রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ২৭। অনুবাদে অর্ণব রায়
এবারে আমরা যাকে বলে পুরো বিষয়টার যাকে বলে একেবারে গোড়ায় এসে উপস্থিত হয়েছি— প্ল্যান্টার আর রায়তের মধ্যে সম্পর্ক। আর এটা বলতে গিয়ে আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে পত্তনীদার হিসেবে প্ল্যান্টারদের ভূমিকাতে। আমি আগেই বলেছি, এই পত্তনীদারদের ওপরেই সমস্ত জমিদারীর ভারটা ন্যস্ত থাকে— চাষজমি ও সেই জমিতে চাষ করা প্রজা সমেত। এই পয়েন্টে এসে বারবার বলা হয়েছে, একজন পত্তনীদার কোনও জমিদারী ইজারাতে নিলে তার প্রজা, যাদের জমিতে ও যাদের দ্বারা নীলচাষ করানো হবে, তাদের ওপর তার কোনও অধিকার জন্মায় না, অন্ততঃ জন্মানো উচিৎ না। মন এতে অনিচ্ছায় সায় দেয়। কিন্তু এই কথা বলার সাথে সাথে আমরা আইন-প্রণেতাদের এলাকায় ঢুকে পড়ি, যারা সবসময়ই বলে কী হওয়া উচিৎ, লেখকের এলাকায় নয়, যে বলে আসলে কী হচ্ছে। ভারতে বহু আগে থেকে কিছু সিস্টেম আর রীতি-রেওয়াজ গড়ে উঠেছে, যেগুলো এখনও পুরোমাত্রায় বহাল। এইসব রীতিরেওয়াজ এমন সব পরিস্থিতি এবং সামাজিক বিন্যাসের মধ্যে গড়ে উঠেছে, ইংরেজদের জীবন বা ইতিহাসে কোথাও তার সমান্তরাল কোনও কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার সব পরিস্থিতিই সাবধানতার সঙ্গে এবং ধৈর্যের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিৎ। যে সমস্যা ইতিমধ্যেই এত বড় আকার ধারণ করে আছে, আর ভবিষ্যতেও আরও বড় হবে বলেই ধারণা করা যাচ্ছে, তার প্রতিকার বা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কিছুটা বেশী সময় ও ধৈর্য্য তো লাগবেই। আমার উদ্দেশ্য পরিস্থিতি কেমন আছে, সেটা দেখানো। অন্যরকম আইনের শাসনে কেমন হতে পারত, সেটা দেখানো নয়। দাবার বোর্ডের কয়েকটা চাল পাল্টে ফেলার মত কিছু আইন বদলে ফেললাম, কিছু লোকের পারস্পরিক অবস্থানকে এদিক ওদিক করে দিলাম, আর এর পর থেকে মানুষজন আর তাদের পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেল, এমনটা না ভাবাই ভালো। এতে করে চাষীর যে ক্ষতিটা হয় সেটা হয় পুরোপুরি প্ল্যান্টারদের অজ্ঞাতসারে, অথবা যতটা তারা অনুমতি দিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশী পরিমানে। ফলে যে চাষী এমনিতেই চাষের কাজে অনিচ্ছায় শ্রম দিচ্ছিল, তাদের মধ্যে একেবারে যাকে বলে বিতৃষ্ণা দেখা দেয়। তা সে সেই কাজের পারিশ্রমিক পাক বা না পাক। আচ্ছা, এই যে আমার পর্যবেক্ষণ, এটা কিন্তু কেবলমাত্র পুরোনো ভাড়াটেদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, নতুন ভাড়াটেদের ওপর নয়। নতুন যারা জমি ইজারা নিচ্ছে, ঠিক একজন ইংরেজ চাষী যখন জমি ইজারা নেয়, তারা কিন্তু পুরো পরিস্থিতিটা সম্যকভাবে জেনেবুঝেই ইজারা নিচ্ছে। আরও একটা কথা, যে সমস্ত চাষী স্বতন্ত্রভাবে তাদের জমি প্ল্যান্টারদের ইজারা দিচ্ছে আর তারপরেও নীলচাষ করিয়ে সেখান থেকে লাভ তুলছে, তাদেরও আমি আমার এই পর্যবেক্ষণ থেকে বাদ দিচ্ছি। এদের ক্ষেত্রে ইজারা দেওয়া বা নেওয়াটা সম্পুর্ণ স্বেচ্ছায় হতে হয়। এদিকে প্ল্যান্টার কিন্তু শুরু থেকেই ঘোষনা করে দেয় যে সে এই যে জমিদারীর ওপর স্বত্ত্ব নিচ্ছে, এর মানে কিন্তু জমি দখল করা ততটা নয় যতটা সেই জমিতে যে ফসল হবে তার মধ্যে নিজের যতটা ন্যায্য অধিকার, অর্থাৎ তারই টাকা নিয়ে তারই হয়ে রায়তে যে ফসল ফলাচ্ছে সেখান থেকে তার যে ন্যায্য ভাগ, সেটাকে ঠিক সময়ে ঠিকঠাক ভাবে পাওয়া। কেননা আমি ইতিমধ্যেই ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছি যে বাংলায় রায়তদের পরিশ্রমের জন্য অগ্রিম টাকা ধরে না দিলে কোনও ফসলই ব্যাপকভাবে চাষ করা সম্ভব নয়। এই সিস্টেম গোটা ভারতেই প্রচলিত। আর যে সব গ্রামে প্ল্যান্টারদের প্রভাব বা ক্ষমতা কম, সেই সব গ্রামে রায়তদের এরকমভাবে অগ্রিম টাকা দিলে, বলা হয়, হয় রায়ত চুক্তির খেলাপ করবে নয়ত জমিদারে বেআইনিভাবে গায়ের জোর খাটাবে— মোদ্দা কথা, প্ল্যান্টারের টাকা সম্পুর্ণ ডুববে। আর এখানেই অসংখ্য প্রশ্নাবলীর যে অনন্ত ডালপালা, তার একটি শাখা বেরিয়ে আসে। হামেশাই দেখা যায়, এই জমিদারশ্রেণী রায়তদের উস্কাচ্ছে প্ল্যান্টারের হয়ে নীলচাষ করার বিরোধিতা করার জন্য, হয় চুক্তির খেলাপ করে না হয় ঝগড়া ঝামেলা করে। তাদের নানারকম স্বার্থ এর মধ্যে জড়িত আছে, সেই জন্যেই তারা এরকম করছে। তাই প্রায়শই প্ল্যান্টারদের বলতে শোনা যায়, নীলচাষের বিরোধিতা দরিদ্র মানুষদের থেকে ধনীদের থেকে বেশী করে আসে। অবশ্য কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে না যে এটিই তার একমাত্র তথ্যসূত্র। তাহলে বলতে হয়, সমস্ত প্ল্যান্টাররাই একরকম আর চাষীদের থেকে যে সমস্ত অভাব অভিযোগের কথা শোনা যায়, সব অসত্য। অথবা বলতে হয়, প্ল্যান্টাররাই ভূল। যারা মাঝখানে নাক গলাচ্ছে তাদের মনে চাষীদের জন্য করুণা আর ন্যায়বিচারের বান ডাকছে, তাই তারা এরকম করছে। তবে এরকম একপেশে পরিস্থিতি কখনোই হবে না, যতক্ষণ না সমস্ত ইংরেজদের পিঠে দেবদূতের মত ডানা গজাচ্ছে আর সমস্ত দেশী লোকের পায়ে শয়তানের মত খুর দেখা দিচ্ছে। বাংলার দরিদ্র শ্রমজীবি মানুষের দুর্ভাগ্য এটা নয় যে তারা এমন একটা শ্রেণীর সম্পুর্ণ অধীনে আছে যারা তাদের ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে, বরং তাদের দুর্ভাগ্য হল শিক্ষার সম্পুর্ণ অভাব, যার জন্য তাদের মধ্যে কোনও ধারাবাহিকতা নেই, তাদের কথার কিচ্ছু ঠিক নেই। যারা একবর্ণও পড়তে জানে না, তারা কীভাবে যাদের মাধ্যমে তাদের চুক্তিগুলো সম্পাদিত হচ্ছে তাদের ওপর সামান্যও নিয়ন্ত্রণ রাখবে? আর শিক্ষাদীক্ষা বিচারবুদ্ধি একেবারে না থাকার কারনে তারা নিজের থেকেই এমন একটা শেকলে আরও বেশী করে জড়িয়ে যায় যা তাদেরকে গরীব থেকে আরও গরীব করে দেয়। অথচ সামান্য বুদ্ধিমত্তা, নিজেদের মধ্যে একতা আর একটু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকা, ব্যাস, এই দুষ্টচক্রকে চিরকালের জন্য ছুঁড়ে ফেলতে এটুকুই প্রয়োজন।[1]
ইউরোপীয় আর রায়তদের ব্যাপারে ফিরে আসি। বাস্তবটা হল, জমিয়ে রায়ত নতুন হোক বা পুরোনো, আশা করা হয়, দাবীও করা হয় যে তারা তাদের জমির একটা মোটামুটি ঠিকঠাক অংশে নীলকরের হয়ে নীলচাষ করবে। এই ব্যাবস্থাটা সর্বত্রই মান্য করে চলা হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থার ফলে যে চাষীদের ওপর অত্যাচার করা হয় বা তাদের অবস্থা জমিদারের অধীনে থাকার থেকে এখন বেশী খারাপ— এই কথাটা জোরের সঙ্গে অস্বীকার করা হয়। আর এটাই বর্তমানে একটা জরুরী ইস্যু।
যদি দেখানো হয় যে এই নতুন ব্যবস্থায় রায়ত ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তাহলে সেই ক্ষতি সব ক্ষেত্রেই পুরোনো রায়তদের সঙ্গে একটা সামঞ্জস্য রেখে হতে হবে, অর্থাৎ চাষীদের শোষণ হচ্ছে। উল্টোদিকে যদি দেখা যায় যে এতে করে চাষী আগের থেকে বেশি লাভ করছে বা সমান লাভ করছে, তাহলে বলতেই হবে চাষীদের শোষণ হচ্ছে না। আর সত্যি বলতে কি, ঠিক যেরকম নানা জায়গায় মন্তব্যও করা হয়েছে, যে রায়ত যদি তার ভাগের লাভটা ঠিকমত পেয়ে যায়, তাহলে সেটা নীল থেকে আসছে না অন্য কিছু থেকে আসছে, তাতে তাদের কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু যদি দেখা যায় একই পরিমান লাভ, বেশীও না কমও না, অনেক কম পরিশ্রম করে ও কম ঝামেলা পুইয়ে পাওয়া যাচ্ছে, মানে এক্ষেত্রে ঘোষিতভাবে যেরকম হচ্ছে আরকি, তার ওপর স্থানীয় জমিদারের নায়েব বা গ্রামের মহাজনের থেকে অনেক বেশী শিক্ষিত ও উদার মনের ইউরোপীয় মালিকের কাছ থেকে নানারকম সাহায্য ও সুরক্ষা পাওয়া যায়— তাহলে যায় আসে বৈকি! আমি শুনেছি, কোনও কোনও মরশুমে যখন ধানের ফলন মার খায়, রায়তরা পুরোপুরি নীলচাষের ওপরে আর নীলকর সাহেবদের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আমি তো এও শুনেছি, কোনও কোনও বছর কোনও কোনও জেলায় খাদ্যের তীব্র অভাব বা দুর্ভিক্ষ হলে একটা ফার্ম থেকেই রায়তদের দু লক্ষ টাকা বা ২০০০০ পাউন্ড পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়েছে। এই ঋণের কিছুটা তারা ধান দিয়ে শোধ করেছে, কিছুটা তারা নীলচাষ করে শোধ করেছে। আর সেটাও করেছে পরের বছরে, যখন চাষের অনুকূল মরশুম পেয়েছে, তখন। কিন্তু এখন যদি দয়াধর্ম ইত্যাদি এর মধ্যে ঢুকে পড়ে দাবি করে, শুধুমাত্র তার কারনেই এইসমস্ত ঋণ-টিন দেওয়ার ব্যাপারস্যাপার হয়েছে, তাহলে কিন্তু তাড়াহুড়োয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যাবে। এই ঘটনাটা শুধুমাত্র একটা উদাহরণ যে কোনও ইউরোপীয় প্ল্যান্টার যদি মাঝখানে উপস্থিত থাকে তাহলে কী কী সুবিধা পাওয়া যায় বা ভবিষ্যতেও পাওয়া যেতে পারে। এই বিপুল পরিমান টাকা ধার হিসেবে দেওয়ার মধ্যে যে পরিমান ব্যবসায়িক স্বার্থই মিশে থাকুক না কেন, বা এই টাকা উদ্ধার করার জন্য যে ব্যাবস্থাই নেওয়া হোক না কেন বা যা কিছুই জামিন রাখা হোক না কেন, একথা বললে ব্রিটিশদের মানবিকতার ওপর চরম অন্যায় হবে যে এই কাজের পেছনে কর্ত্যব্যবোধ বা করুণা কিছুমাত্র ছিল না। কেননা, মনে রাখতে হবে, তারা এমন সময় টাকা ধার দিয়েছে, যখন সেই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য রায়ত আদৌ জীবিত থাকবে কি না তার কোনও নিশ্চয়তা ছিল না, কারন দুর্ভিক্ষ চলছিল। সবচেয়ে বড়ো কথা, যারা টাকা ধার দিয়েছিল, তারা নিজেরাও কিন্তু সেই সময় চরম ভুগছিল।
সুতরাং, বুঝতেই পারছ, সমস্ত ব্যাপারটাই কীভাবে সময় ও ঋতুর ওপর নির্ভর করে থাকে।
টীকা
[1] “রায়তরা কমবেশী সকলেই দরিদ্র। খুব কমজনের সামান্য কিছু মূলধন আছে। আর তারা যদি তাদের জমি চাষ করতে চায়, তাদেরকে চড়া সুদে টাকা ধার করতেই হবে। তাদের শিক্ষার অভাব আর পড়তে লিখতে একেবারেই না জানার কারনে তারা সম্পুর্ণভাবে ঋণদাতাদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। এই ঋণদাতারা আবার নিজেরাই এক একজন দালাল। তারা রায়তদের অগ্রিম টাকা ধার দেয় আর যত টাকা ধার দেয় তার থেকে অনেক বেশী টাকার অঙ্ক লেখা রসিদে চাষীদের দিয়ে সই করিয়ে (মানে টিপছাপ নিশ্চই) নেয়। এছাড়া চাষীরা তাদের বাড়ির অনুষ্ঠানেও মাঝে মাঝে টাকাপয়সা অপচয় করে থাকে, যেমন বিয়ে বা অন্য কোনও উৎসব। এর ফলে তারা চিরকাল গরীব থেকে যায়।”— স্ট্যাট অ্যান্ড গ্রেগ। রিপোর্ট অফ দ্য ২৪ পরগনাস ডিস্ট্রিক্ট। মেজর র্যালফ্ স্মিথ। বেঙ্গল আর্টিলারি। রেভিনিউ সার্ভেয়ার।
(ক্রমশ)
