সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ২৯। বরুণদেব

গত পর্বের পর

গোবিন্দপুরে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য বিস্তারে যারা সহায়তা করেছিল, তাদের মধ্যে ছিল সপ্তগ্রাম থেকে গোবিন্দপুরে ব্যবসা করতে উঠে আসা বসাক পরিবার। পরে তারা উঠে আসে আহিরিটলায়।এই বনেদী পরিবারের আট বছরের বালকটি আহিরিটোলায় অখিল চন্দ্রের জিমন্যাস্টিক্সের খেলা দেখে মুগ্ধ হয়। ভবিষ্যৎ জীবনের বীজ সে রাতেই বপন হয়ে যায় বালকটির মধ্যে। বালকটির নাম কৃষ্ণলাল বসাক। জন্ম ১৮৬৬তে। যদু পণ্ডিতের বঙ্গ বিদ্যালয়, ডফ সাহেরবের স্কুলে পড়তে পড়তে ব্যায়ামের প্রতি অনুরক্ত। যদু পণ্ডিতের স্কুল দর্জিপাড়ায় চলে গেলে সেখানে জিমন্যাস্টিক্সের ক্লাস শুরু হলো। সোনাগাছি অঞ্চলে ছিল অবিনাশচন্দ্র শীলের আখড়া। কৃষ্ণলাল বিখ্যাত জিমন্যাস্টিক্স শিক্ষক বৈষ্ণবচরণ বসাকের কাছে শিক্ষা নিতে লাগলেন। সেখানে পেলেন প্যারালাল ও হরাইজন্টাল বারের তালিম। আট দশ জন যুবকের সঙ্গে বেনেটোলায় ‘স্টার অ্যাক্রোবাটিক কোম্পানি’ নামে এক আখড়া খুলে ফেললেন। শোভাবাজারের রাজবাড়িতে খেলা দেখিয়ে পেলেন রৌপ্য পদক। যোগ দিলেন রাজাবাজারের গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসে। আবেল সাহেব তখন গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসে। আবেল যখন সে সার্কাসদল ছেড়ে চট্টগ্রাম রওনা দিলেন, সকলের আগোচরে আবেলের সঙ্গে চট্টগ্রাম পালিয়ে গেলেন কৃষ্ণলাল। নানা দেশ ঘুরলেন সে দলের সঙ্গে। ছেড়েও দিলেন। হার্মস্টনস সার্কাস, উডি সার্কাস, ওয়ারেন সার্কাস, নানা ইউরোপীয় সার্কাস দলে নাম লেখালেন। কৃষ্ণলাল কলকাতা ফিরলেন ১৯১০এ। পান্নালাল বর্ধন, দেবেন্দ্রনাথ ঘোষের সঙ্গে প্যারিসে গেলেন এক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে। সেখানে হরাইজেন্টাল বারের খেলা দেখিয়ে মোহিত করলেন দর্শকদের। ফিরে এলেন কলকাতায়। আবেল ততদিনে বৃদ্ধ হয়েছেন। আবেলের কাছ থেকে পেলেন পাঁচটি সুন্দর ও সুশিক্ষিত টাট্টুঘোড়া।কৃষ্ণলাল ও আবেল কিছুদিনের জন্য যোগ দিলেন প্রিয়নাথ বোসের সার্কাসে। সেখানে কৃষ্ণলাল আট বছর বয়স্ক এক টাট্টুঘোড়া, জেনিকে নিয়ে খেলা দেখাতেন। একদিন আবেল ও কৃষ্ণলাল বোসের সার্কাস ছেড়ে দিয়ে কয়েকজন ইউরোপীয় সার্কাসশিল্পী ও বাঙালি শিল্পী ফনীন্দ্রনাথ নাথ, রমন মুখার্জীকে নিয়ে দল বাঁধলেন। আবেলস গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাস। কিন্তু আবেলের সঙ্গে বোসের সার্কাসদলের চুক্তির মেয়াদ তখনও শেষ হয় নি। মামলা গড়াল হাইকোর্টে। হাইকোর্টের আদেশে বন্ধ হলো আবেলের সার্কাস। অন্য পথ ধরলেন কৃষ্ণলাল। আবেলস গ্রেট ইস্টার্ণ সার্কাস থেকে আবেলের নাম মুছে দিয়ে দলের নাম দিলেন গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাস। আর্থিক সহায়তা করতে এগিয়ে এলেন জোড়াসাঁকোর থাকোবাবু, সিমুলিয়ার এক সার্কাস ব্যবসায়ী নারায়ণ চন্দ্র বসাক, প্রসিদ্ধ সংবাদপত্র ব্যবসায়ী  অমৃতলাল পাল। কিছুদিন পরে সার্কাসের নাম বদলে গেল- হিপোড্রোম সার্কাস।

হিপোড্রোম সার্কাসের মালিক ও অধিনায়ক কৃষ্ণলাল বসাক বাঙালি হলেও সার্কাসশিল্পীরা ছিল বিদেশী। সিংহের খেলা দেখাতেন জার্মানির বিখ্যাত হেগেনবেক শো থেকে নিয়ে আসা চুক্তিভিত্তিক শিল্পী দিয়ে। ইউরোপের ক্লাউন রোকোকো এই সার্কাসে ক্লাউন শিল্পী হিসেবে বেতন পেতেন মাসে আটশো টাকা।  হিপোড্রোমে ভূতনাথ বসু ছাড়া বাঙালি সার্কাসশিল্পী  বলে দাবি করার মতো কেউ ছিল না তেমন। ভূতনাথ ছিলেন আবেলের প্রিয়পাত্র। প্রায় পনেরো ষোলো বছরের সার্কাস জীবনে আবেল সাহেবের সঙ্গেই কাটিয়ে দেন দশ বছর। পিনাঙে আবেল সাহেব যখন মৃত্যুশয্যায়, তাঁর সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে যান ভূতনাথকে। প্রিয়নাথ বোসের সার্কাসের সঙ্গে কিছুদিন যুক্ত থাকার পর হিপোড্রোমে আসেন ভূতনাথ। ঘোড়া, বাঘ এবং বিশেষতঃ হাতির প্রশিক্ষণে ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

হিপোড্রোম সার্কাস কিছুদিন কলকাতায় খেলা দেখিয়ে বিদেশ যাত্রা করে- কলম্বো, পিনাং, সিঙ্গাপুর, জাভা, হংকং, সাংহাই, পিকিন, ব্যাঙ্কক, সুমাত্রা, ব্রহ্মদেশ, হংকং, জার্মানি। এরপর ভারত ভ্রমণ। জম্মুর মহারাজ খেলা দেখে প্রচুর উপহার দিলেন, তার মধ্যে ছিল চার হাজার টাকার কাশ্মীরী শাল। প্রতি বছর একবার করে ভারত ভ্রমণ করত হিপোড্রোম সার্কাস। প্রিয়নাথ বসুর সার্কাস ছাড়া বাঙালি উদ্যোগপতিদের মধ্যে একমাত্র কৃষ্ণলাল বসাকের হিপোড্রোম সার্কাস দীর্ঘজীবী হয়েছিল, চলেছিল চোদ্দ বছর। মহাযুদ্ধের দামামা বাজলে আর্থিক দূরবস্থা নেমে এলো সার্কাস জগতে। তাঁবু গোটাতে বাধ্য হলো হিপোড্রোম সার্কাসও।

——————————————————————–

পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরের আড়িয়ল গ্রামে জন্ম শামাকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের। পিতা শশিভূষণ ত্রিপুরার জজ আদালতের সেরেস্তাদার। ঢাকায় স্কুলবেলায় ব্যায়ামে হাতেখড়ি। পাশাপাশি কুস্তিতে প্রশিক্ষণ। এই ডাকাবুকো ছেলে একসময় হয়ে উঠল নামকরা পালোয়ান। মনের মধ্যে সৈনিক হওয়ার প্রবল বাসনা। কিন্তু তখন বাঙালির পক্ষে সেনাদলে নাম লেখানো সম্ভব ছিল না । ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুর ডেকে নিলেন তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর জন্য। দু’বছর শ্যামাকান্ত রইলেন সে কাজে। বিরক্ত লাগল। বরিশাল গভর্নমেন্ট স্কুলে ব্যায়াম শিক্ষকের পদে যোগ দিলেন। এই সময় প্রফেসর বোসের গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস এলো বরিশালে। সে সার্কাসের খেলা দেখে প্রাণিত হলেন। সুনামগঞ্জ থেকে কিনে আনলেন একটি চিতাবাঘ। তাকে শেখালেন খেলা। সুনামগঞ্জেই বাঘটিকে নিয়ে খেলা দেখালেন। তাঁর সার্কাস জীবনের সূচনা এখানেই। অসামান্য সাহস ও কৌশলে বড়ো বড়ো হিংস্র বাঘকে বশীভূত করতে পারতেন। এমনকি সদ্যধৃত বুনো বাঘের সঙ্গেও লড়াই করে বেশ কয়েকবার পুরস্কারের সঙ্গে সঙ্গে বাঘটিও উপহার পেয়েছিলেন। জয়দেবপুরের ভাওয়ালরাজা একটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার উপহার দিলেন। উপহার দিলেন পাটনার এক নবাব- একটি বাঘিনী ও দু’টি অশ্ব। মাসিক দেড় হাজার টাকা বেতনে এক বছর কাজ করলেন কুক সাহেবের সার্কাসে। এরপর নিজের সার্কাসদল।  লোকমুখে নাম ছিল শ্যামাকান্তর সার্কাস। ১৮৯৭-এ রংপুরে খেলা দেখাতে এলে ভূমিকম্পে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো একটি বাড়ি। সে বাড়িতেই ছিল  তাঁর সার্কাসের পশুগুলি।  বেশ কয়েকটি পশুর মৃত্যু হলো।  এরপরও  কিছুকাল বাঘের খেলা দেখিয়ে যান।  বাঘ সিংহের খেলা ছাড়া বুকের ওপর পাথর ভাঙার খেলা দেখাতেন। শ্যামাকান্তের অসীম সাহস ও নির্ভীকতা বাঙালির কাছে এক প্রবাদে পরিণত হয়। শ্যামাকান্ত পিতাকে হারালেন যখন, তখন তাঁর বয়স প্রায় বিয়াল্লিশ বছর। আগ্রহ হারালেন জাগতিক বিষয়ে। সন্ন্যাস নিয়ে পরিচিত হলেন সোহং স্বামী নামে। হিমালয়ের পাদদেশে ভাওয়ালিতে স্থাপন করলেন তাঁর আশ্রম। ঐ আশ্রমেই ১৯১৮তে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।

পূর্ববঙ্গের এক প্রসিদ্ধ ব্যায়ামবীর ছিলেন রাজেন্দ্রনারায়ণ গুহঠাকুরতা। বরিশাল জেলার বানরীপাড়া গ্রামে জন্ম। শৈশবে পিতৃমাতৃবিয়োগ হওয়ায় মামার বাড়িতে মানুষ। বারো তেরো বছর বয়স থেকে ব্যায়াম চর্চা শুরু করেন, ঘোড়ায় চড়তে শেখেন। বরিশালের ব্রজমোহন ইনষ্টিটিউশনে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা। একবার মামার বাড়ি থেকে পালিয়ে মাসখানেকের জন্য এক সার্কাস দলে কাজ করে ফিরে আসেন। ১৯১১ সালে বরিশালে প্রায় ২৮ মণ ওজনের একটি রোলার বুকে নেন, তার ওপর পাঁচ মণ ওজনের একটা পাথর, তার ওপর চারজন লোক চড়ে বসল। রামমূর্তি সার্কাসের প্রফেসর রামমূর্তি সার্কাসে প্রথম বুকের ওপর হাতি নিয়ে খেলা দেখাতেন। আর রাজেনন্দ্রনারায়ণই প্রথম বুকের ওপর রোলার চাপিয়ে খেলা দেখান তবে সেটা সার্কাসের রিঙে নয়। ১৯১৭ সালে কার্লেকর সার্কাস কলকাতায় এলে রাজেনবাবু চার টন রোলার বুকের ওপর নিয়ে খেলা দেখান। ১৯১৮য় কলকাতায় আসে অল্ডার্স সার্কাস। বুকের ওপর হাতি নিয়ে খেলা দেখান। ঐ বছর প্রফেসর রামমূর্তিকে চ্যালঞ্জ করে বসেন রাজেন্দ্রনারায়ণ, তিনি রামমূর্তির সমস্ত খেলাই দেখাতে পারেন। রামমূর্তি বলেন, যদি পারো, তবে আমার খেলার সব সরঞ্জাম দিয়ে দেবো তোমাকে। রাজেন্দ্রনারায়ণ দেখান রামমূর্তির সমস্ত খেলা কিন্তু রামমূর্তি তাঁর কথা রাখেননি। রাজেন্দ্রনাথ রেগে গিয়ে বলেন, তোমার মতো একশো রামমূর্তি এই বাংলাদেশ থেকে তৈরী করে দেবো। ১৯২০ সালে কলকাতায় তাঁর সেই প্রচেষ্টা, এক প্রদর্শনী থেকে। ১৯২১ সালে সিটি কলেজে ফিজিকাল ইন্সট্রাক্টরের পদে যোগ দিলেন। তাঁর প্রথম ছাত্র, কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট গোপালচন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী মোটর গাড়ি থামান। রাজেনন্দ্রনারায়ণের আর এক ছাত্র হীরেন্দ্র বসু, দু’দিক থেকে আসা দুটি মোটর গাড়িকে ঠেলে দিয়ে দর্শকদের বিস্মিত করেন। রাজেন্দ্রনারায়ণের এক ছাত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ভারোত্তলোনে নাম করেন। ১৯২৬ সালে তাঁর দুই ছাত্র শৈলেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র সেলার্স সার্কাসে বুকের ওপর হাতি তোলেন। রাজেনবাবু নিজেও আলিপুর চিড়িয়াখানায় ও সেলার্স সার্কাসে বুকের ওপর হাতি নিয়ে প্রদর্শনী করেন। বাংলার নানা জায়াগায় ব্যায়ামচর্চাকে ছড়িয়ে দিতে  ১৯২৮ সালে ‘অল বেঙ্গল ফিজিকাল কালচার অ্যাসোসিয়েশন’ তৈরী হয় তাঁরই উদ্যোগে।

————————————————————–

গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের খাঁচায় সুন্দরবনের দু’টি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। খাঁচায় ঢুকে তাদের লেজ টেনে, কান টেনে তাদের ক্রুদ্ধ করে খেলা দেখাতেন তিনি। বাঘের সঙ্গে তাঁর ঘন ঘন আলিঙ্গন, চুম্বনে শিহরিত হয়ে যেত দর্শক। তিনি বীর বাদলচাঁদ। প্রিয়নাথ বোসের শিষ্য।

এই অতিমানবীয় খেলা দেখে তৎকালীন  ভারতের প্রধান সেনাপতি  লেখেন- তিনি বিশ্বাস রাখেন, যে সুন্দরবনের বাঘেদের দ্বারা আক্রান্ত হবার মতো দুর্ভাগ্য বাদলচাঁদের মতো বীরের হবে না এবং তিনি এইভাবেই রক্ত জমাট করা দুর্ধর্ষ খেলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন। ১৩-০৬-২০০১-এ ‘দ্য ইণ্ডিয়ান ডেইলি টেলিগ্রাফ’ লিখল –  যখন মিস্টার বাদল  খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসেন, দর্শকরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

প্রিয়নাথ বোসকে এই বাঘ দু’টি উপহার দিয়েছিলেন মধ্যপ্রদেশের রেওয়ার মহারাজা। ১৮৯৬ খ্রীস্টাব্দে বোসের সার্কাস দেখে সন্তুষ্ট হয়ে উপহার দেন দুটি ব্যঘ্র শাবক – একটি বাঘ, একটি বাঘিনী। প্রিয়নাথ নাম রাখেন- লক্ষ্মী ও নারায়ণ। এই বাঘ দু’টিকে তালিম দিয়ে তিনি বাদলচাঁদ ও সুশিলাসুন্দরীকে তাদের নিয়ে খেলা দেখাতে শিখিয়েছিলেন। এই দু’টি ছাড়াও শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে আরও দু’টি সুন্দরবনের বাঘ ছিল তাঁর সার্কাসে। প্রিয়নাথ মনে করতেন, লক্ষ্মী-নারায়ণের মতো পরাক্রমশালী বাঘ  আর কোথাও ছিল না। এই বাঘেদের নিয়ে খেলা দেখানো সম্পর্কে প্রিয়নাথ লিখেছেন-‘বিলাত-ফেরৎ সম্ভ্রান্ত লোকেদের মুখ হইতে শুনিয়া, সংবাদপত্রে পাঠ করিয়া কিম্বা ছবি দেখিয়া ব্যাঘ্র শিক্ষার আশ্চর্য্য আশ্চর্য্য সংবাদ জানিতে পারি বটে, কিন্তু রিক্তহস্তে, সামান্য বস্ত্রে (মোটা কোট প্যান্ট আদৌ নহে- কেবল গেঞ্জী ও ট্রাউজার মাত্র) কোনও লোককে সতর্কতার জন্য ক্রীড়াকালে দাঁড় না করাইয়া, অর্ধঘণ্টার উপর বাঘে মানুষে প্রকৃত মল্লযুদ্ধ এবং ব্যাঘ্রগুলিকে ভীষণ উত্তেজিত করিয়া পিঞ্জরের প্ল্যাটফর্মের উপর একেবারে লম্বমান হইয়া শয়ন ও লম্ফত্যাগ পূর্বক ব্যঘ্রদ্বয় কর্তৃক গ্রীবাদেশ ঘন ঘন দংশন করানো ও পরস্পর ঘন ঘন চুম্বন ও আলিঙ্গন গ্রহণ এবং লোমহর্ষন শোণিতশোষক ব্যাপার আর কেহ কোথাও দেখাইয়াছেন কি না বলিতে পারি না।‘ বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে এই ভয়ঙ্কর বাঘে মানুষে টানাটানির খেলা অন্যান্য দেশী বিদেশী সার্কাসের সঙ্গে প্রফেসর বোসের সার্কাসের তফাৎটা গড়ে দিয়েছিল।

প্রফেসর বসুর শিষ্য বীর পবনচাঁদ একদিকে ছিলেন ব্যায়ামবীর, অশ্বক্রীড়ক  আবার  তাঁর ট্রাপিজের খেলা ছিল অতুলনীয়, যে কোনো ইউরোপীয় শিল্পীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো। তাঁর খেলা দেখে ফয়জাবাদ ডিভিশনের তৎকালীন কমিশনার কর্ণেল ফাণ্ডাল ক্যুরি জানাচ্ছেন- ট্রাপিজের ওপর বীর পবনচাঁদের খেলার থেকে ভালো খেলা আমি ইংলণ্ডে দেখি নি। বোসের সার্কাসে খুব সামান্য কাজে যোগ দেওয়া কিশোর পবনচাঁদ ধীরে ধীরে নিজের অধ্যবসায়ে, প্রিয়নাথের শিক্ষায়, হয়ে ওঠেন এক বিস্ময়কর সার্কাসশিল্পী। ১৮৯০ সালে উজ্জয়িনী শহরে কালবসন্ত এসে কেড়ে নেয় এই কিংবদন্তি সার্কাসশিল্পীকে।

১৯০০ খ্রীস্টাব্দে পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুর উদ্যোগে ভারতীয় শিল্পী ও ব্যায়ামবীরদের যে দলটি গিয়েছিল প্যারিসে,  সে দলে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন পান্নালাল বর্ধন। প্যারিসের সেই প্রদর্শনীতে তাঁর হরাইজন্টাল বারের খেলায় মুগ্ধ হয়েছিল দর্শকরা। প্রিয়নাথ বোসের এই প্রিয় ছাত্রটি গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসে ল্যাডার, ট্রাপিজের খেলা, ভল্টের কসরত, বাঘের সাথে খুনসুটি দেখিয়ে দর্শককে মোহিত করে দিতেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ বংশীবাদকও। ইস্টবেঙ্গল রেলওয়েতে চাকরি নিয়ে চলে যান গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসকে বিদায় জানিয়ে। পৃথিবী থেকে তাঁর চিরবিদায়ের কারণ- কুকুরের কামড়।

বোসের সার্কাসের এক বিস্ময়কর প্রতিভার নাম মন্মথনাথ দে। জিন ছাড়াই ঘোড়ার পিঠে চড়ে যেতেন তিনি। চোখ বাঁধা থাকত। সেইভাবেই নানা ক্রীড়াকৌশল দেখিয়ে মুগ্ধ করে দিতেন দর্শককে।

এই সার্কাসেরই আর এক বিস্ময়কর প্রতিভা ফণীন্দ্রনাথ নাথ। দ্রুত গতিতে ছুটে চলা ঘোড়ার পিঠে ডিগবাজি খেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন। জুড়ি ঘোড়া ছুটিয়ে একসঙ্গে দু’টি বালককে নিয়ে অত্যাশ্চর্য নানা খেলা দেখিয়ে দর্শকদের মাতিয়ে রাখতেন।

শিশুকাল থেকে প্রফেসর বোসের সার্কাসে যুক্ত ছিলেন দুই ভাই- বীরেন্দ্রনাথ ও হীরেন্দ্রনাথ। প্রিয়নাথ বসুর কাছে তাঁদের শিক্ষা শুরু। এরপর মন্মথনাথ দে ও এক মার্কিন প্রশিক্ষক গাস বার্ণসের কাছে অশ্বরোহনের প্রশিক্ষণ। ধীরে ধীরে এই দুই ভাই হয়ে উঠলেন প্রথম শ্রেণীর জকি। ট্রাপিজ, স্প্রিং বোর্ড, সাইক্লিং, জাগলিং নানা খেলায় বোসের সার্কাসের সম্পদ ছিলেন এই দুই ভাই। শোনা যায়, শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরবর্তীকালে জিমন্যাস্টিক্স ও অশ্বারোহীর খেলা থেকে সরে আসেন বীরেন্দ্রনাথ। ক্লাউনের ভূমিকায় অভিনয় শুরু করেন। প্রফেসর বোসের সার্কাসে এক জার্মান ক্লাউন লু রোমা মাতিয়ে রাখতেন তাঁবুকে। সেইসময় তাঁর বেতন ছিল মাসে চারশো টাকা। বাঙালি বীরেন্দ্রনাথও ক্লাউনের চরিত্রে ছিলেন সমান দক্ষ। পাশাপাশি ম্যাজিক শো ও বন্যজন্তু প্রশিক্ষণেও সমান পারদর্শী। আর এক ভাই  হীরেন্দ্রনাথও দক্ষ পশু প্রশিক্ষক হ্হয়ে উঠেছিলেন। শোনা যায় বোসের সার্কাস বন্ধ হয়ে গেলে এই দুই ভাই উইলসন্স আমেরিকান সার্কাস, ফিলিপ্স সার্কাস, সেলার্স সার্কাস, বিষ্ণুপন্থ ছত্রের সার্কাসে কিছুকাল কাটান। এরপর শুরু করেন নিজেদের সার্কাস- নিউ বেঙ্গল সার্কাস। ছ’সাত বছর বাংলা ও বিহারের নানা অঞ্চলে ঘুরলেন। কিন্তু কিছু ধারাবাহিক সমস্যা দেখা দিল তাঁবুতে। তাঁবু গোটাতে হলো নিউ বেঙ্গল সার্কাসকে।

বারাণসীর এক মুসলমান পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন বিটা। যোগীন্দ্রনাথ পালের কাছে তালিম নেন অশ্বারোহণের। বোসের সার্কাসদলে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা এই বিটা হয়ে উঠেছিলেন দলের সম্পদ। বোসের সার্কাসের অশ্বারোহী শিল্পীদের ক্রীড়া দক্ষতার কাছে সেই সময়ের বিদেশী শিল্পীরাও ম্লান হয়ে গিয়েছিলেন।

প্রফেসর বোসের সার্কাসে ট্রিপল হরাইজন্টাল বারের খেলা দেখানো বেণীমাধব ঘোষের জন্ম ১৮৬২ সালে, কলকাতার মানিকতলায়। উঁচু থেকে নিক্ষিপ্ত ভারী লোহার বল বুকে নিয়ে অনায়াসে খেলা দেখাতেন ব্যায়ামবীর বেণীমাধব। পরবর্তীকালে ‘স্কুল অফ ইণ্ডিয়ান অ্যাক্রোবাটস’ নামে এক ব্যায়ামের আখড়া স্থাপন করেন। অতি বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তাঁর আখড়া চালিয়েছিলেন। বাংলার সার্কাসশিল্পীদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণের আঁতুরঘড় যে কুস্তি ও ব্যায়ামের আখড়াগুলি, বেণীমাধবের এই আখড়া তাদের মধ্যে একটি। সে যুগে বহু বাঙালির শরীরচর্চার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এই আখড়াটি। বেণীমাধব এক সময় ‘অ্যাক্রোব্যাট’স সার্কাস’ নাম দিয়ে একটি দল খুলেছিলেন। পরবর্তীতে ‘প্রফেসর ঘোষের সার্কাস’ নাম দিয়ে আরও একটি সার্কাস চালু করেন।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply