মানুষের বেঁচে-থাকার ইতিহাস। অনন্ত জানার ‘দেয়ালের লেখা’ পড়লেন সুমনা রহমান চৌধুরী

বিশ্বজুড়েই আমরা দেখেছি ইতিহাসের নানা সময়ে যখন মানুষের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়েছে, তা আশ্রয় নিয়েছে দেয়ালে— কখনো গ্রাফিতি, কখনো পোস্টার, কখনো বা একটিমাত্র শব্দের বিস্ফোরণ হয়ে। দেওয়াল হয়ে ওঠেছে মানুষের বেঁচে থাকার আর্তি, প্রতিবাদ, স্বপ্ন এবং বিদ্রোহের ক্যানভাস। আমরা দেখেছি যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে একটি শিশুর দেওয়ালে ‘হোপ’ লেখা ছবি বা গ্রাফিতি কীভাবে সমস্ত ধ্বংসের মাঝেও মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্রভাবে ঘোষণা করে। অথবা শত মানুষের একযোগে আঁকা রাস্তার ছবি ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’। আমরা দেখেছি দেওয়াল জোড়া নির্বাচনী ইস্তেহার, আবার দেওয়াল-ই জানান দিয়েছে যুগে যুগে স্বৈরাচার বিরোধিতার সোচ্চার উচ্চারণ। গোটা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর ইন্টারনেটের যুগে বিশ্বের মানচিত্র আর দেওয়াল পেরিয়ে পৌঁছেছে আমাদের মোবাইল, কম্পিউটার আর টিভির পর্দায়। আমরা দেখেছি, আন্দোলিত হয়েছি, পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের স্বরের সাথে স্বরও মিলেয়েছি কখনওবা। কিন্তু দেয়াল জুড়ে লেখা এবং আঁকা সেসব শ্লোগান  আর পোস্টারের, গ্রাফিতি আর ছবির পেছনের ইতিহাস ততোটা খুঁড়ে দেখতে যাইনি। অথবা আলাদা করে ভাবিওনি।

জীবনে কখনও কখনও এমন কিছু বইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়, যা আমাদের চারপাশকে দেখার, বোঝার, ভাবনার চোখকেও বদলে দেয়! অনন্ত জানার ‘দেয়ালের লেখা— এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা’ তেমনই এক বই। দেয়ালের লেখা, গ্রাফিতি, পোস্টার— সর্বোপরি রাস্তার শিল্পকে কেন্দ্র করে লেখা এক অভিনব বই। বিশ্বজুড়ে নানা বিপ্লব, আন্দোলন এবং সামাজিক উত্তাল সময়ে দেয়ালের-লেখা, পোস্টার এবং গ্রাফিতি কীভাবে এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, হয়— তারই ধারাবিবরণী। ফলত বইটি হয়ে উঠেছে দেয়াল-শিল্পের মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাসের এক বিকল্প পাঠ। বাংলা ভাষায় এমনতর কাজ শুধু দুর্লভ-ই নয়, দুঃসাধ্যও বটে।

অনন্ত বলছেন আমাদের এই বইটিতে—

“দেয়ালের লিখন যিনি নির্ভুলভাবে পাঠ করতে পারেন— তিনি ততই ইতিহাসের সত্যকে অনুসরণ করে মানবসভ্যতার প্রগতির পথরেখাকে চিহ্নিত করতে পারেন।”

‘রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পর্বতবাহী স্রোতের তীব্রতায়’ বিশ্ব জুড়ে যেসব বহু আলোড়ন সৃষ্টিকারী দেয়ালের লেখা, পোস্টার, গ্রাফিতির জন্ম হয়েছে, হয়ে চলেছে সেসবের এক ঐতিহাসিক দলিল এই বইটি। একেবারেই নিরস গুরুগম্ভীর প্রবন্ধের ঢঙে নয়। বরং সহজ সাবলীলভাবে। গল্প-উপন্যাসের মতো করে। অনন্তের বর্ণনাশৈলী চমৎকার। আমরা তাঁর ‘লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর’ বইটিতেও দেখেছি আগে, অনন্ত পাঠকদের এক দীর্ঘ পথচলায় নিয়ে যান। এই বইটিতেও ‘সুমন নামের এক অজ্ঞাত শিল্পী, যিনি রাস্তার বা জনসাধারণের শিল্পী হতে চেয়েছিলেন’— তাঁর জীবনের বহমানতার মাঝে, উত্থান-পতন, আশা-নিরাশা, স্বপ্ন আর ‘মানুষের মতো বেঁচে থাকার উচ্চাকাঙ্ক্ষা’র সাথে চলতে চলতে আমরা খোঁজ পাবো গোটা বিশ্বের পথের ইতিহাসের। রাস্তায় আর দেওয়ালে, প্রাচীরে আর ক্যানভাসে, অক্ষরে আর রেখায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো যে জেগে আছে মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে।

বহু বছর পর রাঢ় বাংলার শৈশব-পরিচিত এক গঞ্জে মাঝবয়েসী সুমনের প্রত্যাবর্তনের দৃশ্যে ‘দেয়ালের লেখা’ শুরু হয়। শরীরী ভাষায় ‘গাঙ্গেয় কোমলতা’, চোখে ‘আধা-পরিচিতের উদ্‌ভ্রান্তি’ নিয়ে গঞ্জের ‘মাঝারি মাপের স্টেশনে’ সুমন যেদিন এসে নামেন— শুরু হয় তাঁর নতুন এক অভিযাত্রা। পেছনে পড়ে থাকে কলকাতার জীবন, আর্ট কলেজ, দাদা-বৌদির সংসারের দীনতার অভিমানে বিদীর্ণ দিন-রাত, আর অনিন্দিতা— জীবন থেকে সুমন নামের রঙটুকু মুছে ‘জীবন বানানোর এক অসম্ভব শিল্প’ সফলভাবে গড়ে তুলতে পেরেছিল যে।

পরিবর্তনশীল সময়ের এক সংবেদনশীল সাক্ষী হয়ে উঠবেন সুমন ক্রমশ। আর তাঁর চোখ দিয়ে আমরাও প্রত্যক্ষ করবো গঞ্জ সহ গোটা বিশ্বের পরিবর্তন, শিল্পের অবক্ষয়, রাজনৈতিক পেশিশক্তির উত্থান এবং ক্ষমতার যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের অসহায়তার মাঝেও রুখে দাঁড়ানোর স্পর্ধা। সুমনের মতো আমরাও দেখবো— ক্ষমতাবানদের ‘উন্নয়ন’ নামক বৃহৎ পুঁজির রথের চাকা কিভাবে মানুষের চিন্তা-চেতনা, পারস্পরিক সম্পর্ক, পেশা, নৈতিকতা, শিল্পবোধ—সবকিছুকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে। যে বিপদের পূর্বাভাস সুমনের মতো দ্রষ্টারা বহু আগে থেকেই টের পান, কিন্তু তাঁদের সতর্কবার্তা গুরুত্ব পায় না। ফলে তাঁরা হয়ে ওঠেন এক উপেক্ষিত বিবেক। ‘অঘোষিত সন্ত্রাস’-এর আবহের মাঝে সুমনের মতো মানুষেরা বিশ্ব নিরিখেই ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হতে থাকেন।

যাবতীয় অবক্ষয়ের মাঝেও মানবিক আলো হয়ে আসেন সুধাময়, সালেম ওস্তাগররা— সুমনের বন্ধু। বাবু লালার নাতি, গোপাল বাড়ুজ্যে, তিনু পোদ্দার, বাদল মুন্সি, শিবেশ, যতীশ— শুধু কাজ নয়, সুমনের আশ্রয়ও হয়ে ওঠেন যেন বা।

অনন্ত সুমনকে নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করতে চাননি। নিছক পর্যবেক্ষক হিসেবেও নয়। বরং দ্রুত পাল্টে যাওয়া সময়ের অন্তর্লীন সংকেত ধরতে পারা এক জাগ্রত দ্রষ্টা, সংবেদনশীল এক শিল্পীসত্তা হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছেন। যিনি হয়ে উঠবেন গোটা আখ্যানের নৈতিক ও মানবিক কেন্দ্রবিন্দু।

গঞ্জের নির্জন স্টেশনে সুমন প্রথম যেদিন ট্রেন থেকে নামবেন, স্টেশনের চায়ের দোকানের আপাতমলিন এনামেল বিজ্ঞাপনী বোর্ডগুলির ইতিহাস-প্রেক্ষিত হয়ে এনামেল শিল্পের উৎস সন্ধানে সুমন আমাদের নিয়ে যাবেন ফরাসি শিল্পী বার্নার্ড প্যালিসি-র শিল্পসাধনার ইতিহাসে। আর এভাবেই আমরা জানবো ঔপনিবেশিক ভারতের বিপণন কৌশল, সাইনবোর্ড-বিজ্ঞাপনের ইতিহাস থেকে শুরু করে জয়নাল আবেদিন, কামরুল হাসান, শেখ জালালুদ্দিন-কামারুদ্দিন, উইলিয়াম হোগার্থ, এমিলিয়াস সেলের, জুলেস চেরেট, লোত্রেক, আলফোনেস মারিয়া মুচা (নাজি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন), মুর্তজা বশির, জোসেফ কাইসেলাক, ডোনাল্ড জোসেফ হোয়াইট (ডোন্ডি), রিচার্ড মিরান্ডো, মাইকেল ক্রিস্টোফার ট্রেসি (ট্রেসি ১৬৮), ব্লেক লে র্যাট, শেপার্ড ফেইরি সহ অসংখ্য দেয়ালের-রাস্তার শিল্পী হয়ে ব্যাঙ্কসি অব্দি শিল্পীদের শিল্প আর তাঁদের শিল্পের ইতিহাস। সময় আর বিশ্ব ইতিহাসের নানা ঘটনাক্রমে। আমরা পাবো ব্রাজিলিয়ান শিল্পী পাওলো ইতো-কে। মুম্বাই আন্ধেরির স্ট্রীট আর্টিস্ট টাইলারকে। রোমিও বিট্রো সহ সিরিয়ান ব্যাঙ্কসিকে (ইন্টারনেটে হাল আমলের যুদ্ধবিরোধী ছবি সার্চ দিলে প্রথমেই যে গ্রাফিতিটির ছবি ভেসে আসে— একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের গায়ে করোটির স্তূপের উপর দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে শিশু লিখছে— হোপ, এই গ্রাফিতি সহ অসংখ্য যুদ্ধবিরোধী স্বৈরাচার বিরোধী গ্রাফিতির স্রষ্টা।)। শাসকের মৌরুসিপাট্টা কায়েম করার লক্ষ্যে কীভাবে ‘বিগ ব্রাদারেরা আমাদের চোখে চোখে রাখছেন’, নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং ক্ষমতার এই নজরদারির বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের গ্রাফিতি শিল্পীদের প্রকাশ্য যুদ্ধের ধারাবিবরণীও।

হেলাল হাফিজের একটি কবিতার দুটি চরণ কীভাবে স্লোগান হয়ে উঠলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সাড়া জাগানো গ্রাফিতি ‘আইজুদ্দিন’ হয়ে ‘সুবোধ’ গ্রাফিতির ইতিহাসে। এই গ্রাফিতিগুলোর শিল্পী কে জানা না গেলেও, গ্রাফিতিগুলোর ইতিহাস-প্রেক্ষাপট আমাদের কম রোমাঞ্চিত করে না। সাইনবোর্ডের ইতিহাস থেকে সাইনেজ, বিদেশি-দেশি সিনেমার পোস্টার, সত্যজিৎ-এর পোস্টার থেকে সুকুমারের আবোল-তাবোল, গঞ্জদেশের পোস্টার থেকে রাজনৈতিক পোস্টার, ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় তথা নগর কলকাতার পোস্টার থেকে উপনিবেশিক ভারতের পোস্টার, লণ্ডনের দেওয়াল থেকে প্রাচীন গ্রীস-রোমের দেওয়াল, বার্লিন প্রাচীর থেকে সিরিয়া-প্যালেস্টাইনের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেওয়াল, ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ থেকে ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’— ‘দেয়ালের লেখা’য় সুমনের মাধ্যমে অনন্ত আমাদের বিশ্ব পরিক্রমা করান।

গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে গোটা বিশ্ব জুড়েই সংখ্যাগুরুর আধিপত্য যে কীভাবে মানুষের স্বাধীন সত্তাকে গ্রাস করে, অনন্ত তা ব্যঙ্গাত্মক তীক্ষ্ণতায় বয়ান করেন। গঞ্জে মাস্টারমশাইয়ের জমি-দখল, চাঁদাবাজি, নির্মাণ-সন্ত্রাস আর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মাঝে সুমনদের অসহায়তা— রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্লীন পচনের অবয়বটিও অনন্ত স্পষ্ট রেখায় ফুটিয়ে তোলেন।

৩২৯ পাতার বইটির শেষে সংযোজিত হয়েছে একটি অসাধারণ গ্রন্থ ও উল্লেখপঞ্জি। অসাধারণ এই কারণেই, আগেই বলেছি এই বই পাঠককে আরো জানতে, আরো পড়তে উৎসাহিত করে। সুতরাং গ্রন্থপঞ্জিটি দেখে উৎসাহী পাঠকেরা নিজেদের প্রয়োজনমতো বই খুঁজে নিতে পারবেন।

অসংখ্য ছবি আছে বইটিতে। সারা বিশ্বের দেওয়াল শিল্পের। গ্রাফিতির। স্লোগান আর পোস্টারের। এই ছবিগুলো আমাদের বিশ্বভ্রমণের সহায়ক হয়ে ওঠে। লেখায় আর রেখায় সারা বিশ্বের দেওয়াল শিল্প— বইয়ের পাতায় মূর্ত হয়ে ওঠেছে।

‘দেয়ালের লেখা’ শেষ হচ্ছে এই ভাষ্যে—

“শুধু চারপাশে অব্যবস্থিততার একটা স্বস্তিহীন বোধ— একটা অচিহ্নিত তিরতিরে ব্যথা, একটি অজ্ঞাতকুলশীল বেদনার অনুভব, ছন্নতার আশঙ্কাদীর্ণ ভবিতব্য-ভারাতুর এক মেদুরতা ভেতরে ভেতরে ঘনিয়ে থাকলো নিরন্তর— কোন অস্থিতির পালা এবার! কে জানে— কোন্ উন্নয়নের বোমারু বিমান কোন্ নিরাশ্রয়ী আতঙ্কের লক্ষ্যবস্তুর খোঁজে আছে…।”

এই মুহূর্তের বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ-কটি লাইন যেন এক অমোঘ ভবিষ্যৎবাণী হয়ে উঠেছে!

আর দেয়ালের শিল্পীদের, জনগনের-রাস্তার শিল্পী হয়ে উঠতে চাওয়া শিল্পীদের সম্পর্কে অনন্ত তো শুরুতেই বলেছেন—

“মানব-ভবিতব্য বিষয়ে সচেতন ও সংবেদনশীল লেখক-শিল্পী ও স্রষ্টাদের কাছে ইতিহাস আদৌ ভাবাবেগের বিষয় নয়। ইতিহাসের সত্যকে অনুসরণ করা এই লেখক শিল্পীদের কাছে নিজস্ব এক যাপনমন্ত্র। দাস-লেখক, দাসানুদাস শিল্পী, ক্ষমতার হাতের তামাক-খেকো ইতিহাস-লেখক, সংকীর্ণতাবাদীদের উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধি-ব্যবসায়ীদের থেকে রাস্তার শিল্পীদের অবস্থান আলোকবর্ষ দূরে। রাষ্ট্রীয় পোষকতা, অর্থ, সম্মান, স্বীকৃতির অপেক্ষা না-করেই চিরকাল দেয়াল থেকে দেয়ালে এঁরা সমস্ত বিরুদ্ধতাদীর্ণ, প্রতিশোধাত্মক এবং বিপজ্জনক হিংস্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে চলেন। কোনো রক্তচক্ষু, শাস্তির সম্ভাবনাই তাঁদের নিরস্ত করতে পারে না। অপরপক্ষে তাঁদের কাজে আর শিল্প-প্রকরণে মিশে থাকে আবহমান মানুষের বেঁচে থাকার ইতিহাস।”

 

বই : দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
লেখক : অনন্ত জানা
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা
প্রকাশক : সুপ্রকাশ
বইয়ের অংশ-বিশেষ এখান থেকে পড়ে দেখতে পারেন : https://suprokashbooks.com/wp-content/uploads/2026/03/deyaler-lekha_bhumika-pustika_15_03_2026.pdf

Author

Leave a Reply