কাগজের নৌকো। পর্ব ১১। ধারাবাহিক উপন্যাস। লিখছেন সায়ন্তন ঠাকুর

প্রহ্লাদ ঘাট থেকে ফিরে গোপাল রেস্ট হাউসের নিচের তলায় কাচের দরজা খুলে ভেতরে পা দিতেই প্রৌঢ় শর্মাজি দশমী তিথির শশীকলার মতো ভারী কাঠের টেবিলের ওপার থেকে মৃদু হেসে বললেন, ‘ম্যাডাম জ্বি, আপ কা ফোন আয়া থ্যা!’

ঐন্দ্রীকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে, সন্ধ্যার অবকাশের মতো দীঘল কেশরাজি শিথিল কবরীমূলে থমকে রয়েছে, পরনের সাদা শাড়িটিও সামান্য এলোমেলো, আঁখিদুটি যেন কারোর আঙিনায় সদ্য ফুটে ওঠা করুণ নয়নতারা ফুল, দু-এক মুহূর্ত শর্মাজির পানে চেয়ে থেকে শ্রান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘নাম কুছ বতায়া?’

দ্রুত হাতে দেরাজ খুলে একখানি চিরকুট বের করে শর্মাজি ঐন্দ্রীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘জ্বি হা, ম্যায়নে ইঁহা পর নাম লিখকে রাখা, লিজিয়ে।’

চিরকুটে রামানুজের নাম দেখে সামান্য বিস্মিত গলায় শুধোল, ‘উনোনে কুছ কহা?’

–আপ কো ব্যস একবার ফোন করনেকে লিয়ে বতায়া, ঔর হাঁ, কহা ইটস ভেরি আরজেন্ট!

–আরজেন্ট?

–হা জ্বি, উনোনে ওহি বতায়া!

 

বাম কাঁধ থেকে ডানপাশে ঝোলাটি নিয়ে এক মুহূর্ত চিন্তা করল ঐন্দ্রী, রামানুজ তো খুব প্রয়োজন ছাড়া এমন ফোন করে না, তাহলে কি কোনও সমস্যা হল? সমস্যা আর কী হবে, হয়তো কোনও জরুরী ছবি বিক্রির ফরমাশ পেয়েছে, এদের সঙ্গে কেজো সম্পর্ক, অবশ্য জগতে প্রায় অধিকাংশ মানুষের সঙ্গেই ঐন্দ্রীর কাজের বাইরে তেমন কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নাই। ইচ্ছে করেই আজ দীর্ঘদিন সে নিজের চারপাশে একটি চক্রবূহ্য রচনা করে রেখেছে। সহসা শর্মাজির কৌতুহলে চিন্তাজাল ছিন্ন হল, ‘ম্যাডাম জ্বি ক্যেয়া আপ মোবাইল কা ইসতেমাল নেহি করতি?’

 

কাচের দরজার বাইরে শীর্ণ গলিপথের দিকে একবার তাকাল ঐন্দ্রী, নির্জন ম্লান আলোয় পথচলতি মানুষজন যেন ছায়াচিত্র, অদূরে মন্দির থেকে সন্ধ্যারতির শঙ্খ কাঁসর ধ্বনি ভেসে আসছে, কুসুম রেণুর বৃষ্টি শুরু হল বোধহয়, চোখ ফিরিয়ে শর্মাজির দিকে তাকিয়ে আষাঢ় মেঘের মতো স্মিত হেসে বলল, ‘নেহি!’

হোটেল ব্যবসায় বিচিত্র মানুষ কম দেখেননি শর্মাজি কিন্তু এই সময়ের একজন তরুণী মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না শুনে বিস্ময় গোপন করতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজ কা দিনমে বিনা ফোনসে চল্‌তা হ্যে ক্যেয়া?’

কথাটির স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে ঐন্দ্রী মুহূর্তে নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য বলয় রচনা করে শুধোল, ‘ইঁহাপে ফোন করনে কা কোই দুকান হ্যে?’

চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের উপরে রাখা ল্যান্ডফোনের মুখটি ঐন্দ্রীর দিকে ঘুরিয়ে ভারি আন্তরিক সুরে বললেন, ‘কাহে বাহার যায়েগি ম্যাডাম জ্বি, বেফিক্‌র হোকে ইঁহাসে ফোন কিজিয়ে।’

–ঔর ইস্‌কা বিল? আপকা পাস মিটার তো নেহি হ্যে!

দু-এক মুহূর্ত নীরব থাকার পর প্রৌঢ় মানুষটি ফতুয়ার পকেট থেকে সাদা রুমাল বের করে চশমার কাচ মুছে ঐন্দ্রীর দিকে তাকিয়ে পুরাতন ভারতবর্ষের মতো বললেন, ‘ক্যয়া হ্যে ম্যাডাম জ্বি, হোটেল জরুর চালাতা হুঁ, পেইসা ভি লেনা পরতা, লেকিন আজ ভি হর গেস্টকো ম্যে ভগবান্‌ য্যায়সা মানতা হুঁ! মেরা পিতাজি হামেশা বোলা করতা থা, বেটা, গেস্ট মাত বোলো, অতিথি কহো! ঔর এক ফোন কে লিয়ে আপ পেইসাকি বাত কর রহি হ্যে? প্রার্থনা কিজিয়ে এইসা দিন শিউজি মুঝে কভি না দে!’

 

শাড়ির আঁচলটি ঠিক করে সামান্য হাসল ঐন্দ্রী, এক মুহূর্তের জন্য মনোপটে ভেসে উঠল অপরূপা মাতৃভূমির মুখখানি-এই দেশ আর মানুষ দেখবে বলেই তো বারবার পথে নেমে আসি, সুজলা সুফলা কিনা জানি না তবে এমন মানুষ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, লোকে আমাকে হয়তো ছেলেমানুষ ভাবে, ভাবুক, ক্ষতি নাই, তবুও সহস্রবার এখানেই জন্ম নিতে চাই, আমার মায়ের মতো দেশ এই মায়াভুবনে আর কোথাও নাই।

ঐন্দ্রীকে নিশ্চুপ দেখে শর্মাজি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ক্যেয়া ফোন নাম্বার ইয়াদ নেহি হ্যে? ম্যে উনোসে পুছনা ভুল গ্যয়া!’

‘নেহি নেহি! আপ ফিক্‌র মাত কিজিয়ে, নাম্বার ইয়াদ হ্যে!’, কথার মাঝেই রিসিভার টেনে নিয়ে আড়চোখে দেয়াল ঘড়ির দিকে একবার চাইল ঐন্দ্রী, সাড়ে সাতটা, কলকাতায় এখনও কর্মব্যস্ত দিন শেষ হয়নি।

 

ওপারে ফোনে একটি মধুর সুর বেজে চলেছে-সম্ভবত পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতারে যোগেশ্বরী, নাকি নিখিল ব্যানার্জী, রামানুজ ছেলেটি খুবই অন্তর্মুখী, আর্ট ডিলার হিসাবে একেবারেই মানায় না, মাঝে মাঝে মনে হয় সে নিজেও বোধহয় সুর রেখা আর রঙ কল্পনা করে, অবশ্য আলোকচিত্রের জগতও নির্জন-চিন্তার মাঝে বাম কানে রিসিভার ধরে ঝোলাটি ডান কাঁধ থেকে নামিয়ে সামনে সোফার উপর রাখতেই ওদিক থেকে ভরাট পুরুষণ্ঠ ভেসে এল, ‘বলুন!’

পরিচিত কণ্ঠস্বরের মতো শোনাচ্ছে কিন্তু রামানুজের গলা তো এমন নয়, তাহলে কি অন্য কেউ? ঈষৎ অপ্রস্তুত স্বরে ঐন্দ্রী জিজ্ঞাসা করল, ‘রামানুজ বলছেন? রামানুজ চক্রবর্তী?’

দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর আগন্তুক কণ্ঠস্বর জলতরঙ্গে ভরে উঠল, ‘ঐন্দ্রী না?’

নিমেষে মানুষটিকে দেখতে পেল ঐন্দ্রী, কিন্তু ভুল করে কীভাবে এই নম্বর ডায়াল করল, আশ্চর্য, এমন তো হয় না কখনও-চিন্তা থামিয়ে সামান্য বিস্ময়ের সুরে বলল, ‘অবিনাশদা!’

অবাক অবিনাশও কম হয়নি, ‘কী রে, এ কোথাকার নাম্বার?’

–আর বলো না, আমার আর্ট ডিলার রামানুজকে ফোন করতে গিয়ে তোমার নম্বরে ডায়াল করে ফেলেছি!

চাপা হাসির শব্দ শোনা গেল ওপ্রান্তে, ‘ওই হয় রে! আমাকে ইচ্ছে করে তো আর কখনও ফোন করবি না! অবশ্য বাপ-কাকাকে আর কেই বা ফোন করে বল্‌!’

–বাজে কথা বলো না তো! আর তুমি আবার কাকা হলে কোন জন্মে! গতমাসেই একদিন ফোন করে কত গল্প করলাম, থাকো তো একই শহরে, কোনওদিন পথ ভুলেও এসেছ আমার ফ্ল্যাটে?

–সে তুই না ডাকলে আর কী করে যাব!

সোহাগি নূপুরের মতো বেজে উঠল ঐন্দ্রী, ‘অবিনাশদা! এত মিথ্যে কথা ধর্মে সইবে তোমার?’

–মিথ্যে কই রে! যে আঠাশ বছরের বড়ো লোককে কাকা না বলে দাদা ডাকে, সে সব পারে!

–চুপ করো! তুমি আমার চিরকালের দাদা!

 

পরবর্তী কয়েকটি মুহূর্ত মধুবাতাসের সুবাসে আচ্ছন্ন হল, দূর পশ্চিমাকাশে রক্তসন্ধ্যার ছায়াতলে যেন পুরাতন সময়ের সঙ্গে এভাবেই তিরতিরে কালস্রোতের দেখা হওয়ার কথা ছিল, একটি কাগজের নৌকো কে যেন ভাসিয়ে দিল চঞ্চলা নদীস্রোতে, কয়েকটি জীর্ণ পাতা খসে পড়ল আপনমনে, অস্ত সবিতার রেণু আদিগন্ত আষাঢ়প্রান্তে শস্যকণার অন্তরে গোপন আখ্যানের মতো নিঃশব্দে রেখে দিল নূতন প্রাণের বীজ, মন্থর পায়ে দিকবসনা রাত্রিদেবী নেমে এলেন চরাচরে-হাসিকথার শেষে অবিনাশ অনেকদিন পর নির্ভার গলায় বলল, ‘হঠাৎ কথা হয়ে খুব ভালো লাগল রে! ফিরে আয়, এবার সত্যিই একদিন তোর কাছে যাব।’

–প্লিজ এসো। তুমি এলেই আমার সেই চালসার গল্প শুনতে ইচ্ছে করে। তুমি বাবা মা-কী উজ্জ্বল দিন ছিল বলো, এখন কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল সব।

এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে অবিনাশ মৃদু হেসে বলল, ‘এমনই তো হয় রে! কিছুই থাকবে না, বারাণসীর ঘাটে বসে দেখবি কেমন দুলে দুলে পুজোর ফুল ভেসে চলেছে, আমরাও তেমনই বয়ে যাই। এই ভালো জানিস!কিছুই চিরকাল থাকে না বলেই জগত এখনও সুন্দর!’

নক্ষত্রের ক্ষীণ আলোর মতো কয়েকটি অশ্রবিন্দু সবার অলক্ষে আঁখিপ্রান্তে পথভ্রষ্ট নাবিক হয়ে থমকে দাঁড়াতেই চিরকালের নারীর স্বাভাবিক মমতায় ঐন্দ্রী জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার শরীর ভালো আছে তো?’

–আছে রে! তুই নিজের অযত্ন করিস না।

ফোনের তার বামহাতের তর্জনীপ্রান্তে জড়িয়ে আনমনা স্বরে ঐন্দ্রী বলল, ‘ভালো থেকো আর আমি ফিরলে একদিন এসো অবিনাশদা, অনেকদিন তোমাকে দেখিনি।’

‘আসব, নিশ্চয় আসব।’, কথাটি শেষ করে কী যেন মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিমায় অবিনাশ বলল, ‘আচ্ছা শোন্‌, তোকে একটা কথা বলতেই ভুলে গেছি। এমনিও তোর বাড়িতে এর মধ্যেই ফোন করতাম।’

–কী কথা গো?

–তুই মাস দুয়েক আগে একবার গিরিশ ঘোষের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলি, মনে আছে?

–হ্যাঁ, মনে আছে তো। একটা সিরিজ করার ইচ্ছে ছিল, তুমি পাঁচ সাতটা বইও পাঠিয়ে দিয়েছিলে!

–এবার ওঁকে নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন এমন একজনের সন্ধান পেয়েছি!

ঐন্দ্রী শর্মাজির দিকে একপলক তাকিয়ে মৃদু হেসে ফোনের রিসিভারটি ডান হাতে নিয়ে সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করল, ‘তাই?’

–আর মজা কী জানিস সেই ভদ্রলোক বারাণসীর বাসিন্দা!

বিস্মিত স্বরে ঐন্দ্রী বলল, ‘বলো কী! এ তো পিওর কোইনসিডেন্স!’

গঙ্গার প্রায়ান্ধকার ঘাটে বসে আষাঢ়ের মেঘাবৃত টলোমলো আকাশ পানে চেয়ে অবিনাশ ভাবল-কী বিচিত্র এই জগত, একই নদীর পারে বসে তারা অশরীরী কণ্ঠে কথা বলছে, নবীনা ও সহস্র বৎসর প্রাচীন দুই শহরের মধ্যে শত মাইলের ব্যবধান অথচ কেমন সহজেই সুরধুনির নির্বিকার স্রোতের মতো ভাবতরঙ্গ বয়ে আসছে, মৃদু হেসে বলল, ‘ঘটনা পরম্পরা আমরা সবসময় বুঝি না রে! তুই এক কাজ কর, নাম ঠিকানা লিখে নে, একবার দেখা করে আয়, ভদ্রলোকের নাম চন্দ্রভানু রায়, দণ্ডীঘাটের কাছে বাড়ি। আমার নাম বললেই হবে।’

–তুমি চিনলে কী করে?

–সে অনেক কথা, বলব’খন! তুই আগে দেখা করে আয়!

শর্মাজির কাছ থেকে হাতের ইশারায় একটুকরো কাগজ ও কলম চেয়ে ভদ্রলোকের ঠিকানা ও ফোন নাম্বার লিখে ঐন্দ্রী সামান্য ইতস্তত সুরে বলল, ‘তুমি কি ওঁকে একবার বলে রাখবে? তাহলে কাল সকালে আমি যেতে পারি।’

গঙ্গাঘাটে বসে মোবাইল যন্ত্রটি কানে নিয়ে একমুহূর্ত কী যেন ভাবল অবিনাশ, তারপর শান্ত গলায় বলল, ‘বেশ, আমি আজ রাত্রে চন্দ্র বাবুকে ফোনে বলে রাখব, তুই কাল সকালেই যাস।’

 

রিসিভার রাখতেই ঐন্দ্রীর পানে চেয়ে হাসলেন শর্মাজি, ‘গলদ নাম্বার ডায়াল হো গ্যয়ে ক্যয়া?’

ভদ্রলোক তাদের কথা সবই শুনেছেন বুঝতে পেরে নির্বিকার স্বরে ঐন্দ্রী বলল, ‘মুঝে এক ঔর কল্‌ করনা হে!’

ঐন্দ্রীর নির্বিকার কণ্ঠস্বরে কিছু বুঝতে পেরেই বোধহয় শর্মাজি বললেন, ‘হাঁ হাঁ, জরুর। আপ বাত কর্‌ লিজিয়ে, মে থোড়া অন্দর সে আতে হ্যে!’, টেবিলের ড্রয়ার থেকে একগোছা চাবি নিয়ে রেস্টহাউসের রসুই ঘরের দিকে যাওয়ার পথে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপকে লিয়ে কুছ চায়ে ভেজ দু ক্যয়া?’

রামানুজের নাম্বার ডায়াল করে বামকানে রিসিভার ধরে শর্মাজির দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে ঐন্দ্রী হাতের ইশারায় না করতেই দূরভাষের ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠস্বর, ‘রামানুজ চক্রবর্তী স্পিকিং!’

–ফোন করেছিলে?

একমুহূর্ত পর রামানুজ জিজ্ঞাসা করল, ‘ম্যাডাম?’

–হ্যাঁ, বলো কী দরকার!

–ম্যাডাম, চেতন ডালমিয়া ফোন করেছিলেন, লানডান থেকে একজন ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা আপনার দশটি ছবি কিনতে চাইছেন! ছবিগুলি ওঁর একটু তাড়াতাড়ি প্রয়োজন।

দু-এক মুহূর্ত চিন্তা করে ঐন্দ্রী ধীর অচঞ্চল স্বরে বলল, ‘বেশ তো, দিয়ে দাও! তোমার কাছে ছবি তো রয়েছে আর টাকাপয়সার বিষয়টি তুমি আর চেতন বসে ঠিক করে নাও!’

–কিন্তু ম্যাডাম, ছবি যা রয়েছে সেগুলি সবই তো বুকড!

–সব বুকড?

–হ্যাঁ, ম্যাডাম!

সহসা বিদ্যুৎ চমকের মতো ঐন্দ্রীর মনে সদ্য শুরু করা অসমাপ্ত ছবিটি ভেসে উঠল, পরক্ষণেই বহুদিন পূর্বে গিরিশ ঘোষকে নিয়ে শুরু করতে চাওয়া সিরিজ এবং সদ্য অবিনাশের মুখ থেকে শোনা চন্দ্রভানু রায়ের কথা মনে পড়ায় কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর শান্ত স্বরে বলল, ‘বেশ, বলে দাও নতুন ছবিই দেব! এখন তো জুন, অগাস্টের শেষে ডেট দাও!’

ইতস্তত সুরে রামানুজ বলল, ‘কিন্তু ওঁর যে এখনই প্রয়োজন। চেতন ডালমিয়া আমাকে সেরকমই বললেন।’

–শোনো, রামানুজ, অগাস্টের শেষ ছাড়া হবে না। বায়ার যদি রাজি না হন, ইন দ্যাট কেস, ওঁকে বলে দাও, ইটস্‌ নট পসিবল! আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা, এই নিয়ে আমাকে এখন আর বিরক্ত করো না। রাখছি, গুড নাইট, বাই!

 

বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর, মেঘ ও রৌদ্র পরস্পরের সঙ্গে ঘাট ও নদীর চিরপুরাতন ভাষায় কথা কইছে, সুপ্রাচীন বারাণসীর শীর্ণ গলিপথ নির্জন, কোথাও একটি ষাড় অলস ভঙ্গিমায় পথরোধ করে শুয়ে রয়েছে, দোকান বাজারে লোকজনের ভিড়ও আজ যথেষ্ট কম, দূরে কোনও মন্দির থেকে ক্ষীণ ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে, অনেকদিন পর আপন খেয়ালে ভরা আষাঢ় জগতের দুয়ারে ক্ষণিকের জন্য যেন শরত অতিথি হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

শর্মাজির পরিচিত অটোরিক্সার চালক দণ্ডী ঘাটের সামান্য আগে একটি নিদ্রাতুর গলির সামনে ঐন্দ্রীকে নামিয়ে দিয়ে মার্জিত স্বরে বলল, ‘ইস্‌ গলিকো পার করনেকা বাদ হি আপকো ঘাট মিল যায়েগা।’

ঐন্দ্রী কাপড়ের ঝোলা থেকে একটি একশো টাকার নোট বের করে চালকের হাতে দিয়ে সামান্য হেসে বলল, ‘সুক্রিয়া ভাইসাব।’

গাড়ি ঘুরিয়ে অটোরিক্সা চলে যেতেই চারপাশ শুনশান হয়ে উঠল, দুপাশে পুরাতন দালানকোঠা, বন্ধ দোকান- ধীর পায়ে গলির মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছে ঐন্দ্রী, আজ তার পরনে ফিকে বর্ষারঙা কুর্তি ও সাদা ঢোলা হারেম, মৃণালনিন্দিত বাহুদুটি যেন শ্বেত কুসুমের অলঙ্কার, কেশরাজি বেণীবন্ধনে আবৃত, আঁখিতল অস্ফুট মৃদু কাজলে সাজানো, চন্দনগন্ধী সুবাসে আচ্ছন্ন সমস্ত অঙ্গ, অলস পায়ে হাঁটার সময় গতকাল রাত্রে পড়া দণ্ডীঘাটের ইতিহাস মনে পড়ল-পূর্বে সুরধুনির এই ঘাটে বহু দণ্ডী এসে বসবাস করতেন, সেখান থেকেই ঘাটের নাম হয় দণ্ডীঘাট। সন্ন্যাসাশ্রমাবলম্বী তক্ত্যযজ্ঞোপবীত দণ্ডীগণ ন্যায়, বেদান্ত, মীমাংসা ইত্যাদি নানাবিধ শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন-গৈরিকবসন, মুণ্ডিত মস্তক, সর্বাঙ্গে ভস্ম প্রলেপ, কণ্ঠ রুদ্রাক্ষ মালায় সজ্জিত, ব্রাহ্মণ অথবা ব্রহ্মচারী ভিন্ন কারোর থেকে অন্নগ্রহণ নিষিদ্ধ, এমনকি ধাতু নির্মিত কোনও বস্তু স্পর্শেরও চল ছিল না। নির্গুণ ব্রহ্মোপাসনাই তাঁদের একমাত্র ধর্ম, এমনকি মৃত্যুর পর শবদাহ করা হত না, এই ঘাট থেকেই উত্তরবাহিনী সুরধুনির চঞ্চলা স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হত তাঁদের জীর্ণ বস্ত্রের মতো নশ্বর দেহখানি! এই প্রাচীন ইতিহাস স্মরণ করতেই ঐন্দ্রীর মনে সহসা একটি প্রশ্ন উদিত হল, আজও কি তাঁরা রয়েছেন এখানে? পরমুহূর্তেই মনে হল, থাকলেও বা কী, হয়তো স্ত্রীলোকের সঙ্গে তাঁরা কথা বলেন না!

 

ঘাট দেখা যাচ্ছে এবার, প্রায় জনশূন্য, শুধু একজন মুণ্ডিত মস্তক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ পইঠায় বসে এক বালককে মৃদু স্বরে কী যেন বলে চলেছেন। ব্রাহ্মণের পরনে ধুতি, অনাবৃত দেহে শুভ্র উপবীতটি চন্দ্রপ্রভার মতো ভাস্বর। বালকের বয়স খুব বেশি হলে দশ কি বারো, ধুতি ও একখানি ফতুয়া পরে একাগ্রচিত্তে সে বৃদ্ধের কথা শুনছে।

চন্দ্রভানু রায়কে আজ সকালে ফোন করায় বলেছিলেন এই ঘাটেই তাঁর লোক অপেক্ষা করবে-ঐন্দ্রী ঘাড় ফিরিয়ে আশেপাশে কাউকে না দেখতে পেয়ে কৌতুহলবশত ব্রাহ্মণ কী বলছেন শোনার জন্য এগিয়ে গেল, অবশ্য খুব কাছে না বসে কয়েকটি পইঠা নিচে গঙ্গাপানে চোখ রেখে বসতেই কানে ভেসে এল সুললিত কণ্ঠস্বর, আজ আষাঢ় দ্বিপ্রহরটিও ভারি মধুর, ম্রিয়মান রৌদ্র আর মেঘছায়াতলে সুরধুনির মন্দ মন্দ বাতাসে সর্বাঙ্গে জননীর স্নেহস্পর্শের পরশ অনুভব করল ঐন্দ্রী, কান পাততেই শুনতেই পেল বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বলছেন, ‘আচার্য্য শঙ্করের চারিজন প্রধান শিষ্য-পদ্মপাদ, হস্তামলক, মণ্ডন ও তোটক, এই চারি শিষ্যের প্রত্যেকের শিষ্য ছিল, পদ্মপাদের দুই শিষ্য-তীর্থ ও আশ্রম ; হস্তামলকের দুইজন-বন ও অরণ্য; মণ্ডনের তিন শিষ্য-গিরি, পর্বত ও সাগর এবং তোটকেরও তিনজন প্রধান শিষ্যের কথা আমরা জানিতে পারি-সরস্বতী, ভারতী ও পুরি। এই দশজন হইতেই দশনামী সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হইয়াছে। শুধুমাত্র তাহাই নয়, আচার্য্য শঙ্করের প্রতিষ্ঠিত চারিটি মঠ এবং পূর্বোক্ত তাঁহার দশজন শিষ্য পরম্পরা আজও চলিতেছে। পুরি, ভারতী ও স্বরস্বতীর শিষ্যগণ শৃঙ্গগিরির মঠ, তীর্থ ও আশ্রম শিষ্য শারদামঠ, বন ও অরণ্যের শিষ্যসকল গোবর্দ্ধন মঠ এবং গিরি, পর্বত ও সাগরের শিষ্যগণ জ্যোষীমঠের অন্তর্গত। মনে রাখিও, দশনামীগণ নির্গুণ উপাসক বলিয়া পরিচিত, এক্ষণে নির্গুণ ব্রহ্মতত্ত্ব আমরা আলোচনা করিব, অচঞ্চল চিত্তে তাহা শ্রবণ করিয়া জীবন সার্থক কর। অবশ্য তাহার পূর্বে শিবক্ষেত্রে স্বয়ং শূলপাণিকে স্মরণ করিতে হইবে- সৌরাষ্ট্রদেশে বিশদেঽতিরম্যে জ্যোতির্ময়ং চন্দ্রকলাবতংসম্।ভক্তিপ্রদানায় কৃপাবতীর্ণং তং সোমনাথং শরণং প্রপদ্যে। শ্রীশৈলশৃঙ্গে বিবুধাতিসঙ্গে তুলাদ্রিতুঙ্গেঽপি মুদা বসন্তম্।তমর্জুনং মল্লিকপূর্বমেকং নমামি সংসারসমুদ্রসেতুম্।’

ব্রাহ্মণের দ্বাদশজ্যোর্তিলিঙ্গস্তোত্র পাঠের মাঝে ঐন্দ্রী হাতঘড়িটির দিকে তাকাল, দুটো বেজে দশ মিনিট, উঠে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল একজন মাঝবয়সী মানুষ ঘাটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন-ইনিই সম্ভবত নিতে এসেছেন, ধীর পায়ে ঐন্দ্রী তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।

 

দণ্ডী ঘাটের অদূরে চন্দ্রভানু রায়ের শতাব্দী প্রাচীন পৈতৃক ভদ্রাসনটি জীর্ণ হলেও আভিজাত্য এখনও নষ্ট হয় নাই-জ্যোৎস্নাময়ী রাত্রির মতো অতীত রূপ কালপ্রবাহে ভেসে গেলেও তার ক্ষীণ প্রভা আজও স্পষ্ট বোঝা যায়।কাষ্ঠনির্মিত কারুকার্যমণ্ডিত পুরাতন সদর দরজা অতিক্রম করার পর একখানি সুবিশাল উঠান চোখে পড়ে, চারপাশে শ্বেতপাথরের বারান্দার বেষ্টনী, সম্মুখের অপ্রশস্ত সোপান শ্রেণী দ্বিতলে উঠে গেছে, দ্বিতলেও অনুরূপ একখানি বারান্দা, অলিন্দ সংলগ্ন কাঠের বৃহৎ থামগুলি নানাবিধ পৌরাণিক চিত্রে সজ্জিত-যদিও তারা এখন খর চৈত্র দ্বিপ্রহরের আকাশের মতোই বিবর্ণ কিন্তু ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যায় অতি সূক্ষ্ম এই কারুকাজ দক্ষ শিল্পীর দ্বারা কোন্‌ বিস্মৃত অতীতে রচিত হয়েছিল।

ঐন্দ্রী কয়েক মুহূর্ত সাগ্রহে চিত্রকলার দিকে তাকিয়ে ভাবল, তার ছবিও একসময় কালপ্রবাহে এভাবেই জীর্ণ হয়ে যাবে, সবারই তাই হয়, তবুও শিল্পী নিজের খেয়ালে সৃষ্টি করেন, আগামীদিনে শিল্পবস্তু ধ্বংস হবে জেনেও তাঁর এই আত্ম উন্মোচনের পথ নিরন্তর বয়ে চলে সামনে আর সেই অনির্বাণ যাত্রাপথের পাশে মুগ্ধ চোখে বসে থাকেন মানুষটি-মুগ্ধতা শিল্পবস্তুর প্রতি নয়, নয়নদুটি মুগ্ধতার কাজলে সাজানো কারণ এই অনিত্য ধুলাখেলার স্বরূপ তিনি অনুভব করতে পেরেছেন, মনে বেজে উঠেছে অপরূপ এক আড়বাঁশি, ক্ষণিকের জন্য হলেও হয়তো মনোপটচিত্রে সেই আলোকময়ী কিরীট-ভূষণালঙ্কাকৃতা মূর্ত হয়েছেন!

সহসা দণ্ডী ঘাট হতে যে ব্যক্তি পথ চিনিয়ে গৃহে নিয়ে এসেছেন তাঁর কথায় ঐন্দ্রীর সংবিত ফিরে এল, ‘আইয়ে জ্বি, হুজৌর আপকা ইন্তেজার কর্‌ রহে হ্যে!’

(ক্রমশ)

সায়ন্তন ঠাকুর
লেখক | + posts

জন্ম পৌষ মাসে, রাঢ়বাংলার এক অখ্যাত মফস্বলে। সায়ন্তন মূলত মূলত গদ্য লেখেন। প্রকাশিত বইপত্তর-- নয়নপথগামী(উপন্যাস), শাকম্ভরী(উপন্যাস), বাসাংসি জীর্ণানি(গল্প সংকলন)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *