চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর। পর্ব ১৯। দুর্লভ সূত্রধর

গত পর্বের পর

পণের ব্যাপারটা শুনবার পর আমি বেশ হতচকিত হয়েছিলাম। পুরো একটা দুপুর বাগানের টিনের ঘরে কাটিয়ে দিয়েছিলাম।

একাকী।

বিকেলবেলায় রূপুদা এসেছিল, এখন আর লুকিয়ে কাগজ আনতে হতো না।

তবু রূপুদা কাগজ আর বই নিয়ে আসত। সেদিন নিয়ে এসেছিল আন্তন চেকভের গল্প সংকলন।

আমাকে অস্বাভাবিক চুপচাপ দেখে রূপুদা আমার কাছ থেকে সবকিছু সবকিছু জেনে নিল। প্রথমে সেজদির বিয়ের খবরে আনন্দ প্রকাশ করল, তারপর হেসে বলল— ‘এইটুকুতেই তোর এত রাগ হচ্ছে? শোন, জ্যাঠামশাইয়ের ওপর রাগ করিস না। আমরা সকলেই আছি এক-একটা তন্ত্রের মধ্যে। সেই তন্ত্র বা ব্যবস্থাটা আমরা তৈরি করিনি, তা আমাদের ওপরে নির্ভরও করে না। সেই ব্যবস্থাটা তার মতো করে নেয় মানুষকে। তাই যে-ব্যবস্থা মানুষের সঙ্গে মানুষের ভেদরেখা তৈরি করে, মানুষের মর্যাদা হানি করে— ব্যক্তি মানুষ হিসেবে এবং সামাজিক মানুষ হিসেবেও সেই ব্যবস্থাটা বদলানোর জন্য চেষ্টা করা দরকার। ইচ্ছা করলেই অবশ্য ব্যবস্থাটা বদলানো যায় না। তার জন্য ইতিহাস, চলমান সময়ের বাস্তবতা, বিরোধের উপাদানসমূহের কার্যকারিতা— ইত্যাদি নানা কিছুর আনুকূল্যের প্রয়োজন হয়। যতক্ষণ তা না হবে ততক্ষণ অস্থির হলে চলবে না, বাস্তবতা থেকে পালিয়ে গেলেও চলবে না। তার মানেই এই নয় যে আমি ব্যবস্থাটাকে, তার তৈরি বিধিনিয়মকে সম্পূর্ণ মেনে নিচ্ছি। মনে রাখতে হবে— ব্যবস্থাটা যেন আমাকে গ্রাস করতে না পারে। জ্যাঠামশাই তাই-ই করেছেন। সেজদির বিয়ে দেওয়াটা তাঁর কর্তব্য। আবার সারা জীবন সেজদিকে অবিবাহিত ও স্বাধীন জীবনে রেখে দেবেন— বাবা হিসেবে সেটা তাঁর অসম্ভব বলে মনে হয়েছে— বিশেষ করে তাঁর এবং জ্যাঠাইমার অবর্তমানে। এই দেখ না আমার পক্ষে বিয়ে-থা করে সংসারি হওয়া অসম্ভব জেনেও মা এখনও চোখের জল ফেলছে— মা নিজে চলে গেলে ভাই আর ভাই-বউ যদি আমাকে না দেখে— অবহেলা করে— এই মায়ের ভয়! তাই মা কানা-খোঁড়া যেমন তেমন একটা মেয়ে খোঁজার তালে থাকে! এটাকে মায়ের দোষ বলা যায় না, এটা আসলে মায়ের দুর্বলতা। সেজদির বিয়ে নিয়েও এতদিনের চেষ্টার পর আপাতত এর কোনো আর কোনো বিকল্প নেই জ্যাঠামশাইয়ের কাছে। তাই মেনে নিতে না-পেরে তিনি বিমর্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তুই তোর অস্থিরতা ত্যাগ করে নিজের কর্তব্যটুকু কর। আর মেয়েদের অবমাননার বিরুদ্ধে আজীবন বিরোধের শপথ নে।’ রূপুদা হাসল, তারপর পুনর্বার বলল— ‘আজকে যে বইটা দিলাম, সেই আন্তন চেকভের গল্পগুলো পড়, কত কিছু বুঝতে পারবি নিজে নিজেই।’

রূপুদার কথা শুনে আমি আশ্চর্য তো হলামই— এই চিরদুঃখী মানুষটার ভেতরটা পর্যন্ত আজ দেখতে পেলাম যেন। এই মানুষটা সম্পর্কে সমগ্র জনসমাজ কী ভুলটাই না জানে!

আমার চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা-ঘেরা অন্ধকার সরে গেল যেন। ধুলোগুলোকে টেনে নিল একটা শক্তিশালী ভ্যাকুয়াম ক্লিনার।

কাকা দোকান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এবং দাদারা তখনও কেউ দূরের শহরে পড়াশোনা করার ফলে বাড়ি না-থাকায় এবং দিদিদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বাবা— সেজদির বিয়ের আনুষঙ্গিক সব দায়িত্ব আমাকেই দিয়েছিলেন।

কাকা ব্যাপারটা অপছন্দ করলেও বিয়েতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মানসে কাকা কোনো মতামত না দিয়ে মজা দেখছিলেন।

 

বিয়ের দিন সারা সন্ধে প্রবল বৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ হলে হয়তো বলতেন— ‘সেজদি নামক কালো, তেজি অথচ গুণী মেয়েটির বিয়ে নিয়ে যে মালিন্য জমেছিল— অকাল বর্ষণে সমস্ত চরাচরের সঙ্গে যেন সে-সব ধুয়েমুছে গেল।’

 

কিন্তু আত্মিক সংকটের মুখোমুখি আমাদের মতো আহাম্মকের পক্ষে কাব্যিক সংলাপে আশ্রয় নেওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু সেই প্রবল বৃষ্টির অন্যতর ভূমিকা ছিল।

বউভাতের নাম করে যে নগদ নেওয়া হয়েছিল, অস্বাভাবিক দুর্যোগের কারণে ছেলের বাড়ি থেকে বরের গাড়ি ও বরযাত্রীর বাস ভাড়া করা হয়েছিল সেই গাড়িগুলো  অনেক বেশি টাকা দাবি করে পাত্রপক্ষকে বিপাকে ফেলে দিয়েছিল। সেই বর্ধিত দাবি সম্ভবত নগদ নেওয়া টাকার অঙ্ককে ছাপিয়ে গিয়েছিল!

রূপুদা এক ফাঁকে জনান্তিকে আমার কানে কানে বলেছিল— ‘তুকতাকে বিশ্বেস করি নে তাই, নইলে এটাকে ন্যাচরাল জাস্টিস বলতে পারতাম।’

 

দ্বিতীয় আঘাতটা এলো সেজদিরা অষ্টমঙ্গলা করে শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাবার পর।

তখনও বাড়ি ভর্তি লোক। বিয়ের আগে বড়দি, মেজদি, ছোড়দি, ন-দি, ফুলদিরা শ্বশুরবাড়ির নানা কর্তব্য, শ্বশুর-শাশুড়ির শরীর খারাপ, জামাইবাবুদের অফিসের কাজ— ইত্যাকার নানা অজুহাত দিয়েছিল, বিয়ের কাজে কারও টিকিটি দেখা যায়নি। মা আর কাকিমা গলদঘর্ম হয়ে গিয়েছিল।

আসলে সেজদির বিয়ে ঠিক হবার পর বাবা আমাকে ডেকে টাকা হাতে দিয়ে শাড়ি আর গয়না বাদে যাবতীয় দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এমন অনাসৃষ্টি কাণ্ড মেনে নেওয়া সকলের পক্ষেই কঠিন ছিল।

কয়েক বছরের ব্যবধানে পর পর দিদিদের বিয়ে, দাদাদের বাইরে থেকে পড়াশোনা, তারও ওপর পণের টাকা নিয়ে কাকার মনোভাব!— ইত্যাদি কারণে বাবার আর্থিক অবস্থা জানতাম। ফলে বিয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে পয়সা খরচ করতে হয়েছিল হিসেব কষে।

আমাদের ক্লাবের ছিল ডেকোরেটিংয়ের সরঞ্জাম। ছোটোখাটো ডেকোরেটিংয়ের কাজ করে ক্লাবের ফুটবল আর ক্রিকেট টিমের খরচ চালানো হতো।

সেজদিকে সবাই মান্য করত, কেননা প্রতি বছর ঝুলন পূর্ণিমার দিন, বিজয়ার দিন সেজদি আমাদের ক্লাবের রাবণের গুষ্টিকে লুচি আলুর দম আর বোঁদে দিয়ে আপ্যায়ন করত। অন্য পাড়ার সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচের দিন পাঁউরুটি আলুর দমের লাঞ্চও সেজদিই সরবরাহ করত। ফলে আমার সমবয়সী বন্ধুরা সেজদিকে গ্রিক পুরাণের সমৃদ্ধির দেবী টাইখি বা রোমান পুরাণের সম্পদের দেবী ফরচুনা বলে মনে করত।

সেজদির বিয়ের কথা শুনে নিজেদের বার্ষিক লুচি-বোঁদের কিংবা আলুর দম পাঁউরুটির লসের সম্ভাবনা সত্ত্বেও ক্লাবের ছেলেরা সবচেয়ে খুশি হয়েছিল। প্যাণ্ডেল, আলো, জেনারেটার, মাছ, মিষ্টি, রান্নার ঠাকুর— সবকিছু ওরাই সবচেয়ে কম খরচে জোগাড় করে ফেলল।

বৃষ্টিজনিত প্রতিশোধের মধ্যে দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।

জামাইবাবুরা ফিরে গেলেও দিদিরা মায়ের একাকীত্ব দূর করার নামে দিনকয়েক থেকে গেল।

সেজদি অষ্টমঙ্গলা করে ফিরে যাবার পর আত্মীয়স্বজনেরা ধীরে ধীরে সকলেই ফিরে গেলেন নিজের নিজের সংসারে।

কিন্তু বড়দি থেকে গেল।

 

সব কথা আমার জানার কথা নয়— কিন্তু সংসারে কত কানাকানি কানে আসে।

বড়দির এই অচলা অবস্থানের কারণটা অচিরেই স্পষ্ট হলো।

বড়দির শ্বশুরবাড়ির পেছনের অংশের লাগোয়া জমিটা নাকি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। জামাইবাবুর ইচ্ছে ঐ জমিটা নিয়ে রাখে। না হলে অপরিচিত কেউ কিনে বাড়ি তৈরি করে ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলবে।

ঐ জমি কেনার জন্য টাকা চাই এবং সে টাকা দিতে হবে বাবাকেই।

বড়দি আর জামাইবাবুর সোজা কথা— সেজোকে বিয়েতে পণ দেওয়া হয়েছে, তাকেও টাকা দিতে হবে!

এই তথ্যটার আঘাত বাবাকে কতটা লেগেছিল জানিনা— কিন্তু আহাম্মকের কাছে এটা ছিল চাবুকের ঝটকার থেকেও বেশি বেদনাবহ।

সেজদির বিয়ের খরচ থেকে যে টাকা আমি বাঁচাতে পেরেছিলাম সে টাকার থেকে বড়দির দাবি ছিল অনেক বেশি। সাত দিন কেটে গেল— মায়ের সঙ্গে বড়দির নিত্য অশান্তি।

কাকা তো হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন আগেই। দোকানের তহবিল থেকে টাকা দেওয়ার কথা বাবা তো তুলতেই পারলেন না।

শেষ পর্যন্ত বিয়ের খরচ থেকে উদ্বৃত্ত টাকাটুকু আর মায়ের গায়ে থাকা দৈনন্দিন গয়নাটুকু ছাড়া বাকি শেষতম সোনাদানা বিক্রি করে বড়দির দাবি পূরণ করতে হলো বাবাকে!

টাকা কত গুরুত্বপূর্ণ, কত কঠিন সত্য— বাবা-মা, পরিবার সম্মান— সবকিছুর ওপরে তুচ্ছ কতগুলো টাকার শক্তি কতটাই বেশি— সেই কথাটা এতকাল সাহিত্য পাঠে জেনেছিলাম। এই প্রথম জানলাম নিজের অব্যবহিত জীবন থেকে।

স্বপ্নভঙ্গ বা জাগরণের শুরুটা কী এত বিবমিষা দিয়ে হতে পারে!

টাকা পেয়ে বড়দি ফিরে গেল।

তৃতীয় আঘাতটা এলো তার অল্পদিনের মধ্যেই।

বাবার শরীর ভাঙছিল।

বিয়ের সব জের মিটবার আগেই ফাইন্যাল পরীক্ষা দিয়ে মেজদা চলে গিয়েছিল বিদেশে। তারপর কাকা অতি দ্রুততার সঙ্গে কীভাবে পরিবারের আয়ের মৌলিক উৎসগুলোকে করায়ত্ত করেছিলেন— তার আভাস আগেই দিতে হয়েছে।

তবু রূপুদার সান্নিধ্যে, দৈনন্দিন অজস্র সাংগঠনিক কাজের মধ্যে স্লান হয়ে আসছিল স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা।

(ক্রমশ)

Leave a Reply