রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ২৯। অনুবাদে অর্ণব রায়
আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলায় দেশীয় মানুষদের চরিত্রের মধ্যে একটা অদ্ভুত, যাকে বলে অসংগতি রয়েছে। এমনিতে ঢিলেঢালা, উদাসীন, প্রতিদিনের কাজের প্রতি নিস্পৃহ লোক তারা, কিন্তু উত্তেজিত হয়ে পড়লে বা দরকার পড়লে বা পুরস্কারের লোভ থাকলে তারা কাজের দিকে থেকে যে কাউকে পেছনে ফেলে দিতে পারে। আর কোনও কিছু পাওয়ার জন্য দশগুন পরিশ্রম আর কষ্ট সহ্য করতে পারে। যে লোক একটা তুচ্ছ কাজ, যেটা একজন ইউরোপীয় শ্রমিক দশ মিনিটে করে দেবে, সেটা করতে দু ঘন্টা লাগাবে, বা কোনও ফালতু মোট বইবার জন্য একখানা মুটে বা কুলি লাগানোর তাল করবে, সেই লোককেই একবার দেশে যাওয়ার ছুটি দিয়ে দেখো, সে পায়ে হেঁটে যে পরিমান লটবহর ঘাড়ের ওপর ফেলে আর যে বেগে ছুটবে, তা দেখে তোমরা অবাক হয়ে যাবে। যে ভেতো চাষীরা তোমাদের ‘ডাক-যাত্রা’-য় কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যায়, একবার তার দিকেই খেয়াল করে দেখো। আমি একবার দেখতে চাই, মোটামুটি বারো থেকে ষোল জন ইংরেজ, যাদের আগে অন্ততঃ বেশ কয়েক মাসের ট্রেনিং দেওয়া হয়নি, এক এক বারে চারজন করে, প্রতি আধ মাইল অন্তর কাঁধ পালটে পালটে কী করে একটা পালকি বয়ে নিয়ে যায়! সে পালকির নিজের ওজন মোটামুটি ৪০০ পাউন্ড, তার ভেতরে প্রায় তের থেকে চোদ্দ স্টোন (প্রায় ৮০-৮৫ কেজি) ওজনের একজন ভদ্রলোক বসে রয়েছেন। আমি দেখতে চাই না থেমে তারা একলপ্তে কুড়ি বাইশ মাইল কী করে চলে! এরকমও হয়েছে, কোনও এক প্ল্যান্টার তার চাকরদের বলেছেন পরের দিন সকালে ষোল মাইল দূরের কোনও জায়গা বা কারখানায় তাকে পৌছোতেই হবে। তিনি পরের দিন সকাল পাঁচটায় উঠে ছটার সময় ঘোড়ায় চড়ে রওনা দেন। গন্তব্যে পৌঁছে দেখেন তার চাকরবাকরেরা সেখানে তার আগেই পৌছে গেছে এবং ইতিমধ্যেই তার ব্রেকফাস্ট বানানো শুরু করে দিয়েছে। তারা সারারাত হেঁটে সেখানে পৌঁছেছে।
মূল বিষয়ে ফিরে আসি। নীলচাষ করে যে রায়তের ভাগ্য ফিরবে বা সে বিরাট ধনসম্পত্তি করতে পারবে, এরকম কেউই স্বপ্নেও ভাবে না। তারা দরিদ্র আছে, আমার আশঙ্কা, তারা দরিদ্রই থেকে যাবে। যদি না তাদের মধ্যে বিরাট রকম নৈতিক বা শিক্ষাগত পরিবর্তন আসে। এই লক্ষ্যে প্ল্যান্টাররা সবটুকু দিতে বদ্ধপরিকর, শর্ত, সমগ্র সমাজের উন্নতি হতে হবে। তাহলেই তাদের মধ্যে এই যে তাদের জীবনে আতিশয্য, তা শেষ করার প্রবণতা দেখা যাবে। যে সমস্ত বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম-কানুন তাদের দরিদ্র করে রেখেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। নিজেরা আলোকপ্রাপ্ত হবে যাতে করে জীবনের সাধারণ নিয়মকানুন আর মানবিক আচার আচরণের সূক্ষতর দিকগুলি সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। প্ল্যান্টাররা কিন্তু দাবী করেন, তাদের অধীনে থেকে চাষীদের অবস্থার উন্নতিই হয়েছে, অবনতি হয়নি। এবং নীল চাষ ও নীল কারখানার সাথে যুক্ত থেকে তারা হামেশাই লক্ষনীয় রকম সুযোগ সুবিধে পেয়ে এসেছে।
সন্দেহ নেই, যদি নীলচাষ থেকে প্ল্যান্টারের আমদানি প্রতি বছর নিশ্চিত ও সমান হত, তাহলে রায়তদের পরিস্থিতির আরও উন্নতি ঘটত। কিন্তু এই চাষে ঝুঁকির দিকটাও বিরাট বড়। একটু বেশী বৃষ্টি হল কি লাখ লাখ টাকা একদিনের মধ্যে বরবাদ হয়ে গেল! আর অন্যদিকে, বৃষ্টি কম হল, তাতেও ক্ষতি সমপরিমান। একজন প্ল্যান্টার তাই আগেভাগেই ঘোষণা করে দেন, তিনি ততটাই মুক্তমনা হতে পারবেন, যতটা পরিস্থিতি অনুমোদন করবে। আর আমাদের এই জেলার আশেপাশের অঞ্চলের পরিস্থিতি এরকম, যেখানে একজন রায়ত আগে একটাকা পেত দশ বান্ডিল নীলের জন্য এখন সেই একই পরিমান টাকা পেয়ে থাকে চার বান্ডিল নীলের জন্য। কিন্তু দস্তুরী নামক দুষ্ট ক্ষতটি এখনও বজায় আছে। আর যতদিন এই আপদ থাকবে, প্ল্যান্টারের খাতায় তার রায়তদের শোষন করার দরুণ পাওয়া ঘৃণার প্রাপ্তিতে ভরে থাকবে। এই ফসলের কী পরিমান লাভ তুলে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, সেটা কোনওদিনই পূর্ণরূপে বোঝা যাবে না।
এই যে এত অসুবিধা সত্ত্বেও প্রতি বছর প্ল্যান্টারদের বিপুল পরিমান মূলধন, প্রায় পনের লক্ষ পাউন্ড নীল উৎপাদনে লাগানো হচ্ছে; এই টাকা ইংল্যান্ড থেকেই আসুক বা ভারতেই এই উদ্দেশ্যে রেখে দেওয়া হোক, এতে এদেশেই মূলধনের আমদানি হচ্ছে এবং এর বিপুল পরিমান অংশ দেশের মানুষদের ওপরেই খরচ করা হচ্ছে— এতে তাদের কিছুটা হলেও উন্নতি তো হচ্ছে। এই ব্যাপারটা অনেকে শুধু মেনেই নেননি, তারা এই মতবাদটাকে জোর দিয়ে প্রচারও করেছেন। শুধু তাই নয়, ইউরোপীয়দের কর্মক্ষমতা ও উদ্যমের ফলে এদেশে মাটির ব্যবহারযোগ্যতা ও মুল্যমানে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। মাইলের পর মাইল জমি এদেরই দেখাশোনায় ঠিক করে রাখা যাচ্ছে। নয়ত সেসব ভুতুড়ে জঙ্গল, বুনো মোষ, বাঘ আর বুনো শুয়োরের চারণক্ষেত্র হয়ে থাকত।[1] ইউরোপীয়দের রক্ষণাবেক্ষণে এসব জমিকে চাষের কাজে লাগানো যাচ্ছে। পুরোনো জমিতে যত্ন করে লাঙল দেওয়া হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এইভাবে চাষ করলে, দেখাশোনা করলে যে সকলেরই ভালো হয়, একথাটা কি কারোর ভাবনায় উদয় হয়নি?
কিন্তু বলা বাহুল্য, এও যথেষ্ট নয়। এই কাজে শুধুমাত্র একজন ইউরোপীয় মানুষের ধনসম্পদ বা কর্মশক্তি লাগবে তাই নয়, তাকে তার মন ও মস্তিকও পুরোমাত্রায় দিয়ে দিতে হবে, যাতে করে তার কাছে যা যা প্রকৃতির দেওয়া উপহার রয়েছে তা যেন সঠিক দিকে চালিত হয়। তাকে লক্ষ্য রাখতে হবে যে সমস্ত চাষীদের চাষ করার ফলে তার লাভ হচ্ছে, তারাও যেন লাভ করতে পারে। তাকে খাটতে হবে যাতে এই দস্তুরির মত কুপ্রথায় যতদূর সম্ভব নাগাম পরানো যায়। তাকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে মাঝখানে থাকা অধঃস্তন কর্মচারীদের শয়তানির জন্য চাষীরা আর শোষিত না হয়, যাতে তারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের খ্রীস্টান মালিকের সুনাম নষ্ট না করতে পারে। তারা যেন কোনও তরফ থেকেই কোনও সুবিধে আদায় করে নিতে না পারে বা কোনও ভালো কাজ হলে তার কৃতিত্ব অন্যায়ভাবে না নিতে পারে। এরকম তারা হামেশাই করে থাকে। তারা চাষীদের চাপ দিয়ে তাদের রোজগার থেকে মুনাফা তুলে নিজেরা ফুলতে থাকে।
সবশেষে বলতে হয়, পুরো বিষয়টা অনেকটাই মনুষ্যচরিত্রের ওপর নির্ভর করে থাকে। একজন ভালো মনের প্ল্যান্টারের কর্মশক্তিই যদি রায়তদের ওপর দমন পীড়ণ রোধ করতে যথেষ্ট না হয় তাহলে একজন হৃদয়হীন বা লোভী প্ল্যান্টারের হাতে পড়ে তাদের ক্ষতি কী পরিমান বৃদ্ধি পাবে তা আন্দাজ করাই যায়।
একটা কথা বারবার বলা হয়, “ইউরোপীয়রা এদেশে নীলচাষ করার ফলে যেটুকু সুবিধা দেশীয় লোকেদের হয়েছে তার প্রধান উৎস বিদেশী পূঁজির পরিমান, যা কিনা এদেশে লাগানোর ফলে এখানকার শ্রমিক আর জমির চাহিদা তৈরি হয়েছে।” কিন্তু আমার মনে হয় একথা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো একদম দেশী উপাদান, চরিত্র, তারও কিন্তু প্ল্যান্টারের লগ্নি করা পুঁজির মত সমান গুরুত্ব রয়েছে। কখনও কখনও তা অনেক বেশী কার্যকরও বটে। কেননা যদি আমাদের বলা হয়, ‘পল গাছ লাগাবে আর অ্যাপেলো জল দেবে’ (৬) আর ভগবানের কৃপা ছাড়াই ফসল তরতর করে বেড়ে, তাহলে বলতে হয় হিমালয়ের বরফঢাকা চুড়ায় ইতালীর আঙুরক্ষেত হবে আর আববের মরুভূমিতে ঝুমকোলতা ফুলের গাছ হবে, আর গরীবেরা ধনীদের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি বড়লোক হয়ে যাবে।
এখন যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে সত্যিই কি এদেশের মানুষ এখনও পর্যন্ত নীলচাষ থেকে উপকৃত হয়েছে বা হলেও কতটা হয়েছে, তাহলে এই প্রশ্ন তাদের কাছেই করা উচিৎ যাদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর দেবার মত যথেষ্ট তথ্য ও যোগ্যতা আছে এবং যারা একটা বৃহৎ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এর উত্তর দিতে পারবে। তারাই বলবে, কীভাবে এদেশে নীলচাষ হওয়াতে ধনীরা, বিশেষ করে জমিদারেরা লাভবান হয়েছে। তাদের জায়গার দাম দ্বিগুন হয়ে গেছে, কেননা তাদের যে জমি আগে জঙ্গলে ঢাকা ছিল বা চাষের অযোগ্য ছিল, যে সব জমিতে এদেশে ফলা সাধারণ ফসলও ফলত না, সেইসব জমির ভোল বদলে তাদের চাষজমিতে পরিবর্তিত করে দেওয়া হয়েছে। এব্যাপারে কারোর মনে কোনও সন্দেহ নেই।[2] আর যারা দৈনিক মজুরীতে চাকর বা শ্রমিক হিসেবে নীল কারখানার সাথে জড়িত আছে, যারা স্বাভাবিকভাবেই দরিদ্র শ্রেণীভুক্ত, এবং বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রায় ন’শো কারখানা মিলে তাদের সংখ্যাও নেহাত কম হবে না— তারাও লাভবান হয়েছে। একথা আজ কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কেননা, বলাই বাহুল্য, যখন তাদের ওপর দস্তুরি নামক বোঝাটি আর নেই আর তারা নিয়মিত পারিশ্রমিকও পাচ্ছে, তখন নিজেদের দেখেশুনে রাখাটা তাদের পক্ষে এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। বরং যারা সত্যিকারের গরীব, ক্ষেতমজুর, তাদের অবস্থাটা তোমাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। এবার দেখ, চারিদিকে এত প্রমান রয়েছে যে ক্ষেতমজুরদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর ফল বহুবিধ হতে পারে, আমি যদি এখন অতীত থেকে প্রমান টেনে দেখানোর চেষ্টা করি যে সকলের বর্তমান অবস্থা এক রকম, তাহলে তা অযৌক্তিক হয়ে যাবে। এখন কৃষকদের অবস্থার যদি কোথাও কোথাও পশ্চাদপসরণ ঘটে থাকে, তাহলে তার কারণ সত্যিই আমার জানা নেই। আর যেহেতু আমার জানা নেই, আমি বরং এ ব্যাপারে আমার থেকে বেশী যারা জানে, তাদের ওপর বিষয়টা ছেড়ে দেব যে কেন কৃষকদের বর্তমান অবস্থা আগের থেকে আলাদা বা অসুবিধাজনক।[3] আমি বরং সোজাভাবে তোমাকে বলতে পারি বিভিন্ন লিখিত দলিলে কী প্রমান রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এই লেখাগুলির পেছনেও কিন্তু নানারকম স্বার্থবুদ্ধি কাজ করেছে না, এরকম বলা যাবে না।
টীকা
[1] স্যার ওয়াল্টার গিলবার্ট, যেমন শিকারে উৎসাহী তেমনি যুদ্ধে প্রবল সাহসী বীর, আমাকে কিছুদিন আগেই বললেন, ওঁর মনে আছে, এই যে জায়গায় আমি বসে এই লেখাটা লিখছি, তার আশেপাশের আলাকায় একসময় তিনি বুনো শুয়োর শিকার করেছেন।
৬। বাইবেলের ফার্স্ট এপিস্টল টু দ্য করিন্থিয়ান্স (১ করিন্থিয়ান্স ৩ঃ৬ ) থেকে নেওয়া।
[2] “ কয়েক বছর আগে, যখন এদেশে সাধারণতঃ নীল উৎপাদন হত না, আমার একটা এস্টেটে যেখানে নীলের চাষ হত না, সেখানে সারাবছরে সরকারের ঘরে খাজনা দেবার মত পয়সাও উঠত না। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে সেখানে নীলচাষ শুরু হয়। এখন সেখানে এক বিঘা জমিও বিনা চাষে পড়ে নেই। এবং সেখান থেকে ভালোরকম লাভ আসছে। আমার বহু বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন, যাদের কাজকারবারের সঙ্গে আমি ভালোমতন পরিচিত, তারাও এভাবেই তাদের সম্পদ বাড়িয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত তাদের এস্টেট থেকে ভালোরকম রোজগার করছে। যদি মাত্র একটা ফসলের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এরকম লাভ পাওয়া যায়, তাহলে ব্রিটিশের দক্ষতা ও কর্মশক্তিকে যদি এদেশে উৎপাদিত সব জিনিসের ক্ষেত্রে অবাধে কাজে লাগানো যায়, তাহলে আমরা ভালো রকম লাভ আশা করতে পারি।”— বাবু দ্বারকানাথ ঠাকুরের বক্তৃতা।
[3] ১৮৫৮। অনেকে বলেন, নীলচাষের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার কারন ফসলের মান পড়ে যাওয়া। বলা হয়, যে নীলগাছ একসময় ছয় থেকে সাত ফিট উঁচু হত, এখন, সেই একই জমি নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চাষ করার ফলে সেই গাছের বাড়বৃদ্ধি কমে গেছে। ফলে যে রায়ত যে ফসল চাষ করছে, তার লাভও কমে যাচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে এই সিদ্ধান্ত বিতর্কিত মনে হয়। কেননা যদি এটাই কারন হবে, তাহলে ধানগাছের ওপরও একই প্রভাব দেখা যাবে। কৃষ্ণনগর জেলায় কিন্তু ঘোষিতভাবে দেখা গেছে, যদি অনুকূল আবহাওয়া বা জমি পাওয়া যায়, তাহলে আজ থেকে কুড়ি বছর আগে যে পরিমানে ও যে উন্নত মানের নীল পাওয়া যেত, আজই সেই পরিমানে ও সেই মানেরই নীল উৎপাদন সম্ভব।
(ক্রমশ)
