আমাজনের পথে। হেনরি ওয়াল্টার বেটস। পর্ব ৬। অনুবাদে সোমরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমরা যখন পারায় পৌঁছাই, শহরটি তখনও পরপর কয়েকটি বিদ্রোহের অভিঘাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। এই বিদ্রোহগুলির মূল কারণ ছিল স্থানীয় ব্রাজিলীয়দের সঙ্গে পর্তুগিজদের গভীর সংঘাত। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলীয়রা ওখানকার আদিবাসী ও মিশ্রবর্ণের জনগণকেও নিজেদের পক্ষে টেনে নেয়। ১৮১৯ সালে শহরের জনসংখ্যা যেখানে ছিল ২৪,৫০০, এই অস্থিরতার ফলে ১৮৪৮ সালে তা নেমে আসে মাত্র ১৫,০০০-এ। আমাদের আগমনের ১২ বছর আগে থেকে আর কোনো বড় অশান্তি না ঘটলেও মানুষের আস্থা তখনও পুরোপুরি ফিরে আসেনি। বিশেষত পর্তুগিজ বণিক ও ব্যবসায়ীরা শহরের চারপাশে ছায়াঘেরা বাগানের মধ্যে অবস্থিত সুন্দর রোসিনহা বা কান্ট্রি হাউসগুলোতে বসবাস করার সাহস পেতেন না। একসময় যে জমিগুলো চাষের আওতায় ছিল, সেগুলোর ওপর গজিয়ে ওঠা নতুন জঙ্গল বা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার কাজও বহুদিন ধরে বন্ধ ছিল। ফলে শহরতলির প্রায় সব রাস্তার শেষ প্রান্ত আবার বন্য গাছপালায় ছেয়ে গিয়েছিল। সমগ্র শহরের চেহারায় যেন অতীত গৌরবের স্মৃতি লেগে ছিল। রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ, বিশপের বাসভবন, ক্যাথেড্রাল, প্রধান গির্জা ও কনভেন্ট—সবকিছুই এমন বিশালাকার যে বর্তমান শহরের প্রয়োজনের তুলনায় তা অতিরিক্তি বলেই মনে হতো। ইতালীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত বিস্তৃত ব্যক্তিগত বাসভবনে ভরা রাস্তাগুলোও পড়ে ছিল অবহেলিত অবস্থায়। বাড়িগুলোর শরীরের বড় বড় ফাটলে আগাছা ও কচি গাছ গজিয়ে উঠেছিল। শহরের বড় বড় চত্বরগুলোও ভরে গিয়েছিল আগাছায়। নিচু জলাভূমির কারণে সেগুলোর অনেক অংশই যাতায়াতের অযোগ্য হয়ে উঠেছিল। তবু বাণিজ্য আবার ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছিল। আমি দেশ ছাড়ার আগেই শহরের পরিস্থিতির বেশ খানিকটা উন্নতি আমার চোখে পড়েছিল; এই বিবরণের শেষাংশে সেই সম্পর্কে বিস্তারিত বলব।
আমি যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময়ে পারা ছিল ব্রাজিলের বৃহত্তম প্রদেশের রাজধানী। পূর্ব থেকে পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১,৫৬০ মাইল এবং উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ৬০০ মাইল। পরবর্তীকালে, ১৮৫৩ সালে, উচ্চ আমাজন অঞ্চলকে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ হিসেবে গঠন করা হলে এই বিশাল প্রদেশটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়। পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক আমলে এটি একটি কাপিতানিয়া বা গভর্নরশাসিত প্রশাসনিক অঞ্চল ছিল। প্রথমদিকে এই অঞ্চলে ছিল নানা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। বিভিন্ন গোত্রের সামাজিক অবস্থান ভিন্ন হলেও তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যে আমেরিকার আদিম আদিবাসী গোষ্ঠী বা ‘রেড ম্যান’দের সাধারণ বৈশিষ্ট্যই লক্ষ করা যেত। যদিও নিরক্ষীয় অরণ্যে দীর্ঘকাল বসবাসের ফলে সেই বৈশিষ্ট্যে কিছু পরিবর্তন এসেছিল। এইসব গোত্রের অধিকাংশই এখন বিলুপ্ত অথবা বিস্মৃত। বিশেষত প্রধান নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসীদের বংশধরেরা শ্বেতাঙ্গ ও আফ্রিকান অভিবাসীদের সঙ্গে মিশে গেছে। তবে উচ্চ আমাজন অঞ্চল এবং এর অধিকাংশ উপনদীর তীরে এখনও বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের প্রাচীন জীবনযাত্রা বজায় রেখেছে। এই কারণেই ব্রাজিলের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় এই প্রদেশে আদিবাসীদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। মিশ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যেও আদিবাসী রক্তের প্রাধান্য ছিল স্পষ্ট। দক্ষিণ ব্রাজিলের তুলনায় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর অনুপাত এখানে অনেক কম।
পারা শহরটি আমাজন অঞ্চলের প্রবেশবন্দর হিসেবে সম্ভবত সবচেয়ে উপযুক্ত স্থানে প্রতিষ্ঠিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি যে এক বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। প্রধান নদীর উত্তর তীরে হয়তো একটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজধানী গড়ে তোলা সম্ভব হতো, কিন্তু সেখানে জাহাজের চলাচল অনেক বেশি কঠিন। তার উপর, অঞ্চলটি অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। নিরক্ষরেখার এত কাছে (দক্ষিণ অক্ষাংশ ১° ২৮′) অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এখানকার জলবায়ু অতিরিক্ত উষ্ণ নয়। আমার তিন বছরের পর্যবেক্ষণকালে মাত্র একবার তাপমাত্রা ৯৫° ফারেনহাইটে পৌঁছেছিল। দিনের সবচেয়ে গরম সময়, অর্থাৎ দুপুর দুটোর দিকে, তাপমাত্রা সাধারণত ৮৯° থেকে ৯৪° ফারেনহাইটের মধ্যে থাকত। আবার অন্যদিকে, বাতাসের তাপমাত্রা কখনোই ৭৩°-এর নিচে নামত না। ফলে সারা বছরই একইরকম উচ্চ তাপমাত্রা বজায় থাকত। তাপমাত্রার বার্ষিক গড় ছিল প্রায় ৮১° ফারেনহাইট। উত্তর আমেরিকা থেকে আসা বাসিন্দাদের মতে, নিউ ইয়র্ক বা ফিলাডেলফিয়ার গ্রীষ্মের তুলনায় এখানকার গরম অনেক বেশি সহনীয়। বাতাসে আর্দ্রতা অবশ্যই অত্যন্ত বেশি, কিন্তু বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত অন্যান্য অনেক ক্রান্তীয় অঞ্চলের মতো অতটা প্রবল বা একটানা হয় না। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চল স্বাস্থ্যকর জলবায়ুর জন্য সুপরিচিত ছিল। ১৮১৯ সালে গুটিবসন্তের প্রাদুর্ভাব ছাড়া আর কোনো বড় মহামারি এই প্রদেশে দেখা যায়নি। তবে এই রোগ প্রধানত আদিবাসীদের আক্রান্ত করেছিল। আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম এই দেখে যে, রাতের বাতাসে বেরোনো বা নিচু জলাভূমিতে বসবাস করাতেও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঝুঁকি বিশেষ ছিল না। কয়েকজন ইংরেজ এখানে প্রায় বিশ বা তিরিশ বছর ধরে বাস করতেন। তাদের চেহারা এমন সতেজ ছিল যে দেখে মনে হত তারা কখনোই নিজের দেশ ছেড়ে আসেননি।
স্থানীয় মহিলারাও দীর্ঘকাল পর্যন্ত তাদের সৌন্দর্য ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে পারতেন। উত্তর আমেরিকার অনেক অঞ্চলে ব্রাজিলীয় মহিলাদের সম্পর্কে যে অকাল বার্ধক্যের ধারণা প্রচলিত ছিল, পারায় আমি তার কোনো প্রমাণ দেখিনি। ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত, বিশাল নদীর বদ্বীপে, ক্রান্তীয় অঞ্চলের মাঝখানে এবং চারদিক থেকে জলাভূমি দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়া সত্ত্বেও, পারা ছিল আশ্চর্য স্বাস্থ্যকর একটি শহর। তবে এই সৌভাগ্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৮৫০ সালে প্রথমবার এখানে পীতজ্বর (ইয়েলো ফিভার) হানা দেয় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জনসংখ্যার চার শতাংশেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। এরপর একের পর এক মহামারি দেখা দেয়। অবশেষে ১৮৫৫ সালে কলেরা সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। পরবর্তীকালে যদিও জলবায়ুর স্বাস্থ্যকর অবস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসে এবং শহরটি আবার তার পুরোনো সুনাম ফিরে পেতে শুরু করে। তারপর থেকে পারায় এখনও পর্যন্ত কোনও এনডেমিকের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়নি। একসময় নিউ ইয়র্ক ও ম্যাসাচুসেটস থেকেও অসুস্থ ব্যক্তিরা আরোগ্য লাভের আশায় এখানে আসতেন। সুষম তাপমাত্রা, বছরভর চিরসবুজ প্রকৃতি, শুষ্ক ঋতুতে সমুদ্রের জোরালো বাতাসে সূর্যের উত্তাপের খানিক প্রশমন, এবং ঋতুভিত্তিক নিয়ন্ত্রিত বৃষ্টিপাত – সব মিলিয়ে পৃথিবীর অন্যতম আরামদায়ক জলবায়ু বিরাজ করে এই শহরেই।
ব্রাজিল সাম্রাজ্যের অন্যান্য প্রদেশের মতো পারাও ছিল একজন প্রেসিডেন্ট বা প্রাদেশিক প্রধানের শাসনাধীন। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন তিনি সামরিক বাহিনীরও সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তিনি ছাড়াও পুলিশ বিভাগের প্রধান এবং বিচারকরা রিও দে জেনেইরোর কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা নিযুক্ত হতেন। অন্যদিকে, প্রদেশের স্থানীয় ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো জনগণ নির্বাচিত একটি প্রাদেশিক পরিষদ পরিচালনা করত। প্রতিটি ভিলা বা বরোতে নিজস্ব পৌর পরিষদ ছিল। কম জনসংখ্যার অঞ্চলে প্রতি চার বছর অন্তর বাসিন্দারা একজন শান্তিবিচারক (Justice of the Peace) নির্বাচন করতেন, যিনি প্রতিবেশীদের ছোটখাটো বিবাদ নিষ্পত্তি করতেন।
এখানে জনশিক্ষারও একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা ছিল। প্রতিটি গ্রামেই প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল এবং শিক্ষকদের বেতন সরকার দিত। সেই বেতন ছিল বছরে প্রায় সত্তর পাউন্ড, যা স্থানীয় পুরোহিতদের বেতনের সমান। সাধারণ বিদ্যালয়ের পাশাপাশি পারায় একটি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ধ্রুপদি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানও ছিল, যেখানে অধিকাংশ জমিদার ও ব্যবসায়ীরা তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাতেন। প্রদেশটি প্রতি চার বছর অন্তর সংসদের উচ্চ ও নিম্ন কক্ষে নতুন প্রতিনিধিদের পাঠাত। প্রত্যেক গৃহস্বামীর ভোটাধিকার ছিল। জুরি ব্যবস্থাও চালু ছিল, এবং জুরি নির্বাচন করা হতো গৃহস্বামীদের মধ্য থেকে, জাতি বা গাত্রবর্ণ নির্বিশেষে। আমি নিজের চোখে দেখেছি, একজন শ্বেতাঙ্গ ব্যবসায়ী, একজন কৃষ্ণাঙ্গ কৃষক, একজন মামেলুকো, একজন মুলাত্তো এবং একজন আদিবাসী – সবাই একই বেঞ্চে পাশাপাশি বসে বিচারকার্যে অংশ নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে, ব্রাজিলের শাসনব্যবস্থা স্থানীয় স্বশাসন ও কেন্দ্রীভূত প্রশাসনের এক সফল সমন্বয়। জনগণের মধ্যে যদি যথেষ্ট সততা ও প্রজ্ঞা থাকে, তবে এই ব্যবস্থা দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম।
তৎকালীন পারা প্রদেশ, অথবা পরে বিভক্ত হওয়ার পর পারা ও আমাজনস এই দুই প্রদেশ, সব মিলিয়ে প্রায় আট লক্ষ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। অথচ এই বিস্তীর্ণ এলাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র প্রায় দুই লক্ষ ত্রিশ হাজার; অর্থাৎ প্রতি চার বর্গমাইলে গড়ে একজন মানুষেরও কম। সমগ্র অঞ্চল ছিল ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত এবং ক্রান্তীয় অঞ্চলের তুলনায় এই মাটির উর্বরতাও ছিল অত্যন্ত বেশি। অসংখ্য প্রশস্ত ও সুনাব্য নদী সমগ্র ভূখণ্ডের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে। পারার অধিবাসীরা গর্বের সঙ্গে আমাজনকে দক্ষিণ আমেরিকার ভূমধ্যসাগর বলে অভিহিত করেন। এই বিশাল নদী সত্যিই হয়তো সেই উপাধির যোগ্য। কারণ শুধু মূল নদী ও তার প্রধান উপনদীগুলোই নয়, সমগ্র অঞ্চলে অসংখ্য খাল, সরু সংযোগপথ এবং পরস্পর সংযুক্ত হ্রদের বিস্তৃত ব্যবস্থা রয়েছে। এই হ্রদগুলোর কোনোটি পনেরো, কোনোটি কুড়ি, আবার কোনোটি ত্রিশ মাইল পর্যন্ত দীর্ঘ। ফলে সমগ্র আমাজন উপত্যকা সুনাব্য জলপথের এক বিশাল নেটওয়ার্ক দিয়ে সংযুক্ত যা অগণিত শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হয়ে এক মিঠে জলের সমুদ্রের রূপ নিয়েছে। কেবল একটি নদী বললে তার প্রকৃত বিস্তারকে ছোট করে দেখা হয়।
(ক্রমশ)
