সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ৩১। বরুণদেব
স্বাধীনতার পর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশ পুনর্গঠনের কাজ চলছিল। ধীরে ধীরে কাজের বাজারে চাহিদা তৈরী হচ্ছিল। সার্কাস শিল্পের প্রসারের ফলে কাজ পাচ্ছিল বাংলার নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষরা। সাত আটের দশকেও কাগজে কাগজে কর্মখালির বিজ্ঞাপনে সার্কাসের হাতছানি। বনগাঁ, বেথুয়াডহরি, বেতাই, কৃষ্ণনগর, সুন্দরবন, গোসাবা অঞ্চলের গ্রামাঞ্চল থেকে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া নিম্নজীবী পরিবারের ছেলেমেয়েরা যোগ দেয় সার্কাসে। তখনকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের কিশোরদের মধ্যে বাড়ি থেকে পালানোর ট্রেন্ড ছিল। লক্ষ্য বলিউড। কখনো তা সার্কাসের তাঁবুও।
নৃত্য, সঙ্গীত, অভিনয় এই তিন শিল্পকলা সার্কাসের শরীরি শিল্পের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হয়েছে। যুগের বিস্তারের সাথে সাথে, আধুনিকতার সাথে সাথে, সার্কাসও চলার পথে বদল এনেছে। সার্কাসের নিজস্ব ব্যান্ডের জায়গা নিয়েছে রেকর্ড, ক্যাসেট,মাইক্রোচিপ্সের ভোল বদলানো আধুনিকতা। বদলে গিয়েছে সার্কাসের সঙ্গীত, অভিনয়, নৃত্য। কাল্ট হয়ে যাওয়া মেরা নাম জোকারের ‘জিনা ইঁহা মরনা ইঁহা’ ফিল্মি সঙ্গীত সার্কাসের নিজস্ব সঙ্গীত হয়ে গিয়েছে যেমন, তেমনি ১৯৫৬-র গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস, ১৯৭০-র জেমিনি বা ১৯৮০-র গ্রেট রেমন সার্কাস, লাইট-সাউণ্ড-অ্যাকশেনের হাই ভোল্টেজ তাঁবু হয়ে উঠেছে। সার্কাসের সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্কটি চিরকালই নিবিড়। চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য সার্কাস’ থেকে মিঠুন চক্রবর্তীর ‘শিকারি’, কমল হাসানের ‘অপূর্ব সহোদারাংগল’ (Apoorva sahodarangal) বা একবিংশ শতাব্দীর বলিউডি ব্লকবাস্টার ‘হেরাফিরি’- দেশে দেশে কালে কালে সার্কাসীয় প্রবাহ রূপালী পর্দায় চিরকাল বহমান। সার্কাসের প্রেক্ষাপটে প্রথম ভারতীয় ফিল্ম স্বাধীনতার আগে, ১৯৪৩এ- তামিল ছবি ‘চন্দ্রলেখা’। বাদ যায় নি ভারতীয় দূরদর্শনও, ১৯৮৯-এ ডি ডি ন্যাশনালে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘সার্কাস’। সার্কাসের এরিনা থেকে বহু শিল্পী ১৯৩০-এর শেষ দিকে বলিউডের জগতে স্টান্টশিল্পী হিসেবে পা রাখেন।
সার্কাসের জিমন্যাস্ট মেরি ইভান্স থেকে বলিউডের জনপ্রিয় নায়িকা নাদিয়া হয়ে ওঠার কাহিনীটি বেশ চমকপ্রদ। অস্ট্রেলিয়ার পার্থে জন্ম। স্কটিশ বাবা ও অস্ট্রেলিয়ান মায়ের সন্তান মেরি ইভানস ১৯২০-র শুরুর দিকে চলে আসেন পেশোয়ারে, জীবিকার খোঁজে। ভারতের ব্রিটিশ ব্যারাকগুলিতে প্রদর্শনী করা লেডি অস্ট্রোভার ট্রুপে যোগ দেন। হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় জিমন্যাস্ট। সেখান থেকে জারকো সার্কাস কোম্পানিতে। বলিউডের ফিল্ম ডিরেক্টর জোমি ওয়াদিয়ার নজরে পড়েন। তাঁর ফিল্মে স্টান্টওম্যানের চরিত্রে অভিনয় করেন ইভান্স। মেরি ইভান্স হয়ে যান নাদিয়া, পর্দায় পুরুষদের বিরুদ্ধে এক জনপ্রিয় ফাইটিং-ওম্যান। তাঁর প্রথম ফিল্ম হান্টারওয়ালি- সমাজের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এক নিপীড়িত নারীর সংগ্রামের কাহিনী। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল। এরপর হরিকেন হংসা-তে এক হরিজনের চরিত্রে অভিনয়, সমাজের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া। ‘লুটারু লালনা’-য় তাঁর অভিনীত চরিত্রটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেয়। ‘পাঞ্জাব মেল’ ছবিতে তাঁর চরিত্র সামাজিক শ্রেণী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
সার্কাসের তাঁবু থেকে চলচ্চিত্রের জগতে গিয়ে অভিনয় দক্ষতার গুণে জনপ্রিয়তা পাওয়া শুধু বলিউডেই হয়েছে এমনটা নয়, বাদ যায় নি টলিউডও।
কৃষ্ণনগরের গোয়ারিতে জন্ম চক্রবর্তী মশাইয়ের। বাবা আশুতোষ চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর সপরিবারে কলকাতার জোড়াসাঁকো অঞ্চলে, জ্যাঠামশাইয়ের কাছে। বয়স তখন দশ বছর। পড়াশুনায় মন নেই। জ্যাঠামশাইয়ের কড়া শাসনেও মতিগতি ফিরল না। মন পড়ে থাকে নাচ, গান, ব্যায়ামের আসরের দিকে। জ্যাঠামশাইয়ের অ্যামেচার দলে টুকটাক নাচ, শ্যামাসংগীত, কীর্তন, কবিগানের তরজা করে সে। ওদিকে গিরিশ পার্কের কাছে পার্বতী ঘোষ লেনের একটি ব্যায়ামশালায় নিত্য যাতায়াত, সেখানে বারে্র খেলায় মন বসে গেল। একদিন রোজগারপাতির আশায় ছেলেটি চিৎপুরের এক চায়ের দোকানে কাজ নিল। টেবিলে টেবিলে কষা মাংস, কাঁকড়ার ঝাল, পাঁঠার নাড়িভুড়ি চচ্চরি পরিবেশন করা, এঁটো কাপ প্লেট ধোয়া। দোকানে মদারুদের ভিড়। খবর গেল জ্যাঠামশাইয়ের কাছে। দোকানেই জুটল উত্তম মধ্যম। একদিন বাড়ি ছেড়ে পালাল সে ছেলে। সোজা রেঙ্গুন। রেঙ্গুনে তখন তাঁবু পেতেছে প্রফেসর বোসের সার্কাস। সেখানেই জোকার সেজে ট্রাপিজের খেলা দেখানো শুরু। ধীরে ধীরে হরাইজন্টাল ও প্যারালাল বারের খেলা। বাঘ সিংহ হাতি ঘোড়াদের সঙ্গে খেলা দেখাতে দেখাতে একদিন নিজের গায়েই জন্তু জানোয়ারের গন্ধ পেয়ে গেল সে। আর মন টিকল না সার্কাসে।তাঁবু ছেড়ে পালাল সে। এবার বারো টাকার বেতনে এক প্রেসে কম্পোজিটরের কাজ। একুশ বছর বয়সে স্টার থিয়েটারে নাচের দলে কোমড় দোলানো। ধীরে ধীরে পেশাদারী রঙ্গমঞ্চ ও চলচ্চিত্রে পাল্লা দিয়ে অভিনয়। সত্যজিত রায় যাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন- হলিউডে জন্মালে তুলসী চক্রবর্তী অস্কার পেতেন। সার্কাসের জীবনের জোকারের অভিজ্ঞতা তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় জীবনকে অসাধারণত্ব দিতে সাহায্য করেছিল।
সার্কাস আর ফিল্মের জগৎ হাত ধরাধরি করল যখন, সার্কাসের জনপ্রিয়তা একদিকে যেমন বৃদ্ধি পেল, তেমনি সার্কাসও তার তাঁবুর জগতের বিজ্ঞাপন পেল। মান্যতাও পেয়েছিল বিনোদনের জগতেও। তবুও স্বাধীনতা উত্তর কালে কমলা, জেমিনি, ওরিয়েন্টাল, জাম্বো, গ্রেট রয়্যালের মতো যে বড়ো বড়ো সার্কাসদলকে দর্শকের চাহিদা পূরণ ও মনোরঞ্জনের জন্য জন্য ছুটির দিনে ইভনিং আর নাইট শো ছাড়াও মর্নিং শো-ও করতে হত, সময়ের সরণী বেয়ে সেই সব সার্কাসদল একে একে তাঁবু গোটালো, সার্কাস হয়ে গেল এক মৃতপ্রায় শিল্প।
————————————————-
শান্তিপুরের টেক্সটাইল ব্যবসায়ী শান্তি দত্ত। শহরে এক সার্কাস এলো। শান্তি দত্ত সার্কাস দেখতে গেলেন। তিনদিন ধরে টিকিট না পেয়ে সার্কাসের টিকিট কাউন্টার থেকে ফিরে এলেন। প্রতিটি শো হাউসফুল। ভাবলেন, টেক্সটাইল ব্যবসা থেকে সার্কাসের ব্যবসা বোধহয় অনেক লাভজনক। ১৯৭৬ সালে খুলে ফেললেন রেয়ন সার্কাস। শান্তি দত্ত সার্কাস ব্যবসা সম্পর্কে কিচ্ছু জানেন না। সার্কাস জগতের কয়েকজন অভিজ্ঞ মানুষের সাহায্য নিলেন। থালাসেরি থেকে আনলেন সার্কাসশিল্পী ও কর্মীদের। সার্কাস ম্যানেজমেন্টের এক বিশেষজ্ঞ কাশিনাথকে করে দিলেন ডিরেক্টর। কিন্তু শান্তি দত্তর এই প্রচেষ্টা সফল হলো না। তাঁবু গুটিয়ে রেখে সমস্ত সাজসরঞ্জাম, বন্যপশুদের রেখে দিলেন কলকাতার মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে। এম ভি শঙ্করণ জানতে পেরে কিনে নিলেন সেসব। বিহারের দানাপুরে শুরু হলো নতুন এক সার্কাস- জাম্বো সার্কাস। ২রা অক্টোবর, ১৯৭৭। শুরু থেকেই জাম্বো সার্কাস সাড়া ফেলে দিয়েছিল ভারতীয় সার্কাসের তাঁবুতে।
কলকাতায় সার্কাসের শুরুতে ময়দানে পড়ত তাঁবু। ময়দান ছাড়াও আর একটি এলাকা ছিল টালা, যেখানে ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ সরকার কলকাতায় জল সরবরাহের জন্য টালা ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করে। কলকাতার প্রথম দিকে সার্কাসগুলির মধ্যে পার্ক সার্কাসে একটি সার্কাসদল ছিল যার নাম ছিল গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস, কোনো এক সরকারবাবু ছিলেন এই সার্কাসের ম্যানেজার। এ সার্কাসের আয়োজন ছিল ন্যূনতম- রোগা অসুস্থ কয়েকটি টাট্টুঘোড়া নিয়ে বেদুইনের অভিনয়, একজন বয়স্ক বডিবিল্ডার এক মৃতপ্রায় সিংহের সামনে বাহুবলীর পোজ দিতেন।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাংলা ও অসম থেকে বেশ কিছু সার্কাসদল উঠে আসে। বিংশ শতাব্দীর দুইয়ের দশকের শেষদিকে এস কে গুহ, ওরফে বুদ্ধবাবু, খোলেন গ্রেট রিংলিং সার্কাস। রিংলিং সার্কাসের শিল্পী ছিলেন বিখ্যাত সার্কাসশিল্পী শঙ্কর মুদালিয়ার ও বন্যপ্রাণী প্রশিক্ষক প্রফেসর দামু ধত্রে। শঙ্কর মুদালিয়ার ছিলেন বিখ্যাত লুজ ওয়ার শিল্পী, ইউরোপীয়রাও তাঁর খেলা নকল করতে পারেনি। শেলারস সার্কাস থেকে তিনি এস কে গুহর রিংলিং সার্কাসে এসে ডিরেক্টর হয়ে যান। সেখান থেকে এশিয়ান ডায়ামণ্ড সার্কাসে । এরপর তিনি নিজের সার্কাস খোলেন- এশিয়াটিক সার্কাস। সে সময় ব্যাঙের ছাতার মতো বাংলায় অনেক ছোটো ছোটো সার্কাসের জন্ম হয়। তারা প্রায় সকলেই ক্ষীণজীবী।
প্রিয়নাথ বসুর পরবর্তী যুগে দক্ষিণেশ্বরের সুবোধচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় উঠে আসেন এক কৃতি সার্কাস উদ্যোক্তা রূপে।সুবোধ ব্যানার্জী ছিলেন বিখ্যাত জিমন্যাস্টিসিয়ান ও ভারোত্তলক। ১৯৪২ সালে উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়ায় তৈরী করেন দ্য গ্রেট ইন্টারন্যাশনাল সার্কাস। এই সার্কাস বাংলা ও বিহারের বাইরে না বেরুলেও, ইন্টারন্যাশনাল সার্কাস ভারতের সার্কাস মানচিত্রে এক উল্লেখযোগ্য সার্কাসদল। এই সার্কাস বিক্রি হয়ে যায়, জেমিনি সার্কাসের পার্টনার এম ভি শঙ্করন ও কে সাহাদেবন কিনে নেন। তাঁরা আরও কিছু শিল্পী ও বন্যপশু এনে শুরু করেন অ্যাপোলো সার্কাস। অ্যাপোলো সার্কাস নামকরা সার্কাস হয়ে ওঠে খুব কম সময়ের মধ্যে। ১৯৬৮ সালে সুবোধ ব্যানার্জী কলকাতায় আরও একটি সার্কাস খোলেন – অলিম্পিক সার্কাস। সে সার্কাস ভারতের প্রথম সারির এক সার্কাসদল হয়। ১৯৮৬-তে এই ব্যানার্জী পরিবারের আর একটি সার্কাস- ফেমাস সার্কাস। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে ব্যান্যার্জী পরিবারের এই দুই সার্কাস, অলিম্পিক ও ফেমাস বিখ্যাত হয়েছিল। কলকাতার বি এন বোস বাবু খোলেন বোস লায়ন সার্কাস। ১৯৪০ এর দশকের শুরুর দিকে বাংলায় জন্ম নেয় পানামা সার্কাস ও অজন্তা সার্কাস।
বি আই ভি নাইডু অন্ধ্রপ্রদেশের লোক। কলকাতায় তাঁর ছিল বন্যপ্রাণী নিয়ে ব্যবসার ডিলারশিপ। আফ্রিকান সিংহ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, আফ্রিকান লেপার্ড, হিমালয়ান ভাল্লুক, নেপালি হাতি সার্কাসদলগুলিকে সরবরাহ করতেন। খড়্গপুরে ১৯৩২ সালের ১লা এপ্রিল ‘বিচিত্র দরবার সার্কাস’ নামে একটি সার্কাস খোলেন। সেই সার্কাসে কিছু বিখ্যাত ইউরোপিয়ান ট্রুপ ও মালোয়ালি শিল্পীদের নিয়ে আসেন। কিন্তু খড়গ্পুরের প্রথম ক্যাম্পের পরই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।
এম্পায়ার সার্কাসের মালিক গোপাল তফাদার নটরাজ সার্কাস নামে আরও একটি সার্কাস শুরু করেন। এই সময় পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম শহরে উৎসবে পার্বনে মেলায় মেলায় বহু বাঙালির সার্কাস খেলা দেখিয়ে বেড়ায়। ১৯৮০র বছরগুলিতে পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, উত্তর ভারতের রাজ্যগুলি থেকে প্রচুর ছেলেমেয়ে সার্কাসে যোগ দেয়। বাঙালির স্বাস্থ্যচর্চার আইডল বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ নিজের উদ্যোগে খুলেছিলেন একটি সার্কাসদল। ফলপ্রসূ হয় নি সে প্রচেষ্টাও।
দেশভাগের পূর্ববর্তী অধ্যায়ে বাংলাদেশের নবাবগঞ্জে ১৯০৫ সালে রায়মোহন সরকার বাঙালি শিল্পী নিয়ে চালু করেন ‘দ্য লায়ন সার্কাস’। প্রসিদ্ধি পায় সার্কাসটি। খুলনা জেলার মুরেলগঞ্জের আর একটি নামকরা সার্কাসদল হলো দ্য অলিম্পিক সার্কাস। এই সার্কাসের বৈশিষ্ট্য ছিল একজন শাড়ি পরিহিতা বাঙালি মহিলার বাংলা গান। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন মেলা উৎসবে এইসব সার্কাস খ্যাতি লাভ করে।
১৯৩০ থেকে ১৯৭০এর মধ্যে ভারতীয় সার্কাসে আসে প্রচুর চীনা শিল্পী। এইসব চীনা শিল্পীদের আস্তানা কলকাতা। কলকাতায় বসতি স্থাপন করা এইসব চীনাদের জীবিকার তালিকায় জুতোর কারবার, চাইনিজ খাবার, দাঁতের ডাক্তারি ছাড়াও ছিল সার্কাস। বিভিন্ন ধরনের জাগলিং ও ফায়ার জাম্পিংয়ের খেলায় তাদের পারদর্শীতা সার্কাসশিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে সাহায্য করেছিল। একটা সময় প্রায় প্রত্যেক সার্কাসেই ছিল চীনা শিল্পী। সত্তরের শুরু থেকে ধীরে ধীরে ভারতীয় সার্কাস থেকে চীনারা দূরে চলে যেতে থাকে।
—————————————————-
প্রফেসর বোস তাঁর সার্কাসে খেলায় নিয়ে আসেন ম্যাজিক। বোসের সার্কাসে বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকার জন্য নিযুক্ত গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিভা প্রিয়নাথের চোখ এড়ায় নি। তাঁর উৎসাহ ও সহযোগিতায় গণপতি সার্কাসের রিঙে জাদুর খেলা দেখাতে লাগলেন। হয়ে উঠলেন বিখ্যাত জাদুকর- ‘দ্য গ্রেট উইজার্ড অফ দ্য ইস্ট’। ট্রাপিজ, ল্যাডার, জিমন্যাস্টিক্স, বণ্যপ্রাণীর সার্কাসে যুক্ত হলো জাদুর খেলা। সেই সময় যে ইউরোপীয় ঐন্দ্রজালিকরা কলকাতার নিউ এম্পায়ার ও অন্যান্য রঙ্গমঞ্চে খেলা দেখাতেন, সেখানে তিনদিক দর্শকশূন্য। মঞ্চে থাকত তাঁদের সাহায্যকারী এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। দর্শক মূলমঞ্চ থেকে অনেকটাই দূরে। কিন্তু সার্কাসের রিঙ উন্মুক্ত ক্রীড়াচক্র, আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ,সেখানে ঐন্দ্রজাল দেখানো বেশ কঠিন। গণপতি চক্রবর্তীর জাদুতে দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে যেত। গণপতি প্রথম সার্কাসে শুরু করলেন জাদুর খেলা। সার্কাসের সঙ্গে তৈরী হলো যাদুশিল্পের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। বোসের সার্কাস ছাড়াও গণপতি অন্যান্য মঞ্চেও দেখিয়েছেন তাঁর জাদু। ১৯০৯ সালে বহরমপুর শহরে প্রিয়নাথের সার্কাস তাঁবু ফেললে,সার্কাস দেখতে যান বাংলার লেফটনান্ট গভর্নর স্যার এডওয়ার্ড বেকার। গণপতি ‘ভৌতিক বাক্স’-র খেলা দেখাচ্ছিলেন। গণপতি বাক্সে প্রবেশ করলেন। ছোটোলাট ছুটে গিয়ে বাক্সটি ধরলেন রহস্যভেদ করার জন্য। বাক্সের গায়ের কাঁচা রঙ লেগে গেল সাহেবের হাতে। ইতিমধ্যে গণপতি কখন তাঁর ক্যারিসমা দেখিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছেন। কয়েকদিন পর সাহেব লিখে পাঠালেন-
‘দ্য ইলিউশনস এক্সিবিটেড বাই মিস্টার গণপতি অয়ার এক্সসেপসেনালি গুড এন্ড ইন্টারেস্টিং, এন্ড দ্য হোল এন্টারটেনমেন্ট ওয়ান অফ কনসিডারেবেল মেরিট।‘
এই ভৌতিক বাক্সের খেলার জন্য গণপতিকে বলা হতো ‘ভূতের রাজা’। গণপতির জাদুর কাছে সুশীল সুন্দরীদের হিংস্র বাঘের খেলাও কম আকর্ষনীয় হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় বোসের সার্কাসের অন্দরের রাজনীতি। গণপতিকে বোসের সার্কাস ছাড়তে হয়। এই সার্কাসের আর এক শিল্পী হিঙ্গনবালাকে নিয়ে দল গড়ে জাদু দেখাতে থাকলেন তিনি।
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে উত্তর কলকাতায় রামদুলাল মিত্র একটা ছোটো সার্কাসদল খোলেন- গ্র্যান্ড সার্কাস। এই সার্কাসের জাদুকরী নওশীন কমলাবাঈ জোন্স, বাবা এক ইউরোপিয়ান সৈনিক, মা মুসলিম সম্প্রদায়ের। কলকাতা শহরের শ্বেতাঙ্গ বসতি থেকে উঠে এসেছিলেন এই জাদুকরী। তাঁর যাদুর জন্য তিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন। সার্কাসের তাঁবু ছাড়াও তিনি আলাদা করে ম্যাজিক শো করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, কালা যাদু করে তিনি নাকি দর্শকদের কাছ থেকে টাকা হাপিস করে নেন। তিনি তাঁর প্রদর্শনীতে ব্রিটিশ মহিলার বেশে এসে ভাঁড়ামি দেখাতেন- কখনো নির্বোধ ব্রিটিশ মহিলা,কখনো তাদের আয়ার সাথে তাদের কথোপকথন, কখনো বৃটিশ গৃহবধূর সাথে তার নেটিভ প্রেমিকের অবৈধ প্রণয়। এর প্রতিবাদ জানিয়ে পার্কস্ট্রীট পাড়ায় ‘আওয়ার রেস ইস ইন পেরিল’ শিরোনামে এক প্যাম্পফ্লেট ছড়ালো সাহেবরা- কলকাতার ইংরেজ মহিলাদের নিয়ে স্ক্যান্ডাল ছড়ানোর দায়ে এই কলঙ্কিত মহিলার শাস্তি হওয়া উচিত, এই মহিলা মহান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলঙ্ক।
বিশ শতকের শুরুর দিকের বছরগুলিতে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের ফিলিপিনো অ্যাক্রোব্যাট আনোনিতা তাঁর অশ্বারোহণের খেলা বা জিমন্যাস্টিক্সের জন্য যত না পরিচিতা ছিলেন তার থেকে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন চিনা জাদুকরী শেন শুই এবং জাপানী তরোয়াল-মহিলা নাকোতার ভূমিকায়।
কলকাতার বেশ্যালয় থেকে উঠে এসেছিলেন শান্তিবালা। ১৯০০ সালে ন্যাশনাল সার্কাসের ম্যাজেশিয়ান। দর্শকের সামনে উপস্থিত হতেন আন্দামান ও নিকোবরের উপজাতীয় জাদুকরীর পোশাকে। নরখাদকদের ভোজের আয়োজনে খাঁচাবন্দী, আষ্টেপৃষ্টে শিকল দিয়ে বাঁধা, উগ্রচন্ডা, যন্ত্রণায় ছটফট করা শান্তিবালাকে উপস্থাপিত করা হত। এক হিন্দু পুরোহিত পবিত্র জল ছিটিয়ে ভুত তাড়ালে শান্তিবালা খাঁচা থেকে বেড়িয়ে আসতেন। তারপর তিনি দর্শকদের মধ্যে থেকে কাউকে কাউকে ডেকে নিয়ে ও ভ্যানিস করে দিয়ে খাঁচাবন্দী করে ফেলতেন।
১৯২০-র শেষ দিকে কলকাতায় ন্যাশনাল সার্কাসে ‘মহারাজ দ্য মাইটি’ নামে এক জাদুকর খেলা দেখাতেন। তিনি প্রখ্যাত মার্কিন জাদুকর হুডিনির বেশ ধরে দর্শকের সামনে আসতেন। মহারাজ উঠে এসেছিলেন জাদুকর ও বৈদ্য সম্প্রদায় থেকে। তিনি বদ্দিগিরির পেশায় বিশেষ সফল হতে পারেন নি। এ দেশে ততদিনে পশ্চিমী চিকিৎসাবিদ্যা চালু হয়ে গিয়েছে। উত্তরাধীকার সূত্রে প্রাপ্ত জাদুবিদ্যাকে আঁকড়ে ধরে সার্কাসে আসেন তিনি। সার্কাস ছাড়াও মহারাজ বড়ো বড়ো ব্যবসায়ীদের আহ্বানে ম্যাজিক শো করে বেড়াতেন। এই জাদুর খেলায় তিনি ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তাঁর ইউরোপিয়ান গঠন ও বেশভুষায় আকৃষ্ট হতেন ব্যবসায়ী সমাজের অন্দরমহল। বাজারে মহারাজের নামে স্ক্যাণ্ডাল ছড়িয়ে ছিল বেশ।
স্ক্যান্ডাল ছড়িয়েছিল ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিটনের নামেও। সে স্ক্যান্ডালের ইঙ্গিত সার্কাসশিল্পী কুমুদিনীকে ঘিরে। কলকাতায় কুক’স সার্কাসের ট্রাপিজ শিল্পী ছিলেন কুমুদিনী। ভাইসরয় কুমুদিনীকে দিয়েছিলেন মেডেল, সে মেডেলে খোদিত ছিল- এম্প্রেস অফ দ্য এরিনা’। সার্কাস এরিনার সাম্রাজ্ঞী। আয়ারল্যান্ডের একটি সংবাদপত্র সমালোচনা করে লিখেছিল, একজন ইংরেজ ভাইসরয় হিসেবে তাঁর মহান কর্তব্যকে অবহেলা করে একজন সুন্দরী অশ্বারোহীকে মেডেল দিচ্ছেন। এ বড়ো লজ্জার।
ব্রিটিশ উচ্চ পদাধিকারীরা সেসময় ভারতীয় সার্কাসশিল্পীদের খেলা দেখে সন্তুষ্ট হয়ে পুরস্কার, সার্টিফিকেট দিতেন। সার্কাস বাণিজ্যের জন্য সাহেবদের দেওয়া এই সার্টিফিকেট বা পুরস্কারগুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সার্কাসদলের ম্যানেজাররা ফলাও করে সেগুলি প্রচার করতেন। আর যখন লর্ড লিটনের মতো কেউ কেউ বিশেষ পুরস্কার দিতেন, তখন বিশেষ বিশেষ ঢেউ উঠত সমাজে।
——————————————————————-
১৮৮০-তে যাত্রা শুরু করা ভারতীয় সার্কাসের যাত্রাপথে সার্কাস-মালিক বা শিল্পীদের মধ্যে কোনো ঐক্যবদ্ধতা ছিল না। ভারতীয় সার্কাসের শুরুর দিন থেকেই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতায় বন্ধ হয়ে যায় বেশ কিছু সার্কাস। প্রথম মালোয়ালি সার্কাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মহারাষ্ট্রের সার্কাসগুলির জন্য। আর এক অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার সাক্ষী ছিল কলকাতা।
১৯৩৭ সালে কলকাতা দেখল গুরু শিষ্যের লড়াই। শেলারের ‘গ্রেট রয়্যাল সার্কাস’ ও মুদালিয়ারের ‘গ্রেট এশিয়াটিক সার্কাস’ একই সময়ে কলকাতায় তাঁবু ফেলল। এ প্রতিযোগিতা শুধু রিঙয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছিল দর্শকাসনেও। লণ্ডন ও প্যারিস থেকে আনা পারফিউম স্প্রে করা হতো দর্শকাসনে। গ্ল্যামার, আড়ম্বরের প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দু’টো সার্কাসই ঋণে ডুবে গেল। শেলার তাঁর সার্কাসের জন্য কলকাতার রহমতুল্লা এন্ড কোম্পানি থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন। রহমাতুল্লা শেলারের সার্কাসে ট্রাম্পেট বাজাতেন ,বিংশ শতাব্দীর দুই এর দশকে বেতন ছিল পঁয়ত্রিশ টাকা। একসময় সার্কাস ছেড়ে কলকাতায় সুদের কারবার শুরু করলেন রহমতুল্লা। কলকাতায় তিনি হয়ে উঠলেন নামকরা ফাইনান্সার। শেলার রহমতুল্লার ধার সময়মতো শোধ করতে পারলেন না। শেলারের গ্রেট রয়্যাল সার্কাস নিয়ে নিলেন রহমতুল্লা। শঙ্কর মুদালিয়ারের সার্কাসও একইভাবে চলে এলো রহমতুল্লার হাতে। দুটো সার্কাসকে একত্রিত করে শুরু হলো মিনার্ভা সার্কাস। পরের বছর আরও একটা নতুন সার্কাস শুরু করলেন রহমতুল্লা, অলিম্পিয়া সার্কাস। কলকাতায় ক্যাম্প হলো। কিন্তু বন্ধ করে দিতে হলো ম্যানেজমেন্টের দক্ষতার অভাবে।
১৯৫৭ সালে মধ্যপ্রদেশের রতলাম দেখেছিল গ্রেট রেমন ও গ্রেট রয়্যাল সার্কাসের মধ্যে এক প্রতিযোগিতা। গ্রেট রয়্যালের আসর বসার কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে তাঁবু পড়ল গ্রেট রেমনের। গ্রেট রেমনের প্রফেসর কে গোপালন ১৯২৪ সালে রতলমের মহারাজা সজ্জন সিং এর অর্থসাহায্যে সার্কাস শুরু করেছিলেন। তাঁরই একটি কালার পেন্টিং রেখে দিলেন রিঙে। মহারাজার ছবি দেখে দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানাল তাদের প্রিয় ভূতপূর্ব রাজাকে । এই একটি চালে গ্রেট রেমনের তাঁবুতে ভিড় হতে থাকল আর এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রেট রয়্যালকে তাঁবু গুটিয়ে চলে যেতে হলো।
১৯৬০ সালের প্রতিযোগিতা হাওড়ায়। এবার গ্রেট রেমন সার্কাস আর গ্রেট জেমিনি সার্কাস। গ্রেট রেমনের প্রফেসর গোপালন গ্রেট জেমিনির কে এস মেননকে অনুরোধ করলেন হাওড়া ছেড়ে চলে যেতে। মেনন কর্ণপাত করলেন না। গ্রেট রেমনের দু’জন শিল্পী আর একজন ম্যানেজার মেননের জেমিনি সার্কাসে লিজে কাজ করছিলেন। গোপালন জেমিনির কয়েকজন শিল্পী ও অফিসিয়াল স্টাফকে বললেন, সবাই যেন শেষ দিনে সার্কাস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আটজন বাদে বাকি সবাই বেরিয়ে এলো। গ্রেট রেমন তাদের থাকার জন্য হাওড়ায় বাড়ি ভাড়া করে দিল। আলিপুর জেলা আদালতে জেমিনির মেননের নামে একাধিক ক্রিমিনাল কেস করল গ্রেট রেমন। মেনন চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে পালিয়ে গেলেন অসমে।
কিছুদিন পরে গোপালন নতুনদের জন্য একটা সার্কাস খুললেন, নাম দিলেন – অমর সার্কাস। ১৯৬০ সালে অমর সার্কাস যাত্রা শুরু করল পশ্চিমবঙ্গের বক্রেশ্বর থেকে। কোম্পানির দায়িত্ব নিলেন গোপালনের ভাই কে কুমারন। অমর সার্কাস খুব বড়ো সার্কাস হয়ে যায়, গ্লোবাল স্টান্ডার্ড অ্যাক্রোব্যাট ফিটসে প্রথম স্থান অধিকার করে, স্থান পায় বলিমকা বুক অফ রেকর্ডসে।
১৯৬১ সালে কে এস মেনন পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসে গোপালনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুন সার্কাস খুললেন। রিজেন্ট সার্কাস। সেই হাওড়ায়। হাওড়া রেলওয়ে ময়দানে। বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো।
(ক্রমশ)
