান্ত হলেন। কাজি কাদের দাদ তাঁকে কলকাতা ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু সার্কাসের গুরুদায়িত্ব ছেড়ে কলকাতায় ফিরতে রাজি হলেন না প্রিয়নাথ। সার্কাস তখন মালয়শিয়ায়। চিকিৎসার সুবিধার জন্য প্রিয়নাথ সিঙ্গাপুরে আসতে রাজি হলেন। সেখানকার চিকিৎসকরা, যাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক ডক্টর গ্যালওয়ে, চিকিৎসা করতে লাগলেন প্রিয়নাথের। চিকিৎসায় সাড়া মিলল না। ১৯২০-র একুশে মে সিঙ্গাপুরে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব গুণগ্রাহীদের থেকে বহুদূরে নিঃসঙ্গ প্রিয়নাথ বসু বাঙালির সার্কাসের এক অধ্যায় হয়ে ইতিহাস হয়ে গেলেন।
প্রিয়নাথের মৃত্যুর পর কাজি কাদের দাদ সার্কাসকে টিকিয়ে রাখার বহু চেষ্টা করেন। হিপোড্রোম সার্কাস থেকে অবসর নেওয়া কৃষ্ণলাল বসাককে ম্যানেজার নিযুক্ত করে, অনেক অর্থব্যয় করেও টিকিয়ে রাখতে পারলেন না প্রিয়নাথের সার্কাসের তাঁবু।
বিনয়ী, বন্ধুবৎসল, পরিহাসপটু প্রিয়নাথ দেশে বিদেশে যেখানেই গিয়েছেন, তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বন্ধুবলয়। দুঃখে দুর্দিনে, বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে উপস্থিত বুদ্ধি বিবেচনা, আপন হৃদয়বত্তা দিয়ে সমাধান করেছেন সমস্ত সার্কাসীয় সমস্যার। সার্কাসের লোকজন, জীবজন্তু তাঁর কাছে ছিল একটি পরিবার, যে পরিবারের গৃহকর্তা তিনি। অন্য সার্কাস দলের লোকজনদের প্রতিও ছিল তাঁর মমত্ব, যা তাঁকে সার্কাস এরিনায় এক অনবদ্য চরিত্র করে তুলেছিল, যে চরিত্রের আকর্ষণে অন্যরা মায়ামুগ্ধ হয়ে থাকতেন। এটাই তাঁর দীর্ঘ সাফল্যের চাবিকাঠি। ১৮৮৭ থেকে ১৯২০ পর্যন্ত, এই সুদীর্ঘ তেত্রিশ বছরের সময়কালে অনেক সার্কাসের আবির্ভাব ও তিরোধান হয়েছে। প্রিয়নাথ বোসের সমকালীন বা পরবর্তী সময়েও বাঙালিরা সার্কাসের দল গঠন করেছেন কিন্তু কৃষ্ণলাল বসাকের হিপোড্রোম সার্কাসের চোদ্দ বছর সময়কাল ছাড়া আর সকল সার্কাসদলই ছিল ক্ষণজন্মা।
মতিলাল মিত্র, রাখাল চন্দ্র দাঁ, গিরিশচন্দ্র শ্রীমানী, বিহারিলাল মিত্র দে – এই ক’জন মিলে প্রিয়নাথের সিমলের আখড়ার পিছনে খুলেছিলেন ‘ইউনাইটেড ইণ্ডিয়ান সার্কাস’ নামে এক আখড়া। তা ছিল ক্ষীণজীবী। সে আখড়া বন্ধ হলে বিহারিলাল মিত্র গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের ম্যানেজার পদে যোগ দেন। মতিলাল মিত্র আমৃত্যু প্রিয়নাথের সার্কাসের অশ্ব ও হিংস্র জন্তুর প্রশিক্ষক ছিলেন। রাখালচন্দ্র দাঁ ‘আগাসীর সার্কাস’ নামে এক মারাঠি সার্কাসের কাজে যোগ দেন। প্রবোধচন্দ্র সী নামে এক ভদ্রলোক কিছুদিন ‘সী সনস সার্কাস ‘ চালান, পরে প্রিয়নাথ সে সার্কাস কিনে নিয়েছিলেন। উড়িষ্যার এক রাজা ‘অলরাজ সার্কাস’ নামে এক সার্কাস খুলেছিলেন। কৃষ্ণলাল বসাক ঐ দলের ম্যানেজার। এ সার্কাসের আয়ুও ছিল কম। মহারাজ মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর উদ্যোগে ‘মরহাট্টা সার্কাস’ সুতিকাগারেই বিনষ্ট হয়। সিমুলিয়া পল্লীর নারায়ণচন্দ্র বসাকের সার্কাস, বেণীমাধব মুখার্জীর মুখার্জিস সার্কাস, বসুমতী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সার্কাস, রয়্যাল বেঙ্গল সার্কাস, রিং লিং সার্কাস, অনেক ছোটো ছোটো সার্কাসদলের জন্ম হয়েছিল কলকাতায়। তারা সকলেই ছিল ক্ষীণজীবী।
বোসের সার্কাস উত্তরকালে মাঝে মাঝে কিছু বিদেশী শিল্পীকে তাঁবুতে স্থান দিলেও, পরিচালনা থেকে পশুশিক্ষা, অশ্বারোহীর খেলা থেকে ট্রাপিজের খেলা সব বিভাগেই সে সার্কাসে বাঙালির বিজয়পতাকা। প্রিয়নাথের সার্কাস সেই সময়ের বাংলায় একদিকে যেমন গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, আর এক দিকে ব্র্যান্ড তৈরী করে শিল্পীদের গৌরবান্বিত করেছে। প্রিয়নাথ অর্জিত অর্থ থেকে দানধ্যান করেছেন দেশের একাধিক বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, মঠ মন্দির, ধর্মশালা, সভাসমিতিতে। ‘মন্বন্তরে মরি নি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি’-র দেশে মহামারি তহবিলে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে প্রিয়নাথের সার্কাস। দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ প্রিয়নাথ নবীন বাংলার জাতীয় জাগরণের ধ্বজা উড়িয়েছেন সার্কাসের তাঁবুতে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্য ও শেষ ভাগে জাতীয় স্বার্থে সার্কাস তাঁবুগুলি ব্যবহৃত হলো। প্রফেসর বোসের সার্কাস বর্ধ্মানে প্রদর্শনী করতে গেলে বর্ধ্মানের রাজা সার্কাসের সঙ্গে সদ্যোজাত জাতীয়তাবাদকে জুড়ে দিলেন, তাঁর নির্দেশে প্রদর্শনীর শুরুতে তাঁবুর সকলে গেয়ে উঠল- বন্দেমাতরম। পরাধীন ভারতে সার্কাসদলের ম্যানেজাররা ক্যাম্পের অনুমতির জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন। ব্রিটিশ কতৃপক্ষও সার্কাসদলগুলিকে পারমিট দিয়ে তাদের প্রদর্শনী দেখানোর সাহায্য করতেন। সেসব ক্যাম্পে সার্কাসদলগুলি বৃটিশ সম্ভ্রান্তদের জন্য আলাদা করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করত। প্রফেসের বসু ১৯০৯ সালে ক্রাউন প্রিন্স অফ তিপ্পেরার Tipperah জন্য পৃথক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন- প্রথম দু’দিন গভর্নর, ম্যাজেস্ট্রেট ও তাদের পরিবারের মনোরঞ্জনেরজন্য, তৃতীয় দিন ছিল ত্রিপুরার রাজপরিবারের জন্য, বাকি দিনগুলি জনগণের। ব্রিটিশ মিডিয়া ভারতীয় সার্কাসের খবর প্রচার করলে ভারতীয় সার্কাসের কথা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।
আর এই স্বদেশী সার্কাস কেবল যে তখনকার ইউরোপীয় সার্কাসের সমকক্ষ ছিল তাই না , অনেক ইউরোপীয় সার্কাসদলের কাছে ঈর্ষনীয়ও ছিল। ঘরে বাইরে বাঙালি যখন দুর্বল অযোগ্য বলে পরিগণিত, পরিহাসের পাত্র, সেই অন্ধকারাচ্ছন্নময় সময়ে প্রিয়নাথ ও মতিলালের সার্কাসযাপন বাঙালিকে দেশে বিদেশে গৌরবের মুকুট পড়াতে বাধ্য করেছে।
(ক্রমশ)
