কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২৮। শোভন সরকার
গত পর্বে: শিবালা ঘাটের প্রাসাদে এক রকম বন্দী রাজা চৈত সিং। বাইরে শুরু হয়েছে প্রচণ্ড গোলমাল। রাজা কি পালিয়ে যাওয়া স্থির করলেন?
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল রাজা তাঁর কিছু বিশ্বস্ত অনুচর ও লোকজন নিয়ে গঙ্গা পেরিয়ে চলেছেন। পেছনে ঝাপসা হয়ে আসছে রাজার শিবালা মহল। গঙ্গার গর্জন ছাপিয়ে এখনও শোনা যাচ্ছে গোলাগুলির শব্দ। গঙ্গা এমন উত্তাল হয়ে রয়েছে যে তাতে সবকিছুই খড়কুটোর মত ভেসে যায়। কিন্তু তবুও রাজাকে মা গঙ্গারই আশ্রয় নিতে হয়েছে। বর্ষার ভরা গঙ্গা মহলের খিড়কির ঠিক নিচেই নেচে চলেছে, আর সেই খিড়কি থেকে নিচে গঙ্গা অবধি দড়ির মত লম্বা ঝুলে রয়েছে পরপর বাঁধা বেশ কয়েকটা পাগড়ি, তার মধ্যে একটা রাজা চৈত সিং-এর। এই পাগড়ির দড়ি বেয়েই রাজা নিচে নেমে ঝাঁপালেন গঙ্গায়। এই যে সেদিন রাজা তাঁর পাগড়ি ছেড়ে চলে এলেন, এর পর আর কোনো দিন তিনি তাঁর সিংহাসনে বসতে পারলেন না।
হেস্টিংসের কাছে খবর যখন পৌঁছাল ততক্ষণে রাজা চৈত সিং তার হাতের নাগালের বাইরে, রামনগরে। সেখান থেকে সপরিবারে পালিয়ে যান লতিফপুর কেল্লায়।
এদিকে শহরের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে ক্রমশ। শোনা গেল বেনারসের লোকজন ইংরেজ সৈন্যদের দেখলেই পিটিয়ে মেরে ফেলছে। হেস্টিংস প্রতি মুহূর্তে প্রাণনাশের শঙ্কায় ভুগছে। সে বুঝতে পারল যে সে এই মুহূর্তে একেবারে অরক্ষিত — এই সুযোগে যদি নেটিভরা এসে তাকে বন্দী বানায়, তার আর কিছুই করার থাকবে না।
সৌভাগ্যক্রমে চুনার, মির্জাপুর প্রভৃতি এলাকা থেকে ততক্ষণে আরও ইংরেজ সৈন্য এসে পৌঁছালে পরিস্থিতি তখনকার মত কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এল। হেস্টিংস মাধোদাসের বাগানবাড়িতে আরও কিছুদিন থেকে কিছু কাজ সেরে ফিরবে বলে ঠিক করল। কিন্তু শীঘ্রই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেল। ২০শে আগস্ট হেস্টিংসের সেনাদলের ক্যাপ্টেন মেফ্রে উত্তেজনার বশে আবার লড়াই শুরু করে দিল। হেস্টিংস এবার আর অপেক্ষা করল না, সুযোগ বুঝে তাড়াহুড়ো করে লোকজন নিয়ে পালিয়ে গেল চুনার।
বেনারসের মানুষেরা বলে যে হেস্টিংস রাতারাতি হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। ভয়ে, ব্যস্ততায় তার কাণ্ডজ্ঞানটুকুও ছিল না। রসিক বেনারস তখন ছড়া কেটে হেস্টিংসের সাহসের ‘তারিফ’ করে গেয়ে উঠল, ‘ঘোড়ে পর হাওদা, হাথী পর জীন, জলদি সে ভাগা ওয়ারেন হেস্টিন!’ আমাদের নৌকার মাঝির ঠাট্টা এতক্ষণে ধরতে পারলাম।
যাই হোক, পরবর্তীতে আরও ইংরেজ সৈন্য এসে পৌঁছালে হেস্টিংস বেনারসের পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। কোম্পানির শর্তে সিংহাসনে বসানো হল মহীপ নারায়ণ সিং-কে। রাজা চৈত সিং অনেক চেষ্টা করেও তাঁর হারানো সিংহাসন ফিরে পেতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে রাজা মহীপনারায়ণও কোম্পানির শর্ত মেনে অর্থের জোগান দিতে ব্যর্থ হন। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ১৭৯৪ সালের মধ্যেই বেনারসের উপর সম্পূর্ণ অধিকার করে বসে ব্রিটিশ রাজ।
শিবালা ঘাটের রাজমহল ছেড়ে চৈত সিং-এর চলে যাওয়ার পর থেকে ১৮৯৫ অবধি সেই মহল ব্রিটিশদের হাতেই ছিল। তৎকালীন মহারাজা প্রভুনারায়ণ সিং সেই মহল ব্রিটিশদের হাত থেকে ফেরত পান। তিনি চৈত সিং-এর কথা স্মরণ করে এই মহল সংলগ্ন খিড়কি ঘাটের নাম রাখেন চেত সিং ঘাট। মহারাজা বলবন্ত সিং-এর তত্ত্বাবধানে স্থপতি বৈজনাথ মিশ্র এই ঘাট তৈরি করেছিলেন।
ঘাট থেকে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে গেলে তোরণদ্বার। সেদিক দিয়ে প্রবেশ করলে ছাদের উচ্চতায় উঠে আসতে হয়। ছাদের উপরেই চোখে পড়ে এক ভব্য ‘বরাদরি’ বা ‘বারোদ্বারী’, অর্থাৎ বারোখানি দ্বারবিশিষ্ট মণ্ডপ। গঙ্গার উপর থেকে চেত সিং ঘাটের দিকে তাকালে মহলের উপর এই মণ্ডপ পরিষ্কার দেখা যায়। মূলত গান-বাজনা বা কাব্যচর্চার জন্য ছাদের উপরের এই মণ্ডপ ব্যবহৃত হত। বারোদ্বারী ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে গেলে মহলের অন্যান্য অংশে পৌঁছানো যায়। মুঘল স্থাপত্যশিল্পের প্রভাব স্পষ্ট এই মহলের নকশায়।

চেত সিং ঘাটের পরেই রয়েছে নিরঞ্জনী ঘাট। দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত নাগা সন্ন্যাসীদের নিরঞ্জনী আখড়া এখানেই অবস্থিত, তা থেকেই ঘাটের এই নাম। মহারাজা প্রভুনারায়ণ সিং শিবালা ঘাটের উত্তর দিকের অংশ দান করে দেন এই নাগা সন্ন্যাসীদের। আরও উত্তরে রয়েছে দশনামী মহানির্বাণী সম্প্রদায়ের সাধুদের মহানির্বাণী ঘাট। এটিও আগে চৈত সিং-এর দুর্গের অংশ ছিল।
ঘাটের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এইসব অপূর্ব স্থাপত্যকীর্তি মুগ্ধ হয়ে দেখতে দেখতে আমরা নৌকায় ভেসে চলেছি। আজকে যখন সবাই আমাদের মতোই নৌকা থেকে ঘাটের দিকে তাকায় বা পায়ে পায়ে এই চেত সিং ঘাট ছাড়িয়ে চলে যায়, ক’জনই বা মনে করে সেইসব দিনের কথা যখন কাশীবাসী ফুঁসে উঠেছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে? সিপাহি বিদ্রোহ তারও কত পরের ঘটনা। আর ক’জনই বা মনে করে এই ঘাটের চেত সিং মহলের রাজকীয় প্রেক্ষাপটে বুধোয়া মঙ্গলের ঝঙ্কার? আমরা ইতিহাস ভুলে যাচ্ছি, আমাদের নিজেদের ইতিহাস। ইতিহাস ছাড়া কোনো জাতি তার অস্তিত্ব কতদিন বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে?
ইতিহাসের মতই গঙ্গা বয়ে চলেছে — সামনের দিকে। কত পথ পেরিয়ে এসেছে এই নদী, আরও কতটা পেরিয়ে তবে গিয়ে পড়বে সাগরে। ক্লান্তি নেই, বরং বুকের গভীরে নানা স্মৃতি ধরে রেখে নীরবে পথিক হয়েছে। গঙ্গার জলে আঙুল ডোবালাম। তিরতির করে আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঘোলাটে জলের স্রোত আমার স্নায়ুতে জমে থাকা সব ভার একটু একটু করে ধুয়ে দিতে লাগল। কী আছে এই স্রোতে? কেন হয় এমন অনুভূতি? ভেজা হাত তুলে চোখের সামনে আনি। ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল কনুই বেয়ে।
আমি যখন সেই ফোঁটা ফোঁটা জলে অণুবিশ্বের সন্ধান করতে থাকি, আমার চোখের আড়ালে আমাদের নৌকা পেরোতে থাকে শিবালা ঘাট। মহারাজার দুর্গে ও আশেপাশে বেশ কয়েকটি শিব মন্দির রয়েছে এখানে — শিবের বাসস্থান বা ‘আলয়’ হল ‘শিবালয়’, তার থেকেই ঘাটের নাম ‘শিবালা’। নেপালের রাজা সঞ্জয় বিক্রম শাহের প্রাসাদ রয়েছে এই ঘাটে। বর্তমানে অবশ্য এটি একটি অভিজাত হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পেরিয়ে যাই গুলারিয়া ঘাট, দণ্ডী সাধুদের দণ্ডী ঘাট।
তার ঠিক পরেই তুলসীদাসের স্মৃতিবিজড়িত হনুমান মন্দির সংলগ্ন হনুমান ঘাট। পূর্বে এই ঘাটের নাম রামেশ্বর শিবের নামে রামেশ্বর ঘাট ছিল। ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম চরিত্র এবং পুষ্টিমার্গ বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা বল্লভাচার্য এখানে বেশ কিছুকাল বাস করেন। বর্তমানে এই ঘাটে রয়েছে জুনা আখড়া। এরই মহন্ত হরিহর ভারতী আখড়াটি নির্মাণ ও ঘাট পাকা করেন। আবার কথিত আছে, একবার নন্দ দাস নামের এক জুয়াড়ি তার জুয়াখেলায় জেতা একদিনের রোজগারে এই ঘাটের সিঁড়ি বাঁধিয়ে দেয়। হনুমান ঘাটের পর কর্ণাটক ঘাট — মহীশূরের রাজার অবদান। তার পরেই হরিশ্চন্দ্র ঘাট।
‘ঐ দেখ, হরিশ্চন্দ্র ঘাট,’ অঙ্কিতা বলে উঠল।
বেনারসে এমন দু’টি জায়গা রয়েছে যেখানে গেলে কোনো শাস্ত্র না পড়েই জীবনের সমস্ত সত্য জানা হয়ে যায় — এক, মণিকর্ণিকা ঘাট, আর দুই, হরিশ্চন্দ্র ঘাট। সেখানে গেলে আঁচ পাওয়া যায় যে আমরা এই বিশ্বচরাচরের অস্তিত্বের তুলনায় কত তুচ্ছ, কত নগণ্য ও ক্ষণস্থায়ী, কত ভঙ্গুর। সেই স্থান স্বয়ং মনকে প্রশ্ন করে — কীসের এত কামনা, মোহ, আমিত্ব? সবকিছু তো সেই বাতাসের ধূলো হয়ে গাছের পাতায় স্তরে স্তরে জমবে, আকাশের বিশালতায় শরীরের উত্তাপ মিলে যাবে। একদিন হঠাৎ একদিন এক পশলা বৃষ্টি হয়ে মুক্তধারায় বয়ে চলবে কোন মহাসাগরের গভীরতায়। কাশীতে মানুষ মৃত্যু খুঁজতে আসে না, আসে মুক্তির সন্ধানে — চিত্তের মুক্তি, সত্ত্বার মুক্তি, আত্মার মুক্তি।
অঙ্কিতা আর চন্দ্রাবলী তখন মাঝির সাথে কথা বলতে শুরু করেছে। ওরা রাজা হরিশ্চন্দ্রের কাহিনি বলছে। এই কাহিনির সঙ্গে আমার ছোটবেলার কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কাহিনিটি আমি প্রথম শুনি আমাদের বাড়িতে থাকা অডিও ক্যাসেট প্লেয়ারে। আমার ‘কর্তামা’ অর্থাৎ ঠাকুমা তাঁর নতুন প্লেয়ারে সুযোগ পেলেই চালিয়ে দিতেন চৈতন্যদেবের সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া বা রাজা হরিশ্চন্দ্রের দুর্দশার কাহিনি নিয়ে লীলাকীর্তনের ক্যাসেট। আমরাও খেলতে খেলতে কর্তামার সাথে সেসব শুনতাম, কীর্তনিয়ার সাথে একের পর এক লাইন আউড়ে যেতাম, পুরোটাই প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। আজও যখনই হরিশ্চন্দ্রের কাহিনি শুনি, আমি কোন্ সুদূর অতীতের বেলায় হারিয়ে যাই। নৌকায় বসে আমি ওদের গল্পে কান পাতলাম, আর চোখের সামনে থেকে নিমেষে দৃশ্য বদলে গেল, ঘাটে দেখতে পেলাম আমাদের কাহিনির নায়ককে, তিনি কোনো এক মৃতদেহের সৎকারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে এক শোকস্তব্ধ নারী।
(ক্রমশ)
