কাগজের নৌকো। পর্ব ২৫। ধারাবাহিক উপন্যাস। লিখছেন সায়ন্তন ঠাকুর

নিম ফুলের মধু সামান্য তিতকুটে হয়। গাছের ওপরের দিকে দুটো ডালের ফাঁকে কী বিশাল এক চাক বেঁধেছে ওরা। সারাদিন ছুটে ছুটে গুনগুন করে যায় আর আসে। ভেতরে ছোট ছোট খুপরি ঘর, শুধু ওদের কোনও উঠোন নাই।

আমাদের আঙিনা আছে, তাকে গোল করে ঘিরে রেখেছে ভাঙা দালান। আগাছা জঙ্গল, বুনো লতা,লজ্জাবতী আর তুলসী ঝোপে ভরে আছে চারধার। আশি বছর নব্বই বছর আগে বাড়ির মানুষজন বাক্স-প্যাঁটরা তোষক বিছানা বালিশ মুখ দেখার আয়না পিঁড়ি কাঁসার থালা বাটি সব নিয়ে রওনা দিয়েছিল শহরের দিকে। উন্নতি করতে হবে,ছেলেপিলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে সওদাগরি হৌসের বাবুদের চাকর করতে হবে, ভিটার মায়া করে পড়ে থাকলে চলবে ?

তবে ছেড়ে গেলেই ওই ভিটাও যে ছেড়ে যাবে,এমন তো কোনও কথা নেই! সে দিব্যি আছে! পুরনো দিনের বাংলা ইঁটের গাঁথনি,নিচু নিচু কড়ি বরগার ছাদ ঘোরানো সিঁড়ি। ওই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই দোতলার টানা বারান্দা। কড়ি-বরগা খসে পড়েছে, মেঝের দু একটা টালি আলগা হয়ে গেছে অনেকদিন। সন্ধের মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গলা তুলে ‘রাধু , রাধু’ বলে দুবার ডাকলেই হ’ল! একটা লম্বা সিড়িঙ্গেপানা লোক বেরিয়ে আসবে উত্তরের মহল থেকে। হেঁটো ধুতি, সাদা ফতুয়া গলায় একটা পাকানো উড়নি! হাতে টিমটিম করে জ্বলছে রেড়ির তেলের লম্ফ। মাঝখানে সিঁথি পাটি করে দুপাশে পাতা তেল চুকচুকে চুল।

–ই,লাটের ব্যাটা লাট এয়েচে! আবার আলবটু কেটেচে!

একগাল হেসে রাধু বলে উঠল, ‘কত্তা, তামুক ?’

–তামুক হবেখ’ন। আগে খেতে দে দিনি কিচু ?

–আজ্ঞে, কাচাগোল্লা আচে, গাচপাকা ন্যাংড়া আচে, কেটে দি ক’খান ? বাউন’দি কে বলি ক’খান নুচি ভেজে পাকা কুমড়োর ছক্কা দিয়ে দিক ? তেতেপুড়ে এয়েচেন!

–আম ? কোতাকার আম ? কে দিয়ে গেল ?

–আজ্ঞে, নায়েব ময়াই এয়েচিলেন, লালবাগের গাচপাকা আম নে !

–নায়েব এয়েচিল ? খপর দিল না তো একটা আমাকে!

–বলচিল, তেমন খাজনা আদায় হয়নিকো এবচর!

দু এক মুহূর্ত পর কী যেন চিন্তা করে মেজকত্তা বলে ওঠে, ‘যা তুই একন!’

–আজ্ঞে, বাউন’দিকে বলি ?

একটু বিরক্ত স্বরে হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর মতো ভঙ্গি করে কত্তা বলে ওঠে, ‘না না,লাগবে না, তুই কাশেমকে গাড়ি জুড়তে বল, মোতিবাঈয়ের কাচে যাব আমি!’

সন্ধে নেমে এসেছে তখন। উত্তরের গঙ্গা থেকে তপ্ত দিনের শেষে হা হা বাতাস উঠেছে। ছাদে দাঁড়ালে দূরে দেখা যায় ব্রজডাকাতের বিলের ধূ ধূ চর। আলসে দিয়ে ঘেরা উঁচু নিচু তেপান্তরের মাঠের মতো এক ছাদ। মনে হয় এখনই ডানা মেলে উড়ে যাবে পূব আকাশে সদ্য ভেসে ওঠা বগি থালার মতো চাঁদের দিকে। চরের বালি জোছনায় কেমন চকচক করছে,নিশুত রাতে লম্বা লম্বা পা ফেলে কে যেন ওই বালুর ওপর কেঁদে কেঁদে ঘুরে বেড়ায়। ব্রজডাকাতের বিলে থোকা থোকা পদ্ম ফুটেছে। দিনমানে পানসি নিয়ে বিলের জলে কী যেন খুঁজে চলে বুড়ো কাশেম মিঞা। রাতের বেলায় ঘোড়া জুতে মেজকত্তাকে মোতিবাঈয়ের কোঠায় নিয়ে যায়। সূয্যি উঠলে চোখ লাল করে কত্তা ফেরে,রাধু গন্ধরাজ লেবু দিয়ে পাতলা ঘোলের শরবত বানিয়ে কালো পাথরের গেলাসে ঢেলে কত্তার মুখের কাছে ধরলে তবে কাশেমের ছুটি।

ছোট পানসিখানা ঘাটের কাছেই বাঁধা থাকে কাশিমের। পদ্মপাতা লগি দিয়ে ঠেলে ঠেলে মুখ নিচু করে জলে কী দ্যাখে কাশেম ? প্রাচীন বলিরেখায় ঢাকা তার নিজেরই মুখ ভেসে ওঠে জল তলে। কোঁচকানো চামড়া, কোটরে বসা দুটো হলুদ চোখ। মাথায় ফেজ টুপি, সাদা ফিনিফিনে কাপাস তুলোর মতো দাড়ি উড়তে থাকে ডাকাতে বিলের বাতাসে।

বিলের এপারে আশশ্যাওড়ার ঘন বন। পুরোনো একটা বটগাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে কবে থেকে!  মোটা ঝুড়ি নেমেছে গা থেকে। তার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে ডেমিন সাহেবের পোড়ো নীলকুঠি।  ওই সাহেব কুঠি লুটপাট চালাতে ব্রজ ডাকাতের দলবল একবার হানা দিয়েছিল। মেমসাহেব কে তুলে নিয়ে ছিড়েখুঁড়ে ফেলে রেখে গিয়েছিল বিলের ধারে। অনেক পরে গঙ্গা সরে গেলে সেখানে এখন খা খা বালির চর। ফাল্গুন-চৈত মাসে তরমুজ ফলায় চাষার। টকটকে লাল তরমুজের কী মিষ্টি স্বাদ! ভিনদেশি রক্ত মিশে আছে নাকি ওইসব অতিকায় তরমুজের শাঁসে ? ওই ঘটনার পর ডেমিন সাহেবও কেমন পাগল পারা হয়ে গেছিল। একমুখ কটা দাড়ি গোঁফ, ঘন নীল চোখ,রোদে পুড়ে তামাটে গায়ের রঙ, সারাদিন বিলের জলে কাশেমের মতোই কী যেন খুঁজে বেড়াত। তখন কাশেমের কতই বা বয়স, সাত আট হবে। বিলের ধারে সাহেব দেখত ভিড় করতো গাঁয়ের যত ছেলেপুলে। সাহেবের তেজি ঘোড়াটাও কেমন বুড়িয়ে গেল অকালে। সারাদিন ওই বটগাছের ছায়ায় ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো। কুঠির নোকর খানসামারাও একে একে চাকরি ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেল! কত নির্জন দ্বিপ্রহরে সাহেব আর তার ঝিমন্ত ঘোড়াকে বিলের ধারে বসে থাকতে দেখেছে কাশেম। মাথার ওপর খা খা আকাশ, শনশন করে ছুটে আসছে হাওয়া। দু একটা গলা উঁচু বক এক পা ডুবিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিলের জলে। ঝাপসা দিকচক্রবাল রেখার কাছে তিরতির করে কাঁপছে সবুজ গাছপালার সারি।

সেসব কবেকার কথা। কাশেম মরল রাধু মরল মেজকত্তা মরে হেজে গেল কালের বাতাসে। কত্তার নাতিরা ভিটা ফেলে সব এদিক ওদিক।

সন্ধ্যারতি শুরু হয়েছে মন্দিরে। কত্তাদের কুলদেবতা গিরিধারীজিউ দুপাশে দুটি রাধারাণী নিয়ে হাসিমুখে চেয়ে আছেন। গলায় জুঁই ফুলের মালা। বাতাসা কদমা লাল চিনি ছড়ানো চমচম পাথরের বাটি ভর্তি ক্ষীর আর লুচির সেবা দেওয়া হয়েছে গিরিধারীকে। নাটমন্দিরে বেজে উঠছে শ্রীখোল। টিউব লাইটের আলোয় সাদা চারপাশ। ঝাড়বাতি তামাদি হয়ে গেছে কবেই। কত্তার আমলের সে রবরবা আর নাই । উত্তরের মহল থেকে শোনা যায় মেজকত্তার ভারী গলার স্বর, ‘রাধু,রাধু, এই হারামজাদা রাধু!’

ছুটতে ছুটতে হাতের কাজ ফেলে এসে দাঁড়ায় রাধু, ‘আজ্ঞে,কত্তা !’

–গিরিধারীকে সর্ষের তেলের নুচি দিয়েচিস ? হারামজাদা এত বড় সাহস তোদের!

–আজ্ঞে,ঘি শ্যাস…

–চুপ কর! খাগড়ায় ঘি আড়তের বিশ্বেস আচে কী করতে শুনি!

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে রাধু।

–কী রে মুকে রা নেই ক্যানো ? আর ওই ক্যানকেনে গলায় কোন গুখেকোর ব্যাটা কীত্তন করচে শুনি ?

–আজ্ঞে, শক্তিপুরের…

গর্জে ওঠে মেজোকত্তা, ‘শক্তিপুর ? ছ্যা ছ্যা, শ্যামবাবাজির আখড়ার দল কোতায় ?’

একটু থেমে ফের হিসহিসে গলায় বলে ওঠে কত্তা, ‘কাশেমের বিটির মতো ডাকাতে চরায় তোর লাশ পুঁতে দেব রাধু! বড্ড বাড় বেড়েচে তোদের!’

দুপুরের দিকে শুনশান মন্দিরে কেউ থাকে না। দরজা বন্ধ করে নিদ্রা গিয়েছেন গিরিধারী। দু একটা পায়রা গলায় মটর তুলে বকবকম বকবকম করে চলেছে নিজের মনে। পাশের ঘরে শ্রীনিবাস আচার্যের পট। ঝাপসা হয়ে এসেছে হাতে আঁকা পট, চন্দনের ফোঁটা কপালে, একটা বেলকুঁড়ির মালা পরানো গলায়। ঠাণ্ডা পাথরের মেঝে, কোথায় একটা ঘুঘু একসুরে ডেকে চলেছে। আচার্যের চোখে ঘুম নেই। সেই পদটা যে এখনও শেষ হয়নি। দরজা বন্ধ করে রেখে দিয়েছে, বড় ইচ্ছে করে গিরিধারীর সামনে গিয়ে একবার বসে। নতুন পদ গেয়ে শোনায় মাধবকে। উপায় নেই, সিংহাসনে জড় ভরতের মতো আটকে রেখেছে। এরা এমনকি ছোটবউ পদ্মাবতীর একটা পট পর্যন্ত এনে রাখতে পারেনি তাঁর পাশে! এমন দ্বিপ্রহরে পদ্মা একখিলি পান রেখে যেত, সারা ঘর চন্দন গন্ধে আমোদিত! সবাই ভুলে গেল পদ্মাকে। আচ্ছা সেই যে তরুণ, নিজের বংশ, লিখছিল কী যেন একটা নতুন আখ্যান, শ্রীনিবাসচরিত, সে কি লিখবে পদ্মার কথা ? জানে সে ?

একদিন সন্ধেয় কীর্তনের আসরে রাধু কে সঙ্গে নিয়ে দালানে এসে দাঁড়িয়েছেন মেজোকত্তা। ফিনফিনে চুনোট করা ধুতি, সাদা বেনিয়ান, সারা গায়ে হিনা আতরের গন্ধ ম ম করছে। নাটমন্দিরে এক যুবককে বসে থাকতে দেখে ভারী অবাক হলেন মেজোকত্তা। কোথায় যেন দেখেছেন, মনে পড়ছে না, খুব চেনা, খুব নিজের মনে হচ্ছে! ভারী অদ্ভুত পোশাক পরেছে তো ছেলেটি, ফিরিঙ্গিদের মতো! রাধুকে হাত তুলে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন

–ছোঁড়াটা কে রে রাধু ? চেনা চেনা ঠেকচে!

একটু নিচু স্বরে হাসিমুখে রাধু বলে, ‘কত্তা, আপনার নাতির নাতি! কলকেতা থেকে এয়েচে!’

বিস্মিত হয়ে রাধুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন মেজোকত্তা, ‘তোর মাতা কি খারাপ হয়েচে রাধু ? নাকি সূয্যি ডুবতেই আফিম চড়িয়েচিস ? আমার ছেলেই হল না একনও, তায় নাতি!’

–নিয্যস সত্যি কতা কত্তা!

–চুপ কর! তবে মুখটা আমার পারাই বটে! কী করে ছোঁড়া জানিস ?

–শুনেছি তো কী সব পদ লেকে টেকে! শিনিবাস ঠাকুরকে নিয়ে কী যেন লিকচে!

–বলিস কী ? আচার্য কে নিয়ে ? কীত্তন মিটলে একবার নিয়ে আসিস তো আমার কাচে!

 

শেষবার মেজোকত্তার সঙ্গে অবিনাশের দেখা হয়েছিল দার্জিলিং ম্যালের সামনে। ঘোলাটে আকাশ, শনশন হাওয়া আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমেছে, সন্ধে আসব আসব করেও থমকে দাঁড়িয়ে আছে জলাপাহাড়ের রাস্তায়। জোয়ির দোকানে রামের গ্লাস হাতে নিয়ে গুলতানি শুরু করেছে ভিনদেশি পর্যটকের দল।

রাস্তাঘাটও প্রায় চুপচাপ। শুধু অবিনাশ এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাহাড়ি একটা লোমশ কুকুর পায়ে পায়ে হাঁটছে সঙ্গে, অবিনাশের আজ কেমন যেন অচেনা লাগছে পথঘাট, বারবার মনে হচ্ছে যে কোনও গলির ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে রাস্তায় মস্ত একটা ফাটল,যে ফাটলের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া যায় আঠারোশো সালের প্রথম দিকে। মেরেকেটে শ’খানেক লোক তখন লেপচাদের ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম দার্জিলিঙে, দু চারজন ফিরিঙ্গি গরমের হাত থেকে বাঁচতে ক’দিনের ছুটি নিয়ে পালিয়ে আসে জমজমাট রাজধানী থেকে। মিঃ ওয়ারম্যান আর তার বউ মিলে প্রথম হোটেলটিও খুলে ফেলেছেন ততদিনে, যদিও খা খা করে সেই সরাইখানা, কলকাতা থেকে আসতেই সময় লেগে যায় এক মাস বা তারও বেশি! অত কষ্ট করে কেই বা আসবে।

হাঁটতে থাকে ম্যালের দিকে, রাস্তা একটু চড়াই। হাঁফ ধরছে, কনকনে ঠাণ্ডাও পড়েছে আজ। ফুটপাতের ওপর ছোট ছোট লঙ্কা সর্ষে শাক ব্যাঙের ছাতা লেটুস পাতা ধামায় করে নিয়ে বিক্রি করছে একটি নেপালি মেয়ে। মাথায় রঙিন ছাতা। এবার একাই এসেছে অবিনাশ, প্রধানদের বাড়িতে রয়েছে, থাকা-খাওয়া নিয়ে অল্পই ভাড়া। ইচ্ছে আছে আশেপাশের ছোট ছোট গ্রামগুলো ঘুরে ঘুরে দেখবে, যেসব জায়গায় কোনওদিন কেউ বেড়াতে যায় না! কিন্তু তেমন গ্রামই বা আর কই, তারপর বাঙালি দেখলেই ইদানিং সবাই এখানকার সন্দেহের চোখে তাকায়। গোর্খাভূমির দাবী নিয়ে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে লোকজন। সামান্য লঙ্কার আচার রাই শাক মেখে একই থালা থেকে ভাত খেতে চাইলেও, আসলে তো অবিনাশ ভিনদেশি যুবক।

একটু খিদে খিদে পাচ্ছে, পাশেই ঝলমল করছে গ্লেনারিজ। তাজা পাঁউরুটি আর কেকের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। একপট সোনালি চা আর দু টুকরো সদ্য সেঁকা বিস্কুট নিয়ে ফায়ার প্লেসের উষ্ণ আগুনের পাশে বসলেই হয়, কিন্তু অত সাজানো রেঁস্তোরা আজকাল আর তার পছন্দ হয় না। কেমন যেন রূপকথার মতো, জোলো হাওয়া নাই, মেঘের ছায়া নাই, গনগনে অভাব নাই। পাহাড়ি বস্তির লেপচা মেয়েটির ঘরে চাল বাড়ন্ত, বরের ভাড়া খাটা জিপগাড়ি টুরিস্টের অভাবে বসে গেছে তিনমাস, সস্তার মদের গন্ধ মলিন বিছানায়, তাদের ছোঁয়া সযত্নে বাঁচিয়ে গড়ে তোলা সেই শৈলরাণীকে তেমন আপন মনে হয় না। রাণীর মুকুটে পুরোনো ব্রিটিশ রাজের রোমান্স লেগে আছে। তার থেকে বরং ওই আস্তাবলের পাশে একটা ঘুপচি দোকানে বসে একপ্লেট মোমো ভালো, ট্যালটেলে আগজ্বলন্ত জলের মতো স্যুপ দেবে একবাটি আর পাঁচটা কি ছ’টা মোমো, খিদের মুখে অস্পষ্ট পাহাড়ি সন্ধ্যায় অমৃত মনে হবে।

ম্যালের কাছাকাছি আসতেই দেখা হয়ে গেল তার সঙ্গে অবিনাশের, আজ ভিড় প্রায় নেই বললেই চলে, অন্যদিন এমন সময় থিকথিক করে লোকজন। গুটিকয় মানুষ এখানে ওখানে জটলা করছে, অক্সফোর্ড বই দোকানও বন্ধ। একরাশ গোলা পায়রা বকবকম করে উড়ে যাচ্ছে আকাশে তারপর আবার ঝাকবেঁধে মাটিতে এসে বসছে। লাল নীল বেলুনওয়ালা শূন্য কাঠের বেঞ্চির একপাশে বসে, ক্লিন্ন আকাশের গায়ে পতপত করে উড়ছে তার রঙিন বেলুন। ওর নাম দুঃখীলাল, বেগুসরাইয়ের লোক। গতকালই আলাপ হয়েছিল, ছমাসে নমাসে একবার মুলুকে যায়। চাচেরা ভাই কেশবলাল ম্যালে ঘোড়া চালায়, দুই ভাই একসঙ্গেই থাকে। কেশবলালের জরুও থাকতো এখানে, মাস দুয়েক হল হিল ডায়রিয়ায় মরে গেছে। এখন বেলুন বিক্রি করে রাত্রে বস্তির ঘরে ফিরে দুঃখীলালই রোটি পাকায়, স্কোয়াশ ভর্তা করে,আলুর খুব দাম এদিকে। কতদিন ঝাল ঝাল আলুচোখা খায়নি, বলছিল কাল সে-কথা।

একটু দূরে নির্জন বেঞ্চির ওপর বসে আছে লোকটা, বসার ভঙ্গিটি খুব চেনা চেনা। কোথায় যেন দেখেছে! অবিনাশের ভালো মনে পড়ছে না কিন্তু অচেনা তো নয়। বিদেশি ডাইনিদের মতো একটা চোঙা টুপি পরেছে মাথায়, গায়ে কালো আলখাল্লা,হাত দুটো ঢেকে রেখেছে ধূসর দস্তানায়। পথের কতগুলো পাহাড়ি কুকুর ঘিরে আছে লোকটাকে। সে হাতে করে দুটো বলকে কখনও তিনটে করে লুফছে আবার পরমুহূর্তেই একটা বল এসে পড়ছে হাতের মুঠোয়। কুকুরগুলো অবাক চোখে চেয়ে আছে সেই অপরূপ ভোজবাজির দিকে।

ভারি অবাক হল অবিনাশ, প্রায়ান্ধকার সন্ধে, পিছনে ধূসর আদিগন্ত মেঘের পরত,যার নিচেই লুকিয়ে আছে সোনার পাহাড় কাঞ্চনজঙ্ঘা, বৃষ্টির রেণু মাখা বাতাস বইছে শনশন করে, নির্জন লোকশূন্য ম্যালে বসে একজন মানুষ কুকুরদের মাদারির খেলা দেখাচ্ছেন, বড়ো অবাস্তব, সংশয়ী মনে বিশ্বাস হতে চায় না সহজে।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে, হাতের ইশারায় অবিনাশকে পাশে বসতে বললেন লোকটি। তারপর কুকুরগুলোকে বায়ুস্তর থেকে ক’টা বিস্কুট এনে খেতে দিলেন, মুখে অদ্ভুত একটা শিস দিয়ে বলে উঠলেন, ‘যা যা! আজকের মতো যা, কাল আবার আসিস’

কুকুররাও দলবেঁধে বিস্কুটের টুকরো মুখে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে হাঁটা দিল নিচের দিকে। অবিনাশের দিকে ফিরে এবার মৃদু হাসলেন, তারপর দস্তানা দুটো খুলে ফেললেন। আলো আর নাই তখন আকাশে। হ্যালোজেন ল্যাম্প জ্বলে উঠেছে, হলদে আলোয় কুচি কুচি হীরের মতো এলোমেলো নেমে আসছে বৃষ্টিকণা। খাদের দিক থেকে ধেয়ে আসছে বরফওয়ালা বাতাস। নিভু নিভু আলোয় অবিনাশ স্পষ্ট দেখল, মুরগীর ঠ্যাঙের মতো আঙুলগুলো, কাঠি কাঠি হাড় বের করা, আর তর্জনিটি অস্বাভাবিক লম্বা। সেই হাত ঘুরালেন দুবার, ওই যেদিকে মেঘের তলায় ঢাকা পড়ে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, সেদিকে।

বিস্ময়াভূত অবিনাশের চোখের সামনে খুলে গেল সিনেমার মতো দৃশ্যপট, কোন মহাশূন্যে হতে ভেসে আসতে লাগলো সিনে-প্রোজেক্টার চালানোর মতো কিরকির শব্দ।

সন ১৩২২ বঙ্গাব্দ। আষাঢ়ের দীর্ঘ অপরাহ্ন বর্ষণক্ষান্ত রৌদ্রের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মাদারি আর ফলসা গাছের ছায়ায় শান্ত কাকচক্ষু দীঘির জলে ঘন নীল আকাশের প্রতিবিম্ব। দূরে কদম গাছের মাথায় দিনান্তের হলুদ আলো কী এক অপূর্ব ইন্দ্রজাল রচনা করেছে। পূব দিক থেকে বয়ে আসছে স্নিগ্ধ শীতল বাতাস।

গড় নাসিমপুর রাজবাড়ির পশ্চিম প্রান্তে দোতলার জানলায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছেন এক দীর্ঘকায় পুরুষ। সম্পূর্ণ উদাস দৃষ্টি, চেয়ে আছেন কিন্তু কিছুই দেখছেন না। অনাবৃত দেহ,পরনে একখানি মিহি পাড় শান্তিপুরী ধুতি। ডান হাতের আঙুলে ধরা একটি চিঠি।

প্রিয়তম
আমার অপরাধ লইবেন না। ঝুঁটিপঞ্চা গতকাল কাহার নিকট হইতে খবর লইয়া আসিয়াছে গত কয়েক দিবস যাবৎ আপনি গড় নাসিমপুরের রাজা কুমার বীরেন্দ্রনারায়ণের অতিথি হইয়া রহিয়াছেন। জানিয়া,আপনাকে পত্র না লিখিয়া আর থাকিতে পারিলাম। আমার যে কয়দিন কী ভাবে কাটিয়াছে! অহরাত্র আপনাকে লইয়া দুশ্চিন্তা।

গতকাল প্রিয়নাথ বসু মহাশয়ের সার্কাস হইতে নিবারণ বাবু মহাশয় স্বয়ং আসিয়াছিলেন। আমাদিগকে ফিরিয়া যাহিবার নিমিত্ত অশেষ অনুরোধ করিলেন। বসু মহাশয় আপনাকে উদ্দেশ্য করিয়া একখানি পত্রও লিখিয়াছেন। দুই বৎসর পূর্বে আমরা সার্কাস ছাড়িয়ে আসিবার পর হইতেই পূর্বের ন্যায় পসার জমিয়া উঠিতেছে না। দর্শক সকল আপনার অপূর্ব যাদুর খেলা দেখিবার নিমিত্তই নাকি সার্কাসের টিকি ট কাটিয়ে যাইত। এমনতরো বলিলেন আমাকে নিবারণ বাবু। আমি মেয়েমানুষ, কী আর বলিব ! আপনাকে ভালবাসা ভিন্ন কদাপি অন্য কোনও চিন্তা মনে রাখিতে পারি নাই। একবস্ত্রে আপনার সহিত সার্কাস ছাড়িয়া পথে নামিয়াছিলাম।

কলিকাতায় এবৎসর প্রবল বর্ষা নামিয়াছে। অনেক মানুষ কলেরা রোগে আক্রান্ত। আপনি সর্বদা শরীরের খেয়াল রাখিবেন। দুবেলা অন্ন প্রস্তুত করিয়া আপনাকে দিতে পারিতেছি নাই,এ কষ্ট যদি বুঝিতেন আপনি। বিদেশে কী খাইতেছেন কী পরিতেছেন ভাবিয়া ভাবিয়া আমার দিনরাত্র কাটিয়া যায়।

আমি বুঝিতে পারি,আপনি আমাকে সম্পূর্ণ ভালবাসিতে পারেন নাই। যাহা আছে তাহা কর্তব্য,দায়িত্ব এবং স্নেহ। আমার ন্যায় অভাগীর জীবনে তাহাই বা কম কী! আপনার মন অধিকার করিয়া রাখিয়াছে,আপনার একমাত্র প্রেয়সী,বাল্য প্রেম,যাদুবিদ্যা। আত্মারামের সন্ধান করিতে ঘর ছাড়িলেন। লোকমুখে শুনিয়া থাকি আত্মারাম নাকি একটি উপকথা। আপনি যদিও সর্বতোভাবে বিশ্বাস করিয়া থাকেন উনি দিব্য শরীরে বাঁচিয়া আছেন। আপনার বিশ্বাসই আমার বিশ্বাস।

আমার জন্য দুশ্চিন্তা করিবেন না। আপনি জীবনে খুশী হইলেই আমি সুখী। যাদুবিদ্যার প্রতি আপনার প্রেমই আমার প্রেম।

প্রণাম লইবেন।
ইতি
হিঙ্গনবালা দাসী।

হরিমতীর চিঠিটি কতবার যে পড়লেন গণপতি। প্রিয়নাথ বসু আজ লোক পাঠিয়েছে,অথচ যেদিন মাতাল বলে সবার সামনে অপমান করেছিলেন! সেইরাত্রেই মদ আর সার্কাস দুটোই ছাড়লেন,শুধু এককথায় তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল হরিমতী। হিঙ্গনবালার নিজেরও কম খ্যাতি ছিল না সার্কাসে। অন্যায় করছেন কি হরিমতীর ওপর ?নিজের মনকেই প্রশ্ন করলেন গণপতি।

সন্ধে ঘন হয়ে আসছে। ময়লা আলোটুকু লেগে আছে আকাশের গায়ে। কোথায় যেন কামিনী ফুল ফুটেছে। মিষ্টি গন্ধ ভেসে ভেসে চলেছে যেন কোন সুদূরে।

হরিমতীর জন্য ভারী হয়ে উঠল গণপতি যাদুকরের মন। দীপ জ্বলবে গৃহে,প্রিয় সঙ্গিনী প্রসাধন শেষ করে এসে বসবে মাথার কাছে। আহ! গৃহসুখ! সেই তো পরিপূর্ণ জীবন।

কিন্তু না,আত্মারামের সন্ধান তাঁকে পেতেই হবে। যাদুবিদ্যার পথ বড় কঠিন। ইন্দ্রিয় সংযম না থাকলে ভেসে যেতে হয়। গৃহের পথ তাঁর জন্য নয়।

আজ রাত্রে রাজবাড়ির প্রাচীন প্রাঙ্গনে বসবে যাদুর আসর। কুমার সাহেব আর রাজবাড়ির ঘনিষ্ঠ দু চার মানুষ শুধু দর্শক। গণপতি দেখাবেন সব থেকে কঠিন যাদুবিদ্যা। ভোজবাজি বলা হত একেই প্রাচীন যাদুশাস্ত্রে। আত্মারাম হলেন এ বিদ্যার একমাত্র প্রয়োগকর্তা। গত দু বছর নিজের চেষ্টায় অসীম মনোসংযোগ অভ্যাস করেছেন গণপতি। জানেন না,কী হবে তার ফল আজ। মন অবশ হলে চলবে না এখন,আর মাত্র কিছু সময়। হরিমতীর ভালবাসা সত্য হলে তিনি নিশ্চয় পারবেন।

রাত্রির তৃতীয় প্রহরে শুরু হবে সেই প্রাচীন যাদুবিদ্যার প্রয়োগ। অন্ধকার নাটমন্দির মৃদু মশালের আলোয় রহস্যমণ্ডিত হয়ে উঠবে। অষধা নক্ষত্র প্রবেশ করবেন বৃষরাশিতে। শুক্ল পক্ষের নির্মেঘ আকাশ। সেটিই প্রশস্ত সময়। শুরু হবে অলৌকিক এক ভোজবাজি।

সায়ন্তন ঠাকুর
লেখক | + posts

জন্ম পৌষ মাসে, রাঢ়বাংলার এক অখ্যাত মফস্বলে। সায়ন্তন মূলত মূলত গদ্য লেখেন। প্রকাশিত বইপত্তর-- নয়নপথগামী(উপন্যাস), শাকম্ভরী(উপন্যাস), বাসাংসি জীর্ণানি(গল্প সংকলন)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed