রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ২৬। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

তোমরা বোধহয় জানো, ভারতে একটা চালু প্রথা রয়েছে, চাকররা মালিকের কাছ থেকে জিনিস কেনাকাটার ওপর ‘দস্তুরি’ নিয়ে থাকে। তারা এক টাকায় দু পয়সা হিসেবে (মোটামুটি এক শিলিং-এ তিন ফার্দিং ধরে নিতে পারো)। কোনও চাকর মালিকের জন্য কোনও জিনিস কিনলে বা মালিকের হয়ে কোনও জিনিসের দাম দিয়ে দিলে এই টাকা পেয়ে থাকে। এই বিষয়টা সবাই জানে আর কেউ আপত্তি করে না। বাজার যাওয়া, জিনিস কেনা, বয়ে নিয়ে আসা— এসবেরও তো একটা পারিশ্রমিক আছে! মালিকরা এভাবে খানিকটা পারিতোষিকও দিয়ে দেয় চাকরদের। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটা ন্যায়বিচার রয়েছে। আর এটা সর্বত্র প্রচলিত। যেমন একজন ইহুদীর বন্ড সম্পর্কে বলা হয়, আইন অনুমতি দেয়, আদালত পুরস্কার দেয় (৫)। কিন্তু ধরো কোনও দরিদ্র ফেরিওয়ালা তোমার দরজায় কড়া নাড়ল। সে সারাদিন তার মালের পসরা কাঁধে করে রোদে গরমে ঘুরছে বা কোনও কুলিকে দিয়ে পয়সা দিয়ে মালটা বওয়াচ্ছে। দিনমান ঘুরেও তার কোনও লাভ থাকছে না। তুমি সেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কিছু জিনিস কিনলে আর তাকে পয়সা দিয়ে দিলে। তোমার চাকরদের ভূমিকা এখানে ততটুকুই যতটা একজন চাঁদে বসে থাকা মানুষের। কিন্তু তুমি ঘরে ঢুকে শুনতে পেলে সদর দরজার কাছে ঝগড়া বেঁধে গেছে। তারা তাদের দস্তুরি দাবী করছে আর কে সেই দস্তুরির কতটা ভাগ পাবে তাই নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করছে। তোমার মনে হল, এ তো শুধু মাংস নয় সেই ইহুদীর চুক্তিতে যে নিষিদ্ধ রক্তের কথা আছে, এ সেই রক্ত। তোমার মনে পাপ-পূণ্যের ঝড় উঠল, তুমি সঙ্গে সঙ্গে মুখের ওপর মানা করে দিলে। ভয় দেখালে, তাদের মুখ থেকে ফের এরকম কথা শুনলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করবে, মেরেও ফেলতে পারো। ফেরিওয়ালা চলে গেল। তুমি নিশ্চিন্তমনে ঘরে ফিরে এলে। তোমার মনে শান্তি, তুমি ন্যায়বিচার করেছ। কিন্তু তুমি জানতেও পারবে না, তোমার দরজা থেকে পঞ্চাশ গজ যেতে না যেতে সে ফেরিওয়ালা আবার চুপিচুপি ফিরে এসেছে আর নিজের থেকেই দারোয়ানকে (বা যেই সেখানে থাকুক না কেন) তার দস্তুরিটা দিয়ে গেছে। কেননা সে ভালো করে জানে, যদি সে এরকমটা না করে, তাহলে তাকে আর সেই বাড়িতে কখনও ডাকা হবে না। অথবা খোদ মালিক যদি নিজে থেকে না ডাকে, তাকে সেই বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হবে না। জগতে আরও অনেক ফেরিওয়ালা রয়েছে, তারা অনেক বেশী মানিয়ে চলে, তাদেরকে ডাকা হবে।

যখন তোমার চারপাশের লোকজনই এরকম, তখন তুমি কীই বা প্রতিকার করবে! কিছুই করার নেই। তুমি কি দারোয়ানকে ছাড়িয়ে দেবে! আর সারাদিন বসে বসে কেউ দরজায় কড়া নাড়লে নিজেই গিয়ে দরজা খুলবে! এবার ভাবো, এরকম করলে তোমার সেই দারোয়ান সেই ফেরিওয়ালাটার ওপরে কী পরিমান অত্যাচার করবে! আমার বিশ্বাস, নীলের কারখানাই হোক বা জমিদারের জমিদারী, প্রতিটি কর্মচারী, নীচে থেকে ওপর পর্যন্ত সবাই দরিদ্র রায়তদের সঙ্গে, যদি সামান্যতমও টাকাপয়সার লেনদেন থাকে, এরকমই ব্যবহার করে থাকে। আর রায়তের হিম্মত নেই এই অন্যায়ের প্রতিরোধ করার। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই পুরো সামাজিক ব্যবস্থাটাই পারস্পরিক শোষণের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে আর নাছোড় আঠার মত সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যাক্তির সাথে লেগে আছে।

রায়তরা নিজে থেকে যে ফসলগুলি লাগায় সেগুলি হল, ধান-তামাক-আখ-রাই-সরষে (দুই ধরণের হয়)- তিসি-লঙ্কা-হলুদ-তিল-গম-বার্লি-মটরশুঁটি-কলাই-চানা-অরহড়— আরও কয়েক রকমের ডাল, যখন মরশুম আসবে তখন দেখতে পাব আশা করি। আর এইখানে এসে আমাকে নীলচাষ সম্পর্কে কয়েকটা মন্তব্য করতেই হবে যেগুলো নীলচাষীদের স্বার্থের সাথে সম্পৃক্ত।

আমি আগেও দেখিয়েছি, ফসল হিসেবে নীলের অনেক সুবিধে রয়েছে, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে। কিন্তু বলা হয় রায়তদের মধ্যে এই ফসলটি একেবারেই জনপ্রিয় নয়। কোনও কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে নীলের এই জনপ্রিয়তার অভাবের কোনও ন্যায্য কারন থাকতে পারে। যদি আমার কাছে এরকম বিশ্বাস করার কারণ থাকত যে নীলের প্রতি সাধারণ মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গী সর্বকালীন এবং সার্বজনীন, যদি আমি নিজের চোখে না দেখতাম কীভাবে নীলচাষ এখানে সাধারণ দরিদ্র মানুষের ভালো থাকার সাথে জড়িয়ে আছে আর তাদের ওপর অত্যাচার করছে না, তাহলে আমি এই নীলচাষের ব্যাপারটা ঠিক যেভাবে আমেরিকার কেনটাকি প্রদেশের কোনও দাসব্যাবসায়ীর বাড়িতে গিয়ে ওঠা অতিথি বর্ণনা করে, ঠিক সেইভাবে তোমার কাছে  পেশ করতাম— অত্যাচারের শিকার মানুষগুলোর আর্তচিৎকার একেবারেই বাদ দিয়ে দিতাম।

নীলগাছ

 

তোমরা নিশ্চই ধরে নিচ্ছো না যে আমি একটা সংস্কৃতির থেকে আর একটা সংস্কৃতি কীভাবে উন্নত বা এই অসম সাংস্কৃতিক অবস্থান কীভাবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলোকে প্রভাবিত করছে— তা নিয়ে আমি কোনও গুরুগম্ভীর আলোচনা করব। বা এ ব্যাপারে গোঁড়াভাবে কোনও একটা মতকে আঁকড়ে ধরে থাকব। তার জন্য এদেশের কৃষি-অর্থনীতির বিষয়ে গভীর জ্ঞান আর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা দরকার, যা আমার একেবারেই নেই। সমস্যাটার উভয় পক্ষেই প্রচুর কথা বলা হয়েছে। মুহূর্তে মুহূর্তে মত পরিবর্তন হয়েছে। আজ এই কথা বলা হচ্ছে তো কাল অন্য কথা বলা হচ্ছে। সবকিছুই তাৎক্ষণিক আর নানারকম বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, যেমন আবহাওয়া, স্থান, লোকের আচরণ, যাকে মানুষের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গীও বলা যেতে পারে ইত্যাদি। ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শুনতে গেলে, মানুষ সবসময়ই একটু বাড়িয়ে চড়িয়ে বলতে ভালোবাসে। এক এক করে প্রতিটি মানুষের কাছে গেলে সবসময়ই ঘটনার অতিরিক্ত কিছু শুনতে পাওয়া যাবে।

এদেশে নীলচাষ সম্পর্কে প্রধান যে অভিযোগটা আসে, মানে আমি যা বুঝতে পারছি আরকি, তা হল, কোনও জমিতে নীলচাষ হলে সেই জমিতে একছত্রভাবে নীলেরই চাষ হতে থাকে। তা যদি না হত তাহলে চাষী সেই জমিতে ধান বুনতে পারত। চালের ভাত এদেশের মানুষদের প্রধান খাদ্য। আর ধারণা আছে যে চাষী এককভাবে নিজের জমিতে ধানচাষ করলে তার লাভ হত বেশী।

এখানে আমরা আর পাঁচটা বিতর্কিত বিষয়ের মতই আধডজন মতন প্রস্তাবনা আর অনুমানের মধ্যে ডুব দেব। সমস্যাটাকে সরল করে বুঝতে গেলে এগুলোর নিস্পত্তি হওয়া আগে প্রয়োজন। একথা আগেই বলে রাখা প্রয়োজন, এখন যে বিষয়ে আমি বলতে যাচ্ছি, সে বিষয়ে আমাকে খানিকটা আন্দাজেই বলতে হবে। প্রথমতঃ, বলে রাখি ধান দুই ধরণের হয়। এক ধরণের ধান নীচু জলাজমিতে চাষ করা হয়। এই ধরণের ধান চাষের সঙ্গে নীলচাষের কোনও সম্পর্কই নেই। কেননা এই ধরণের জমিতে কখনোই নীলের চাষ হতে পারে না। কোনও কোনও জেলায় অর্ধেক চাষের জমিতে এই ধানের চাষ হয়, কোথাও তো পুরোটাই এই চাষ। দ্বিতীয়তঃ, একথা জোর দিয়ে বারবার বলা হয়েছে, প্ল্যান্টাররা নীল চাষের জন্য যে জমি নিয়েছে, তার তিন-চতুর্থাংশই ধানচাষের জন্য একেবারে অনুপযুক্ত ছিল। কিন্তু এই হিসাব সব জেলার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হতে পারে না। যেমন কৃষ্ণনগরের সম্পর্কে এই কথা বলতে গেলে তা সর্বৈব মিথ্যা বলা হবে, কেননা এখানে যে সমস্ত জমিতে নীলচাষ হয়, সে জমি ধান চাষের জন্যও সমান উপযুক্ত। আবার যশোর বা ঢাকার ক্ষেত্রে জমি নীচু, চারিদিকে জল জমে থাকে, এই ধরণের জমিতে ধানচাষ একেবারেই ভালো হবে না। যাকে চুর জমি বলা হয়, অর্থাৎ নদীতে বন্যা হওয়ার পর সেই জল নেমে গেলে যে পলিমাটি পড়ে থাকে, সেই জমি নীলচাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। আবার এই জমি ধানচাষের জন্য ভালো না। পরে যখন এই পলিমাটি থিতিয়ে যায়, জমির চরিত্র বদলে যায়, তখন আবার এই জমি ধানচাষের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। আবার যে সমস্ত জেলার জমি উঁচু, সেখানে পরপর দুই বছরের বেশী ভালো ধান হবে না। তৃতীয় বছরেও শুনেছি চাষের খরচ ওঠে না।  আবার একই জমিতে এক বছর নীল তার পরের বছর ধান আবার তার পরের বছর নীল, এইভাবে চাষ করা হলে জমির উর্বরতা হ্রাসের বা জমির ক্ষয়ের কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। আর এই লক্ষণ গোটা কৃষ্ণনগর জুড়েই দেখা যায়।

সুতরাং একটু খেয়াল করে দেখলেই বোঝা যাবে এলাকা বা স্থানের ওপর সবকিছু কতটা নির্ভর করে থাকে।

টীকা

শেক্সপীয়রের মার্চেন্ট অফ ভেনিস থেকে নেওয়া, মূল লাইন “the law allows it, and the court awards it” – অ্যাক্ট ফোর সিন ওয়ান।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply