রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ২৫। অনুবাদে অর্ণব রায়
আরও একটা অত্যন্ত খারাপ ধরণের শোষনের উপায় রয়েছে। যদিও খুব বেশী দেখা যায় না, আমাকে বলা হয়েছে এই উপায় অসম্ভব বা খুব বিরল নয়। উপায়টি হল, ঘোষণা করে দেওয়া যে কোনও জমিতে রায়তের আগের বছরের ভাড়া বাকী রয়েছে। বা অনেক সময় বলে দেওয়া হয় আগের বেশ কয়েক বছরের ভাড়া বাকী রয়ে গেছে। এবারে সেই হতভাগ্য চাষীর অজ্ঞতার কারণে এই বিষয়ে খুব বেশী বিরোধিতা করার অবকাশও থাকে না। সব কিছু কিন্তু খাতায় কলমে লেখা রয়েছে! ম্যাজিক শো তে যখন ম্যাজিশিয়ান একটা হাঁসকে সবার চোখের সামনে নিজের পকেটে ভরে দিয়ে পাশের লোকটার পকেট থেকে বের করে আনে, আর চোখের সামনে তাকে এই কাজ করতে দেখা সত্ত্বেও লোকে কিছুই প্রমান করতে পারে না। সেরকমই রায়ত যদি জমিদারের দাবী বেআইনী প্রমান করতে চায়, তার পক্ষে সেইসব খাতাপত্তর উদ্ধার করা ওই হাঁস উদ্ধার করার থেকেও কঠিন কাজই হবে। আবার এরকমও হতে পারে, জমিদারের দাবী সম্পুর্ণ মিথ্যা নয়। যতই অন্যায় হোক। হয়ত তার বাবা বা কাকা কোনওকালে সত্যিই কিছু টাকা ধার নিয়েছিল। নিয়ে হয়ত ভুলেও গেছে। সেই ঋণ এত বছরে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদে আসলে ফুলেফেঁপে বেড়ে এতটাই হয়ে গেছে যে চাষীর সর্বনাশ ঘনিয়ে এসেছে।
জমির অধিকার নিয়ে বিবাদ উপস্থিত হলে বা অন্য কোনও রকম মামলার ক্ষেত্রে অবসম্ভাবীভাবেই জমিদার জেতে। কেননা, শুনতে যতই খারাপ লাগুক, প্রজাদের মধ্যে শিক্ষার অভাব এবং নৈতিকতার অভাব এই দুইয়ের কারনে তাদের সাক্ষ্য কিনে নেওয়া দুঃখজনকভাবে অত্যন্ত সোজা ব্যাপার, যার কাছে টাকা আছে সেই পারবে। যে চাষী জমিদারের অধীনে কাজ করে বা তার কাজ থেকে বেরিয়ে গেছে, কয়েক আনা পয়সার জন্য এবং জমিদারের প্রতি ভয়ে-ভক্তিতে তাকে যা শেখানো হবে আদালতে গিয়ে শপথ করে হুবহু সেকথা গড়গড় করে বলে চলে আসবে। তবে এসব ক্ষেত্রে এরকম মামলা মোকদ্দমা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কেননা, যদিও সাধারণের মধ্যে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে এদেশের লোকেরা মামলাবাজ হয়, কোর্ট-কাছারির ঝামেলা পছন্দ করে। কিন্তু আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, সেটাও তারাই পছন্দ করে যাদের এসব করার দম আছে, টাকাপয়সার দিক থেকে যারা জমিদারদের সাথে টক্কর দিতে পারে। গরীব রায়ত ‘মোকদ্দমা’-র নাম শুনলেই হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে। অন্যান্য শোষনের যে রাস্তাগুলো, আমি ইতিমধ্যেই বলেছি, বড়মানুষের বাড়ির যে কোনও অনুষ্ঠান হোক না কেন (যেহেতু সাধারণ মানুষের সাথে এসব অনুষ্ঠানের কোনও আত্মিক যোগ নেই, তাদের কাছে হাস্যকর মনে হয়), গরীব দুর্ভাগা চাষীর ওপরে তার খরচের বোঝা কিছুটা চাপবেই।
আর যে বছর খারাপ ফসল হয়, চাষী সময়ে ভাড়া দিতে পারে না, স্বাভাবিকভাবেই চাষীর যে সামান্য জমিজমা আছে, সেটা বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু যদি সেটাও যথেষ্ট না হয়? চাষীর দারিদ্র্য দেখে মনে হয়, সেরকমটা হওয়া খুবই সম্ভব। সেক্ষেত্রে ক্ষতির বোঝাটা জমিদারের ওপর গিয়ে পড়ে।
যেহেতু ‘দুর্বলের হাতিয়ার চালাকি’, তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, মাঝে মাঝে জমিদারও ঠকে যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে, পুরো সিস্টেমটায় আরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে যার ফাঁক দিয়ে এই চালাকিগুলো প্রবেশ করতে পারে। প্রথমতঃ মূল্যবোধের দূর্বলতা। মূল্যবোধের দুর্বলতা আসে ব্যাক্তিত্বের দুর্বলতা থেকে। এই ব্যাক্তিত্বের দুর্বলতা হল যুগ যুগ ধরে হতাশা সহ্য করার ফল। ব্যাক্তিত্বের দুর্বলতা থেকে আসে মানসিক ও শারীরিক অনীহা। আর তাই জমিদার আর মহাজনরা মনে মনে ঠিক করে নেয় যে এই অনিচ্ছুক চাষীদের থেকে সময়ে টাকা আদায় করার ও নিজেদের ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য তারা যে শোষনমূলক নীতি চালায়, তার প্রয়োজন আছে বলেই করে। সুতরাং, যদিও এখন আগ্রাসন দু তরফেই দেখা যায়, সময়ে সময়ে উভয়েই আক্রমণ ও আত্মরক্ষা করে থাকে, কিন্তু একথা প্রায় ঘোষিতভাবেই সকলে জানে যে এই আগ্রাসনের সূত্রপাত মূলতঃ উচ্চশ্রেণীর সম্পুর্ণ বিবেকহীন লোভী আচরণ থেকেই। মিঃ এফ— চাষীদের মধ্যে কাজ করার কুড়ি বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন যে, সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে এমন কোনও মানুষ নেই যে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দয়া, ভালো ব্যাবহার আর ন্যায়বিচার পেলে অভিভূত হয়ে যাবে না; কিন্তু দিনের পর দিন তাদের ভালো হওয়ার প্রবণতাকে নিরুৎসাহ করা হয়েছে, দিনের পর দিন সেই স্বার্থপর সত্ত্বার দ্বারা শোষিত হয়ে বিকৃত ও দূর্ণীতিগ্রস্থ হয়ে গেছে। সেই শোষক সত্ত্বা কখনও স্বপ্নেও এদের ভালো করার কথা ভাবেনি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে চাষীদের অবস্থা ঋণদাস বা ক্রীতদাসের থেকে ভালো কিছু নয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তাদের তাদের বর্তমান অবস্থা যে আরও খারাপ হয় নি, সেটা ভেবেই তারা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে থাকে।
দেশীয় জমিদারদের কথা যথেষ্ট হল। এরপর আমি ধরে নিচ্ছি, জমিদারদের জায়গায় ইউরোপীয়রা রয়েছে। আর আমাকে নিশ্চই একথা বলে দিতে হবে না তাদের কাজকর্ম চালানোর পন্থা বা দরিদ্র প্রজাদের প্রতি তাদের মানসিকতা সবটাই তাদের শিক্ষা এবং চারিত্রিক বলের ওপর নির্ভর করে থাকে। সুতরাং, প্রজাদের ওপর একজন জমিদারের যে প্রবল আধিপত্য, চাইলে তিনি যে পরিমান কাজ প্রজাদের জন্য করতে পারেন, তার ওপর ইউরোপীয় হওয়ার যে সুবিধে, সব মিলিয়ে, একটু আগে যেরকম বললাম, তিনি বিপুল সংখ্যক মানুষের মানুষের কাছে আশির্বাদও হতে পারেন, আবার অভিশাপও হতে পারেন। উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতা বা সিস্টেমের মধ্যের ভূত কিন্তু খাতায় কলমে একই থাকে। তফাতটা হয়ে যায়, যিনি সিস্টেমটা চালাচ্ছেন, তার ভেতরে কতটা শিক্ষা আর প্রজাদের ভালো করার ইচ্ছা রয়েছে যা ক্ষমতা ব্যবহার করার সময় তার মনটাকে প্রভাবিত করছে। সুতরাং আমরা জানি ঠিক কোনদিকে অধিক দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যায় আর আমরা আর একটু বেশী আত্মবিশ্বাসের সাথে আশা করতে পারি যে সেইসব দায়িত্বগুলি যথাযথভাবে পালন করা হবে।
এখানে নানাদিক থেকে দেখে মন্তব্য করা যেতেই পারে যে দেশী কর্তৃপক্ষের থেকে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষের হাতে প্রজাদের শোষিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। কারণ, দেশীয় জমিদার শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষার অভাব। বছর কুড়ি আগে একজন লেখক লক্ষ্য করেছিলেন, কোনও ইউরোপীয় যদি দেশীয় প্রজাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছেন, তাহলে সেই অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্য কিন্তু শুধু ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। তার সামাজিক আচরণ বা ধর্মবিশ্বাস তার প্রজাদের ওপর কোনও প্রভাব ফেলে না। অন্যদিকে দেশীয় জমিদারের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো।
আর একটা কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্ল্যান্টার ও জমিদারের থেকে যে টাকা আদায় করা হয় তার বেশীরভাগ অংশটাই যায় অধঃস্তন কর্মচারী বা দালালদের পকেটে। এরা সবাই প্রতিষ্ঠানের অফিসার বা কর্মচারী। আর হয় প্রচলিত প্রথা বা সাধারণের বিশ্বাস, কোনও একটা কারণ হবে, ধরেই নেওয়া হয় এই মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা আসলে প্রভূদের মতই ক্ষমতা ধরে। এই ধারণার অপব্যবহার করে এরা রায়তের কাছে যা ইচ্ছে কর আদায় ও অন্যান্য উপায়ে শোষণ করে থাকে। আর সেই হতভাগ্যরা পাছে আরও ক্ষতি হয়, এই ভয়ে সব রকমের অত্যাচার মুখ বুঁজে সহ্য করে যায়। এই ব্যাপারটার ওপর কতদূর নিয়ন্ত্রণ আনা যায় এখন সেটাই প্রশ্ন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। এই শয়তানকে থামানোর জন্য যা যা প্রতিকার নেওয়া সম্ভব, তা কি সত্যিই নেওয়া হয়েছে? আমার এ ব্যাপারে বলার যোগ্যতা নেই। কিন্তু আমি তোমাদের সামনে কিছু ছবি তুলে ধরব প্রতিদিন খোদ কলকাতাতে, আমাদের সকলের নাকের ডগায় কী কী ধরণের কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়। কলকাতার মত ছোট্ট বাড়িটিতেই যদি এই হাল হয়, তাহলে বাইরের পৃথিবীর বিস্তৃত মাঠে কী অবস্থা হবে!
(ক্রমশ)
