রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১৮। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

তৃতীয় চিঠি

 

লক্ষীপুর লেক-এর স্কেচ

 

  মূলনাথ, জানুয়ারী ২০

 

আমি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি, আমার এবারের মূলনাথ যাত্রা কিছুটা হলেও স্বাস্থোদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত। আর এবারে আমার উচিৎ সেই কাজে কতদূর উন্নতি হল তার রিপোর্ট দেওয়া। সেকথা বিস্তারিত না লিখলে এই মফঃস্বলের জীবন আমাকে যা দিয়েছে, সে বিষয়ের প্রতি সুবিচার করা হবে না।

যথারীতি দীর্ঘ ক্লান্তিকর নৌকাযাত্রার পর আমি সুখসাগর পৌঁছোলাম সকাল দশটা নাগাদ। সেখানে পৌঁছে দেখি আমার জন্য সবকিছু সেই সক্কালবেলা থেকে তৈরি  হয়ে বসে আছে— চাকরবাকর, চা, টোষ্ট আর একটা জিন পড়ানো ঘোড়া। আমিও তাড়াহুড়ো করে ঐ বিনা অ্যালকোহলওয়ালা ‘স্টিরাপ কাপ’ (১) থেকে ঢক করে চা টুকু মেরে, ঘোড়ার জিনের সামনের দিকে একটা কাচা সুতির কাপড় ঝুলিয়ে রওনা দিয়ে দিলাম। এদিকে যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। এই মাথার যন্ত্রণা আগের দিন থেকে আমার পিছু ধরে আছে। ভাবলাম, কুড়ি মাইল পথ! ভালোই শুরু হল! যদিও আগের অভিজ্ঞতা আমার মনে কিছুটা হলেও আশা জাগিয়ে রাখছিল।

প্রথম ধাপের গন্তব্য নয় মাইল দূরের একটা জায়গা, নাম নাকলি। নিরবিচ্ছিন্ন মাথার যন্ত্রণা আর মাথার ওপর গনগনে সূর্য নিয়ে এই পথটাকেই কমসে কম পঞ্চাশ মাইল মনে হচ্ছিল। কিন্তু নাকলি পৌঁছে আমার মনে সাহস এল। দেখলাম, সেখানে আমার জন্য যে দ্বিতীয় ঘোড়াটা অপেক্ষা করছে, সেটা আমার পূর্বপরিচিত টোবি। টোবি আমার খুব পছন্দের ঘোড়া। ওর ওপর সওয়ারি করা অত্যন্ত আরামদায়ক ব্যাপার। টোবি বিশ্রাম টিশ্রাম নিয়ে একেবারে তাজা হয়ে ছিল। আমি তার ওপর চড়তে না চড়তে সে সহিসের হাত থেকে লাগাম ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটতে শুরু করে দিল। তার ছোটার গতি দেখে মনে হচ্ছিল যে সে বুঝতে পেরেছে যে সে বাড়ি যাচ্ছে। এবার (আমার মনের আশা আমাকে ফিসফিস করে বলল) বোধহয় মাথার যন্ত্রণাটা চলে যাবে। জানি, এই মাথার যন্ত্রণা একখানা আস্ত শয়তান, যাওয়ার আগে আমাকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে যাবে, কিন্তু প্রথম দুই মাইল একেবারে সহ্যের বাইরে কষ্ট হতে লাগল। মনে হল আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাব। যাই হোক, মনে সাহস নিয়ে কোনওমতে সামনের দিকে ঝুঁকে বসলাম। ঘোড়া যখন তৃতীয়বারের মত কদমতালে চলা শেষ করে এনেছে, প্রতিবার কদমতালেই আমার হাল খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, আমার মস্তিস্কটা একটু শিথিল হল, মাথার ব্যাথাটাও আস্তে আস্তে কমতে লাগল। ঘোড়া যখন চতুর্থ কদমতালের মাঝখানে, আমি অবাক হয়ে দেখলাম দূর থেকে একটা ঘোড়ার ‘বগি’ গাড়ি আসছে। যদি দেখা যায় এই গাড়িটা এই শেষ চার মাইল আমাকেই নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নাই। তাই-ই হয়েছে। টোবিকে ছেড়ে দিয়ে আমি লাফ দিয়ে গাড়িটায় চড়ে বসলাম। বেচারা টোবিকে দেখে মনে হচ্ছে সে রোদের মধ্যে দিয়ে নয়, নদীর মধ্যে দিয়ে ছুটে এসেছে। গাড়িতে আমার পাশে বুড়ো বাচাল সহিসটাও চেপে বসল। আমরা মূলনাথের দিকে রওনা দিলাম। মূলনাথ পৌঁছোতে বেলা তিনটে বেজে গেল। ততক্ষণে আমার সারাদিনে ঘন্টাপাঁচেক ঘোড়ার পিঠে কাটানো হয়ে গেছে।

সেখানে এক অত্যন্ত আন্তরিক আপ্যায়ন পাওয়া গেল। আর তারপর, কী খাবেন কী পান করবেন কোথায় বিশ্রাম নেবেন ইত্যাদি হাজারো প্রশ্নের উত্তরে আমি বললাম আমাকে শুধু চা আর পাউঁরুটি দিন। এই খাবারটুকু আর স্নান, এ ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছুই চাই না। ইতিমধ্যে মাথাব্যাথা সম্পুর্ণ গায়েব হয়ে গেছে। আমি পুরোপুরি সুস্থ্ হয়ে গেছি। যেন আমি গত একমাস চিকিৎসাধীন ছিলাম— আর টোবি ছিল আমার ডাক্তার। সুতরাং তোমরা দেখতেই পাচ্ছ, আমি কিন্তু তোমাদের একজন অশক্ত রোগীর রোগযন্ত্রণার বিবরণ দিয়ে বিব্রত করতে চাইছি না, আমি তোমাদের মফঃস্বলের জীবনযাত্রা ও তার অভ্যাসের গুরুত্ব বোঝাতে চাইছি। দেখাতে চাইছি কীভাবে শুদ্ধ বাতাস আর জোরালো শারীরিক কসরত ডাক্তারের ওষুধ আর পাঁচনের জায়গা নিতে পারে। সেই যে বুড়ো রক্সবার্গ লেয়ার্ড (২) বলেছিল না, এসব জিনিস ডাক্তার বদ্যি ওষুধপত্তরের থেকে ঢের ভালো। আর সম্ভবত মনের জোরের ওপরও খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে না। আসার সময় রাস্তার ধারে একখানা আরামদায়ক সরাইখানা পেয়েছিলাম। সেটার কথা মনে করে পরে আমার মনে হল, এই যে জায়গাটা আমাদের বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা দিচ্ছিল, এটা না থাকলে আমাদের যাত্রা কখনোই শেষ হত না, আর আমার সুস্থ্ হয়ে ওঠাও আরও মাসখানেক পিছিয়ে যেত। এই যে ভালো জিনিসের প্রতি আমাদের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ, এতে শেষপর্যন্ত দেখা যায় ভালোই হয়।

মূলতঃ যে বিষয় নিয়ে এই চিঠিটা লিখব ঠিক করেছি, সেই বিষয়ে প্রবেশ করার আগে বলে নিই, আমি খুব সম্প্রতি কৃষ্ণনগর সিভিল স্টেশনে গেছিলাম। এই জায়গাটাও মফঃস্বলের জীবনযাত্রার দু-একটা চিহ্ন বহন করছে। পরে হয়ত সুযোগ হবে না, তাই এই ফাঁকে যেমন যেমন দেখেছি তেমন তেমন বলে রাখি। যদিও আমি খুব অল্প সময়ের জন্য গেছিলাম তাই বলার মত খুব বেশী কিছু দেখার সুযোগ হয়নি।

ডঃ এ— নিমন্ত্রণ করেছিলেন মিঃ এফ—কে, তার ওখানে এক দু দিন কাটিয়ে আসার জন্য। সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করা হলে কয়েক সেট সুতির জামাকাপড় আর কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী গুছিয়ে একজন খিদমতগার ও একজন বেয়ারা দিয়ে রাত থাকতে (রেলগাড়ি নেই যে) হাতির পিঠে করে পাঠিয়ে দেওয়া হল। সকাল আটটা নটার মধ্যে আমরা মুলনাথ থেকে ঘোড়ার গাড়িতে রওনা দিলাম। প্রথম তিন মাইল ছবির মত সুন্দর আর আমগাছের ছায়ায় ঢাকা গ্রামের পথ দিয়ে গেলাম। সেখানে দেখলাম আমাদের ঘোড়া আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ভোর হতে না হতে ঘোড়াগুলোকে এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বগি গাড়ির ঘোড়াগুলোকে সহিসের সঙ্গে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হল। গাড়ির ঘোড়া ফেরত পাঠিয়ে আমরা আমাদের ঘোড়ায় চড়ে বসলাম। ঠিক যেরকমটা চাই, সেরকম মনোরম সকাল। সুন্দর ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, ছবির মত সুন্দর গ্রামদেশ। শহরের লোক যাকে বলবে জবরদস্ত ঘোড়সওয়ারি, সেরকম জবরদস্তভাবে ঘোড়া চালিয়ে সকাল দশটার একটু পরে আমরা মূলনাথ থেকে ষোল মাইল দূরে বগাডাঙা  বলে একটা জায়গায় পৌছোলাম।

বগাডাঙা  মূলনাথেরই অধীনে থাকা একটা আউট ফ্যাক্টরি। স্বাভাবিকভাবেই এখানে আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য কোনও গৃহকর্তা উপস্থিত ছিল না। কিন্তু বাংলোটি ছিল অতি আরামদায়ক। একজন ভ্রমণকারীর যতটা প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই আসবাব— ইঁট আর লোহা দিয়ে বানানো একখানা মজবুত নীচু ঘর, মাথায় খড়ের চালা। এরকমটা একমাত্র ব্লেক সাহেবের কবিমনই কল্পনা করতে পারতেন। সেই যে উনি বলে গেছে না ‘খড়ের চাল বাদামী সোনার রঙ’ (৩)। এখানেও বাড়ির চারপাশে ছড়ানো ফাঁকা জমি দেখে মনে হয় মূলনাথের সুরূচির প্রসারিত হাত এখানেও পৌঁছেছে। সাত আট বছর আগে লাগানো সমস্ত গাছ বড় হয়ে ঝাঁপালো হয়ে উঠেছে। এখন সেগুলো বাগানের শোভাই বাড়াচ্ছে না, পুরো এলাকায় ছায়া দিচ্ছে, আরাম দিচ্ছে, আশ্রয় দিচ্ছে।

বলা বাহুল্য, দুজন চাকর আমাদের অনেক আগে এখানে এসে পৌঁছেছে। ফলে গিয়ে গিয়েই আমরা স্নান আর পোশাক পরিবর্তনের বিলাসিতাটা করতে পারলাম। এটুকু করেই আমরা ব্রেকফাস্ট করতে বসে গেলাম। ব্রেকফাস্টও এরকম পরিস্থিতিতে যতোটা সাদামাটা হওয়া যায়, ততোটাই ছিল। গরম টোষ্ট ডিম আর চা। ব্যায়াম করলে যেরকম ক্ষিধে পায়, আমাদের তখন সেরকম ক্ষিধে।

 

অনুবাদকের টীকা

১। স্টিরাপ কাপঃ বিদায়ী কাপ। বাড়িতে অতিথি এলে সেই অতিথি চলে যাবার সময় ঘোড়ায় উঠে পড়ার পর তার হাতে বিদায় নেওয়ার ঠিক আগে যে ওয়াইনের কাপ বা গ্লাস তুলে দেওয়া হয়, তাকে স্টিরাপ কাপ বলে। স্টিরাপ বা ঘোড়ার রেকাবে পা গলিয়ে দেওয়ার পর এই কাপ তুলে দেওয়া হয় বলে এই নাম।

২। রক্সবার্গ লেয়ার্ডঃ সম্ভবত স্কটল্যান্ডের রক্সবার্গের কোনও জমিদারের কথা বলা হচ্ছে। লেয়ার্ড বলতে ছোট জমিদারকেই বোঝায়।

‘খড়ের চাল বাদামী সোনার রঙ’ ঃ এখানে কবি উইলিয়াম ব্লেকের (১৭৫৭-১৮২৭) কথা বলা হচ্ছে। তিনি ১৮০০ থেকে ১৮০৩ পর্যন্ত পশ্চিম সাসেক্সের ফেলফ্যামে একটি কুটিরে বাস করেন। এই কুটির তার অত্যন্ত প্রিয় ছিল। এখানে বসেই তিনি তার দীর্ঘকবিতা ‘জেরুজালেম’ লেখেন (১৮০৩-০৪-এ লেখা, প্রকাশিত হয় ১৮২০ সালে)। এখানে সেই বাড়ির কথাই বলা হচ্ছে।

 

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply