লাল রঙের দেশ মারয়ুল । পর্ব ১ । জুলে! খামজং!! । লিখছেন কৌশিক সর্বাধিকারী

কুশক বাকুলা রিনপোচে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে উত্তরদিকে খারদুংলার দিকে তাকালেই একটু উত্তরপশ্চিমে দুধসাদা শান্তিস্তূপ  আপনার নজরে পড়তে বাধ্য। ধরা যাক এই শান্তিস্তুপের পায়ের কাছে চাংস্পা-তেই এক লাদাখি পরিবারের বাড়ির একপাশে একটা ছোট্ট ছিমছাম ঘরোয়া গেস্টহাউসে আপনি আগামী কয়েকমাসের লেহ-বাসের জন্য বাসা ঠিক করলেন। লেহ টোকপোর ধারে একসার মালচাং গাছ পেরিয়ে প্রায় চার-পাঁচবিঘে জায়গা নিয়ে এই পরিবারটির ঘর-গেরস্তি, বসতবাড়ি, গেস্টহাউস, সবজি বাগান আর ছোট একটা আপেল-অ্যাপ্রিকটের বাগিচা। কয়েকটা দিন উচ্চতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে ঘরে শুয়ে বসে ভাল মতো বিশ্রাম নিয়ে এই জুনের প্রথম সপ্তাহের একদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হল চারপাশটা একটু পায়ে হেঁটে দেখে নিলে কেমন হয়!
পাহাড়ি পেঁয়াজ, কোৎসে

জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনা অনুযায়ী জুন মাসের প্রথমে লেহ-তে সকাল ৫.১০ নাগাদ ৬২ ডিগ্রী উত্তরপূর্ব থেকে সূর্য ওঠার কথা লেখা থাকলেও পাহাড়ের পেছন থেকে প্রথম সূর্যরশ্মি অতিকায় পেন্সিলের মত দেখতে য়্যুলাত গাছের ফাঁক দিয়ে বাগানে এসে পড়তে পড়তে প্রায় ছ’টা বেজে যায়। আপনি অবশ্য সূর্যোদয়ের অনেক আগেই যথাবিহিত বেশভূষা করে বেরিয়ে পড়েছেন৷ বাড়ির সামনে হাতার মধ্যেই বিঘে দুয়েক চৌকো জমি।  ছোট ছোট ভাগ করে আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলো, বকচয়, পালং, গাজর, টমেটো, ধনেপাতা, পুদিনা লাগানো হয়েছে। আছে পাহাড়ি জংলী পেঁয়াজ কোৎসে, লাদাখি রান্নার জরুরি উপকরণ। জমির দুই দিকে ফুলন্ত পিটুনিয়া গাছের সারি, অপর দুই দিকে গোলাপে কুঁড়ি এসেছে সদ্য। পূর্বদিকে অন্য একটা নীচু জমিতে কয়েকটা অ্যাপ্রিকট আর আপেল গাছ, দুটো চেরী গাছ, একটা প্লাম, একটা পীয়ার। অ্যাপ্রিকট আর চেরীর ফুল কবেই ঝরে গেছে, এখন গাছে মটরদানার আকারের ফল, আপেলের ফুলও শেষের মুখে। বাড়ির সামনে একটামাত্র লাইলাক গাছ, ফুলে ফুলে ছয়লাপ।

লাইলাক মঞ্জরী
পিছনে গোয়ালঘর, তাতে তিনটে জো আর দুটো গাধাকে সদ্য জাবনা দেওয়া হয়েছে, পশুগুলোর চেহারায় স্বাভাবিক লাদাখি নির্লিপ্তি, নিশ্চিন্তি এবং ঔদাসীন্য। গোয়ালের পাশেই একটা জলের নল, খোলা, তাতে কল নেই। কে জানে কোন উৎস থেকে আসা পরিষ্কার স্বাদু জল অবারিত ধারায় বয়ে সরু কাটা খাল দিয়ে বাগানে জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। খালের ধারে অগুনতি সপুষ্প আইরিস গাছ, স্থানীয় ভাষায় এই ফুলকে বলে টেসমা মেন্তক। সর্বচরাচর শান্ত, শুধু একজোড়া ওরিয়েন্টাল ম্যাগপাই ব্যস্তসমস্ত হয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে পোকা খেয়ে বেড়াচ্ছে আর মাঝেমাঝেই ক্যাঁচমেচে গলায়  জো-গুলোকে বকছে।
পরিবারের কর্ত্রী ছোটখাটো চেহারার সদাহাস্যমুখী মধ্যবয়সী সোনম খুব ভোরে উঠে এই গৃহযন্ত্র  সচল করে তোলেন। অত্যন্ত কর্মঠ এবং স্নেহমহী এই মানুষটি আশেপাশের সবার ‘আনেলে’। ‘আনে’ মানে মাসি। লে শব্দটা লাদাখে বহু অর্থবাচক, এক্ষেত্রে সম্মানসূচক। মা যেমন আমালে। এছাড়া জুলে (নমষ্কার), ওলে (আচ্ছা ঠিকাছে) ইত্যাদি প্রভৃতি। সেসব ক্রমশ প্রকাশ্য।
আনেলের দিনচর্যা শুরু হয় সূর্য ওঠার আগে। প্রতিদিন ভোরে টোকপোয় জল এলে উনি সেই নতুন প্রবাহ সংগ্রহ করে,  তথাগতের সামনে রুপোর পাত্রে জল দেন, ঝকঝকে মাজা কাঁসার পাত্রে চমরীঘৃতের দীপ জ্বালেন, তার পর সদর দরজার পাশে, পপলার গাছের নীচে বাড়ির পাঁচিলের উপরে একটা বড় মাটির ধুনুচিতে ধোঁয়া দেন। এর নাম সুর। মধু ,গুড়, চিনি এই তিন রকম মিষ্টদ্রব্য বা নরসুম আর দই, দুধ, মাখন এই তিন রকম শ্বেতদ্রব্য কারসুমের সঙ্গে ফে বা যবের ছাতু শুকনো করে মেখে সুর বানাতে হয়, আকারে প্রমাণ সাইজের মুড়ির মোয়ার দেড়া। তা ছাড়া যা কিছু ভালো, যা প্রাণে চায়, যেমন খুরমানি, কাজু, কিশমিশ, আখরোট – সেইসবও যোগ করা যায় সুরে। শুদ্ধ চিত্তে, ধুনুচিতে কাঠকয়লার আগুনের উপর গোটাতিনেক সুরের গোলক চাপিয়ে রেখে দেওয়া হয় খোলা জায়গায়। এই অগ্নিপাত্র থেকে যে ধোঁয়া ওঠে তা আঘ্রাণ করতে পিতৃপুরুষ ও হিমশীর্ষনিবাসী দেবতারা নেমে আসেন দোরগোড়ায়। সূক্ষ্মদেহ বিধায় তাঁদের জন্যে এমন লঘুপথ্যের ব্যবস্থা। এমনটাই শিশুকাল থেকে জেনে এসেছেন আনেলে। এটি তাঁর সংসারের নিত্যকর্মপদ্ধতি। আনেলে আরও বলেন, মৌনব্রতপালন করে উপবাস করেন যে শ্রমণরা, তাঁদেরও নাকি পেট ভরে যায় সুরেরই গন্ধে। তবে যাযাবর জীবনে এই আচারটি পালন করা চলে না, পিতৃপুরুষেরা মরমানুষের মতো সঞ্চরণপটু নন কি না। তাঁরা পুরুষানুক্রমিক বসতবাটির চারপাশে থাকতেই পছন্দ করেন। গীতায় উল্লিখিত  ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মাগ্নৌব্রহ্মণাহুতম আপনার স্কুলবেলায় শেখা ছিল, সেটি ভাবতে ভাবতে আপনি এগোলেন প্রাতঃভ্রমণের পথে।
আনেলের বাড়ি
বাড়ির গেট খুলেই পাবেন আপার টুকচা রোড। আপনি বাঁদিকের রাস্তা ধরলেন। সঙ্গী হল বাড়ির সর্বক্ষণের পাহারাদার কালোসাদা তিব্বতি ম্যাস্টিফ, যাকে আপনি ভালবেসে দাবা বলে ডাকেন। দাবা ঘন ঘন লেজ নেড়ে আপনাকে এগিয়ে দেবে সামনের মোড়টা অবধি, তারপর ফিরে যাবে নিজের জায়গায়। চুকর পার্ট্রিজ আর পায়রারা এতক্ষণে লেগে পড়েছে রাস্তার দুধারে সদ্য চষা জমি থেকে ঘাসের আর যবের দানা খুঁটে খাবার কাজে। ঠিক এখান থেকে দক্ষিণে কোবাল্ট ব্লু রঙে সদ্য ঘুমভাঙা লেহ শহরকে দেখা যায়। তার পিছনে এয়ারস্ট্রীপ আর তারও পরে সিন্ধুনদ পেরিয়ে স্তোক কাংড়ি আর স্তোক রেঞ্জের মাথায় ঝকঝকে সাদা বরফের টুপি।
আপনি মিনিট পাঁচেক হেঁটে এসে পড়লেন এয়ারপোর্ট থেকে শান্তিস্তুপ যাওয়ার বড় রাস্তায়, এইবার ডান দিকের পথ ধরে চলতে শুরু করবেন। রাস্তা বেশ চড়াই, তাই সময় লাগবে বেশ। ইয়ুরথাং রোডের যেখান থেকে শান্তিস্তুপে চড়বার পাঁচশো পঁচাত্তরটা সিঁড়ির প্রথম ধাপ শুরু, সেখানে রাস্তার ধারে একটা বড় ধর্মচক্র  মহাউৎসাহে ঘুরিয়ে যাচ্ছে তিনটে স্কুলপড়ুয়া মেয়ে। সেই সঙ্গে মোবাইলে জুম্বা-র ভিডিও চালিয়ে খুশির নাচ। ডানদিকে চলে গেছে চাংস্পা রোড। এখানেই হঠাৎ খেয়াল করবেন চওড়া পীচ রাস্তার মাঝখানে পাশাপাশি রাখা দুটো লোহার পাটাতনের দরজা হাট করে  খোলা। ভেতরের অন্ধকারের মধ্যে কেবল আন্দাজ করা যায় যে পাতালপুরীর সিঁড়ি নেমে গেছে সোজা। দেখবেন ম্যাজিকের মতো সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছেন এক হাসিমুখ মানুষ। আপনি যারপরনাই অবাক হবেন, তবে কাছে গিয়ে, যথোচিত সম্ভাষণ করে বলবেন জুলে! এমন কোনও লাদাখপা নেই, যিনি এই সম্বোধনের প্রত্যুত্তর না দিয়ে চলে যাবেন।
লাদাখে, যে কোনও গ্রামের সবথেকে উপরের বাড়িটি যে পরিবারের, সেই পরিবারের প্রধান ব্যক্তিকে বলা হয় ছুরপোন, অর্থাৎ জলরক্ষক। ইনি গ্রামের একজন অতি সন্মানীয় এবং দায়িত্ববান মানুষ। আবহাওয়া যেমনই হোক, বরফ পড়ুক আর শুকনো থাক, সকালের প্রথম পাখি ডাকলেই পাথর সরিয়ে কিছু কিছু নালায় ইনি জল বইয়ে দেন, আর গোম্ফার সামনেকার লুংতার ছায়া পবিত্র পাথরটাকে ছুঁলে আবার অন্য নালাগুলোয়।
লাদাখি ভাষায় জল-কে বলে ছু। গোটা লাদাখে গ্রামগুলো সবই বেড়ে উঠেছে কোন না কোন পাহাড়ি নালার ধারে, যার স্থানীয় নাম টোকপো। খারদুং গ্লেসিয়ার থেকে নেমে আসা লেহ টোকপোর দুপাশে উপর থেকে নীচে গড়ে উঠেছে পরপর আটটা গ্রাম: গ্যাংলাস, গোম্ফা, সংকর, চাংস্পা, লেহ, টুকচা, সেনম আর স্কারা। তবে এখন কেবল গ্যাংলাস আর স্কারা-ই স্বতন্ত্র গ্রাম, বাকীগুলো লেহ শহরের পেটের মধ্যে ঢুকে গেছে।
হিমবাহ থেকে বয়ে আসা এইসব নালার জল উজানে বিভিন্ন ছোট ছোট নালা বা য়ুরগো দিয়ে বইয়ে দেওয়া হয়, একটা ধারা গ্রামের মন্দির বা গোম্ফার দিকে, কিছু রাংথাক-এর দিকে, কিছু ডানদিকের বাড়ি আর ক্ষেতগুলোতে, কিছু বামদিকে। সবথেকে উপরে একটা ছোট চৌবাচ্চা বানিয়ে তার থেকে অনেকগুলো নল লাগিয়ে সবগুলো বাড়িতে চব্বিশঘণ্টা পরিষ্কার খাওয়ার জল সরবরাহের ব্যবস্থা আছে। শীতের সময়ে টোকপো-তে জল কমে আসে। বরফ জমে গেলেও তলা দিয়ে তিরতির করে বয়ে যায় জল। গ্রামে তখন শুরু হয় সর্বজনগ্রাহ্য রেশনিং সিস্টেম। বন্ধ থাকে ওয়াটারমিল বা রাংথাক।
আমাদের ছুরপোন সাহেব স্টেনজিং নামগিয়াল এই পাশের পাড়াতেই থাকেন। উনি জানালেন, বেশ কয়েক বছর আগে লাদাখ হিল কাউন্সিলের উদ্যোগে  লেহ শহরের অনেকটা জায়গা জুড়ে মাটির নীচে জলের পাইপ বসানো হয়। এই পাইপের উৎসমুখ সাউথ পুলুর উত্তরে, খারদুং গ্লেসিয়ারের নীচে। আগাগোড়া এই পাইপটি মাটির অনেকটা নীচে হওয়ায় জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসে যখন মাইনাস ২৫ ডিগ্রী তাপমাত্রা হয়ে যায়, তখনও পাইপের মধ্যে জলের প্রবাহ চালু থাকে। মাটির গভীরে হবার কারণেই জল জমে বরফ হয়ে যায় না। উৎসমুখ হিমবাহের নীচে হওয়ায় স্তরীভূত বরফের চাপে একটি জলস্রোত বজায় থাকে৷ প্রাকৃতিক ভাবে পরিশ্রুত, নানান খনিজে সমৃদ্ধ সেই জলই লেহ শহরের বাড়িতে বাড়িতে পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। জায়গায় জায়গায় জলপ্রবাহের অভিমুখ বদলে দেবার জন্যে ভালভ এবং স্টপকক রয়েছে। লোহার দরজা খুলে মাটির তলার গহ্বরে স্টিয়ারিং এর মতো বড় লোহার চাকা ঘোরালেই জলের প্রবাহ বদলে যায়। ছুরপোন সাহেব খুব ভোরে উঠে বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ভূগর্ভস্থ চাবি ঘুরিয়ে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেন। গ্রামীণ জীবনযাত্রা ক্রমশ নাগরিক হয়ে উঠলেও জলসাম্যের এই নিয়মের এখনো বদল হয়নি।
বাবার হাতে শিং, ছেলের হাতে হাল, মায়ের হাতে বীজ

আপনার এখন গন্তব্য কোনচোক ডোগমো’র বাড়ি। সেখানে আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন সদ্যপরিচিত কয়েকজন স্থানীয় বৃদ্ধ মানুষ। তাঁদের বিভিন্নরকম বিমারির দাওয়াই বাতলে, কলকত্তার গপসপ করতে করতে এক কাপ গরম গরম নুন-মাখন দেওয়া গুড়গুড় চা আর একটুকরো খামির রুটি খাবেন। বাড়ির সামনের জমিতে ততক্ষণে কোনচোকের মা-বাবা চাষের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। দুটো জো-এর ঘাড়ে মালচাং কাঠের য়াসিং বা জোয়াল আর তার সঙ্গে লাগানো শল বা লাঙল। লেহ-র মোতি মার্কেটে দুটো তিনটে বড় বড় চাষের যন্ত্রপাতির দোকান আছে, লোহালক্কড় সেখান থেকে কিনে য়াসিং আর শল কোনচোকের বাবা নিজেই বানিয়ে নিয়েছেন। সদ্যচষা জমি থেকে পোকা বেরোচ্ছে, সেই পোকা খাবার জন্যে লাঙলের পিছনে হাঁটছে গোটাকয় সবুজ ডানা ওরিয়েন্টাল ম্যাগপাই আর তাদের পিছনে যবের বীজ ছড়াতে ছড়াতে যাচ্ছেন কোনচোকের মা।

আপনার প্রাতঃভ্রমণের রাস্তাতে, মোরাভিয়ান মিশন স্কুলের সামনে টুকরিতে করে নানারকম ফুল নিয়ে বসেছিলেন দুই সুন্দরী মালিনী। দোকানে এতো সকালেও মেয়েদের ভিড়। কার্নেশন, নানা রঙের ডায়ান্থাস, আর একটি অচেনা ফুল। আপনি নাম জানতে চাইলেন যেই, হেসে গড়িয়ে পড়লো মেয়েরা। বলল ফুলের নাম বেশরম, সারা শীতে সব ফুল মুরঝে গেলেও এই ফুল গাছ ভরে ফুটে থাকে।
স্কুলের উল্টোদিকের চষা খেত থেকে উঠে এলেন আংমো লামো। হাতে তার লম্বা কাঠের হাতলওয়ালা বেলচা। কিছুটা পথ তার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আপনি জেনে নেবেন রোজ সকালবেলা চার কিলোমিটার উতরাই বেয়ে আংমো নেমে আসেন, নালার উৎসমুখের পাথর সরিয়ে ওঁর ভাগের ফসলের খেতে আসা জল বইয়ে দিতে। আবার চার কিলোমিটার চড়াই ভেঙে ঘরে ফিরে যান। আপনার বিস্ময় দেখে উনি হাসিমুখে বলবেন, করনা পড়তা হ্যায় জী!
এই রাস্তায় দুটো বড় ঝুপসি পাহাড়ি বুনো গোলাপের বা সিয়া-র ঝাড় আছে। একটা মোরাভিয়ান মিশনস্কুলের চত্ত্বরে , অন্যটা চাংস্পা মেন রোডে লেহ টোকপোর ধারে রাইস-বোল রেস্তোঁরার সামনে। গাছভর্তি কুঁড়ি এসেছে, কিন্তু এখনও একটাও ফুল ফোটেনি। তবে মালুম হয়, ‘কাল ছিল ডাল খালি, আজ ফুলে যায় ভরে’ গোছের ঘটনা শিগগিরই দেখা যাবে৷ এখান থেকে নাকবরাবর রাস্তা গেছে মেইন মার্কেটের দিকে। লেহ মেইন মার্কেট একটা বিশাল ইংরজি এল আকৃতির জায়গা। দক্ষিণ থেকে উত্তরে ‘এল’ এর লম্বা বাহুটির সঙ্গে পশ্চিম থেকে পূর্বে ছোট বাহুটির সংযোগস্থলের লাগোয়া উত্তরদিকে রয়েছে লেহ জামা মসজিদ যার উত্তর এবং পূর্বদিক জুড়ে রয়েছে পুরনো লেহ শহর। জামা মসজিদের উত্তর পশ্চিমে একটি অতি প্রাচীন মোটা এবং পেঁচানো গুঁড়ির উইলো গাছ আছে, যেটা নাকি শিখগুরু নানকদেব লাগিয়েছিলেন। গাছের গুঁড়িটি এখনও বর্তমান থাকলেও তাতে প্রাণের কোনও স্পন্দন নেই। গাছের সঙ্গে লাগোয়া গুরুদ্বারে অবশ্য রোজই সাধনভজন আর লঙ্গরসেবা হয়। এখান থেকেই পঁচিশ কদম উত্তরে গেলে পুরনো লেহ’র কন্দুর মহল্লা।
মেইন মার্কেটের দুই বাহুর সংযোগ স্থল থেকে ডানদিকে পঞ্চাশ মিটার গেলেই রাস্তার বাম দিকে পড়বে লালা’জ আর্ট কাফে। প্রায় দুহাজার বছরের পুরনো প্রস্তরোৎকীর্ণ বুদ্ধমূর্তির পাশের এই কাফেটিতে মাঝে মাঝেই দেশী-বিদেশি শিল্পীদের ছবি ও আলোকচিত্রের প্রদর্শনী হয়। বুদ্ধমূর্তির খানিকটা আগে একটা সাদা বিলিতি রোডসাইন বোর্ডে লেখা আছে, ফার্ণডেল রোড, লন্ডন, ৩৯১৭ মাইল। তবে এই সাতসকালবেলায় হাঁটতে গিয়ে লেহ থেকে লন্ডন চলে যাওয়াটা কোন কাজের কথা নয় ভেবে আপনি বামদিকের পাথর বাঁধানো গলিটা ধরলেন, যেটা ঘুরপথে চলে গেছে সেই কন্দুর মহল্লার দিকে।
গোটা লাদাখে এখন কোভিড লকডাউন। সকালে কয়েকঘন্টা শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান খোলা থাকে। কোভিডের জন্যে গতবছরের মতো এবছরও পর্যটক একেবারেই নেই। আর তাই, কন্দুর মহল্লা খোলা থাকলেও লেহ মেইন মার্কেটে দু’ধারের দোকানগুলো একটাও খোলা নেই। পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষদের জীবিকার যা অবস্থা হয়েছে, তাতে এই দু’বছরে লাদাখ প্রাকপর্যটন যুগের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দিকেই প্রায় রওনা দিয়েছে। এতে অর্থাগম ও চাকচিক্য কমছে তা সত্যি তবে সেই একই সঙ্গে যে প্রবলগতিতে চাষের খেতে হোটেল-গেস্টহাউস গড়ে উঠছিলো, তাতে কিছুটা লাগাম পড়েছে৷ ১৯৮৪-র আগে যখন লাদাখে পর্যটন ছিল নগণ্য, তখনও এখানকার অধিবাসীরা দিব্যি আনন্দে বেঁচেবর্তে ছিলেন। গত দেড় দশকের নগরায়ণে শুধু পরিবেশের ভাঁড়ারেই টান পড়েনি, এখানকার অধিবাসীদের সহজ, নির্ভার জীবনযাপনেও নাগরিক কলুষ অনেকটাই ছায়া ফেলছে।
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য মালবিকাগ্নিমিত্রম-এ বিপণিস্থিত কন্দু’র উল্লেখ রয়েছে। কন্দুপক্ক বলে একটি খাবারের উল্লেখও পাওয়া যায়, যা কিনা কন্দুতে পক্ক। এই কন্দু শব্দটি থেকেই এসেছে তন্দুর। এখানে এসে জানলাম তন্দুরের বহুবচন কন্দুর। মানে বেকারির আর কি! একসঙ্গে অনেকগুলো তন্দুর থাকলেই তা কন্দুর। আর যিনি বেকিং এর কাজ করেন, তিনি কন্দুর-মহ্ইনু৷ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের প্রাচীন প্রথার মত পুরোন লেহ-র মুসলমানদের মধ্যেও বাড়িতে রুটি বানানোর চল কম। মহল্লার মাঝে পরপর চার পাঁচটা রুটি বানানোর দোকান থাকে, সেখানেই পাইকারি হারে বানানো হয় মুচমুচে কুলচা আর বিভিন্ন ধরণের তন্দুরি রুটি, নান, তপতান, গিরদা। সবাই সেখান থেকেই নিয়ে যান। মাসকাবারির ব্যবস্থাও খুব চলে।
কন্দুর মহল্লায় কুলচা, গিরদা আর তপতান দিয়ে প্রাতরাশ

কন্দুর মহল্লায় আকবর ওস্তাদের দোকানে গিয়ে দেখবেন এক তন্দুর ভর্তি কুলচা প্রায় তৈরি। অন্য তন্দুরে কাঠের পাঁজা গনগনে হয়ে জ্বলছে। দুপুরের পরে দোকান বন্ধ। একপ্রস্থ কুলচা মচমচে করে ঢিমে আঁচে সেঁকে তুলতে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগে। তাই ভোর তিনটেয় উনুনে আঁচ পড়ে। আকবর ওস্তাদ সখেদে বললেন লকডাউনের জন্যে বিক্রি খুবই কমে গেছে, এরকম আর দু-তিনমাস চলতে থাকলে এখানকার পাট উঠিয়ে চলে যাবেন শ্রীনগর। শ্রীনগর বড়া শহর হ্যাঁয়, উঁহা কী এক গলি মেঁ জিতনা খরিদ্দার হ্যায়, উয়ো লেহ কা পুরা বিজনেস কা সমান। আরও কিছুক্ষণ সুখদুঃখের গল্প করে সাদা তিল আর অ্যামন্ডকুচি ছড়ানো একটা মুচমুচে কুলচা আর এককাপ কাশ্মীরি কাহবা খেয়ে আপনি ফেরার পথ ধরবেন।

ওল্ড লেহ মার্কেট থেকে এবার আবার সেই আপার টুকচা রোড দিয়ে ফেরা। একটু এগিয়ে গেলে টোকপোর ঠিক আগে, বাঁদিকের পড়বে সুকু গার্ডেন কাফে। বেশ বড় বাগান-বাগিচাওলা বাড়ি। বাগানের অনেকগুলো ফুলন্ত আপেলগাছ রাস্তায় ঝুঁকে পড়েছে৷ সেগুলি নিবিষ্ট মনে দেখতে গিয়ে খেয়াল করবেন সুকু পরিবারের কর্তা সত্তরোর্ধ মুরুপ সুকু আপনাকে বলছেন জুলে… খামজং? খামজং মানে ভাল আছেন তো? আপনি বলবেন খামজং-লে, মানে হ্যাঁ হ্যাঁ সব বেশ দিব্যি ভাল। দু-চার কথার পরে বৃদ্ধ নিজেই আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাবেন বাগানের খুরমানি, চেরি এবং বিভিন্ন ধরণের আপেলগাছ। গাছের নীচে সতেজ কোৎসের ঝাড়। পরে কোনও এক ছুটির দিনে বাগানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে যাবার নিমন্ত্রণ নিয়ে আপনি ফের এগোবেন ফেরার পথে। আজ কাজের দিন, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে হবে, দফতর ন’টায়।

সুকুসাহেবের বাগানের আপেল ফুল
(ক্রমশ)
কৌশিক সর্বাধিকারী
লেখক | + posts

কৌশিক সর্বাধিকারী। পেশায় মিলিটারি ডাক্তার, বেশ কিছুকাল কর্মসূত্রে রয়েছেন লাদাখে। সেখানকার নিসর্গ, মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর নিরন্তর সন্ধিৎসার সঙ্গে পাঠকর সাক্ষাৎ ঘটবে এই কলামে।

3 thoughts on “লাল রঙের দেশ মারয়ুল । পর্ব ১ । জুলে! খামজং!! । লিখছেন কৌশিক সর্বাধিকারী

  1. আহা.. পড়তে পড়তে মনটা কেমন মারয়ুমে হারিয়ে গেলো… ❤

  2. প্রথম পর্ব পড়ে প্রত্যাশা বেড়ে গেল। এই কলমের নিবে হীরার দ্যুতি, স্বল্প জানা রঙিন পাহাড়ের দেশটি তার সবকিছু নিয়ে গোটাগুটি উঠে আসতে চলেছে। আগ্রহী কৌতুহল নিয়ে অপেক্ষায় থাকলাম।

  3. দ্বিতীয় পর্বের অপেক্ষায়।
    লেখার গতিময়তা থামতে দেয়না,এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলার পরে আরো একবার পড়তে ইচ্ছে হয়।লেখার স্বাভাবিক সহজ ছন্দ আকর্ষনীয়।
    “লাল রঙের দেশ মারয়ুল “পৌঁছে গেলাম বলে মনে হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *