রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ৩০। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

যখন এই প্রশ্নটা সামনে এল যে ইউরোপীয়দের এদেশে জমি রাখার অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সরকার তখন বিভিন্ন প্রভিন্সের ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য নির্দেশনামা জারী করলেন। সেই নির্দেশনামায় তাদেরকে বলতে বললেন, “জমির ওপরে নীলকর ও তাদের কর্মচারীদের আইনী অধিকার আরও মজবুত করার জন্য ইউরোপীয়দের এদেশে জমি নিজেদের দখলে রাখাটা জরুরী কি না। আর এ বিষয়ে বর্তমানে আইনে যে সমস্ত ধারা-উপধারা রয়েছে, সেগুলোর কোনওটার কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন কি না।” এছাড়া সরকার বাহাদুরের রাজত্বে ইউরোপীয় নীলকরদের সাধারণ আচরণ বা চরিত্র কেমন, তারা তাদের চারপাশের স্থানীয় মানুষজনের সাথে কী রকম লেনদেন করে বা তাদের সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করে, সে বিষয়েও তথ্য চেয়ে পাঠানো হয়।

সত্যি কথা বলতে কি, এই সময় পর্যন্ত, মানে আজ থেকে মোটামুটি চব্বিশ বছর আগে পর্যন্ত এদেশে নীলকর সাহেবদের আচার-আচরণ সম্পর্কে খুব একটা ভালো চিত্র আঁকা হয়নি। আর অনেক ক্ষেত্রেই, সন্দেহ নেই, তার যথেষ্ট সঙ্গত কারণ রয়েছে। তখন যারা এই সমস্ত কারখানার দায়িত্বে ছিল তারা আজ যারা দায়িত্বে আছে তাদের থেকে একেবারেই এক ভিন্ন শ্রেণীর মানুষ ছিল বলেই আমার বিশ্বাস। আর খারাপ আচরণ সবসময়েই ভালো আচরণের থেকে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। অতএব, যেভাবে, “মানুষ যা খারাপ করে, তা তার পরও রয়ে যায়/ যা সে ভালো করে তা হাড়ের স্তুপে চাপা পড়ে যায়” (৭), ঠিক সেভাবে সমগ্র চিত্রের খারাপ দিকটাই বেশী পরিচিতি লাভ করে। অবশ্যই আরও বেশী করে পরিচিতি পাওয়া উচিৎ, তা না হলে ত্রুটিগুলো সংশোধন হবে কী করে! সরকারী এনকোয়্যারিতে এরকম অসংখ্য রিপোর্ট বেরিয়ে এসেছে, তার থেকে কয়েকটা বেছে নিলেও একখানা বই হয়ে যাবে। সেখানে শুধু নীলকরদের আচরণের কথাই বলা আছে তা নয়, নীলচাষ এদেশের মানুষের কোন কাজে আসছে, এই প্রশ্নও তোলা হয়েছে। সেই সব রিপোর্টে বিভিন্ন রকমের মতামত প্রকাশ করা হয়েছে। একদিকে বলা হয়েছে, কৃষকের পক্ষে যত নীল উৎপাদন করা সম্ভব, সবটুকু ন্যুনতম মূল্যে নিজের দখলে নেওয়ার জন্য এরা নানারকম অনৈতিক উপায় অবলম্বন করে থাকে, রায়তের সঙ্গে চুড়ান্ত দরাদরি করা থেকে শুরু করে তাদের প্রয়োজনীয়তা দুর্বলতা লোভ ইত্যাদির সুযোগ নেওয়া, রায়তকে বাধ্য করা নীলচুক্তির আওতায় আসতে আর একবার এসে গেলে সারাজীবনেও তাকে এর বাইরে বেরোতে না দেওয়া ইত্যাদি। তার ওপরে রয়েছে আমলা বা নীলকুঠীর কর্মচারীদের অত্যাচার ও শোষনের নানা অভিযোগ, সেগুলো যেমন তিক্ত, তেমনি সত্যও বটে।[1] অন্যদিকে দেশীয় মানুষজনের মধ্যে প্ল্যান্টাররা সম্মানের উচ্চস্থানে আসীন হয়ে রয়েছে। দেশীয় মানুষদের পারিবারিক বা প্রতিবেশীর সঙ্গে বিবাদ মেটাতে হামেশাই তার ডাক পড়ে। এছাড়া অসুস্থকে ওষুধ দেওয়া, যারা সমস্যায় পড়েছে তাদের পরামর্শ দেওয়া, কারোর পরিবারে কোনও উৎসব অনুষ্ঠান হল, তাকে অর্থসাহায্য করা, তা না হলে সে গোটা জীবনের মত মহাজনের খপ্পরে গিয়ে পড়বে, তার ওপর আশেপাশের দরিদ্র প্রতিবেশীর দরকারে অদরকারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া তো আছেই। এতে করে তার ব্রিটিশ হিসেবে সুনাম ছড়িয়ে পড়া ইত্যাদিও হয়ে থাকে। নীলচাষ সংক্রান্ত রিপোর্টেই দেখা যাচ্ছে এদেশের মানুষ নীলচাষ বা নীলকরকে ঘৃণা করবে না কি পছন্দ করবে সেটা জায়গা অনুযায়ী আলাদা আলাদা হয়। এদিকে আমাদের বলা হচ্ছে, “গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিলের পয়লা জানুয়ারি ১৮৩০-র কর সংক্রান্ত চিঠিতে এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া আছে যেখানে দেখা যাচ্ছে রায়তরা নীলকরকে রাজী করিয়ে তাদের এলাকায় বসত করানোর জন্য মাথা কুটে মরছে”— ওদিকে অন্য অন্য জায়গায় দেখা যাচ্ছে রায়তরা এর সম্পুর্ণ বিরোধী।

যদি সত্যি মতামত প্রকাশ করতেই হয়, তাহলে আমি বড়জোর সেইসব দেশীয় মানুষদের লেখা থেকে নমুনা তুলে আনতে পারব যারা তাদের স্বদেশবাসীর প্রতি কিছুটা হলেও সহানুভূতিশীল। দেশীয় ভদ্রলোকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান ও বিশ্বাসযোগ্য হলেন মাননীয় শ্রী রামমোহন রায় মহাশয়। এঁর কথা তোমাদের মনে থাকবে। ইনি ইংল্যান্ডে গেছিলেন ও সেখানেই মারা যান। এঁর মতে, এঁর স্মরণকালের মধ্যে চাষীদের অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি, বরং চারপাশের ছবিটা বিষন্নতার এবং হতাশারই বটে। একমাত্র ব্যাতিক্রম যে সমস্ত চাষীরা নীলচাষের সঙ্গে যুক্ত আছে, তারা। তিনি বলছেন,   “নীলকর সাহেবদের ব্যাপারে আমি বলতে চাই, আমি বাংলা ও বিহারের বেশ কিছু জেলায় ভ্রমণ করেছি। আমি লক্ষ্য করেছি, যে সমস্ত দেশীয় লোকেরা নীলচাষের এলাকার কাছাকাছি বাস করে, তাদের পোশাক আশাক যে সমস্ত দেশি লোক নীলচাষের এলাকা থেকে দূরে বাস করে তাদের থেকে লক্ষ্যনীয়ভাবে ভালো। হয়ত টুকটাক কিছু ক্ষতি নীলকর সাহেবরা করেছে, কিন্তু সামগ্রিক ভাবে দেখতে গেলে তারা এদেশের সাধারণ মানুষের যতটা উপকার করেছে ততটা উপকার ইউরোপের কোনও শ্রেণীর মানুষ করতে পারে নি, তা সে তারা উঁচু পদে চাকরি করুক বা না করুক।”

দ্বারকনাথ ঠাকুর আর একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান দেশীয় মানুষ। তিনি একজন খুঁটিয়ে সবকিছু লক্ষ্য করার মানুষও বটেন। তিনিও বলছেন, “আমি বলতে চাই, বিভিন্ন জেলায় আমার বেশ কিছু জমিদারী রয়েছে। আমি দেখেছি, কোথাও নীলের চাষ হলে বা কোনও এলাকায় ইউরোপীয় মানুষ বসবাস করলে সেখানকার সমাজ সামগ্রিকভাবে যথেষ্ট লাভবান হয়। জমিদারেরা ধনী ও সমৃদ্ধ হয়, রায়তের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়, এবং দেশের অন্যান্য জায়গায় যেখানে নীলের চাষ হয় না, সেখানকার চাষীদের থেকে এদের অবস্থা অনেকাংশেই ভালো হয়। আশেপাশের জমির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং চাষবাসের দ্রুত উন্নতি হয়।[2]

সব শেষে, আমাদের অত্যন্ত পরিশ্রমী ও প্রতিভাবান বড়লাট উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক নীলচাষের বিষয়ে তাঁর রিপোর্টে, মানে যে রিপোর্টটার কথা একটু আগেই উল্লেখ করলাম সেটা, কী বলছেন সেটা জানতে পারলে বোধহয় মন্দ হয় না। কেননা এখনও পর্যন্ত ইউরোপীয়দের আচরণের প্রভাব এদেশের মানুষের সাধারণ অবস্থার ওপরে কতটা পড়ে বা তারা তাদের চারপাশের মানুষের ভালো করার কতটা ক্ষমতা তাদের ওপর দিয়ে রাখা হয়েছে সেই বিষয়ে যাবতীয় যা কিছু বলা হয়েছে বা বলা হবে, সব কিছুর ওপর বড়লাটের মন্তব্য একটা আলাদা গুরুত্ব আরোপ করে। বড়লাটের ‘মিনিট’-এ স্পষ্ট করে ইঙ্গিত করা হয়েছে, নীলকরদের বিরুদ্ধে কী কী খারাপ কাজ করা হয়েছে আর কী কারনে সেই সবের উৎপত্তি হয়েছে। সে মিনিটে আরও বলা হয়েছে, এই সমস্যার সবচেয়ে বড় সমাধান সময়ের সাথে সাথেই দিয়ে দেওয়া গেছে কেননা আজকাল আগের থেকে অনেক উন্নত শ্রেণীর ইউরোপীয় মানুষদের নীল কারখানার মালিক হতে দেখা যায়। রায়তদের প্রতি নীলকরদের বা এক নীলকরের আর এক নীলকরের প্রতি তথাকথিত দুর্ব্যবহারের বিষয়ে; তাদের অবস্থান, জমির মালিকানা পেতে তাদের অসুবিধে ও অপমান; আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গিয়ে তাদের যথার্থ দাবীগুলি আদায় করার লড়াই; এমনকি এই অগ্রিম দেওয়ার প্রথার জন্য ফসল ফলার পর সেই ফসল নিজের অধিকারে আনতে যে লড়াই একজন নীলকরকে করতে হয়— এই সমস্ত বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “ব্যবসার সমস্ত শাখায় বেইজ্জতি হচ্ছে এবং ক্রমে ক্রমে ব্যাপারটা জালিয়াতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।” প্রতিপক্ষদের অনধিকার দখলদারি আটকানোর কোনও উপায় পাওয়া যাচ্ছে না। ওদিকে দরিদ্র রায়তদের কাছ থেকেও ন্যায্য পাওনা আদায় করা যাচ্ছে না। সবশেষে, এদেশে ইউরোপীয়দের থাকার ব্যাপারে যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তার ফলে বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের একেবারে অন্দরমহলে এমন এমন লোককে নিযুক্ত করতে বাধ্য হচ্ছে যাদের, যদি একটু বড় করে ভাবার সুযোগ থাকত, কিছুতেই নিযুক্ত করত না। মহামান্য বড়লাট বলছেন, “কিন্তু এই এতরকম অসুবিধেজনক পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও আমার অনুসন্ধানের ফলাফল হল (আমি আগে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হয়েছিলাম, তার বিরোধিতা করেই বলছি) নীলকররা এদেশের মানুষের যে পরিমান উপকার করেছে তার তুলনায় যে পরিমান দুর্ব্যবহারের খবর আসে, তা প্রায় কিছুই না, আর একথা জোর দিয়ে বলা যায়। এক্ষেত্রে এবং আরও অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই ব্যতিক্রমটাই এত বেশী মনোযোগ আকর্ষণ করেছে যে লোকে এটাকেই স্বাভাবিক ঘটনাক্রম বলে মনে করে নিয়েছে। কোথাও শান্তিভঙ্গ হলে তা তৎক্ষণাৎ জনগনের গোচরে আনা হয়, বা কোথাও যদি নীলকরের দুর্ব্যবহারের একটা দুটো উদাহরণও দেখা যায় তাকেই একেবারে রঙ টং চড়িয়ে পেশ করা হয়; কিন্তু অসংখ্য ছোট ছোট নামহীন কাজ, যেগুলো খুব শৃংখলার সঙ্গে সুবিচারের সঙ্গে জাতীয় সম্পদের বৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলেছে আর আশেপাশের মানুষদের জীবন আরামদায়ক করে চলেছে, তাদের কথা সকলের কাছে অজানাই থেকে যায়। আমি জানি, কোনও কোনও জেলায় কৃষির ক্ষেত্রে যতটুকু উন্নতি হয়েছে, তা  সে সমস্ত এলাকায় কোনও না কোনও প্ল্যান্টার বসতি স্থাপন করার কারনেই হয়েছে। একথা সাধারণ ভাবেই সত্যি আর বলতে কোনও বাধা নেই (সব সাধারণ সত্যির ক্ষেত্রে যা হয়, এক্ষেত্রেও কিছু ব্যতিক্রম তো রয়েইছে) যে এক একটি নীল উৎপাদনের কারখানা আসলে সেই এলাকার উন্নতির কেন্দ্রবিন্দু। শুধুমাত্র যে সমস্ত মানুষ সেই কারখানায় কাজ করে তারাই নয়, আশেপাশের যত এলাকা রয়েছে, সব জায়গার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানে একটা সাধারণ উন্নতি আসে। প্রতিটি মানুষকে যদি আলাদা করে ধরা যায় তাহলে হয়ত এই উন্নয়নের মাত্রাটা খুব বেশী কিছু হবে না, কিন্তু আরও মুক্তমনের আলোকপ্রাপ্ত একটা সিষ্টেম যদি চালু করা যায়, তাহলে তার থেকে আমরা কী কী আশা করতে পারি, তার একটা আন্দাজ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট।”

 

———————————————

 

এরকম “মুক্তমনের আলোকপ্রাপ্ত একটা সিষ্টেম” এদেশে চালু ব্রিটিশ প্ল্যান্টারদের প্রধান পলিসি হিসেবে হোক এবং প্রমানিত হোক যে এই আলোকপ্রাপ্তি থেকে যা আশা করা গেছিল, তা অর্জন করার জন্য এই পলিসি যথেষ্ট। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, এই যে দরিদ্র মানুষের একটা সর্বজনস্বীকৃত উন্নতি ঘটেছে, এটা তো শিক্ষিত ইংরেজ ভদ্রলোকের হাতে কিছু বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রায় সর্বশক্তিমানের মত ক্ষমতা দেওয়ার ফলেই হয়েছে!

সেই যে কলকাতার কাগজগুলোয় ‘প্ল্যান্টার্স ক্যালেন্ডার’ (৮) বেরোয়, যেখানে লেখা থাকে এ মরশুমে গোটা দেশে কোন নীল কারখানা কত ব্যবসা করল, যেগুলোতে কোনও আসল তথ্য থাকে না এবং যেগুলো, আমার বিশ্বাস, শুধুমাত্র প্রকাশ করা হয় কিছু মানুষের অহং-কে তুষ্ট করার জন্য যারা মনে করে এই ব্যবসাটা এযাবৎকালের সবচেয়ে পার্টনারশিপ। আমি চাই এই অকেজো ক্যালেন্ডারটির সাথে সাথে আর একটা এরকমই ক্যালেন্ডার প্রকাশ পাক, যেখানে লেখা থাকবে কতগুলো গ্রাম ও কী সংখ্যক চাষী প্রতিটি নীল কারখানার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, একজন নীলকরের আমলে কতগুলো স্কুল ও হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে, কত ছাত্রকে সেখানে পড়ানো হয় আর কত রোগীকে সেই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়, রায়তের অধিকারে কতগুলি হাল-বলদ রয়েছে, সমত ফসল থেকে মোট কত দাম তারা ঘরে তুলতে পারে, কতজন দুর্ভাগা রায়ত মহাজনের খপ্পরে পড়েছিল আর তাদের মধ্যে কতজনকেই বা সেখান থেকে উদ্ধার করে আনা গেছে, সব মিলে এক বছরে জনসংখ্যা কর বেড়েছে বা কমেছে— এইসব। এরকম একটা ক্যালেন্ডার প্রকাশ পেলে বাকী সকলের জন্য সেটা অনুকরণযোগ্য হবে। ফলে চারিদিকে একটা উৎসাহের ঢেউ বয়ে যাবে, আমার চারপাশে আমি এরকম লোককে দেখতে পাব যারা কী পেয়েছে তা নিয়ে গর্ব না করে কী দিয়েছে তা নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে গর্ব করবে। আর এসময় আমি একজন সম্রাট হতে চাইব, যে কিনা এক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল প্রতিযোগীর গলায় হিরেমুক্তোখচিত হার তুলে দেবে।

যাই হোক, চিঠিটা সাধারণ মাপের চেয়ে তিনগুন বড় হয়ে গেল। আর আমার আশঙ্কা তোমাদের ধৈর্য্যও ফুরিয়ে এসেছে। সুতরাং আমার যা বলার তা পরের চিঠির জন্য তুলে রাখলাম।

 

বাংলা নৌকার নোঙর

টীকা

শেক্সপীয়রের জুলিয়াস সীজার। সীজারের অন্ত্যেষ্টিতে মার্ক অ্যান্টনির স্পিচ থেকে নেওয়া। মূল লাইন, “The Evil that men do lives after them, / The good is oft interred with their bones.”

[1] একজন ইংরেজ প্ল্যান্টার রায়তকে জমিদার বা গ্রামের মালিকের হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু তার নিজের কর্মচারী রায়তকে মারাত্মকভাবে শোষণ করে। সেই অত্যাচার গ্রামের ধনী শ্রেনীর অত্যাচারের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। আলিপুরের কমিশনার মিঃ বারওয়েল বলেন, “প্ল্যান্টারদের নামে এদেশে যেখানে যত অত্যাচার শোষন হয়ে থাকে, সবই করে এই প্ল্যান্টারদের ওপর নির্ভর করে থাকা দেশী কর্মচারীরা, যাদের প্রকাশ্যে বা গোপনে কাজে লাগানো হয়েছে।” প্ল্যান্টার রায়তকে অগ্রিম টাকা দিয়ে তার জমির ভাড়া শোধ করতে সাহায্য করে এবং পুরোনো ধারের জন্য তারা জমি হাল-বলদ বাজেয়াপ্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়। যদিও এর বদলে রায়তের কাছ থেকে নীলকর যে মূল্য বুঝে নেয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই রায়তের পক্ষে মোটেই সুবিধেজনক নয়, কিন্তু যে সমস্ত দেশী মহাজনের কাছে তারা টাকা ধার নিয়ে সারাজীবনের মত বাধা পড়ে যায়, তাদের থেকে অনেক কম শ্বাসরোধকর।

[2] ইউরোপীয়দের এদেশে বসতি স্থাপন সংক্রান্ত কাগজপত্র থেকে।

৮। প্ল্যান্টার্স ক্যালেন্ডারঃ সাহেবরা যা করে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ লিখিত দলিল ও হিসেব রাখে। এদেশে যখন নীলচাষ হত, তখন কোন কোন এলাকায় নীলচাষ হচ্ছে, কতটা জমিতে নীলচাষ হচ্ছে, বছরের কোন মরশুমে চাষ হচ্ছে, মরশুমের কোন সময়ে ফসল বোনা হবে, কখন ফসল কাটা হবে, কখন তা কলকাতার বাজারে আনা হবে, কবে তা প্যাক করে ইউরোপের দিকে চালান হবে, তার বিবরণ ফলাও করে কলকাতার বিভিন্ন কাগজ, যেমন বেঙ্গল হরকরা, ইংলিশম্যান ইত্যাদি কাগজে ছাপা হত। গ্রান্টের চিঠি ও অন্যান্য সমকালীন বিবরণ থেকে জানা যায়, প্ল্যান্টারদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনও এই চাষের মরশুমের চক্রকে ঘিরেই আবর্তিত হত। সুতরাং, এই ক্যালেন্ডারের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও যথেষ্ট ছিল। যদিও এখানে গ্রান্ট এই ক্যালেন্ডারের সমালোচনাই করেছেন।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply