কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২০। শোভন সরকার
গত পর্বে: ঘাটে বসে চা খেতে খেতে শিবম আর আমি পুরোনো কথা বলতে শুরু করলাম। কথা উঠল তাওয়াইফদের নিয়ে।
‘আম্রপালির নাম শুনেছ?’ শিবম জিজ্ঞেস করল।
‘কোন বিখ্যাত মানুষ? উম… উঁহু, আমের নাম…?’
‘আম? হ্যাঁ, আমের নাম তো সত্যি, তবে আমি বলছি বুদ্ধের সময়ের একজন বিখ্যাত নগরনটীর কথা।’
‘তাইতো, মনে হচ্ছে শুনেছি নামটা। সেই বেশ্যাবৃত্তি ছেড়ে বুদ্ধের আশ্রয়ে এলো যে?’
‘ঠিক। আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ছ’শো কি পাঁচশো শতকে বৈশালীতে রাজার আম বাগানে এক গাছের গোড়ায় পাওয়া গেল এক শিশুকন্যা। কে, কোথা থেকে এল, কেউ জানে না। কোন কোন বৌদ্ধ সাহিত্যে তো বলা হচ্ছে এর জন্ম আমগাছ থেকেই — ‘আম্র পল্লব,’ তার থেকেই নাম ‘আম্রপালি’।
সেই নিষ্পাপ মেয়ে যখন হাসি-কান্নায় খেলতে খেলতে বড় হতে লাগল, বৈশালীর সমস্ত দিকে ছড়িয়ে পড়ল তার রূপের খ্যাতি। এগারো বছর বয়সেই নাকি আম্রপালিকে বৈশালীর সেরা সুন্দরীর তকমা দেওয়া হয়, ভাবো একবার।’
‘এত কম বয়সে? খুবই বাড়াবাড়ি তো!’
‘সেই সময়ের হিসেবে এ অস্বাভাবিক নয়, তবে শোভন, গল্পের ক্লাইম্যাক্স অন্য জায়গায়। কিশোরী বয়সেই আম্রপালি প্রেমে পড়ল পুষ্পকুমার নামে এক যুবকের। ওদিকে যখন আরও বহু পুরুষ তার পাণিগ্রহণের জন্য ঘুরঘুর করে আসছে, পুষ্পকুমারের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। বিয়ের সবকিছু প্রস্তুত। অঘটন ঘটল ঠিক তাদের বিয়ের দিন।
তৎকালীন রাজা মনুদেব আম্রপালিকে একান্তে পেতে চেয়েছিল। কিন্তু যখন সে শুনল যে কোথাকার এক পুষ্পকুমার তাকে বিয়ে করছে, মনুদেব আর চুপ বসে রইল না। রাজার ষড়যন্ত্রে বিয়ের দিনই বরকে হত্যা করা হল নৃশংসভাবে।’
‘তারপর? রাজা আম্রপালিকে বলিউড স্টাইলে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করল?’
শিবম জোরে হাসতে হাসতে বলল, ‘সত্যিই কিন্তু আম্রপালির গল্প নিয়ে একটা বলিউড সিনেমা আছে, ‘আম্রপালি’, ১৯৬৬। তবে নাহ্, সেখানেও সেসব কিছু হয়নি। যাই হোক, বৌদ্ধ সাহিত্যে আমরা জানতে পারি যে রাজা তাকে তুলে নিয়ে গেলেও বিয়ে অন্ততঃ করেনি। ভেবে দেখ, বিয়ে করে ঘরণী করে রাখলে আম্রপালিকে আজ কেই বা চিনত? বিয়ের বরকে হত্যার পর রাজা সবার সামনে ঘোষণা করে দিল যে, আম্রপালি ‘বৈশালী জনপদ-কল্যাণী’ হলেন — তখন শহরের সবচেয়ে সুন্দরী আর গুণী নারীকে এই উপাধি দেওয়া হত। আমার কী মনে হয়, জানো তো? এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ রাজনৈতিক — আম্রপালিকে তিনি কাউকেই পেতে দিলেন না।’
‘এই ‘জনপদ-কল্যাণী’ ব্যাপারটা ঠিক কী? মানে, সে কারও একার নয়, বরং জনপদের সকলের, তাইতো?’
‘একদম ঠিক। তাঁকে নিজস্ব মহল এবং অন্যান্য সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের সম্মানের অধিকার দেওয়া হল, কিন্তু পরোক্ষে ছিনিয়ে নেওয়া হল ব্যক্তিগত সম্পর্কের অধিকার, ভালোবাসার অধিকার। এরপর থেকে আম্রপালি রাজদরবারে রাজনটী হিসেবে নিজের কলা প্রদর্শন করতে থাকেন।’
‘কী মর্মান্তিক!’
‘কেন?’
‘কেন আবার? নিজের ভালোবাসার মানুষকে হত্যা করে তাকে ‘বারনারী’ ঘোষণা করে দেওয়া হল, সেটা মর্মান্তিক ছাড়া আর কী বলব?’
‘হয়তো তুমি ঠিকই বলছ, তবে তখনকার সমাজকে বর্তমানকালের আতশকাচে দেখলে কিন্তু ভুল হবে।’
‘সেটা কেমন?’
‘তখন শিল্পকলায় পারদর্শী নারীকে বিশেষ সম্মানের নজরে দেখা হত। ‘নগরনটী’ বা ‘নগরবধূ’ বা ‘পুরসুন্দরী’ ইত্যাদি নানা বিশেষ্যে যাঁদের আমরা চিনি তাঁদের যথেচ্ছ স্বাধীনতা ছিল নিজেদের জীবন-যাপনের — যেমন ধর, সন্তান ধারণ না করার স্বাধীনতা, পর্দার আড়ালে না থাকার স্বাধীনতা ইত্যাদি।’
‘বুঝলাম, ঐ বলির আগে পাঁঠার যে সম্মান আর কি।’
‘অস্বীকার করতে পারছি না অবশ্য। আম্রপালির কথা প্রাচীন ভারতের একজন সম্মানীয় নগরনটীর উদাহরণ দিতে গিয়েই বললাম। উনি নানা কলাবিদ্যায় পারদর্শী তো ছিলেনই, বিদূষীও ছিলেন, ছিলেন রাজনৈতিক কূটবুদ্ধিতে দক্ষ এবং নির্ভীক এক মানুষ। আবার প্রচুর দান-ধ্যান করতেন — বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তা, মন্দির ইত্যাদি নির্মাণ করিয়ে দেন। পরে নটীর পেশা ছেড়ে বুদ্ধের অনুসারী হন।’
‘হ্যাঁ, হয়তো সেই কারণেই বৌদ্ধ সাহিত্যে বিশেষ করে তাঁকে উল্লেখ করা হয়েছে — যে একজন নগরনটীও বৌদ্ধধর্মের মত উদার ধর্মের ছত্রছায়ায় স্বাগত।’ একটু থেমে আমি আবার বললাম, ‘আচ্ছা শিবম, বেনারসের প্রাচীন ইতিহাসে এরকম কেউ নেই?’
‘আছে তো, আবার সেই বৌদ্ধ সাহিত্যেই। ‘অট্টকাশী’ বা ‘অদ্ধকাশী’ নামের এক গণিকা। তিনিই নাকি আমাদের ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথম গণিকা যিনি তাঁর পেশা ছেড়ে ‘প্রব্রজ্যা’ অর্থাৎ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তিনিও যে এক প্রতাপশালী নগরনটী ছিলেন তার আঁচ পাই তাঁর নামে।
‘নামে? কেন, ‘অদ্ধকাশী’ মানেটা ঠিক কী?’
‘অদ্ধ-কাশী মানে অর্ধেক কাশী। বলা হয় যে তাঁর এক দিনের যা পারিশ্রমিক ছিল, তা নাকি সেই সময়ে গোটা কাশীর সারাদিনের যা রাজস্ব আয়, তার অর্ধেক। বুঝলে?’
‘বল কী! মারাত্মক ব্যাপার। আচ্ছা, বৌদ্ধ সাহিত্য ছাড়া আর কেউ লেখেনি এঁদের নিয়ে?’
‘অনেকেই। এই যেমন ধর না, খ্রীষ্টিয় প্রথম শতকে অশ্বঘোষের লেখা ‘সৌন্দরানন্দ’, অষ্টম শতকে কাশ্মীরের রাজমন্ত্রী দামোদর গুপ্তের লেখা ‘কুট্টনীমতম্’। বেশ মজার এই বইটা।’
‘কী রকম?’
‘বইটায় কাশীর গণিকালয়ে বিক্রালা নামে এক বুড়ি মালতী নামের এক যুবতীকে শেখাচ্ছে যে কীভাবে গণিকাবৃত্তিতে ছলা-কলা প্রয়োগ করে প্রেমের ফাঁদ পাততে হয়, তাতে কীভাবে ধনীদের ফাঁসিয়ে তাদের থেকে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা আদায় করা যায়, আবার তারা জোঁকের মত লেগে থাকলে কীভাবে তাদের ঝেড়ে ফেলতে হয়। বোঝো এবার, এক মন্ত্রী লিখছেন স্ক্যাম করার ম্যানুয়াল,’ বলে হেসে উঠল শিবম।
আজকের সকালটা অনেকদিন মনে থাকবে। রয়ে যাবে এইসব হাসির স্মৃতি, আর গল্প। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা এই শহরের উত্থান পতনের বহমান স্রোতে গল্পরাই এর জিয়নকাঠি — গল্প হারালে স্মৃতিহারা হতে হয়, স্মৃতির অভাবে হারিয়ে যায় সভ্যতার ইতিহাস, আমাদের অস্তিত্বের শিকড়। তাই বেঁচে থাকুক গল্পেরা।
হাসি থামিয়ে শিবম বলল, ‘কী হল শোভন, মনে হচ্ছে তোমার মনের মধ্যে কোথাও একটা কিছু কাঁটার মত বিঁধে রয়েছে?’
‘না, ঠিক তা নয়। শুধু তখনকার মানুষজনের মূল্যবোধ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছি।’
‘বুঝলাম, এতে তোমার দোষ নেই। ইংরেজরা আমাদের দেশে এসে ওদের সংকীর্ণ মূল্যবোধের পাঠ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে।’
‘কিন্তু কাশীর মত ধর্মক্ষেত্রে গণিকাদের এত প্রশ্রয়?’
‘কী বলছ শোভন! এঁরাই তো কাশীর সংস্কৃতিকে এক সময় ধারণ ও বাহন করত। শেষ রাতে নিভু নিভু সলতের প্রদীপকে এঁরাই আগলে রেখেছিলেন নানা ঝড়-ঝাপটায়। দেখ, তুমি ভাবছ এঁরা অবাধে দেহব্যবসা করত। কিন্তু তা নয়। এঁদের মত আত্মসম্মান বোধ ও তার যথোপযুক্ত ধারণ তাঁদের সময়ে দাঁড়িয়ে অন্য কেউ করতে পারত কী না তা সন্দেহ। নৃত্য-গীত-বাদ্য ছাড়াও কলা বিদ্যার নানা দিকই ছিল এঁদের মূল অভীষ্ট। বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’ বইতে যে চৌষট্টি কলার কথা উল্লেখ রয়েছে তার সমস্ত বিদ্যায় এঁরা পটীয়সী ছিল। ভুলে যেওনা, আমাদের দেবী সরস্বতী তো এই চৌষট্টি কলার অধিষ্ঠাত্রী। তুমি ধর্মের কথা বলছ? কাশীর ধর্মীয় জীবনযাত্রায় নগরনটীদের বরাবরই অবাধ প্রবেশ ছিল।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। এই বিষয়ে আমি অতটা পড়াশোনা করিনি বলেই আমার মন এখনও কল্পনা করতে হোঁচট খাচ্ছে। সেজন্যই তো আমি আরও জানতে চাই। তাছাড়া আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর এখনও পাইনি — তাওয়াইফ কারা?’
‘দাঁড়াও, ধীরে ধীরে আমি সেদিকেই এগোচ্ছি। আগে বলি গহড়ওয়ালদের সময়ের কথা। কাশীর স্বর্ণযুগ বলা হয় এই রাজবংশের রাজত্বকালকে। একাদশ-দ্বাদশ শতকে এঁদের রাজত্বকালে কাশীর নগরনটীদের খ্যাতি দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। মূলতঃ রাজা, আশেপাশের সামন্তপ্রভুরা এঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এই সময়ের ইতিহাসে দেখা যায়, চৌকের আদি বিশ্বেশ্বর মন্দিরে নটীরা অনায়াস যাতায়াত করতেন। গোপাষ্টমীর মত বিশেষ বিশেষ দিনে দেবদাসীরা দেবতার উদ্দেশ্যে নিজেদের নৃত্য-গীত উৎসর্গ করতেন। ‘দেবদাসী’, অর্থাৎ দেবতাদের দাসী, তাঁরা যেন স্বর্গের অপ্সরাদেরই প্রতিরূপ, মন্দিরের দেবতার জন্য তাঁরা নিজেদের সমস্ত কলাবিদ্যা উৎসর্গ করে দিতেন।’
‘আচ্ছা তুমি কখনও মনিকর্ণিকা ঘাটে নগরবধূদের অনুষ্ঠানের কথা শুনেছ? প্রতি বছর নাকি হোলির পর চৈত্র নবরাত্রির সময় শিবকে তুষ্ট করার জন্য নগরবধূরা মনিকর্ণিকা ঘাটের শ্মশানে এসে নাচে? এটা কি সত্যি?’
‘হ্যাঁ, চৈত্র শুক্লপক্ষে সপ্তমীর দিন, বাবা মহাশ্মশান বা মসান নাথের মন্দিরে।’
‘কেমন বেখাপ্পা নয়? ওদিকে চিতা জ্বলছে আর এদিকে নাচ-গান চলছে, তাও আবার নগরবধূরা। আচ্ছা, ঠিক কারা এই নগরবধূ? এরা মনিকর্ণিকায় গিয়ে নাচেই বা কেন?’
‘এতগুলো প্রশ্ন একসাথে। বলছি দাঁড়াও। শ্মশানে এই বার্ষিক অনুষ্ঠানের শুরুরও একটা বেশ সুন্দর গল্প আছে।’
(ক্রমশ)
