কাগজের নৌকো। পর্ব ১৪। ধারাবাহিক উপন্যাস। লিখছেন সায়ন্তন ঠাকুর

রামানুজের ঘরের সামনে আজ সকাল থেকেই আলতো অভিমানের মতো মেঘ বয়ে চলেছে, দূরে শৈলরাজি প্রায় অস্পষ্ট, মাঝে মাঝে ধুপি গাছের অরণ্য হতে সকরুণ আর্তনাদ হয়ে ভেসে আসছে চঞ্চল বাতাসের শব্দ।এমন দিনে পাহাড়ে কিছুই করার থাকে না, জানলার পাশে বসে নুপূর ধ্বনির মতো বৃষ্টি আর বাতাসের খেলা দেখছে রামানুজ, বিজলি চলে যাওয়ায় এই সকালেই মোমবাতি জ্বালাতে হয়েছে, সামনে লেখার খাতাটি রাখা, ছায়াচ্ছন্ন হলুদ আলো সাদা পাতাটিকে যেন অতীত স্মৃতি-আখ্যান করে তুলেছে। পুরাতন দিনের কথা এলোমেলো বাতাসের মতোই রামানুজের মনে পড়ছে, ছবি তৈরির ইচ্ছা বোধহয় তখনই মাথার ভেতর বাসা তৈরি করেছিল। সে এক আশ্চর্য ছায়াছবির ভুবন। কলমটি খুলে ঝুঁঝকো আঁধারে সাদা কুয়াশার মতো পাতায় লিখতে শুরু করল রামানুজ…

 

মাথায় টিনের চালওয়ালা কিছু খুচরো দোকানপাটকে পিছনে রেখে এগিয়ে গেছে বাসরাস্তা, রাস্তার দুপাশে কাঁকর মেশা মাটির রং লাল অথবা খয়েরি,স্পষ্ট করে বোঝা যায় না।রাঢ় দেশের মাটির তেমনই দস্তুর।ভরা শীতের খেয়ালি বাতাসের সঙ্গে উড়ে বেড়ায় মাটির গা বেয়ে উঠে আসা রুক্ষ ধুলো।মানুষজনের আদুর গায়ে খড়ি ওঠে,গায়ের চামড়া হা পিত্যেশ করে বসে থাকে কয়েক ফোঁটা সরষের তেলের আশায়।এই সময় বড় ভালো কাটে ওদের।সদ্য আলু আর সরষে উঠেছে ঘরে,চারপাশের ধার দেনা মিটিয়ে অল্প কাঁচা পয়সা রয়ে গেছে হাতে এখনও।সেই লোভে বাসরাস্তার দুধারের টিনের চালওয়ালা দোকানে সস্তার হরেক কিসিমের মাল এসে জুটেছে।মাঠের কাজ সেরে মেয়েদের সন্ধ্যের আড্ডা ঘন হয়ে উঠছে ক্রমশঃ সেইসব দোকানের আঙিনায়।সারা দিনের কাজ শেষে দলের অল্পবয়সী বউটার গায়ে উঠেছে পরিস্কার করে কাচা কটন প্রিন্টের শাড়ি, মাথার চুল তেল-জলে টান করে বাঁধা,মুখে একটু বা পাউডারের আলতো ছোঁয়া।ওদের অহেতুক হাসির গমক ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।বড় রাস্তার সামনের বাঁকটা পার হলেই নিতাই মিষ্টান্ন ভান্ডার।দোকানের খোলা কাঠের বেঞ্চে মানুষের ভীড়।এই অঞ্চলের বেনারসি চমচম মিষ্টি বেশ বিখ্যাত।আশপাশের দুচার গাঁয়ে নামডাক আছে তার।কড়া পাকের চমচমের শরীর জুড়ে ঘন ক্ষীরের চাদর লেপ্টে থাকে।রসের গন্ধে আর কয়েক পা এগোলেই চোখ আটকে যায় মাথায় তেকোণা টিনের চাল ছাওয়া বেশ বড় একটা ঘরের সামনের জটলায়।কাঁচা মাটির দেওয়ালে চুন মেশানো নীল রঙের গাঢ় পোঁচ।সামনের ফাঁকা জায়গায় দুটো বাঁশের খুঁটির গায়ে সাঁটানো হয়েছে সস্তার নিউজ প্রিন্টে ছাপা “কবরস্থান-কি-চৌকিদার”-এর পোষ্টার!লাল রঙের কালি দিয়ে তৈরী ধ্যাবড়া গোলের মধ্যে ইংরাজী “এ” অক্ষরটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়।এ অঞ্চলের একমাত্র ভিডিও হল।প্রাপ্তবয়স্ক রসের আড্ডার জমজমাট ঠেক।ফি শুক্কুরবার সেখানে নতুন “বই” লাগে!অল্পবয়সী যত সাইকেল জড়ো হয়।যেমন আজও হয়েছে।ছেলে ছোকরার ভীড়ে চল্লিশের কোঠায় পা দেওয়া লোকজনও দেখা যায় বিস্তর।কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে আজকের “বই”-এ নাকি হেভি সব সিন আছে।ওই যে পোষ্টারে হাঁটুর ওপর অবধি তোলা সাদা ফ্রকের মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে,ওকে দেখতেই তো আজ আসা! বাইরে একটা ছোট টেবিল পেতে একমনে টিকিট বিক্রি করছে হল মালিকের কর্মচারী।হুড়োহুড়ি সামলানোর জন্য দুজন হাট্টাগোট্টা লোকও মজুত আছে।তারা কেউই নাকি তেমন সুবিধার লোক নয়।কিন্তু তাতে কিছুই যায় আসে না সন্ধ্যে রাতের এই মোচ্ছবে ভীড় জমানো লোকজনের।টিকিট কাটার জন্য ধাক্কাধাক্কিও চলছে সমানে।দুরকমের টিকিট পাওয়া যায়। আড়াই টাকা আর সাড়ে চার টাকা দাম।টিকিট মানে একফালি লম্বাটে সাদা কাগজের ওপর রাবার স্ট্যাম্প মারা দামের অঙ্ক,ওপরে একটা তাড়াহুড়ো করা নীল কালির সই।আড়াই টাকার টিকিটে জায়গা মেলে পিছনের সারির বেঞ্চে,আর সাড়ে চার টাকায়,সামনে ইউরিয়ার সাদা চিকচিকে বস্তা কেটে বেছানো প্লাস্টিকের ওপর।সন্ধ্যের শো,কিন্তু তেমন কোন ধরাবাঁধা সময় নেই,মোটামুটি পর্যাপ্ত টিকিট বিক্রি হলেই সিনেমা শুরু করে দেওয়া হয়।যেদিন টিকিটের ভাল কাটতি হয় না,সেদিন শুরু হয় অপেক্ষা,কখন ঘরের দরজা খুলে দেওয়া হবে,কখন ‘বই’ শুরু হবে!আজ অবশ্য তেমন অপেক্ষার দিন নয়।আজকের শুক্রবার একটু অন্যরকম।পোষ্টারে ওই মেয়েটির মুখে লেগে থাকা ইশারা অবলীলায় টেনে আনছে লোকজন।বেশীরভাগ দিন এমনই হয়।সেইসব সিনেমা জুড়ে ভূতের উপস্থিতি অনিবার্য,আর তার সঙ্গে মিশে থাকে দেহজ ইশারার পাতলা এক পর্দা।খুব স্পষ্ট নয় সে ইঙ্গিত,তবু সেখানেই জল-হাওয়া পায় একদল মানুষের দেহবোধ এবং যৌনতা।নরম ফর্সা খোলা ত্বকের আহ্বানে জেগে ওঠে তাদের মনের অনেক নীচে লুকিয়ে থাকা এক ফ্যান্টাসির দুনিয়া।যেখানে ওদের থেকে অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে থাকা দুনিয়ার একটি মেয়ের খোলা গা দুচোখ ভরে দেখা যায়,তাকে মাটির দাওয়ায় পাতলা কাঁথার ওপর পেতে রাখা কোঁচকানো বিছানায় কল্পনা করা যায় অনায়াস।মনে রাখতে হবে এ হল সেই সময় যখন আমাদের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিল এক প্রিমিটিভ জগৎ যেখানে ন্যাংটো শরীর দেখার জন্য কোন ইন্টারনেট ছিল না। যখন সন্ধ্যে নামলেই দিন শেষ হয়ে যেত আর জেগে উঠতো এক অন্য রূপকথার দুনিয়া।সেখানে আমোদ মানে ছিল শীতকালে প্রান্তিক মাঠে বসা সার্কাসের তাবু,যাত্রার আসর অথবা মেলা।কখনও সখনও আসর জমাতো বাউল কিংবা আলকাপের দল।নব্বই-এর শুরুর দিকে সেই জলসায় থাবা বসাতে শুরু করল সিনেমার মায়া।অনেক বেশী মোহময়,সচল ছবির ইশারা জন্ম দিল এক নতুন কালচার।শহর মফস্বল ছাড়িয়ে অনেক ভেতরের গ্রামে যেখানে সিনেমা হল তৈরী হল না,সেইসব গঞ্জে বাজারের ঠিক বাইরে গড়ে উঠল ঢালু টিনের চালের কাঁচামাটির ঘর।সেই ভিডিও হলের হাতছানির মায়া এড়াতে পারল না মানুষজন।যাদের দিন শুরু হত মাঠে,পুকুরের জাল ফেলায় অথবা কোন স্বচ্ছল গৃহস্থের বাড়ির গোয়ালে দুধেল গাইদের দেখাশোনায়।সন্ধ্যে ঘনালে ভীড় জমে উঠতো ভিডিও হলের আশপাশে।মাঝেসাঝেই বাঁশের খুঁটির ওপর সাঁটা হত ছোট-বড়-মেজ-সোনা বউ সিরিজের বাংলা ‘বই’-এর পোষ্টার।সেরকম সাঁঝবেলায় বাড়ির বউরাও আসার অনুমতি পেত।মাঠে একসঙ্গে কাজ এবং প্রায় একই পয়সা কখনও বা বেশী রোজগার করার পরও আমোদ ও রসের এই প্রভেদ মুছে ফেলা যেত না।পর্দায় নরম মেয়ের শরীর দেখার নিয়ম নির্দিষ্ট ছিল শুধু ওদের বরদের জন্য।গ্রামের প্রান্তে স্বামী ফেলে যাওয়া দু-একজন একা থাকা মেয়ের জন্য এই নিয়ম লাগু হত না,ওদের খারাপ মেয়েছেলে নামেই জানত তাবৎ গঞ্জের লোকজন।তারা একাই আসত ওইসব “কবরস্থান-কি-চৌকিদার” অথবা “কাতিল চন্ডালিনী” দেখার জন্য।মুখে হয়ত তালের রস থেকে বানানো আরকের মৃদু সুবাসও পাওয়া যেত।

ভিডিও হলের আশেপাশেই জমে উঠতো মদের ঠেক।গলিঘুঁজির অন্ধকারে দু-চার টাকার বিনিময়ে সহজেই হাত বদল হয়ে যেত মাটির ভাঁড়।উপচে পড়তো ফেনাময় তাড়ি অথবা ভাত পচিয়ে চোলাই করা তীব্র দিশি আরক।টাকনার জন্য পাওয়া যেত বেশ করে নুন,তাজা নধর কাঁচা লঙ্কা আর পেয়াজ দিয়ে মাখা আঁকুর বের হয়ে আসা কাঁচা ছোলা।তাড়াতাড়ি গলায় ঢেলে ঢুকে পড়তে হত ভিডিও হলের মৃদু আলোর রাজ্যে।হাতে পয়সা থাকলে সামনের সারির খচমচে ইউরিয়ার বস্তার ওপর নচেৎ পিছনের বেঞ্চে আসন জুটতো।টাইট প্যান্ট আর হাতা গোটানো শার্টের কেউ কেউ ওই ভাঁড় হাতে নিয়েই ঢুকে পড়তো ভিতরে।হল মালিকের লোকের সঙ্গে বেঁধে যেত তুমুল বচসা।কিন্তু প্যান্ট-শার্ট পরা লোকজনকে শেষমেশ চিনতে পেরে ছেড়েও দিতে হত।তামাম গঞ্জ এলাকায় তাদের তেমন সুনাম ছিল না।ইয়ারদোস্ত নিয়ে একদম পিছনের টানা বেঞ্চ দখল করে নিত তারা।ভিডিও হলের বাইরে হোল্ডওল থেকে ঝুলে থাকত হলুদ বাল্ব।চারপাশের নিকষ আঁধারের গায়ে লেপ্টে যেত রোগা হলদে ছায়ার আবেশ।হলের ভেতরে তখন শুরু হয়ে গিয়েছে জমজমাট ‘বই’।কোন রুপালি পর্দার ওপর নয়,একুশ ইঞ্চি রঙীন বিপিএল টিভির ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে গল্পের সব চরিত্র।সামনে থেকে টিভি দেখা সুবিধা,সেই হিসেবের কথা মনে রেখেই সামনের সারির টিকিটের দামও বেশী।পাশেই রাখা থাকে কালো বাক্সের একটা যন্ত্র,ফুনাই অথবা আকাই কোম্পানির জাপানী ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার।চওড়া ফিতেওয়ালা ক্যাসেট ঢুকে যায় ভিসিপির গহ্বরে।ঘুরে ওঠে স্টীলের গোল চাকা,জড়িয়ে যায় দেহবোধ আর মৃদু যৌনতার ইশারা সম্বলিত ক্যাসেটের কালো ফিতে সেই চাকার গায়ে,ইলেকট্রনিক্স কর্ড বেয়ে সেই ইশারা ফুটে ওঠে টিভির সামনের কাঁচের ইলেক্ট্রনে। বিচিত্র সুরওয়ালা গানের হাত ধরেই আসে মেয়েটি,চোখেমুখে লেগে থাকে আহ্বান।এই সিনেমায় সে আসলে কোন মানুষ নয়,অশরীরী সেক্সের লোভে সে টেনে আনে পুরুষদের,তারপর ঘাড় মটকে রক্ত চুষে খায় ওই ফিল্মি ‘কবরস্থানে’!যেমন এই নির্জন একটেরে ভিডিও হলেও তার টানে ছুটে আসে গঞ্জের মানুষ।তাদের অধিকাংশেরই পোষাক মানে চেক ছাপ লুঙ্গি,ফুলহাতা জামা আর ধূসর রঙের চাদর।ভিডিও হলের ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে থাকে তাড়ি আর বিড়ির গন্ধে।আবছা টিভির আলোয় নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে,একটা হাত ঘোরাফেরা করে তাদের কোমরের নীচে।সিন রিপিটের জন্য চিৎকার করে।তখন রিওয়াইন্ড করে ক্যাসেটের কালো ফিতে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিতে হয় খানিকটা।আবার দেখে ওরা সেই সদ্য দেখে ফেলা দৃশ্যাবলী।এরই মাঝে হটাৎ হানা দেয় লোডশেডিং,অতর্কিতে।বন্ধ হয়ে যায় গল্প।হল্লার ঢেউ ওঠে মাটির দেওয়ালের ঘরে।দু চারটে দেশলাই কাঠি জ্বলে ওঠে ফস করে।নিভে যাওয়ার আগে সে সদ্য ফোটা আলোয় দেখে নেওয়া যায় ঘরের ভিতরের অস্থিরতা।যেসব বড়লোক হল মালিকের জেনেরেটার থাকে,প্রচুর কালো ধোঁয়া উড়িয়ে তারা চালু করে যন্ত্র,থেমে যাওয়া ফিল্ম আবার সচল ও জ্যান্ত হয়ে ওঠে।নাহলে শুরু হয় অপেক্ষা।বাইরে বেড়িয়ে আসে হলভর্তি লোকজন।মদের ঠেক ততক্ষণে ভেঙে গেছে।বিড়ি ধরিয়ে ইতিউতি পায়চারি করে ওরা।সদ্য দেখা মেয়েটাকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প জোড়ে।তার ফাঁকফোকর বেয়ে উঠে আসে গাভীটার গরম হয়ে যাওয়া,মাছ ধরার জালটাও প্রায় ছিঁড়ে এসেছে-সেই গল্পের সুতো।আগামীকাল কাছেই গড়ে ওঠা গরুর ডাক্তারের হাসপাতালে যাওয়ার পরিকল্পনা করে।এরই মাঝে রাত গড়ায় তার নিজস্ব ঢাল বেয়ে।কখনও সখনও সেই দূর প্রান্তে সারারাত লোডশেডিং থাকে।পয়সা উসুল হয় না ওদের।পরেরদিন আবার বিনি পয়সায় বাকিটা দেখার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাড়ির পথ ধরে।রাতের রাস্তায় আলো দেখায় কারুর দু-ব্যাটারির টর্চ। সেই বৃত্তাকার ফোকাসড আলোর চারপাশে উড়ে বেড়ায় রাতের পোকামাকড়। নিঝুম ক্যানালের ওপরের ব্রীজ থেকে শোনা যায় জলের কলকল শব্দ। ড্যাম থেকে আজ রাতে জল ছাড়া হয়েছে ওরা বুঝতে পারে।প্রতিদিনের অভ্যেসে পাড়ায় ঢোকার মুখে পিছু নেয় দুটো নেড়ি কুকুর। বাড়িগুলো শব্দহীন হয়ে রয়েছে। যেসব বাড়ির মানুষগুলো আজ ভিডিও হলে ঠেক জমিয়েছিল শুধু তাদের বাড়ির দাওয়ায় টিমটিম করে জ্বলতে থাকে কেরোসিন কুপির ময়লা আলো। বউ ভাত নিয়ে বসে থাকে,পায়ের শব্দ আর কুকুরের চেনা চিৎকারে থালা সাজাতে শুরু করে। কুয়াশার স্তর পার হয়ে ওরা যে যার ঘরে ফিরে আসে। ভাতের থালায় আয়োজন বড় সামান্য,কুচো মাছের টক আর আলুসেদ্ধ।খাওয়ার শেষে রাত্রিকালীন বিড়ি ধরিয়ে কেউ চেয়ে থাকে সামনে।উঁচু ঢালের ওপর খড় ছাওয়া মেটে বাড়ি।সামনে আদিগন্ত মাঠ,এখন শীতকালে আলুর চাষে জমজমাট,কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে আছে।ভেসে ওঠে আজকের সিনেমায় দেখা ফর্সা মেয়েটার আবছা দেহ। দূরের বড় পুকুরের পাড় থেকে ছুটে আসে ভেজা বাতাস।হাতছানির ইশারা ঘুরে ফিরে বেড়ায় সেই রাতের বাতাসে।না দেখা সেই ন্যাংটো দেহের টানে বউ-এর বিছানার দিকে এগোয়। যদিও বউ আজ ঘুমিয়ে কাদা।ঘরের বাতাসে থম মেরে থাকে ভাত পচা চোলাই-এর ঝাঁঝালো গন্ধ।বুঝতে পারে বউ হয়তো বিকালে বাড়িতে ভাত পচিয়ে চোলাই তৈরী করেছিল।তাই আকন্ঠ গিলে পড়ে রয়েছে।এসব অঞ্চলে প্রায় প্রতি ঘরেই লুকিয়ে চোলাই তৈরী হয়,ভাত নয়তো তালের রস।খানিক বাখর মানে ইস্ট মিশিয়ে প্রস্তুত হয় সেই আরক।ঘুমানো ছাড়া এইসব রাতে আর কিছুই করার থাকে না।পরের দিন ভিডিও হলের বিনিপয়সার শো-এর কথা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।আজকের শেষ না হওয়া ‘বই’ উড়ে বেড়ায় খড়ের চালের নীচে ঘরময়।ঘুম নেমে আসে তার গা বেয়ে নিশ্চুপে।

প্রতি সকালে ভিডিও হলের ধোয়ামোছা চলতে থাকে। গত রাতের পোড়া বিড়ির টুকরো,মদের ভাঙা মাটির ভাঁড় ঝাঁট দিয়ে পরিস্কার করে চলে এক সিড়িঙ্গে চেহারার লোক।ইউরিয়ার চিকমিকে বস্তা ঝেড়ে পুনরায় পেতে দেয় সে।সাদা বস্তার ওপর লেগে থাকে হলুদ দাগ,সে দাগ আর তোলা যায় না। নিজের মনে গজগজ করতে থাকে লোকটা। ফুনাই ভিসিপির ডালাও খুলতে পারে সে পুরনো মিস্ত্রির দক্ষতায়।পাতলা সাদা কাগজ দিয়ে গভীর ভালোবাসায় পরিস্কার করে ভিসিপির যান্ত্রিক হেড।ক্লিনার স্প্রে করে দেয় ওই ধাতব হেডের গায়ে।হেডের গায়ে ময়লা থাকলে রাতের বেলায় ছবিরা চঞ্চল হয়ে ওঠে,ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামে টিভির পর্দা জুড়ে।বেজায় বিরক্ত হয় দল বেঁধে আসা লোকজন।চিৎকার জুড়ে দেয়,কখনও বা হাতাহাতি।সহ্য করতে পারে না লোকটা।ভিডিও হল আর ওই নতুন ভিসিপির মায়ায় আটকে পড়েছে সে।কত হাত ঘুরে ওই যন্ত্র এখানে এসে পড়েছে,তার কাছে।বাংলাদেশ বর্ডার পার হয়ে চোরাপথে আসে ওইসব ভিসিপি।কত মেহনত করে লুকিয়ে নিয়ে আসা হয় তা সে জানে। বড় ভিআইপি সুটকেসে নরম তোয়ালে জড়িয়ে ওকে নিয়ে এসেছিল ভিডিও হলের মালিক। মাঝেমাঝেই থানার মেজবাবু সরকারী বাস থামিয়ে,জিনিসপত্র ঘেঁটে ধরপাকড় শুরু করেন।ভিসিপি পেলেই সিজ করে নেওয়া হয় বিনা প্রশ্নে। যদিও এই ভিডিও হলে কখনও পুলিশ ঢোকেনি। কারন নিয়ে লোকটার মাথাব্যাথা নেই। জানার আগ্রহও নেই তার।সে ভিডিও হলের রাজ্যপাট নিয়েই খুশি। প্রতি সন্ধ্যের আগেই সাজিয়ে গুছিয়ে রেডি করে দেয় তার মেহবুবাকে! জমে ওঠে রাতের মেহফিল। প্রতিটি সিনেমা সে কতবার করে দেখে,তবু তার ক্লান্তি আসে না। একেকটা ফ্রেমের সঙ্গে নতুন করে বেঁচে ওঠে লোকটা।

এসবের মাঝখানেই ভিডিও হল হয়ে যায় ছোট ছোট সব গঞ্জের লাইফ লাইন।প্রান্তিক মানুষের অনিবার্য এক এসকেপ রুট।প্রতিদিনের ক্লান্তি,বিনোদন আর চাপা যৌনতা নিয়ে সে বেঁচে থাকে মাথা উঁচু করে।অবিসংবাদিত রঙীন কেচ্ছায় মুখর হয়ে থাকে তার চারপাশের বাতাস।নিস্তরঙ্গ জীবনে ভিডিও হলই হয়ে ওঠে একমাত্র ভ্যাম্প।তার হাতছানি এড়াতে পারা যায় না। কিন্তু সেসব রূপালি দিন হুস করে চোখের পলকে ভ্যানিশ হয়ে যায়। ভিডিও হলের মুকুট থেকে খসে পড়ে পালক। তার জায়গা দখল করে টিভি এবং আরও পরে সিনেমা হল। ভিডিও হলের ছোট কুঠিবাড়ি ধসে যায়,মদের ঠেক উঠে যায় অন্যত্র।গমগমে সান্ধ্য আড্ডার সঙ্গে তার নাম আর জুড়ে যায় না অবলীলায়।আমারও কতদিন সেইসব গ্রাম গঞ্জে যাওয়া হয় না। টরেন্ট প্রোটোকলের যুগে সেই ভিসিপি আর কালো ফিতের ক্যাসেটও তামাদি হয়ে গেছে কবেই। শুধু এখন মাঝেমধ্যে শহর মফস্বল ছাড়িয়ে দূর গঞ্জের প্রান্তে বিকেল ঘনিয়ে আসার সময় কোন চলমান ট্রেনের জানলা দিয়ে একঝলক চোখে ভেসে আসে হটাৎ সেই হারিয়ে যাওয়া সিনেমার পোষ্টার।‘কবরস্থান-কি-চৌকিদার’ অথবা ‘খুনি হাভেলি’-উজ্জ্বল,রঙচঙে এবং সন্ধ্যের আকাশের ওপর নড়বড়ে বাঁশের খুঁটির গায়ে লেপ্টে আছে। চারপাশের সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে।যাদু-বাস্তবের দোলায় জেগে ওঠে মাঠের ওপর আলতো করে ছুঁয়ে থাকা সন্ধ্যেকাল।একটা ঢালু টিনের চাল,মাটি লেপা দেওয়াল এবং মদের ঠেক।জমে ওঠে ভীড়।গরম ফুলুরি আর কাঁচা ছোলামাখার গন্ধে চনমন করে বাতাস। যুবক শীতের কুয়াশা ভেদ করে ঠিক তখনই জানলার ওপাশে পোষ্টার ফেলে দ্রুত এগিয়ে যায় আমার ট্রেন।ততক্ষনে রাতের ‘বই’ চালু হয়েছে সেইসব ভিডিও হলের টিভির বুক জুড়ে,আরও একবার।

(ক্রমশ)

সায়ন্তন ঠাকুর
লেখক | + posts

জন্ম পৌষ মাসে, রাঢ়বাংলার এক অখ্যাত মফস্বলে। সায়ন্তন মূলত মূলত গদ্য লেখেন। প্রকাশিত বইপত্তর-- নয়নপথগামী(উপন্যাস), শাকম্ভরী(উপন্যাস), বাসাংসি জীর্ণানি(গল্প সংকলন)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *