কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২৩। শোভন সরকার

গত পর্বে: ব্রিটিশ শাসনকালে তাওয়াইফরা ধীরে ধীরে তাঁদের মর্যাদা হারালো। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু তাওয়াইফদের নাম আজও উজ্জ্বল, আর কত নামই বা হারিয়ে গেছে সময়ে।

শিবম আমার প্রশ্ন শুনে হালকা হেসে গঙ্গার ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন নিজের মনেই কত পুরোনো দিনের সাদাকালো জগতে হারিয়ে গেছে হঠাৎ করে। তবে আমি অবাক হলাম না, শিবমকে আগেও এরকম কথার মাঝে কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে যেতে দেখেছি। কী যেন ভাবে, হয়তো নিজের মনোজগতের অপার রহস্যে ডুব সাঁতার দিয়ে ঘুরে আসে একবার। সঙ্গে তুলে নিয়ে আসে কতকালের সঞ্চিত গুপ্তধন। 

গুপ্ত কী না জানিনা, তবে জীবন আমাকে অনেকবার অপ্রত্যাশিত আনন্দধনের সন্ধান দিয়েছে। আজকের এই সকালটা যেন তেমনই এক প্রাপ্তি। কত কিছু জানলাম। একদিকে মনের গহীনে আটকে থাকা কৌতূহল মেটার তৃপ্তি আর অন্যদিকে বৃহত্তর জীবনের উদারতার সন্ধান পাওয়ার আনন্দ — সব মিলিয়ে আজকের সকালটা আমার মনের মধ্যে এক বিশেষ জায়গা করে নিল। আনন্দময়ী ঘাটের নামটা যেন সত্যিই সার্থক — আনন্দ এখানে অনাবিল, অনন্ত। আশেপাশের দৃশ্যপটে তা নয় কেবল, তার বাইরেও কিছু অনুভূতি রয়ে যায় যার ব্যাখ্যা আমার ভাষায় কুলোল না। ‘আনন্দময়ী’ — ঘাটের এই নামটা কী স্নিগ্ধ, কী কাব্যিক, কী মমতা মাখা। 

কেন এই ঘাটের এমন নাম? কে এই আনন্দময়ী মা? কেনই বা বেনারস তাঁকে এত সযত্নে মনে রেখেছে? মনে প্রশ্ন ছিল বহুদিন পর্যন্ত। কৌতূহল ছিল এই ঘাটের প্রাচীরের ওপারে কী আছে তা জানার। কাকতালীয়ভাবে, মাস্টার্স শেষ হওয়ার কিছু আগে একদিন আমার বান্ধবী চন্দ্রাবলী কথায় কথায় আমার সেই সমস্ত প্রশ্নের জটাজাল থেকে আমাকে বের করে এনেছিল। কেবল তথ্য নয়, তার সঙ্গে উপহার দিয়েছিল ওর ব্যক্তিগত এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার রোমাঞ্চকর বর্ণনা। 

চন্দ্রাবলী মাস্টার্সে আমার সহপাঠী হলেও ওর সাথে সখ্য গড়ে ওঠে নাটকের সূত্রে। একবার কোন এক নাটকের রিহার্সালের সময় আমি ওর হাতব্যাগে একজন মহিলার ছবি দেখতে পাই — স্মিতহাসি ভরা মায়াময়ী মুখ, শ্বেতবসনা। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে জানলাম উনি মা আনন্দময়ী, চন্দ্রাবলীদের পরিবারের গুরুমাতা। 

মা আনন্দময়ী। ছবিঋণ: রিচার্ড ল্যানয়

আমি আগে কখনও এঁর ব্যাপারে শুনিনি। আজকাল তো কত রকম গুরুই তো খবরে উঠে আসছে, কে আসল কে নকল বোঝা বড় দায়। অন্যের বিশ্বাসে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু আমি নিজে আসল-নকল খুঁজে বের করার পরিশ্রম করতে নিতান্তই অনাগ্রহী। অতএব, আমি এই ব্যাপারে আর কোন কৌতূহল দেখালাম না সেবার। 

কিন্তু নানা প্রসঙ্গে বারবার মা আনন্দময়ীর নাম আমার সামনে এসে হাজির হতে লাগল। একবার আমাদের ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর অন্বয় স্যার তাঁর নিজের তৈরি এক ডকুমেন্টারি ফিল্ম আমাদের দেখালেন — ‘ডটার্স অফ সরস্বতী’। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও বেনারসের ‘মা আনন্দময়ী কন্যাপীঠ’ কীভাবে সংস্কৃত শিক্ষাকে সার্থকভাবে মহিলা শিক্ষার আধার করে তুলেছে তা এই ফিল্মটার মূল প্রতিপাদ্য। আনন্দময়ী ঘাটের ঠিক উপরেই এই প্রতিষ্ঠানটি নজরে আসে। ডকুমেন্টারিটা দেখে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পেলাম ঠিকই, কিন্তু মনের গভীরে জানার কৌতূহল যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। অগত্যা আবার চন্দ্রাবলীকেই ধরলাম। 

অবিভক্ত বাংলার ত্রিপুরায় খেউড়া গ্রামে (বর্তমান বাংলাদেশে) ১৮৯৬ সালে যখন মেয়েটির জন্ম হল, মা-বাবা খুশিতে আত্মহারা হয়ে নাম রাখলেন নির্মলা সুন্দরী। সারল্য ও অলৌকিকতার আলো নির্মলাকে সবসময় ঘিরে রাখত। তের বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হল ঢাকার বিক্রমপুরের রমণীমোহন চক্রবর্তীর সাথে। তাঁর প্রথম দিকের শিষ্য জ্যোতিষচন্দ্র রায়, সবাই ডাকত ‘ভাইজি’ বলে, তিনিই সর্বপ্রথম নির্মলা সুন্দরীকে ‘আনন্দময়ী মা’ বলে সম্বোধন করেন। ১৯৩৮ সালে কন্যাপীঠের যাত্রা শুরু হয় কেবল দু’টি মেয়ে নিয়ে। পরে ১৯৪৪ সাল নাগাদ কাশীর ভদৈনীতে তাঁর আশ্রম স্থাপিত হল গুরুকুল ব্যবস্থায় কুমারী মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য। মেয়েরা এখানে আইভরি রঙ বা গজদন্তবর্ণ কাপড় পরে, চুল ছোট রাখে, ব্রহ্মচর্যব্রত পালন করে। 

কাছেই শিবালাতে ১৯৬৮ সালে ভক্তবৃন্দের সহায়তায় মা আনন্দময়ী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মায়ের উপস্থিতিতে এই হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। কিন্তু এই সবের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল আনন্দময়ী মায়ের সদাপ্রসন্ন মুখ এবং সকলের প্রতি অকুণ্ঠ বাৎসল্য। বিখ্যাত সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ও দার্শনিক তথা বেনারসের গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজ (বর্তমানে ‘সম্পূর্ণানন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়’)-এর এক সময়ের অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় গোপিনাথ কবিরাজ; ভারতের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের একাদশ উপাচার্য ডক্টর ত্রিগুণা সেন প্রভৃতির মত তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্বগণ আনন্দময়ীর শিষ্য ছিলেন।

এহেন মা আনন্দময়ীর সাথে কীভাবে চন্দ্রাবলীর পরিচয় হয়েছিল তা জিজ্ঞেস করেছিলাম ওকে। সেই কথা বলতে গিয়ে সে আমাকে শোনাল এক ছোট্ট মেয়ের গল্প। সত্যি বলতে কি, মেয়েটির এমন আশ্চর্য অলৌকিক গল্প শুনতে আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না সেদিন। আপনাদেরও শোনাই সেই মেয়েটির কথা।

ছোট্ট মেয়েটির বয়স তখন কত হবে, ঐ তিন-চার। একদিন বাবা তাকে কোলে করে নিয়ে এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর কত গল্প শোনাচ্ছে। মেয়েটিও চোখ মেলে মেলে এদিক ওদিক চেয়ে দেখছে, যেন সবই নতুন। কিন্তু মনে হল সব অচেনার মাঝে দেওয়ালে দেওয়ালে, শো-কেসে নানা জায়গায় নানা ভঙ্গীতে রাখা আনন্দময়ী মায়ের ছবিগুলোর দিকে তার চোখ বারবার আটকে যাচ্ছে। যেন তার সাথে আনন্দময়ীর কত কালের পরিচয়। ঠাকুরমার ঘরে ঢুকতেই মেয়েটি প্রশ্ন করল, ‘এটা কে?’ 

ঠাকুমা বললেন যে তিনি আনন্দময়ী মা। শুনে মেয়েটি বলে উঠল, ‘ও আমার কাছে এসেছিল কালকে। আমাকে ‘বন্ধু’ বলে ডাকল।’  

ঘরের সবার এবার অবাক হবার পালা। আনন্দময়ী সত্যিই সব বাচ্চাদের ‘বন্ধু’ বলেই সম্বোধন করেন। কিন্তু এই মেয়েটিকে তো তা আগে কখনও বলা হয়নি। কী করে জানল সে? মেয়েটির ঠাকুরমার মনে পড়ে গেল অন্য এক দিনের ঘটনা। নাতনি একদিন তাঁর কোলে বসে গলা জড়িয়ে তাঁকে বলেছিল, ‘তুমিই আমার মা, ওরা আমার কেউ নয়।’ নিজের ছেলে-বৌমার বিরুদ্ধে নাতনির সেই আধো বুলির অভিযোগ হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেবার শালকিয়াতে তাঁর বাপের বাড়িতে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। সেখানে গিয়ে মেয়েটি একাই ঘুরে বেড়াতে লাগল এদিক সেদিক। বড়রা ব্যস্ত হয়ে উঠল, একি, বাচ্চা মেয়েটা হারিয়ে যাবে তো। কিন্তু মেয়েটা বলল, ‘আমি তো সব চিনি।’ ছেলের মুখে পরে সেই গল্প শুনে তিনি চুপ করে রইলেন। মনে পড়ে গেল সেই কত বছর আগের কথা। শালকিয়ার সেই বাড়িতেই আঁতুর ঘরের আলো-আঁধারিতে তাঁর প্রথম মেয়ে হয়েছিল। কিন্তু বাঁচানো যায়নি, গলায় নাড়ি ফেঁসে রয়েছিল। এই সব কিছুর মধ্যে এক অদ্ভুত যোগ খুঁজে পান যেন আজকের ছোট্ট মেয়েটির ঠাকুমা। নিজের হারানো মেয়েকে আরও একবার বুকে জড়িয়ে নেন। আনন্দময়ী ওকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন কোথা থেকে। 

এত বছর পর সেই ছোট্ট মেয়েটা যখন বড় হয়ে নিজেই আমাকে তার এই সত্যি গল্পগুলো শোনালো, তখন আমার গায়ে কাঁটা দিল। এগুলো চন্দ্রাবলীরই ছোট বেলার গল্প। বেনারসে আসার পর চন্দ্রাবলী প্রায়ই যে আনন্দময়ীর আশ্রমে যাতায়াত করত, সেখানে মেয়েদের ইংরেজি পড়াত, তা জানতাম।

বেনারসের যে আনন্দময়ী আশ্রমের কথা চন্দ্রাবলী আমাকে বলল সেটিই সেই ‘মা আনন্দময়ী কন্যাপীঠ’। অবিভক্ত বাংলাদেশের কোন এক অখ্যাত গ্রাম থেকে এসে নির্মলা সুন্দরী নামের সদাহাস্যময়ী মানুষটি ধীরে ধীরে জিতে নিল কত মানুষের মন। হয়ে উঠলেন আনন্দময়ী মা। তিনিই সর্বপ্রথম মহিলা যিনি মহিলাদের নিয়ে কীর্তন সভার আয়োজন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো তাঁর ছিল না, কিন্তু সহজ সরল ভাষায় কত গভীর কথা অবলীলায় বলতে পারতেন, মনের গহিনে প্রবেশ করে ব্যথা প্রশমন করে ফেলতে পারতেন। তাঁর আড়ম্বরহীন জীবন-যাপন, প্রচার বিমুখতা, মানুষের প্রতি সাম্যদৃষ্টি আর নির্মল অট্টহাস্য সকলকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। কাশীর ভদৈনীতে খালি পড়ে থাকা এক জমি ব্রিটিশদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে সেখানে মেয়েদের শিক্ষার জন্য আবাসিক আশ্রমটি চালু করেন, সংলগ্ন ঘাট বাঁধিয়ে দেন। এই ঘাটকেই আমরা আজ মা আনন্দময়ী ঘাট নামে চিনি। পূর্বে এর নাম ছিল ইমলিয়া ঘাট ও রাই বলদেও সহায় ঘাট। 

আজকে যখন শিবম আর আমি মা আনন্দময়ীর আশীর্বাদধন্য ঘাটে বসে একমনে নদীর মৃদুমন্দ অথচ গম্ভীর চাল দেখছি, মনের মাঝে কোথাও এক অনির্বচনীয় আবেগ জেগে ওঠে।

‘এই নদী কত কী যে দেখেছে, সেই কথা মাঝে মাঝে ভাবি। কত কিছুই না এল, তারপর একদিন সময়ের স্রোতে ভেসে গেল, তার হদিশ আমরা কতটুকুই বা রাখি। এই যে তুমি বুধোয়া মঙ্গলের কথা জিজ্ঞেস করলে, এই উৎসবের নাড়িতে নাড়িতে এই গঙ্গা জড়িয়ে ছিল, কাশী জড়িয়ে ছিল। আজ আছে কেবল তার স্মৃতি।’ 

শিবম গঙ্গার স্রোতের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে যেন কথাগুলো বলে উঠল। তার চোখে গঙ্গা থেকে তখন প্রতিফলিত হচ্ছে বুধোয়া মঙ্গলের ঝলমলে অতীত। 

(ক্রমশ)

প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Author

Leave a Reply