কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৪৮। শোভন সরকার

গত পর্বে: দিল্লির সুলতান ও জৌনপুরের শর্কীদের আমলে বারাণসী নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী রইল। এরকমই সময়ে অন্ধকারে দিশা দেখাতে এলেন ভক্তি আন্দোলনের পথিকেরা।

ভক্তি আন্দোলনের মূল কথাই হল দেবতাকে নিয়ম-শৃঙ্খলার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে প্রেম ও ভালোবাসার অঞ্জলিতে উপাসনা করা; জাত-পাতের ব্যক্তিগত সংকোচ কিংবা হোম-যজ্ঞের জটিল প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মাঝে দেবতার খোঁজ পাওয়া। মধ্যযুগে যখন সাধারণ মানুষ দেবতার স্পর্শ না পেয়ে হতাশার অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছিল, তেমনই এক সময়ে বারাণসীতে রামানন্দ নিয়ে এলেন ভক্তিরসের স্রোত। বারাণসীতে বিদ্যাচর্চার জন্য এসে এই ব্রাহ্মণ বুঝতে পারেন ধর্মের বোঝা মানুষের চলার পথ সহজ করার বদলে কঠিনতর করে তুলেছে। কোনো কঠিন রূপক নয়, বরং দৈনন্দিন জীবন-যাপনের মধ্যে তাঁর উপাস্য দেবতা রামকে তিনি খুঁজে পেলেন। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি জাতের তোয়াক্কা না করে, গোঁড়া ব্রাহ্মণদের রক্তচক্ষুর সামনে বসেই নানা বর্ণের সাধারণ মানুষের সাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করলেন। ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণের ভূমিকাকে অস্বীকার করলেন। দুর্বোধ্য সংস্কৃত বুলি না আউড়ে অবধি, ভোজপুরির মতো নিত্যদিনের ভাষাকে তুলে নিয়ে এলেন মন্দিরের অলিন্দে। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে তাদের ভাষাতেই ঈশ্বরকে প্রেম নিবেদন করতে শেখালেন।  

তাঁরই প্রেমের ভাষার অনুরণনে উচ্চকণ্ঠে ধর্মাধর্মের বাইরে আসার গান গেয়ে শোনালেন কবীর ও রবিদাসের মতো যোগ্য উত্তরসূরীরা। তাঁতের ছন্দে কাপড় বুনতে বুনতে কত গভীর কথা কত সহজেই বলে চলতেন কবীরদাস। নির্গুণ অর্থাৎ নিরাকার ঈশ্বরতত্ত্বে বিশ্বাসী কবীরের কথা লিখতে গিয়ে ডঃ মোতিচন্দ্র বলছেন, ‘হিন্দু কিংবা মুসলিম যেই হোক না কেন, তিনি তো সমস্ত বাহ্যাচারের ঘোর বিরোধী ছিলেন। সমঝোতা করা তাঁর প্রকৃতিতে ছিল না। উনি তো সেইসব জাতি, কুল, সংস্কার বা সম্প্রদায়গত ভেদ-ভাবনাকে ভেঙে ফেলে এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে সকল মানুষ এক এবং প্রেমের ভাষাই পথের সাথী।’

রামানন্দের আরও এক অন্ত্যজ শ্রেণীর শিষ্য ছিলেন রবিদাস। জাতে মুচি, সমাজের দৃষ্টিতে তিনি অস্পৃশ্য। কিন্তু কবীরের মতো রবিদাসও এই সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন নিজের জীবনচর্যার মাধ্যমে। তাঁর সহজ-সরল বাণী বহু মানুষকে আধ্যাত্মিক আশ্রয় দিয়েছিল। রবিদাসের বেশ কিছু পদ্য শিখদের পবিত্র গ্রন্থ ‘গুরু গ্রন্থ সাহিব’-এ আজও পড়া হয় ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে। তাঁর ভাষায়, ঈশ্বর সকলের মধ্যে বাস করেন, কোনো ভেদ করেন না। পবিত্র মনেই ঈশ্বরের প্রকৃত আসন — ‘মন চাঙ্গা তো কঠৌতি মেঁ গঙ্গা’ (মন পবিত্র হলে গঙ্গা সর্বত্রই বিরাজমানা)। 

বারাণসীতে রবিদাস কত জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয় বিএইচইউ-তে পড়ার সময়। সেদিন ছিল রবিদাস জয়ন্তী। হস্টেলের ছেলেদের কাছে শুনলাম আমাদের ক্যাম্পাসের সীর গেটের বাইরে ‘মেলা’ লেগেছে। তার চেয়েও বড় কথা ওখানে নাকি লঙ্গরের ব্যবস্থা থাকে। হস্টেল মেস ছাড়া তখন যে কোনো খাবারই আমাদের কাছে প্রিয়। বেশ ইচ্ছে হল সেখানে যাওয়ার। কয়েকজন বন্ধু মিলে সেই শীতের সন্ধ্যায় পায়ে হেঁটেই চললাম আমাদের ক্যাম্পাসের সীর গেটের দিকে। এতো বড় ক্যাম্পাস, এদিকটায় দিনের বেলাতেও কখনও আসার সুযোগ হয়নি। ঠাণ্ডায় অন্ধকারে চলতে চলতে সত্যিই আমাদের নিজেদের বোধবুদ্ধি নিয়ে সন্দেহ হতে লাগল। বেরিয়ে যখন পড়েছি, আর ফিরি কেন! সীর গেট দিয়ে বেরিয়ে যে এলাকায় এসে পড়ি তার নাম সীর গোবর্ধনপুর — এখানেই মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা সন্ত রবিদাসের জন্ম। জন্মস্থানে এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে সুবিশাল এক সাদা রঙের মন্দির। দূর থেকেই আলো দিয়ে সাজানো সোনালী চূড়ার মন্দিরটি দেখে বিস্ময় জাগে। নানা চেহারার কত মানুষ নানা বাহারের পোশাক পরে এসে ভিড় করেছে! দূর-দূরান্ত থেকে এসেছে তারা। মেলাও বসেছে জমজমাট। খাবার-দাবার তো আছেই, আছে দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র। 

মেলায় পৌঁছে প্রথমে লঙ্গরের ব্যবস্থার খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হলাম। এখানে বিনা পয়সায় সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ একসারিতে বসে খাবার পায় — খিদের সামনে আবার জাত-পাত-ধর্ম! ভেবেই রেখেছিলাম যে আমরাও আজ খালি পেটে ফিরব না। কিন্তু তার আগে মেলা ঘুরে দেখি বরং। এক ভিড়ের জটলা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে দেখলাম। রবিদাসের ‘ঝাঁকি’ অর্থাৎ শোভাযাত্রা বেরিয়েছে। আলোয় সাজানো এক রথের উপর রবিদাসের মূর্তি, তাকে ঘিরে নানা বাহারের পোশাক পরা ভক্তের দল ভজন-কীর্তন করছে, নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে অসি হাতে নাচ করছে। সে দেখবার মতো এক দৃশ্য বটে! কয়েকশো’ বছর আগে দলিত শ্রেণীর একজন মানুষ কত মানুষকে বছরের পর বছর ধরে তাঁর পদ্যের ছন্দে মোহিত করে রেখেছে — তা দেখে অবাক হই। বলা হয় যে কৃষ্ণভক্ত মীরাবাইও সন্ত রবিদাসের আধ্যাত্মিক দীপ্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন। বারাণসীতে এখনও যখন জাত-পাতের ভিত্তিতে ভিন্নতা পীড়ার কারণ হয়, তখন তার মাঝে এই আলোর ঝাঁকি দেখে খানিকটা ভরসা হয়। রবিদাস সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এক ইউটোপিয়া ‘বেগমপুর’-এর কল্পনা করেছিলেন। ‘বেগম’ অর্থাৎ দুঃখহীন। তাঁর কল্পনার বেগমপুরে কোনো দুঃখ-পীড়া, সামাজিক ভেদাভেদ নেই, শাসকের অত্যাচারে মানুষ জর্জরিত হয়না। সেদিন শীতের রাতে বহু মানুষের ভক্তি ও প্রেমের আনন্দধারায় বুঝি সেই বেগমপুরেরই এক স্পর্শ পেয়ে মন ভরে উঠল। 

লঙ্গরে সবার সাথে ভিড়ের মধ্যে সুদীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে শালপাতা হাতে করে খাবার নিলাম। পেট ভরে খাওয়ালো। মনের খুশিতে সবাই সেবা দিচ্ছে আর সেবা নিচ্ছে। খাবারের তালিকায় ঠিক কী কী ছিল সেদিন তা মনে নেই আজ আর, কিন্তু রয়ে গেছে এক তৃপ্তির ভাব। 

পঞ্চদশ শতাব্দীর আরও এক গুরুত্বপূর্ণ সমাজ-সংস্কারক ছিলেন বল্লভাচার্য। বাল্যকাল মথুরায় কাটলেও তিনি অল্প বয়সেই বারাণসীতে চলে আসেন এবং এখানেই থেকে যান। রামানুজ ও শঙ্করাচার্যের মতবাদ থেকে সরে এসে তাঁর প্রবর্তিত শুদ্ধাদ্বৈতবাদ তথা পুষ্টিমার্গে ভক্তিই প্রধান হয়ে ওঠে। আজ এতকাল পরেও তাঁর দেখানো পথে বহু কৃষ্ণভক্ত নিজেদের মুক্তির সন্ধান পান। 

সময় থেমে থাকে না, থেকে যায় কিছু স্মৃতি আর ইতিহাস। লোদী বংশের পতনের পর বাবরের আগমনের সাথে সাথে বারাণসীর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হল। ১৫২৯ সালের মধ্যে চুনার সহ বারাণসী বাবরের অধিকারে চলে আসে। ১৫৩০ সালে তাঁর মৃত্যু হলে পুত্র হুমায়ুন দিল্লির সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তাঁর সময়ে শের খাঁ বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। চুনার দুর্গের অধিকার নিয়ে বেশ কিছু সময় ধরে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে। বহু টানাপোড়েনের পর হুমায়ুনকে হারিয়ে শের খাঁ ‘শাহ’ উপাধি নিয়ে তিনি বারাণসী সহ প্রায় সমগ্র উত্তর ভারত নিজের দখলে নিয়ে নেন। তাঁর পুত্র ইসলাম শাহের মৃত্যুর পরবর্তী বেশ কয়েক বছর বারাণসী অস্থির সময়ের মধ্যে কাটায়। প্রথম দিকে বারাণসীর পরিস্থিতি নিয়ে সামান্য বেগ পেলেও শেষ অবধি মুঘল সম্রাট আকবরের হস্তক্ষেপে অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়। 

আকবর নানা কারণে বেশ কয়েকবার বারাণসীতে আসেন এবং থাকেন। তাঁরই উৎসাহে মন্ত্রী মান সিংহ ও টোডরমল এখানে বেশ কিছু কীর্তি রেখে যান যা আজও আকবরের দূরদর্শিতা ও ধর্মীয় সহনশীলতার পরিচয় দেয়। আকবরের এই দুই রাজপুত মন্ত্রীর উদ্যোগে বেশ কিছু ঘাট কিংবা মন্দিরের সংস্কার ও নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। মনে করা হয়, এই সময়েই টোডরমলের সহায়তায় এবং বিশিষ্ট পণ্ডিত ও ‘ত্রিস্থলিসেতু’ গ্রন্থের রচয়িতা নারায়ণ ভট্টের প্রচেষ্টায় বারাণসীর ইতিহাসে তৃতীয় বারের জন্য নতুন করে বিশ্বেশ্বর বা বিশ্বনাথ মন্দির নির্মাণ করা হয়। 

সম্রাট আকবরের সময়েই আজকের তুলসী ঘাটে এক উজ্জ্বল তারার মতো উদিত হন তুলসীদাস। কবীর বা রবিদাসের থেকে তাঁর ভক্তিধারা পৃথক ছিল। তাঁর রচনায় ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠত্বকেই একরকম মুখ্য করে তোলা হয়। তিনি স্থানীয় ভাষায় লিখলেন ‘রামচরিতমানস’, রামকে পৌঁছে দিলেন সাধারণ মানুষের দরবারে। তিনি দেবতাকে মনুষ্যত্ব প্রদান করলেন — তাঁরা স্বর্গ বা মন্দির নয়, বরং সাধারণ মানুষের মাঝে এসে তাদের সাথে এক পংক্তিতে ধূলো-কাদা মেখে অশ্রু বিসর্জন করলেন। দেবত্ব নয়, ভেদাভেদ নয়, মনুষ্যত্বই প্রধান হয়ে উঠল। ‘রামচরিতমানস’-এর মাধ্যমে তুলসীদাস বারাণসীর অলিতে-গলিতে ভক্তি আন্দোলনের যে রসধারা সকলের জন্য বইয়ে দিলেন, সে ধারা আজও বহমান। 

সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল বারাণসীতে সর্বপ্রথম এক ইংরেজ পর্যটকের পদার্পণ। রালফ ফিচ। তাঁর বর্ণনা সমকালীন বারাণসীর সামাজিক ও ধার্মিক আচার-আচরণের এক বিশ্বাসযোগ্য ছবি তুলে ধরে — চোখের সামনে বারাণসীর ঘাট জীবন্ত হয়ে ওঠে। ফিচের লেখা পড়তে পড়তে আমার একটুও মনে হয়নি যে তাঁর বর্ণনার বারাণসীকে আমি চিনি না — বরং দেখি সেদিনের সাথে আজও কত মিল!

(ক্রমশ)

প্রথম অধ্যায় কালভৈরবের সন্ধানে প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায় ঘাটে ঘাটে প্রথম পর্ব

তৃতীয় অধ্যায় ফিরে দেখতে যাওয়া প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Leave a Reply