পুনর্ভবাপুত্র। ধারাবাহিক উপন্যাস। তৃতীয় পর্ব। লিখছেন আহমেদ খান হীরক।

জিনের বাদশা

সকাল হবে আর আমরা ছবি আপার বাড়ি যাবো না, তা হবার না!

তবে, আমাদের বাড়ির সকালটা, অন্য বাড়ির সকালের চাইতে একটু আলাদা করে হয়। সবসময়ই।

আমাদের বাড়ির সকালটা বার গুণে শুরু হয়।

আজ মঙ্গলবার… সকালটা তাই শুরু হবে খিচুড়ি দিয়ে। যদি বুধবার হতো, তাহলে কিন্তু চালের রুটি। মানেটা হলো, আমাদের বাড়ির সকালের নাস্তা বার ধরে পূর্বনির্ধারিত। তো, এই খিচুড়ি আমার বিশেষ প্রিয়। ঢাকায় আসার পর প্রবল ভুনা খিচুড়ির পাল্লায় পড়েছিলাম। কিন্তু এ খিচুড়ি ভুনা নয়…গলা। পাতলা এ খিচুড়ি খেতে হয় মরিচ পোড়া আলুভর্তা দিয়ে; সঙ্গে ডিমভাজা থাকলে ভালো, না থাকলেও কোনো অসুবিধা নেই। গরম খিচুড়ির ওপর গাওয়া ঘি পড়ে গেলে মনে হবে মুখে যাচ্ছে গলে থাকা অমৃত।

আমার খাওয়াটা আজকে তাড়ার সঙ্গে হলো। স্কুলড্রেস পরেই বেরিয়ে পড়লাম—না, স্কুলের দিকে না–একদম ছবি আপার বাড়ির দিকে।

চারটা গলি, আর সাতটা মতো বাড়ি পেরোলেই ছবি আপাদের বাড়ি। উঠানে থইথই করছে লোকজন। এদিকটা থেকেই বাজারের শুরু হয়েছে বলে বলা যায় বাজারও হামলে পড়েছে। এমন খবর রাষ্ট্র হতে সময় তো লাগে না!

বারান্দায়, একটা চৌকির ওপর, ছবি আপা বসে আছে। হেলান দিয়ে আছে দেয়ালে। লালচে সালোয়ার কামিজ পরনে। চুলগুলো রুখো। চোখের নিচে কালি কিনা কে জানে! মুখটা শুকিয়ে এতটুকু। আশ্চর্য! ঠোঁটজোড়াএখনও নীল!

আরো আশ্চর্য এই যে, এর মধ্যেও, ছবি আপাকে প্রতিমার মতো সুন্দর লাগছে।

সেবাইত আখড়ায় প্রতি বছর, দুর্গা পুজোর আগে, বর্ডার পেরিয়ে, কারিগর আসতেন। সময় নিয়ে, ধরে ধরে, দুর্গাকে তৈরি করতেন। বারান্দায় মনে হচ্ছে তেমনই কেউ বসে আছে। সবার দৃষ্টিতে বিস্ময়। সবার মুখে কৌতুহল। সবার মধ্যেই একটা বিড়বিড়ানি। তাদের যে দুটো শব্দ খুব ঘন ঘন শোনা যাচ্ছে তা হলো–জিনের বাদশা! জিনের বাদশা!

লোক কমছে না। বরং আরো বেড়েই যাচ্ছে। উঠানে জায়গা দেয়া যাচ্ছে না, এমন অবস্থা। কেউ বারান্দার দিক থেকে রান্নাঘরের দরজাতেও। এর ওর মুখ থেকে টুকরো টুকরো কথা শুনে যা গল্পটা সেই অল্প বুদ্ধির মাথাতে দাঁড় করাতে পারলাম তা এরকম…

ছবি আপারা তখন লুকাচুন্নি খেলছিল। পুনর্ভবা প্রায় খালি হয়ে এসেছিল তখন। বিশেষত খালি ছিল পাথরঘাটও। ছবি আপা চোর হয়ে প্রথমেই ডুব দিয়ে চলে গিয়েছিল কচুরিপানার আড়ালে। কিন্তু ইতি আপা তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলে ধরা পড়ার ভয়ে ছবি আপা এবার সেখান থেকে ডুব দিয়ে চলে যায় পানির নিচের দিকে। বেশ খানিকটা নিচে যাবার পর, নিজেকে মাছের মতো পানিতে কাটিয়ে, ইতি আপার উল্টো দিকে পানি থেকে ওঠার চেষ্টা করে ছবি আপা। আর তখনই, ছবি আপা বুঝতে পারে, তার পা কোথাও আটকে গেছে। চেষ্টা করেও শরীরটা ওঠাতে পারছে না ওপরে। ছবি আপা কয়েকবার পা ঝাঁকুনি দেয়; কিন্তু লাভ হয় না। এবার শরীরটা ঘুরিয়ে ছবি আপা নিচটা দেখার চেষ্টা করে… আর তখনই সে, কী ভয়ানক, একটা লোমশ হাত দেখতে পায়। আর হাতটা ক্রমেই তাকে পানির নিচের দিকে টানতে থাকে। নিচে, আরো নিচে!

ছবি আপা বারবার চেষ্টা করে ওপরে উঠতে। কিন্তু পারে না। হাতটা তাকে পানি থেকে আরো পানির ভেতর… একেবারে যেন নদীর শেষ তলানিতে নিয়ে যেতে থাকে। ছবি আপা চিৎকার দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু লাভ হয় না। তাকে পাতালের ভেতরে যেন ঢুকাতে থাকে হাতটা।

জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ছবি আপা। আর যখন ফেরে তখন দেখে পানির ভেতর একটা প্রাসাদের মধ্যে সে। কী তার জেল্লা! কী তার ঝকমারি ব্যাপার-স্যাপার! আর প্রাসাদের মধ্যে, একটা বড় সিংহাসনে বসে আছে ধবধবে সাদা জুব্বা পরা কেউ। মুখভর্তি সাদা, লম্বা লম্বা দাড়ি, চুলও একেবারে ধপধপে। চোখগুলো যেন জ্বলছে। আর ছবি আপার হাত তখনও ধরে আছে ওই কালো কর্কশ হাত। হাতটা ধরে লোকটার দিকে তাকাতেই ছবি আপা যেন চিৎকার করে ওঠে। কী ভয়াল দর্শনের লোক! ছবি আপার চাইতে ডাবল লম্বা। মুখটা কালো। চোখগুলো লাল। ছবি আপা ভয়ে ভয়ে বলে, আমি কোথায়?

কালো লোকটা হাসে। কিন্তু সাদা লোকটা খুব বিরক্ত হয়। সাদা লোকটা বলে, কেন ধরে আনছিস ওরে?

কালো লোকটা বলে, ওরে আমার পছন্দ হয়েছে। খুব পছন্দ। আমি ওরে বিয়া করব।

সাদা লোকটা চিৎকার করে বলে, জিনে আর মানুষে বিয়া করার নিয়ম নাই, জানিস না তুই?

কালো লোকটা কিছু বলে না অনেকক্ষণ। তারপর ফোঁস করে বলে, আমি সত্যি সত্যি ওরে বিয়া করতে চাই বাদশা!

বাদশা আরো জোরে চেঁচায়। প্রাসাদ যেন কেঁপে ওঠে। কালো লোকটাও। বাদশা বলে, এক্ষুনি ওরে ওপরে রাইখা আয়। যা…!

কালো লোকটা নড়ে না। বলে, আমি ওরে মহব্বত করছি। আমি ওরে…

বাদশা এবার ঝটকায় উঠে দাঁড়ায়। এবার যেন অদ্ভুত গোঙানিতে ভরে যায় চারপাশ। কালো লোকটা ভড়কে পিছিয়ে যায়। বাদশা এবার ছবি আপার মাথায় হাত দিয়ে বলে, মা, তুমি ভয় পাইও না। তুমি দেখতে রূপবতী। এ জন্য ওই নাদান তোমাকে ধরে নিয়ে আসছে। তোমার রূপের মায়ায় পড়ছে। তোমারে মহব্বত করছে বলে ভুল ভাবনাও আসছে মাথায়। ওরে মাফ করে দাও।

ছবি আপা কিছু বলতে পারে না। কিন্তু পরক্ষণেই বাদশা ছবি আপার হাত ধরে টান দেয়। আর সেই একটা টানেই যেন হঠাৎই আপা খেয়াল করে সে নদীর ভেতর। ঠান্ডা পানি। পুনর্ভবার পুরনো ঘ্রাণ। বাদশা ছবি আপাকে আরেক টানে পাথরঘাটের পাথরটার ওপর বসিয়ে দেয়। পরক্ষণেই পানির ভেতর একটা ঘাই তুলে, বাদশা একেবারে নাই!

দিনের বেলা, তাও আবার সকাল, তবু এই গল্প শুনে আমার কলিজা খালি হয়ে যায়। স্কুল যাবো না বাড়ি চলে যাবো, বুঝতে পারি না। বাড়ি গেলেও আজকে আর কেউ কিছু বলবে না। আর যদি বলতে আসেই তাহলে জিনের বাদশার গল্পটা শুনিয়ে দেবো। সবাই হা হয়ে টাশকি খেয়ে থাকবে–আমাকে স্কুল না যাবার জন্য বকারও সুযোগ পাবে না।

ছবি আপাকে আরেকবার দেখি। এত ভালো লাগে! কী রূপ তার… জিন পর্যন্ত তাকে ধরে নিয়ে যায়। গর্ব তো হয়ই, ঈর্ষাও হয় খানিকটা। নিজের রোগা-পটকা হাতের দিকে তাকাই। একটু রূপ যদি ছবি আপার কাছ থেকে পেতাম। কোনো পরীর সাথে তাহলে আমারও দেখা হয়ে যেত!

আমি ছবি আপার দিকে তাকিয়েই ছিলাম আর ছবি আপাও তখন চোখ ওঠালো। আমার চোখে চোখ পড়তেই অল্প হেসে উঠে দাঁড়াল—হীরক… এইদিকে আয়…

এই ভরা মজলিশে, এত লোকের ভেতর, মধ্যমণির মুখে হঠাৎ করে আমার নাম শুনে আমার গর্ব হওয়ার কথা… ওমা, তা না হয়ে আমার ভীষণ সংকোচ হতে লাগল। আমি কেউ না, আমি কেউ না… এমন একটা ভাষা ফুটে উঠতে শুরু করল শরীরে। ফলে এগিয়ে যাওয়া আর হলো না। কিন্তু ততক্ষণে ছবি আপা নিজেই এগিয়ে এল। লোকজন সরে যাচ্ছে তাকে জায়গা দিকে। ছবি আপা আর হাতটা ধরল শক্ত করে। আমি তাকালাম সেই হাতের দিকে… কী সুন্দর ফর্সা হাত! একটা নীল কাঁচের চুড়ি পরা। আমাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল মইয়ের দিকে… লাল রড দিয়ে বানানো মই। মইয়ের ওপরেও ছবি আপার সেই টান… আমার একবার ভ্রম হলো আমাকে বোধহয় পরি ধরেছে… টেনে নিয়ে যাচ্ছে পরির বেগমের কাছে। আমি এত সুন্দর… এই পরিটা ঠিক করেছে যে আমাকে বিয়ে করবে! আমি বোধহয় এরপর থেকে পরির রাজ্যে থাকব!

কিন্তু আমরা দাঁড়ালাম শুকনো মরিচের রাজ্যে।

সারা ছাদজুড়ে মরিচ। লাল মরিচ। চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ছবি আপা এখনো আমাকে ধরে আছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে চট করে বুকের ভেতর হাত চালিয়ে দেয় আপা। খলবলিয়ে একটা কিছু বের করে নিয়ে আসে। আমার হাতে গুঁজে দেয়। আমি চট করে তাকিয়ে নিই। একটা চিঠি। একটু একটু ভেজা। ছবি আপা তাড়াতাড়ি বলে, ইশকুলে যাবি না তুই?

আমিও দ্রুত মাথা নাড়াই।

ছবি আপা বলে, যাবার সময় বা আসার সময়… তোদের রুবেল ভাইকে দিয়ে দিবি! সবাইকে লুকিয়ে দিবি।

আমার বুকের ভেতরটা অযথা ধড়াস করে ওঠে। ছবি আপা তাড়াতাড়ি চিঠিটা আমার হাত থেকে পকেটের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। আমার হাতে আর চিঠি নেই, কিন্তু চিঠির ভেজাটা আছে। আমি বলি, আপনাকে জিনের বাদশার কাছে নিয়ে গেছিল?

ছবি আপা হেসে দেয়। টোলপড়া হাসি। তারপর আমার কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু একটা বলে। তাতে জিনের বাদশার বেদম নিষ্পত্তি হয়ে যায়। কিন্তু কী সে নিষ্পত্তি তা আমার মাথায় খুব ভালো করে ঢোকে না। কারণ তখন উপহার হিসেবে ছবি আপা আমার গালে চকাস করে একটা চুমু খেয়ে ফেলেছে।

আমি গালে চুমু, হাতে ঘাম, আর পকেটে একটা গোপন চিঠি নিয়ে ইস্কুলের দিকে চলে যাই।

(ক্রমশ)

আহমেদ খান হীরক
+ posts

জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৮১। দশ বছরের লেখালেখির জীবনে লিখছেন মূলত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। কর্মরত আছেন একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলে। কথাসাহিত্যের সাথে লিখছেন টিভি নাটক ও সিনেমা।

প্রকাশিত বই-পত্তরঃ
কবিতা - আত্মহননের পূর্বপাঠ (২০১০)
রম্য সংকলন - যে কারণে আমি সাকিব আল হাসান হতে পারি নি (২০১৭)
গল্প সংকলন - য পলায়তি স জীবতি (২০২০), সিলগালা মহল্লার ব্যালকনিরা (২০২১)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *