চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর

গত পর্বের পর

এই অঞ্চলের সুপরিচিত পার্টি নেতারা সকলেই তখন হয় নানা ধরনের আইনের খপ্পরে বিনাবিচারে জেলে বা সন্ত্রাসের কারণে এলাকা ছাড়া। বুলু গুহ তো কোনো নেতা-টেতা নন— পার্টির নিন্মস্তরের সর্বক্ষণের কর্মী। পার্টি অফিসটাকে সাফ রাখা, চারপাশের লাগামহীন সন্ত্রাসে ঘরছাড়া ও এই অফিসে আশ্রয় নেওয়া পার্টি নেতাদের ফাই-ফরমাস খাটা সেখানে চা করা, রান্নাবান্না করা— এইসব ম্যানেজ করার দায়-দায়িত্ব ছিল বুলু গুহর ওপর। রান্নাবান্নাই বা কী— প্রতিদিন পার্টি সমর্থক বা দরদীদের দেওয়া পাঁচমিশালি চালের ভাত, ডাল আর আলুসেদ্ধ! প্রতিদিন ডালও জুটতো না— চালে টান পড়লে আলুসেদ্ধ দিয়ে ফ্যানাভাত কিংবা ফ্যান দিয়ে মেখে আলুসেদ্ধ মুখে দিয়ে খাওয়া। এক ফোঁটা সরষের তেল, কাঁচা পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কার তখন নিদারুণ কদর।

বুলু গুহকে কেউ কোনোদিন বক্তৃতা করতে দেখেনি, কোথাও মাতব্বরি করতেও নয়। কথা বলতেন কম— তার জায়গায় মুচকি হাসি দিয়ে সবকিছু ম্যানেজ করতেন!

ফলে বুলু গুহকে শাসক, উগ্র পার্টি-বিরোধী অতিবাম বা প্রশাসন— কেউ-ই বিশেষ পাত্তা দিত না।

মূল নেতৃত্বকে জেলে পুরে ফেলার পরে সেই কারণে পুলিশ বা প্রশাসন সে-সময় কোণঠাসা পার্টিকে নিয়ে বিশেষ মাথাও ঘামাত না।

মাঝে মাঝে নিজেদের বাগানের সেই টিনের ঘরে আহাম্মকের মায়ের ভাঁড়ার থেকে ঝাঁপি করা নাড়ু খেতে খেতে রূপুদা আমাকে প্রতিযুগ পত্রিকা পড়িয়ে যেত। বলেছিল— ‘পার্টির কাজ কিন্তু প্রতিদিন গোপনে গোপনে হয়ে চলেছে। প্রশাসন আর ওরা ভাবে সব শেষ করে দিইচি! — কিন্তু জানবি কমিউনিস্ট পার্টিকে শেষ করা অত সহজ নয়। এই বুলুদাকে দেখলে বুঝবি না যে, বুলু গুহ কতটা পড়াশুনো করা রাজনৈতিক পণ্ডিত লোক। এমন কত লোক আছেন, যাঁরা কিনা সারাটা জীবন, পৈতৃক সম্পত্তি, বিরাট ভবিষ্যৎ ভোগসুখ সব ছেড়ে, শতেক কষ্ট সহ্য করে পার্টির কাজ করছেন!’

‘এমন কত লোকে’র দলে রূপুদা যে নিজেকেও রেখে দিয়েছিল তাতে আহাম্মকের কোনো সন্দেহ ছিল না।

রুশ লেখক আলেকজাণ্ডার পুশকিনের রচনা, ফিওদর দস্তয়েভক্স্কির ‘দি পুয়োর পিপল’, ‘দি ফ্রেণ্ড অব দি ফ্যামিলি’, ‘দি ইডিয়ট’, ‘এ লিটল হিরো’ ইত্যাকার গ্রন্থ— ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’, ‘আমার ছেলেবেলা’, ‘পৃথিবীর পাঠশালা’,— জন রীডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’,— আন্তন চেকভের ছোটোরল্প সংকলন কিংবা চিনা লেখক লু সুনের ‘আ কিউ’-এর মতো বই রূপুদাই আহাম্মককে পড়িয়েছিল। এক গ্রীষ্মের কাঠফাটা দুপুরে এনে দিয়েছিল চে গুয়েভারার ডায়েরি বইটা। লাল রঙের ওপরে কালো দিয়ে চে-এর মুখের স্টেনসিল পোর্ট্রেট। সে এসব বই নিজের হাতখরচের টাকা থেকে নির্মলবাবুকে দিয়ে আনাত।

এর আগেই শহরের সাধারণ লাইব্রেরি থেকে নিয়ে নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ উপন্যাসটি আহাম্মকের পড়া হয়ে গিয়েছিল। পার্টি অফিসটি যে বাড়িটিতে ছিল সেই বাড়িটা ভাঙাচোরা, প্রায় পোড়ো বাড়ির মতো হলেও তারই একটি ঘরে একটা ছোটো লাইব্রেরির মতো ছিল।

ভাঙাচোরা প্রাচীন অফিসবাড়ির সবচেয়ে মনুষ্যবাসের ঘরটায় দুটো বড়ো বড়ো আলমারি আর একটা লম্বা শো-কেসে ঠাসা বই। সকালে অফিস ঝাঁটপাট দিতে আসা মিলারা বেওয়া, ঘরের ফাটা মেঝেতে চলা পিঁপড়ের সারি আর বুলু গুহ ছাড়া এই ঘরে কস্মিনকালেও কেউ ঢুকত না। বিকাল বা সন্ধে নাগাদ যে কর্মীরা অফিসে আসতেন তাদের কাউকে ওই ঘরে উঁকি মারতে দেখা যেত না। বুলু গুহ প্রায় প্রতিদিন আলমারি খুলে বইপত্রগুলো নেড়েচেড়ে রাখতেন। ডেলিপ্যাসেঞ্জার নির্মলবাবুকে দিয়ে কলকাতা থেকে কিছু কিছু বই আনাতেনও।

 

বুলু গুহর মাধ্যমে রূপুদা সেখান থেকেও বই এনে পড়ত এবং আহাম্মককেও নাড়ু কিংবা আচারের বিনিময়ে পড়তে দিত।— এখান থেকেই বুলুদার দেওয়া আন্তন মাকারেঙ্কোর ‘জীবনজয়ের পথে’ বইটির সমস্ত খণ্ড, আলেক্সেই টলস্টয়ের সোভিয়েত যুগের গল্প-সংকলনের বাংলা অনুবাদ ইত্যাদি  রূপুদার হাত ঘুরে আহাম্মকের হাতে এসেছিল। এই বইতেই ছিল বিখ্যাত ‘রুশ চরিত্র’ গল্পটি— যেখানে সৈনিক, লেফটেন্যান্ট  ইয়েগর দ্রিওমভ যুদ্ধধ্বস্ত তার বিকৃত মুখ নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল লেফটেন্যান্ট গ্রমভের ছদ্ম-পরিচয়ে। সে দেখতে চেয়েছিল এই বিকৃত চেহারায় বাবা, মা এবং তার বাগদত্তা কাতিয়াসহ স্বজনেরা তাকে আদৌ চিনতে এবং গ্রহণ করতে পারেন কী-না।

যুদ্ধ-পরবর্তী চিকিৎসা শুধু তার মুখটাকেই কদাকার করেনি, কণ্ঠস্বরও দিয়েছিল বদলে। তার গলা শুনে মা মারিয়া পলিকর্পভনা কিংবা বাবা ইয়েগর ইয়েগরভিচ প্রথমে তাকে চিনতে পারেননি। ভেতরে ভেতরে অনুমানে, শোণিত স্রোতের আত্মসাক্ষ্যে উদ্বেলিত হলেও মা-বাবা কেউই সেটা মুখে বলতে পারেননি। যখন দ্রিওমভের বিকৃত মুখমণ্ডল দেখে ভয়ের চিহ্ন ফুটে উঠল বাগদত্তা কাতিয়ার মুখে তখন রুশ বীরের অন্তঃকরণে শূন্যতা ছেয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গেই সে কাউকে নিজের পরিচয় না দিয়েই ফ্রন্টে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

ফ্রন্টে ফিরে আসার পর মা চিঠিতে লিখলেন— ‘খালি মনে হয় তুমিই এসেছিলে।……স্টোভের ওপর বিছানায় রাত কাটিয়েছিল লোকটি, ঘুমোনোর সময় ওর কোটটা ঝাড়তে বাইরে নিয়ে গিয়ে তাতে মুখ চেপে ধরে কত কেঁদেছিলাম— এ ইয়েগরেরই, কোটটা তারই! … ইয়েগরুশ্্কা, আদরের বাছা আমার, ভগবানের দোহাই, লিখবে তো ব্যাপারটা কী? কিংবা হয়তো সত্যিই আমার মাথার ঠিক নেই …’

এই চিঠি পেয়ে লেফটেন্যান্ট দ্রিওমভ দ্বিতীয়বারের জন্য বাড়িতে ফিরল। বাবা-মায়ের সজল আলিঙ্গনে ধরা পড়ল সে। আর সুন্দরী কাতিয়া তার সোনালি চুলের সোনালি আলো ছড়িয়ে যুদ্ধের দেবতার মতো দেখতে দ্রিওমভের সঙ্গে সারা জীবন জড়িয়ে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করল।— এই হলো ‘রুশ চরিত্র’। রুশ চরিত্রের অন্তর্নিহিত এই বিরাট শক্তিই ফ্যাসিস্ট জার্মানিকে পরাজিত করেছিল।

গল্পটি দৈহিক নয়, মানবিক সৌন্দর্যের বার্তায় শেষ হয়।

আলেক্সেই টলস্টয়ের লেখা অসামান্য গল্পগুলি নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ইস্পাতের মতোই আহাম্মককে বিমোহিত করেছিল।

তখনও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়নি। মস্কোর প্রগতি প্রকাশন রুশ লেখকদের বইগুলির ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ প্রকাশ করত। বইগুলোর ছাপা কাগজ বাঁধাইয়ের মান ছিল দারুণ। গ্লসি হোয়াইট প্রিন্টে ছাপা বইগুলি ওজনে ছিল অত্যন্ত ভারি। রুশ সাহিত্যের বইয়ের প্রচারের জন্য প্রথমে প্রগতি, পরে রাদুগা প্রকাশন সম্ভবত সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের ভর্তুকিপুষ্ট প্রকাশনা ছিল বলেই বইগুলোর দাম ছিল অত্যন্ত কম। বড়ো মাপের আদ্যন্ত রঙিন সোভিয়েত দেশ পত্রিকাটিও কম আকর্ষণীয় ছিল না। বুলু গুহর আগলে রাখা পার্টি অফিসের গ্রন্থাগারে রুশ উপকথা ও লোককথার নানান সংকলনও মজুত থাকত। সেগুলিও অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।

আমাদের পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ, বিক্রম ও বেতাল, কথাসরিৎসাগর, রূপকথার সংকলন, ঈশপের গল্প ইত্যাদি তো পড়াই ছিল— এবার রুশ লোককথাগুলো পাঠ করে দেশ দেশে প্রচলিত লোককথার মধ্যে নিহিত কঠিন সামাজিক ও যাপনগত সত্যের সন্ধান পাওয়া গেল— ‘হার্ড অ্যান্ড হার্ডার ট্রুথ’।

আহাম্মকের ‘ক’ অক্ষরে না পৌঁছতে পারার এই বিবৃতিমূলক কথনও যেন ক্রমান্বয়ে সেই হার্ড থেকে হার্ডার ট্রুথের রক্তক্ষরণেরই ইতিবৃত্তে পরিণত হতে থাকে!

হচ্ছিল সেই সময়ের সোভিয়েত বইয়ের কথা।

তখন হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইনের ট্রেনে একজন মাত্র হকার— পরমেশ ভৌমিক বইয়ের ভারি কাঁধ-ব্যাগ টেনে টেনে রুশ বই বিক্রি করতেন। বইগুলোর দামই এত কম ছিল যে তার আবার কমিশন কতটুকু ছিল— তা সহজেই অনুমেয়!

 

সোভিয়েত বইয়ের হকার হিসেবে পরমেশ ভৌমিক এতই পরিচিত ছিলেন যে, তাঁর নাম সকলেই জানত। তাঁর পরিচিতির একটা বড়ো কারণ ছিল তাঁর বাঁ-হাতটা ছিল কনুই থেকে কাটা। সোদপুরের দিকে কোনো কারখানায় কাজ করতেন, মেশিনের দুর্ঘটনায় হাত গিয়েছিল কাটা। বামপন্থী শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ছিলেন বলে কারখানা থেকে যে সামান্য প্রাপ্য- পাওনা, তা আদায় করতেও তাঁর হয়রানি হয়েছিল প্রচুর। পরে সেই এক হাত নিয়েই অমন ভারি ভারি ব্যাগ টেনে তিনি হকারি করতেন!

আসলে এই বই বিক্রি করাটাকেও পরমেশ পার্টির কাজ বলে মনে করতেন।

ডেলি প্যাসেঞ্জার নির্মলবাবু কলকাতার বড়োবাজার, চিনাবাজার, বাগড়ি মার্কেট, কলেজ স্ট্রীট, কোলে মার্কেট ঘুরে ঘুরে শহরের দোকানদারদের অর্ডারমাফিক নানা মাল কিনতেন। তারপর বস্তার থেকেও বড়ো দুটো ঢাউস ব্যাগে মাল সাজিয়ে হাওড়া থেকে ট্রেনের ভেণ্ডার কম্পার্টমেন্টে চাপতেন। তার মধ্যেও তিনি ট্রেনে পরমেশ ভৌমিকের কাছ থেকেই রূপুদা আর বুলু গুহর জন্য বই কিনতেন, বইগুলো, স্টেশনে কোনো কমরেডের পৌঁছে দেয়া পত্র-পত্রিকা, পার্টির কাগজপত্র ব্যাগের জিনিসপত্রের তলার দিকে চালান করতেন।

পরে আহাম্মক ভেবে দেখেছে— বই নিয়ে ভেণ্ডার কম্পার্টমেন্টে কেন উঠতেন পরমেশ ভৌমিক! ভেণ্ডার কম্পার্টমেন্টে বই কিনবে কে! আসলে নির্মলবাবুর সঙ্গে কথা বলবার জন্যই তিনি ভেণ্ডারে উঠতেন। আর নির্মলবাবুই বা পার্টির কাগজপত্র বা রূপুদার জন্য বই টেনে আনতেন কেন? তিন হাত ঘোরা সস্তার বই থেকে ক-পয়সা লাভের জন্য নিশ্চয়ই নয়!

এসব চরিত্র নিয়ে প্রচুর ধাঁধা ছিল।

মার্কেজের ঐ ডাক্তারবাবুই বা কেন পেশাগত সফলতা ছেড়ে এক সামরিকশাসিত মফস্বল শহরে পড়ে ছিলেন? প্রতিরোধ যুদ্ধে নিহত পরিচয়বিহীন বিপ্লবী অগাস্টিনের মা, বা কর্নেলের স্ত্রীকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করার কিংবা   সেন্সরবিহীন খবর এবং গোপন ইশতেহার পৌঁছে দেওয়ার কোন দায় ছিল তাঁর!

 

গাব্রিয়েল মার্কেজ কর্নেলের নিহত পুত্রের কমরেডদের কাছে সেন্সরবিহীন নিষিদ্ধ খবর আর গোপন ইশতেহার পৌঁছে দেওয়াকে বিনা রোমাঞ্চে হাজির করেছেন।

কিন্তু মানুষের ইতিহাসে নির্মলবাবু, পরমেশ ভৌমিক, বুলু গুহ বা আমাদের ন্যালাখ্যাপা রূপুদাদের মতো দেশি চরিত্রের কথা কেউ কোথাও  লিখে রাখে না। সাংগঠনিক স্বীকৃতিতেও তা ধরা থাকে না।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply