শরৎচন্দ্র দাসের ‘তিব্বত যাত্রীর ডায়েরি’। তৃতীয় পর্ব । অনুবাদে অমৃতা চক্রবর্তী

0

পর্ব ৩

আমার জীবনের গোড়ার দিকের কথা বলতে গেলে আমার ভাইয়ের কথা না বললেই নয়।

১৮৭৪ সালের মার্চে যখন আমি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আমার ম্যালেরিয়া হল। এ সময় প্রফেসর সি বি ক্লার্ক (প্রসিদ্ধ উদ্ভিদবিজ্ঞানী, এম. এ.)-এর কাছ থেকে দার্জিলিং-এর একটি ভুটিয়া আবাসিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করার জন্য আমার কাছে প্রস্তাব আসে। তিনি তখন রাজশাহী বিভাগে বিদ্যালয় পরিদর্শক পদে ছিলেন। প্রথমে প্রস্তাবটি আমি ফিরিয়ে দিই। চাকুরির এই প্রস্তাবটার কথা আমি যখন ভাই নবীনচন্দ্র-কে বলি, সে বলে “দাদা, আপনার এই প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত ছিল। গরমকাল আসছে। চাকুরিটি ছেড়ে দিয়ে দার্জিলিং-এর আবহাওয়ায় নিজেকে সুস্থ করার একটা মস্ত সুযোগ হারালেন।” সে প্রায় জোর করে ক্লার্ক সাহেবের সাথে আমাকে অতিসত্বর দেখা করার পরামর্শ দেয়। ভাইয়ের কথা মেনে নিয়ে আমি চাকুরিতে যোগ দিই।

এডগার সাহেব ( পরবর্তীতে যিনি স্যার জন হিসেবে খ্যাত) তখন দার্জিলিং-এর ডেপুটি কমিশনার। তিনি আমার যোগদানপত্র অনুমোদন করলে ৪ঠা এপ্রিল আমি দার্জিলিং-এর উদ্দেশে রওনা হই। ইস্ট-ইণ্ডিয়া রেলওয়েতে চেপে সাহেবগঞ্জ; সাহেবগঞ্জ থেকে ফেরি স্টিমারে করে করগোলা ঘাটে পৌঁছাই। সেখান থেকে একটি গরুর গাড়ি ভাড়া করে পূর্ণিয়া জেলার পূর্ণিয়া শহর, কৃষ্ণগঞ্জ এবং তিতালিয়া পেরিয়ে শিলিগুড়ি এসে পৌঁছাই। শিলিগুড়ি থেকে কার্শিয়াং যাওয়ার ঘোড়ার চলাচলের পুরোনো এক রাস্তা ধরে হেঁটে আমি কলাবাড়ি আসি। কলাবাড়ি থেকে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে বহু কষ্টে উপরের দিকে ওঠার সময় দেখি শিশু কোলে এক পাহাড়িয়া মহিলা তার ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে অনায়াসে টাট্টু ঘোড়ায় চেপে চলেছে। আমি কার্শিয়াং পৌঁছে একটি ঘোড়া ভাড়া করে দার্জিলিং পৌঁছাই। এটাই ছিল আমার ঘোড়ায় চড়ার প্রথম অভিজ্ঞতা। ১০ই এপ্রিল (১৮৭৪)-এ আমি আমার দার্জিলিং পৌঁছানোর খবর ডেপুটি কমিশনারকে জানাই।

তখন আমার ২৫ বছর বয়স। এডগার সাহেব আমাকে বলেন যে সরকারের ইচ্ছে হলো একটা আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করা যাতে স্বাধীন সিকিম রাজ্যের কুমারকে (যিনি বর্তমান মহারাজ) ইংরেজি শিক্ষা প্রদান করার ব্যবস্থা করা যায়। সেই সঙ্গে কুমারকে সঙ্গ দিতে এখানে কাজী মহাশয় এবং শহরের অন্যান্য প্রধান ব্যক্তিদের পুত্ররাও পড়াশোনা করবে। তাছাড়া এখানে কিছু দোভাষীও যাতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পায় সে ব্যবস্থা করা হবে। তিনি ইতিপূর্বেই পেমা-ইয়াং-সি মঠের একজন তরুণ লামা যেন-গা-সো কে চাকরিতে নিযুক্ত করেছেন আমাকে স্কুলের কাজে সাহায্য করার জন্য। আমি এরপর প্রয়াত মহারাজ কুসো-কিয়ং-নামগুল কে চিঠি লিখে তাঁর পুত্র কুমার এবং সিকিমের প্রধান কাজী মহাশয়দেরও অনুরূপভাবে তাঁদের পুত্রদের আমার তত্ত্বাবধানে শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করে চিঠি দিলাম। তাছাড়া দার্জিলিং-এর আশেপাশে বসবাসকারী কিছু ভুটিয়া কিশোরদের নিয়ে আবাসিক বিদ্যালয়টিকে এবার আরম্ভ করে দিলাম। ভুটিয়া কথ্য ভাষার সাথে অপরিচিত থাকায় প্রথম প্রথম আমরা ইশারায় ভাববিনিময় করতাম। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের চলিত ভাষার কিছুটা আয়ত্তের মধ্যে এনে ফেললাম। কিশোরগুলিও আমার কাছ থেকে কিছু কিছু সাধারণ শব্দ শিখে নিল। সেই থেকে আমি তিব্বতি ভাষা শিখতে শুরু করলাম। এই ভাষারই উপভাষায় দার্জিলিং আর সিকিমের ভুটিয়ারা কথা বলে। আর সেই তরুণ লামাটিও আমার সাথে ইংরেজি এবং তিব্বতি ভাষা চর্চা শুরু করতে লাগল।

আগস্ট মাসে স্যর জেমস হার্শেল এবং তাঁর সঙ্গে এডগার সাহেব বিদ্যালয় পরিদর্শনে এলেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চার মাসের মধ্যে শিক্ষক আর পড়ুয়াদের তিব্বতি এবং ইংরেজি ভাষায় কতটা উন্নতি সাধন হয়েছে সে বিষয়টি নথিভুক্ত করা হলো। আমাদের বিনীত প্রচেষ্টায় তিনি এতটাই বিমুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি বিদ্যালয়ের কাজের উপর একটি অফিশিয়াল স্মারকলিপি লিখে দিয়েছিলেন। তা থেকে কিছু লাইন উদ্ধৃত করলাম :—

“১. আমি এইমাত্র দার্জিলিং-এ এডগার সাহেবের প্রতিষ্ঠিত আবাসিক বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করলাম। কিছু তিব্বতি  কিশোরকে ভবিষ্যতে দেশের কাজে সুপ্রশিক্ষিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। মাত্র চার মাস আগে সমতল থেকে আসা শিক্ষক মহাশয়ের সহযোগিতায় এই বিদ্যালয়টি চালু হয়েছে। আর ইতিমধ্যে এর প্রাপ্ত ফলাফল সত্যিই অসাধারণ। এখানে মোট ১৪ জন ছাত্র; বয়স ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। তার মধ্যে একজন দার্জিলিং-এর সব থেকে বড় জমিদার চেবু লামার পুত্র। সে এতদিন সিকিমের পেম-ইয়াং-সি মঠ থেকে শিক্ষা লাভ করেছে। এডগার সাহেব সেখান থেকে তাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। অন্য ছেলেদের মধ্যে ৬ জন লামা। যদিও তাদের পিতা-মাতা লামা নন; অল্প বয়সে বিবাহ  রুখতে তাদের লামা হিসেবে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একজন ছেলে আছে যে লামা নয় আর ইতিমধ্যেই বিবাহিত।

২. এই কিশোরদের চেহারা বেশ দৃষ্টিনন্দন। বছরে দু’বার স্নান করার পরিবর্তে তাদের সপ্তাহে দু’বার স্নান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক মহাশয়ের আশা যেন ছেলেরা সপ্তাহে তিনবার করে স্নানের অভ্যাস করে। তারা প্রতিদিন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার নিয়ম পালন করে। তাদের মাথার চুল সুবিন্যাস্ত ভাবে ছাঁটা। তাদের কালো অথবা রাঙা কর্টিসগুলি (corteis: দেখতে অনেকটা নীল-কোট এর মত) পরিষ্কার এবং সুন্দর। সাধারণ কোন পাহাড়ি ছেলের থেকে এই কারণে এদের দেখতে অনেকটা আলাদা লাগে। প্রতিদিনের কাজে তাদের নিদারুণ উৎসাহ। এবং এ যাবৎ তাদের উন্নতি অসাধারণ। প্রত্যেকেই ইংরেজি বাক্য পড়তে সমর্থ। বেশিরভাগই ছাত্রই শুনে শুনে কিছু জানা ইংরেজি বাক্য লিখতে পারলো। তিন-চারজনের লেখার হাত রীতিমতো দুর্দান্ত। পটু হাতে, অসামান্য ভঙ্গিমায় এরা খড়ি দিয়ে লিখল; ঠিক যেন এক একজন দক্ষ করণিক তারা। ছেলেদের প্রত্যেকেই তিব্বতি ভাষায় লিখতে সক্ষম। এর বেশিরভাগটাই তারা আগেই শিখে এসেছে।

৩. তাদের ইংরেজি ভাষার বোধটিও তাৎক্ষণিক। বিদ্যালয়ের শিক্ষক মহাশয় চার মাস আগে যখন এখানে আসেন, এক বর্ণ তিব্বতি ভাষাও তিনি জানতেন না; আর ছাত্ররা জানতনা এতটুকু ইংরেজি। তাদের কাছে একটি তিব্বতি এবং ইংরেজির শব্দ ছাড়া যোগাযোগের কোন পথই ছিল না। লামা শিক্ষকটি ইংরেজি শিখতে সচেষ্ট। কিন্তু দু’পক্ষের একটা সাধারণ ভাষা আছে, যা হলো প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, এবং এটার দ্বারাই তারা একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করেছে। এ সত্ত্বেও কিশোরগুলি অনেক শব্দের বানান এবং তার মানে বলতে সক্ষম, অথচ সেই শব্দগুলি তাদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন। ছোট শব্দগুলিতে এখন রীতিমতো দক্ষ এবং ইতিমধ্যে ব্যাকরণে কিছুটা পাঠ নেওয়া শুরু করেছে।

৪. তারা পাটিগণিতেও বেশ কিছুটা উন্নতি করেছে। ছোট ছোট যোগ করতে এরা স্বচ্ছন্দ। এসবের সাথে তারা ছুতোরের কাজও শেখা শুরু করেছে। বেঞ্চ, মানচিত্র রাখার যে স্ট্যান্ডগুলো তারা ব্যবহার করছে, নিজেরাই সেগুলো তৈরি করেছে। খুব সম্প্রতি একটা গোলটেবিলও বানিয়ে ফেলেছে। তারা কাজ নিয়ে খুব আনন্দে থাকে। তাদেরকে বাগান পরিচর্যা, রাস্তা তৈরির পাঠ দেওয়া হয়। খুব শীঘ্রই তারা ব্যায়াম শিখতে শুরু করবে।

৫. শিক্ষক মহাশয় শরৎচন্দ্র দাস তার কাজের প্রতি সক্রিয় নিষ্ঠার জন্য সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।”

এরমধ্যে সিকিমের বৃদ্ধ মহারাজ প্রয়াত হলেন এবং আমাদের ছাত্র কুমার যুতব-নামগনা মহারাজা পদে অভিষিক্ত হন। পাঁচ জন সুদর্শন কিশোর (কবি, করমি, লাসো, ইয়াং সাং, রিংগো কাজী মহাশয় এর সন্তানরা) আমার বিদ্যালয়ে ভর্তি হল। এর পরেই আমি তিব্বতি ভাষার চর্চার ক্ষেত্রে ভীষণ অধ্যবসায় শুরু করলাম।

ঠিক পরের বছরে বিদ্যালয় পরিদর্শনে এলেন স্বয়ং ভাইসরয় লর্ড নর্থব্রুক, লেডি বেরিং এবং মেজর বেরিং (বর্তমানে লর্ড ক্রোমার)। তারা এখানে এসে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে ভাইসরয় লর্ড নর্থব্রুক আমাদের বিদ্যালয় পরিদর্শনের স্মারক হিসাবে সরাসরি ইংল্যান্ড থেকে তাঁর প্রতিকৃতিটি উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন। স্যার রিচার্ড টেম্পল ভাইসরয়ের বিশেষ অনুরোধে তাঁর হয়ে প্রতিকৃতিটি উপহার দিতে এসেছিলেন। এই উপলক্ষে তিনি একটি ছোট্ট কিন্তু খুব সুন্দর একটা বক্তৃতা দিয়েছিলেন। যার মধ্যে তিনি শুনিয়েছিলেন বিস্তৃত অজানা দেশে অভিযানের দুরন্ত কাহিনী। আর তাতে আমার ভবিষ্যৎ অন্বেষণের পূর্বাভাস নিহিত ছিল। তাঁর সেই বক্তৃতার প্রত্যেকটি কথা আমার মনে সারাজীবন গেঁথে থাকবে।

(সম্পাদনা: শোভন সরকার)

Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *