কাগজের নৌকো। পর্ব ২। ধারাবাহিক উপন্যাস। লিখছেন সায়ন্তন ঠাকুর

(আগের পর্বের পর)

কুসমি গ্রামে হাসপাতালের পাশে ডাক্তারবাবুর বাংলোটি ভারি সুন্দর, দুখানি শোওয়ার ঘর, একটি ছোটো খাবার ঘর লাগোয়া রান্নার জায়গা, একা মানুষের জন্য যথেষ্ট বন্দোবস্ত, তবে অবিনাশের সবথেকে বেশি ভালো লাগে খোলা বারান্দাখানি, কাঠের নিচু গেট খুলে হাতায় পা রাখলে প্রথমেই চোখে পড়ে টানা বারান্দা, তার আগে রোগা নদীর মতো মোরাম বিছানো এক ফার্লং পথ, দুপাশে বুনো ফুলের ঝোপ, বাড়িটির পেছনে স্নেহশীলা বড়ো দিদি হয়ে সর্বক্ষণ ছায়া-আঁচল বিছিয়ে রাখে একটি পুরোনো দিনের স্বর্ণচাঁপা গাছ– অবিনাশ মনে মনে তার নাম রেখেছে অপরাজিতা!

আরও দুটি গাছও রয়েছে, একটি নিম আর অপরটি গেটের পাশে পলাশ, এদের কল্যাণেই সাদা ধপধপে বাংলোটি প্রায় সারাক্ষণ ছায়াচ্ছন্ন হয়ে থাকে, পেছনে ধূ ধূ রুক্ষ মাঠ, অনেক দূরে দিকচক্রবাল রেখার কাছে অস্পষ্ট শৈলশিরা চোখে পড়ে-চরাচরে মৃদু ঢেউ তুলে যেন আপনমনে বয়ে গেছে, বাংলোর সামনে মোরামে ঢাকা কাঁচা পথ হাসপাতাল পার হয়ে চলে গেছে আরও পশ্চিমে, ওইদিকে সাঁওতালদের একটি গ্রাম রয়েছে– তার আগে যুবক প্রহরীর মতো সারি সারি শালগাছ আকাশে মাথা তুলে যেন অরণ্য কথা রচনা করেছে, রয়েছে একসারি মহুয়া ফুলের গাছ, গ্রাম থেকে হাসপাতালে আসার সময় একটি রুগ্না নদী পার হতে হয়, এই শীতবেলায় জল প্রায় নাই বললেই চলে, নুড়ি পাথরে ভর্তি দুপাশ, তবে নদীর নামখানি ভারি মিষ্টি-সারু, কুসমি গ্রামের সারু নদী!

 

এসব রুক্ষ অঞ্চলে জলের ভারি কষ্ট, অনেক দূরে দু-একখানি ঝোরা রয়েছে, খাবার জল আনতে আশপাশের চার-পাঁচটি গ্রাম থেকে মেয়েরা সেখানেই যায়, দলবেঁধে যায় সবাই, কাঁখালে মাটির কলসী, খর দিনে বিবর্ণ ধূসর চরাচরে রঙিন শাড়ি পরা নারী দলকে দূর থেকে দেখলে একঝাঁক চঞ্চলা প্রজাপতি বলে ভ্রম হয়। তবে সূর্যের আলো পড়ে এলে পথঘাটে মানুষের চলাচল কমে যায়-গ্রামগুলিও দূরে দূরে, একটি গ্রামের থেকে আরেকটির দূরত্ব চার-পাঁচ মাইল তো হবেই, মাঝে লোকবসতি নেই, চাষ আবাদও বড়ো একটা হয় না, যতদূর চোখ যায় পাথুরে জমির উপর ছোটো ছোটো ঝোপ আর মাঝে মাঝে শালবন কি প্রকাণ্ড মহুয়া গাছ নজরে আসে, সন্ধ্যার পর এখনও এসব দিকে ভালুকের উৎপাতের কথা শোনা যায়, তাই যা কিছু কাজকর্ম সবই দিনশেষে স্তিমিত হয়ে আসে, আলো নিভে এলে নিঝুম চরাচরে যেন কোনও একাকিনী যুবতি তার ভ্রমরকৃষ্ণ কেশরাজি সযতনে বিছিয়ে দেয়।

 

জলকষ্টের জন্য ডাক্তার-বাংলোর হাতায় একখানি কুয়ো রয়েছে, এই কার্তিক মাসের গোড়াতেই তার জল অনেকটা নিচে নেমে গেছে, হাসপাতালের ডিউটি শেষে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় কপিকল ঘুরিয়ে বালতি করে জল তুলে প্রতিদিন শান বাঁধানো কুয়োতলায় বসে স্নান করে অবিনাশ, স্নানশেষে অনেক রাত্রি অবধি বারান্দায় একখানি আরাম কেদারা পেতে শুয়ে থাকে, মাথার উপর নির্মেঘ নক্ষত্র আকাশ-যেন কোনও বালিকা লক্ষ লক্ষ চুমকি দিয়ে পরম যত্নে তার রেশমী উত্তরীয়টি সাজিয়েছে, আলোর চিহ্নমাত্র নেই কোথাও, দূরে জোনাকির মতো শুধু জেগে থাকে হাসপাতালের ক্ষীণ বাতি, ইচ্ছে করেই বাংলোর সব আলো নিভিয়ে দেয় অবিনাশ অবশ্য এখানে বিজলি বাতি থাকা আর না-থাকা প্রায় সমান, দশ পনেরো ঘণ্টা লোডশেডিং দৈনন্দিন ঘটনা, সন্ধ্যা নামার আগেই একখানি নিভু নিভু লণ্ঠন জ্বেলে রাখে বগুয়া,সেটিই অতিথির মতো বারান্দার এককোণে চুপ করে বসে থাকে।

 

শুয়ে শুয়ে কত কী ভাবে অবিনাশ, একটি চিন্তার সুতো ধরে আসে আরেকটি নতুন চিন্তা, মাঝে মাঝে দূরে সাঁওতালদের গ্রাম থেকে শোনা যায় দ্রিমি দ্রিমি মাদলের শব্দ, তার সহকর্মী সহপাঠীরা কোথায় এখন, কলকাতা কি কোনও জেলা শহরে বাড়ি ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করছে, কেউ হয়তো আরও পড়াশোনার জন্য পাড়ি দিয়েছে বিদেশ কি অন্য রাজ্যে, কত উজ্জ্বল সোনার ভবিষ্যৎ তাদের, এরাই তো একদিন বিখ্যাত সার্জন কি মেডিসিনের ডাক্তার হবে, হাজার টাকা ফি, তিনমাস আগে থেকে নাম লেখাতে হয়, কত পসার অর্থ প্রতিপত্তি সামাজিক সম্মান আর সে শুধু এমবিবিএস পাশ করে এই নির্জন জনশূন্য দেশে দেহাতি মানুষ, হতদরিদ্র সাঁওতাল মুণ্ডাদের  চিকিৎসা করছে, যদিও বা একখানি সরকারি চাকরি পেয়েছিল সেটিও ধরে রাখতে পারল না, ভাবে আর নিজের মনেই হাসে অবিনাশ, ছোটোবেলা থেকেই উচ্চাশা নেই কোনও, বাবা-মা কয়েকবছর আগে মারা যাওয়ার পর সেই অর্থে সংসারে পিছু টানও নাই, পাঁচবছর ডাক্তারি পড়ে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে মিথ্যাই মানুষ ডাক্তারদের ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করে, কিছুই তাদের হাতে থাকে না, তারা শুধু চেষ্টা করে, অসহায় রোগীর আরোগ্যের জন্য প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে, কোনওবার সফল হয় কোনও ক্ষেত্রে পরাজিত হয়, তেমনই নিয়ম! ইদানিং অবিনাশের মনে হয় একমাত্র অন্তর্দৃষ্টি বা ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের সাহায্যে কুয়াশাবৃত জন্ম-মৃত্যু-আরোগ্য ভুবনের অতি সামান্য অংশের একটা অস্পষ্ট আন্দাজ মাত্র পাওয়া যায় বাকিটা এখনও এই প্রবাসী রাত্রির মতোই রহস্যাবৃত। এসব কথা কেউই তেমন মানতে চায় না, এমনকি বাসুদেবদার সঙ্গে মাঝে মাঝে তর্ক বেঁধে যায়, অবিনাশ খুব একটা তর্কও করে না আজকাল, কী হবে তর্কে, জীবন কোনও তর্কের আখড়া নয়।

 

অবিনাশের দেখাশোনা করে একটি অল্পবয়সী সাঁওতাল ছেলে, বগুয়া, এখানেই থাকে, রান্নাবান্নাও করে, খুব ভালো কিছু নয় তবে খাওয়া নিয়ে অবিনাশের তেমন কোনও বিলাসিতা নেই, খাবার মোটামুটি নুন দিয়ে সেদ্ধ হলেই হাসিমুখে খেয়ে নেয়, ছেলেটিও বেশ, সতেরো আঠারো বছর হবে বয়স, ভারি সরল, কত যে তার গল্প! সন্ধ্যার পর পারতপক্ষে বাংলোর বাইরে যায় না, অবিনাশকে বড়ো বড়ো চোখ করে বলে, সাম হোনে সে কাঁহি মাত যাও ডাগডার সাহিব!

অবিনাশ হেসে শুধোয়, ‘কেন রে ? গেলে কী হবে ?’

এমন আশ্চর্য প্রশ্ন কখনও শোনেনি বগুয়া, আজিব আদমি, সাম মে ভি নিকলনা চাহতে হ্যে! পাগলা গয়া সায়দ! বিস্মিত স্বরে জিজ্ঞাসা করে , ‘দানো কা বারে মে কভি নেহি শুনা ?’

–দানো?

–হাঁ হাঁ দানো, ই টাঁড় মে সুরয ডুবনে সে হি দানোকা রাজ সুরু হো যাতা হ্যে, ই কোই মজাক কা চিজ নাহি ডাকডার সাহিব।’

অবিনাশ হাসতে হাসতে বলে, ‘লেকিন হাসপাতাল মে কোই মরিজ আয়ে তো? তব তো মুঝে যানা হি পড়েগা বগুয়া!’

মাথা নেড়ে গ্রাম্য কিশোর জোরের সঙ্গে বলে, ‘কোই নেহি আয়েগা সাহিব, রাতমে কোই নেহি আয়েগা, আদমি মর যায়েগা ফিরভি সামকে বাদ কোই ঘর সে নেহি নিকলেগা!’

–ধর তবুও কেউ এল, তখন?

লণ্ঠনের পলতে সামান্য উঠিয়ে ছমছমে গলায় বগুয়া বলে, ‘তব জরুর ওহ কোই আদমি নেহি সাহিব, জানিয়েগা দানো হি ভেস বদল কর আয়া হ্যে!’

হেসে উঠতে গিয়েও চুপ করে যায় অবিনাশ, ভাবে এই তার নিজের দেশ, নানাবিধ বিচিত্র লোকবিশ্বাস সংস্কার আর কিংবদন্তীর ডানায় ভর করে বেঁচে আছে এমন শত শত দরিদ্র সরল নরনারী, হ্যারিসন সাহবের মেডিসিন বইয়ের পাতায় তাদের আরোগ্যের সন্ধান কখনও লেখা থাকে না। পার্কসার্কাসের উজ্জ্বল আলোকজ্জ্বল সাতমাথার সন্ধ্যা মোড়ে, লেডি ব্রেবোর্নের বিদূষী তরুণীদের কলহাস্যে, ময়দান বইমেলার মমার্ত মঞ্চে গ্রামসির তত্ত্বে অথবা তাদের কলেজের ছাত্র নেতা সুজয়দার থিসিস-আন্টি থিসিস-সিন্থেসিস আলোচনায় সেই ভারতবর্ষকে দেখা যায় না! কলকাতার অন্তরমহলে লুকিয়ে থাকা ভিন্ন অলীক কলকাতার ভুবনে সেই দেশের সামান্য রূপ দেখেছিল অবিনাশ-চালতাবাগানে মাসির ঠেক কি দুশো দুই বাসস্ট্যান্ডের রাত গুমটির ভেতর কন্ডাকটার খালাসির আড্ডায় এখনও মধ্যরাত্রে ওই দেশ উঠে দাঁড়ায়, যে ভাষায় কথা বলে তার নাম মাতৃভাষা! অনেকদিন আগে হরিদ্বার থেকে উখিমঠের পাকদণ্ডী পথে সেই দেশকেই অবিনাশ দেখেছিল, সরল আন্তরিক অতিথিপরায়ণ ভারতবর্ষ, রামমন্দিরের জন্য শত দাঙ্গা, গৃহহীন কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নির্বিচারে হত্যা, হাজার বোফর্স কেলেঙ্কারির মাঝেও তার দেহের বসনখানি আজও অমলিন, ভালোবাসার আলোয় ওই তুষারাবৃত হিমালয়ের মতোই বৈরাগ্য সুবাসে উজ্জ্বল, কোটি দুর্নীতি তাকে নষ্ট করতে পারেনি আর পারবেও না কখনও, সহস্র বৎসর ধরে ভারতাত্মার অন্তরে বয়ে চলেছে প্রেম ফল্গুধারা, আজ অবিনাশ বুঝতে পারে সেই প্রেমধারাই আমাদের একমাত্র ধর্ম। বগুয়ার মতো মানুষেরাই সেই দেশের প্রকৃত ভূমিপুত্র।

 

একেকদিন সন্ধ্যার পর অবিনাশের কাছে বাসুদেব সামন্ত আসেন, হাসপাতাল চারপাশের লোকজন এইসব নিয়ে কথা হয়, আজও এসেছেন, বগুয়ার বেশি চিনি দেওয়া চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘বুধুয়ার মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে অবিনাশ।’

টেবিলের মাঝে রাখা লণ্ঠনের ম্রিয়মান শিখার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ অবিনাশের পাঁচ বছরের দরিদ্র মেয়েটির মলিন মুখখানি মনে পড়ল, দিন চারেক আগে হাসপাতালে এসেছে, প্রচণ্ড জ্বরে প্রায় বেঁহুশ, একশো তিন-চার ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রা, প্যারাসিটামল দিলে কয়েক ঘণ্টার জন্য উপশম হচ্ছে আবার বর্ষার পাড় ভাঙা নদীর মতো দুরন্ত ক্রোধে ফিরে আসছে জ্বর, তখন একেবারে নেতিয়ে পড়ছে শিশুটি অথচ কী আশ্চর্য জ্বর কমে গেলেই ক্ষীণ কন্ঠে আধো আধো স্বরে বলছে, ভুক লাগা! গতকাল জ্বরভাঙা বিকেলে সামান্য দুধ দেওয়া হয়েছিল-বেচারা দুধ হয়তো কখনও চোখেই দেখেনি, দু চুমুক মুখে দিতেই হড়হড় করে বমি করে দিল, এভাবে চললে আর বেশিদিন বোধহয় রাখা যাবে না। দু-এক মুহূর্ত কী যেন ভেবে অবিনাশ বলল, ‘বাসুদেবদা, আমি কিন্তু সিওর, ইটস আ কেস অব এন্টারিক ফিভার, ডেফিনিটলি টাইফয়েড।’

–তা নয়, তাহলে ক্লোরামফেনিকল কাজ করতো। আমাকে কনসাল্ট না করে গতকাল থেকে শুরু করে দিলে, তবু এখনও জ্বর কমল না।

চিন্তিত স্বরে অবিনাশ জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার কি মনে হচ্ছে?’

‘সেটাই তো বুঝতে পারছি না, হেপাটাইটিস হতে পারে, একবার বিলিরুবিন টেস্ট করাতে পারলে হত কিন্তু এখানে কোথাও’, মাঝপথে কথা থামিয়ে চুপ করে গেলেন বাসুদেব সামন্ত।দিল্লী এইমসে তাঁর সহপাঠীরা বলতো, বাসুর ডায়গোনেসিস কখনও ভুল হতে পারে না, তারা খুব একটা ভুল কথা বলতো না, ওইরকম ক্লিনিক্যাল আই সত্যিই বিরল। এখন বয়স হয়েছে, কাঁচপাকা চুল, রোদ্দুরে কালচে হয়ে যাওয়া মুখ হলদে আলোয় হেমন্ত অপরাহ্নের মতো ম্লান, সেদিকে তাকিয়ে জোর গলায় অবিনাশ বলল, ‘না, হেপাটাইটিস নয়, আমি নিশ্চিত এটা টাইফয়েড।’

দীর্ঘদিন তাঁর রোগ নির্ণয় কখনও ভুল হয়নি, শুধু উপসর্গ দেখেই নির্ভুল বলে দিতে পারেন অসুখ, সদ্য পাশ করা অবিনাশের দৃঢ় প্রত্যয়ী কণ্ঠস্বরে সামান্য বিস্মিত হয়ে মুখ তুলে শান্ত অথচ কঠিন গলায় বাসুদেব বললেন, ‘ক্লিনিক্যালি স্প্লিন নরম্যাল, ক্লোরামফেনিকল-টাইফয়েডে চয়েস অব ড্রাগ, সেটিও কাজ করছে না, গত কুড়ি দিনের উপর বাড়িতে জ্বরে পড়ে ছিল, তুমি ম্যালেরিয়া বললে তাও একরকম হতো কিন্তু টাইফয়েড…আই ডোন্ট থিঙ্ক সো অবিনাশ। তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা না করে ড্রাগ শুরু করে দিয়ে ঠিক কাজ করোনি।’

একসময় ক্রিকেট খেলার ঝোঁক ছিল অবিনাশের, জেলা স্তরেও খেলেছে, ফাস্ট বল করতো, অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের সামনে ইনসুইং দেওয়ার আগে যেমন তরুণ বোলার দু-বার ভাবে তেমনই একমুহূর্ত কী যেন চিন্তা করল, তারপর আত্মবিশ্বাসী স্বরে কেটে কেটে বলল, ‘আমার মনে হয় বাচ্চাটি রেজিস্টেন্স টু ক্লোরামফেনিকল।’

 

অবিনাশের কথা শুনে সোজা হয়ে বসলেন বাসুদেব, ছেলেটা বলে কী, বহুদিন কোনও চিকিৎসকের এমন আত্মবিশ্বাসী কন্ঠস্বর শোনেননি তিনি, অনেকদিন পূর্বে কলেজে মেডিসিনের বৃদ্ধ অধ্যাপক সুমলয় চট্টোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ে গেল, তিনি এমনই দৃঢ় স্বরে বলতেন, ‘শোনো বাবা আমাদের মতো গরীব দেশে ডাক্তারি করতে হলে ইনটিউশন আর ক্লিনিক্যাল আইয়ের উপর সর্বদা ভরসা রেখো।’

 

দু-এক মুহূর্ত কারোর মুখেই কোনও কথা নাই, কার্তিক মাসের আকাশে একখানি ভাঙা চাঁদ উঠেছে, দূরে মহুয়া গাছের উপর থেকে একটি অতিকায় সাদা প্যাঁচা সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে বিষাদ ঋতুর শূন্য নিথর প্রান্তর পার হয়ে উড়ে গেল মালভূমির দিকে, হিম জ্যোৎস্নায় রাত্রিদেবী একখানি সাদা শাড়ির আঁচল বিছিয়ে যেন বসে রয়েছেন এই ঊষর মায়াভুবনে, কেউ কোথাও নাই, জনমানবশূন্য চরাচরে এমন রাত্রে শোনা যায় ঊর্দ্ধলোক থেকে নেমে আসে গন্ধর্বের দল, তারা রূপপিপাসু, তখন ক্ষণিকের জন্য উন্মুক্ত হয় অলীক ভুবনের দুয়ার, এই মরপৃথিবীর ব্যাধি যন্ত্রণার কথা সেসময় সকলে ভুলে যায়, হয়তো হাসপাতালে রোগশয্যায় শুয়ে শিশুটি এখন গন্ধর্বদলের দিকে অপলক চেয়ে রয়েছে, তারা হয়তো মৃদু ঘুমপাড়ানি সুরে শিশুটিকে বলছে, ‘এসো এসো, আমাদের সঙ্গে এসো, দুধনদীর তীরে সবুজ ঝর্ণার পাশে গহিন শালবনে আমরা জ্যোৎস্না দিয়ে তৈরি প্রজাপতিদের সঙ্গে খেলা করব, তুমি আসবে না? এসো এসো, কিচ্ছু হয়নি তোমার, চলে এসো, মেঘ মেশানো আলোর শরবত দেব তোমাকে, দেখবে কেমন সুস্থ হয়ে যাবে তুমি! আমাদের সঙ্গে এসো খুকি!আমরা যে তোমাদের রূপ আর ভালোবাসার টানেই বারবার এখানে ফিরে আসি।’

 

একটি সিগারেট ধরিয়ে প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গের সুরে বাসুদেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দেন হোয়াট নেক্সট? তোমার কথা অনুযায়ী ক্লোরামফেনিকেল তো তাহলে কাজ করবে না, কী করবে ভাবছ?’

গেটের বাইরে একাকী পলাশের দিকে একবার তাকাল অবিনাশ, আর কয়েকদিন পর চৈত্র মাসে সব পাতা ঝরে যাওয়ার পর সেবাব্রতে প্রাণপাত করা সন্ন্যাসীর রিক্ত করতলের মতো রক্ত কুসুমে ভরে উঠবে পত্রহীন শাখা প্রশাখা, বহুদূর থেকে খর রৌদ্রে হেঁটে আসা পথিককে সে যেন তখন নির্মেঘ সুনীল আকাশের নিচে কুসুমে সাজানো হাত তুলে বলে, চিন্তা করো না, তোমাকে পথ দেখানোর জন্য এই জনশূন্য প্রান্তরে আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি।

পলাশ গাছটি অবিনাশের বন্ধু-সে নাম রেখেছে কুসুমকুমার!হেমন্ত জ্যোৎস্নায় এক মুহূর্তের জন্য কুসুমকুমার যেন অবিনাশের দিকে চেয়ে হেসে উঠে বলল, ভয় কী!তুমি আরোগ্য দানের কাণ্ডারী, ভয় কী!

স্থির গলায় অবিনাশ বলল, ‘কাল থেকে ভাবছি উফ্লোক্সেসিন শুরু করব।’

এবার আর মেজাজ ধরে রাখতে পারলেন না বাসুদেব, কড়া গলায় বেজে উঠলেন, ‘আর ইউ ম্যাড? বয়স জানো ওর ? পাঁচবছর, গড ড্যাম সি ইজ আ জাস্ট ফাইব ইয়ার্স ওল্ড চাইল্ড, আর তাকে তুমি মাত্র তিন চার বছর আগে তৈরি হওয়া লাস্ট জেনারেশন আন্টিবায়োটিক দেবে, যে ওষুধ কিনা এখনও টাইম টেস্টেড নয়…ইউ আর ইউ আর…জাস্ট ম্যাড, পাগল হয়ে গিয়েছ।’

একমুহূর্ত চুপ করে থেকে পুনরায় বললেন, ‘প্রথমে চালসার ঘটনাটা আমি বিশ্বাস করিনি কিন্তু এখন দেখছি দে ওয়ার রাইট। তুমিই জোর করে ব্রিচ ডেলিভারির কথা বলেছিলে, তারপর সামলাতে না পেরে…আচ্ছা টেল মি ওয়ান থিংক, তুমি এখানে উফ্লোক্সেসিন পাবে কোথায়?’

–ঝাঁঝার শর্মা মেডিকেল হাউসে খোঁজ নিয়েছি, ওদের কাছে একটা ভায়াল রয়েছে, প্রয়োজনে বলেছে পাটনা থেকে আনিয়ে দেবে।

–ওহ! গ্রেট! সব ব্যবস্থা তাহলে করেই ফেলেছ। হু গেভ উই দ্য পারমিসান, আমি জানতে চাই, হু গেভ ইউ দ্য পারমিসন ?

মুখ নিচু করে মৃদু স্বরে অবিনাশ বলল, ‘বাসুদেবদা প্লিজ, আমাদের বাচ্চাটাকে বাঁচাতে হবে। বাঁচাতেই হবে।’

–বাঁচানো মানে পাগলামি নয়, অতটুকু বাচ্চা, আমরা ড্রাগ সাইড এফেক্টের কথা অবধি এখনও জানি না, হঠাৎ যদি কোলাপস করে তাহলে তার দায় কে নেবে? তুমি?

প্রবীন চিকিৎসক বাসুদেব সামন্তর চোখে স্থির দৃষ্টি রেখে অবিনাশ অতি শীতল কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি নেব দায়িত্ব। বাচ্চাটা এমনিও মারা যাবে, পালস ক্ষীণ, স্প্লিন ড্যামেজ হতে বসেছে, আর তাছাড়া’, অবিনাশকে কথা শেষ করতে না দিয়ে উত্তেজিত স্বরে বাসুদেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাছাড়া কী?’

–আমি কলকাতায় থাকতে জার্নালে পড়েছি নর্থ আফ্রিকার বহু দেশে টাইফয়েডে ম্যাজিকের মতো কাজ করছে এই ড্রাগ। বিশেষত রেসিট্যান্স টু ক্লোরামফেনিকেল কেসে।

–এটা ভারতবর্ষ অবিনাশ, এই জায়গা বিহারের কুসমি গ্রাম, নর্থ আফ্রিকা নয়! নোপ, আমি এই রিস্ক নিতে পারব না আর আমার নিজেরও ডাউট রয়েছে, আই থিংক দিস ইজ নট আ কেস অব টাইফয়েড।

অবিনাশ হঠাৎ দুহাতে বাসুদেবের ডানহাতটি চেপে ধরে বলল, ‘দাদা প্লিজ, আমাকে বাচ্চাটিকে বাঁচাতে দিন। এবার আই উইল নট বি ডিফিটেড বাই হার!’

এমন কথায় অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বাসুদেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হার? হু ইজ সি? কী আবোলতাবোল বকছ, কার কাছে হেরে যাবে না?’

‘তাঁকে আপনি চেনেন না বাসুদেবদা, তিনি শ্মশানবাসিনী করুণাময়ী, ভবপাশ ছিন্ন করে সকল জীবকে মুক্তি দেন কিন্তু এখানে মেয়েটি শিশু, তার নিজ কর্ম শুরুই হয়নি এখনও, আমি চিকিৎসক হয়ে কিছুতেই এখানে হার মানব না।’, কথাগুলি বলতে বলতে চোয়াল শক্ত হয়ে এল অবিনাশের, লণ্ঠনের ম্লান আলোয় তাকে কিংবদন্তীর প্রাচীন যোদ্ধাদের মতোই দেখাচ্ছে, বহু বৎসর পূর্বে ক্রিকেট মাঠে বল হাতে রান আপে যাওয়ার সময় এমনই দেখাত তাকে, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, শান্ত, অবিচল এক যুবক।

 

প্রায়ান্ধকার কুসমি গ্রামের মাঠবাংলোয় হঠাৎ অবিনাশকে কেমন অচেনা মনে হয় বাসুদেবের, এখানে ওকে নিয়ে আসার আগে অনেকে বলেছিল অবিনাশ মানসিক ভাবে সুস্থ নয়, আজ মনে হচ্ছে তাদের কথা না শুনে হয়তো ভুলই করেছিলেন। শান্ত স্বরে বললেন, ‘দ্যাখো অবিনাশ, তোমার নামে অলরেডি একটা কেস চলছে, কেন আবার আরেকটায় জড়িয়ে পড়বে, আমরা চিকিৎসক-নিয়মের মধ্যে থেকেই তো আমাদের কাজ করতে হবে, তাই না? বলো!’

বিস্মিত কণ্ঠে অবিনাশ বলে, ‘আপনি নিয়মের কথা বলছেন দাদা? আপনিও? আমরা যে ওথ নিয়েছি, প্রতিজ্ঞা করেছি, রোগীর আরোগ্যদান ছাড়া আর কখনও কিছু ভাবব না, শুধু নিজেদের সামাজিক সম্মানের কথা ভেবে পিছিয়ে যাব? আপনি তো এমন ছিলেন না বাসুদেবদা, প্লিজ, আমাকে পারমিসান দিন। প্লিজ!’

দু-এক মুহূর্ত বিষাদ নিশীথে চুপ করে থাকলেন বাসুদেব সামন্ত– এইমসের কৃতি ছাত্র, যাঁর কথায় এখনও দেশের নানাপ্রান্তের অসংখ্য চিকিৎসক আস্থা রাখেন, চেয়ার থেকে উঠে মৃদু স্বরে বললেন, ‘আমি এই পারমিশান তোমাকে দিতে পারব না অবিনাশ, সরি।’

বারান্দা থেকে নেমে কয়েক পা হেঁটে কাঠের গেটের কাছে পৌঁছে কী ভেবে একবার দাঁড়ালেন তারপর জোসনার মাঝে মুখ ফিরিয়ে মলিন আলোর বারান্দায় বসে থাকা তরুণ অবিনাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কাল থেকে বুধুয়ার মেয়ের চিকিৎসা আমি করব অবিনাশ, তুমি বরং পাঁচ নম্বর বেডের পেশেন্ট দেখো।’

(ক্রমশ)

সায়ন্তন ঠাকুর
লেখক | + posts

জন্ম পৌষ মাসে, রাঢ়বাংলার এক অখ্যাত মফস্সলে। সায়ন্তন মূলত মূলত গদ্য লেখেন। প্রকাশিত বইপত্তর-- নয়নপথগামী(উপন্যাস), শাকম্ভরী(উপন্যাস), বাসাংসি জীর্ণানি(গল্প সংকলন)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *