আমাজনের পথে। হেনরি ওয়াল্টার বেটস। পর্ব ৮। অনুবাদে সোমরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়

গত পর্বের পর

অধ্যায় ২

মিস্টার মিলারের রোসিনহায় প্রায় একপক্ষকাল কাটানোর পর আমরা খবর পেলাম, একই ধরনের আর-একটি বাগানবাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে। সেটির অবস্থান আমাদের থাকার জন্য বেশি সুবিধাজনক। কারণ সেই জায়গাটি শহর থেকে দেড় মাইল দূরে নাজারেথ গ্রামে, একেবারে বনের কাছেই। বাড়ির মালিক ছিলেন ডানিন নামে এক বৃদ্ধ পর্তুগিজ ভদ্রলোক। তিনি থাকতেন উনা নদীর মোহনায় তাঁর টালি তৈরির কারখানায়। উনা একটি ছোট নদী, যা পারা শহর থেকে প্রায় দু-মাইল দূর দিয়ে বয়ে গেছে। আমরা স্থির করলাম, বনের ভিতর দিয়ে হেঁটেই তাঁর কাছে যাব। পথ প্রায় তিন মাইল। যদিও শুনেছিলাম, বছরের এই সময়টায় সে-পথ দিয়ে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব। নৌকায় উনা পৌঁছোনো তার চেয়ে অনেক সহজ। কিন্তু জাহাজের ডেক থেকে যে সমৃদ্ধ, জলাভূমিময় অরণ্যকে এতদিন মুগ্ধ হয়ে দেখেছি, তার ভিতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার এমন সুযোগ এত তাড়াতাড়ি পেয়ে আমরা বরং খুশিই হলাম। সেইমতো এক রোদ ঝলমলে সকালে, প্রায় এগারোটার সময়, পথঘাট সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নিয়ে আমরা সেদিকে রওনা দিলাম। পরবর্তীকালে বনের এই এলাকাটিই হয়ে উঠেছিল আমার শিকার করার অন্যতম আদর্শ জায়গা। সেই হাঁটার সময়কার নানা ঘটনা, আমার প্রথম অনুভূতি এবং এখানকার বিস্ময়কর গাছপালা সম্পর্কে কিছু পর্যবেক্ষণ এবার বিস্তারিত লিখব। নিচু জমিগুলিতে অরণ্যের প্রকৃতি মোটামুটি একই রকম। তাই একটির বর্ণনা করলেই বাকিটা বুঝে নেওয়া যাবে।

শহরতলির একটি সোজা রাস্তা ধরে আমরা এগোতে লাগলাম। চারপাশের জমির তুলনায় রাস্তাটি বেশ কিছুটা উঁচু করে তৈরি। দেখলাম, দু-পাশে নিচু জলাভূমির মধ্যেও বসতি গড়ে উঠেছে। সেখানে বেশ কয়েকটি বিশালাকার রোসিনহা চোখে পড়ল। অপূর্ব দেখতে গাছের পাতার আড়ালে সেগুলি প্রায় ঢাকা পড়ে আছে। শেষ রোসিনহাটি পার করে আমরা এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছোলাম, যেখানে পথের কিনারা থেকে মাত্র পাঁচ-ছয় গজ দূরেই সুউচ্চ অরণ্য প্রাচীরের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এর উচ্চতা সম্ভবত একশো ফুট। গাছের কাণ্ড ইতিউতি চোখে পড়ে, যদিও তাদের পুরোপুরি দেখা যায় না। কারণ ভূমি থেকে গাছের শিখর পর্যন্ত প্রায় গোটা অংশ জুড়ে ছেয়ে আছে বিচিত্র সব সবুজ রঙের লতানো গাছ। ফুল প্রায় চোখেই পড়ে না। শুধু কোথাও কোথাও সবুজ আবরণের গায়ে নিঃসঙ্গ তারার মতো ফুটে থাকতে দেখা যায় টকটকে লাল প্যাশন-ফ্লাওয়ার।

অরণ্যের সেই প্রাচীর আর রাস্তার মাঝখানে নিচু জমি ঝোপঝাড়ে ভরে গিয়েছিল। এর মধ্যে কাঁটাওয়ালা মিমোসার সংখ্যাই বেশি। ইংল্যান্ডে যেমন কাঁটাঝোপ অন্য গাছপালাকে ঢেকে ফেলে, এরাও তেমনভাবে অন্যান্য ঝোপের উপর ছড়িয়ে পড়েছে। আরও ছোট আকারের কিছু মিমোসা রাস্তার একেবারে ধার ঘেঁষে মাটির উপর দিয়ে লতার মতো এগিয়ে চলেছে। আমরা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পায়ের সামান্যতম স্পর্শেই তারা কুঁকড়ে যাচ্ছিল। নিচু গাছগুলির একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সুন্দর পাখির পালকের মতো দেখতে পাতা আর উজ্জ্বল হলুদ ফুলে ভরা ক্যাসিয়া গাছ। আর জলাভূমির গর্তগুলির চারপাশে দল বেঁধে জন্মেছিল বৃক্ষবৎ অ্যারাম। এই সমস্ত গাছপালার উপর দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল অসংখ্য উজ্জ্বল রঙের প্রজাপতি। এত বেশি সংখ্যায় তাদের আগে কখনও দেখিনি। কোনওটি সম্পূর্ণ কমলা কিংবা হলুদ (Callidryas); আবার কোনওটির ডানা অস্বাভাবিক রকমের দীর্ঘ। তারা বাতাসে ডানা মেলে সমান্তরালভাবে ভেসে চলেছে। কালো ডানার উপর ফুটে উঠেছে নীল, লাল আর হলুদের বিচিত্র নকশা (Heliconii)। ঘাসের মতো উজ্জ্বল সবুজ রঙের একটি অপূর্ব প্রজাতি (Colænis Dido) আমাদের বিশেষ নজর কেড়েছিল। মাটির কাছাকাছি আরও অনেক ছোট প্রজাতির প্রজাপতি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তাদের দেখতে অনেকটাই আমাদের দেশের পরিচিত প্রজাপতিদের মতো। নানা জাতের শিমগোত্রীয় গাছ ও অন্যান্য ঝোপঝাড়ে জন্মানো ফুলের আকর্ষণেই তারা সেখানে এসে ভিড় জমিয়েছিল। প্রজাপতি ছাড়া অন্য পতঙ্গ খুব বেশি চোখে পড়েনি। কেবল ফড়িং ছিল প্রচুর। আকৃতিতে তারা ইংল্যান্ডের ফড়িংগুলির মতোই, কিন্তু তাদের মধ্যে কয়েকটি আগুনের মতো টকটকে লাল রঙের হওয়ায় আলাদা করে চোখে পড়েছিল।

বারবার থেমে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে আমাদের মুগ্ধতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। তারপর আমরা আবার পথ চলতে শুরু করলাম। এবার রাস্তা সামান্য উপরের দিকে উঠতে লাগল। আর সেইসঙ্গে মাটি ও গাছপালার চরিত্রও যেন হঠাৎ বদলে গেল। এখানে ঝোপঝাড়ের বদলে চোখে পড়ল ঘাস, নিচু সেজজাতীয় গাছ এবং এমন সব গাছপালা যাদের পাতাগুলি আর্দ্র জমিতে জন্মানো উদ্ভিদের তুলনায় আকারে ছোট। এটি ছিল একটি পুনরুত্থিত বন। গাছগুলির সামগ্রিক চেহারা আমাদের দেশের বাগানে দেখা লরেল ও অন্যান্য চিরসবুজ গাছের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাদের পাতা চকচকে, গাঢ় সবুজ রঙের। কোনও কোনও গাছের পাতায় সুন্দর শিরার নকশা, উপরিভাগ রোমশ (Melastomæ); আবার তাদের মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক গাছের পাতা তুলনায় ছোট (Myrtles)। তবে সংখ্যায় তারা এত বেশি ছিল না যে গোটা অরণ্যের সাধারণ চরিত্রের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে।

এভাবে আমরা অনেকটা সময় হাঁটতে থাকলাম। মাথার উপর সূর্যের তেজও বেড়েই চলেছে। দিনটা বেশ মনোরম। আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্র নেই। বস্তুত, এ ছিল এমন একটা দিন যা বর্ষার শেষ এবং শুষ্ক ঋতুর আগমনবার্তা বয়ে আনে। বালুময় মাটি থেকে নির্গত উত্তাপ এতই প্রবল যে তার উপরের বাতাসকে কাঁপতে দেখা যায়। আশপাশে কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণী বা পাখির দেখা পেলাম না। এমনকি তাদের ডাকও কানে এল না। কেবল ছায়াঘেরা সরু পথের ধারে খামারের কয়েকটি গবাদি পশু একটি গাছের বিস্তৃত শাখাপ্রশাখার নিচে জড়ো হয়ে হাঁপাচ্ছিল। মাটিও এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে আমরা পায়ে তার তাপ অনুভব করছিলাম। তাই সম্মুখে দৃশ্যমান অরণ্যের ছায়ায় যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছোনোর জন্য আমরা পা বাড়ালাম। অবশেষে অরণ্যে প্রবেশ করতেই কী স্বস্তিই না পেলাম আমরা! মোটামুটি চওড়া একটি পথের উপর দাঁড়িয়ে আমরা দেখলাম দুপাশের গাছের ডালপালা মাথার উপর একে অপরকে অতিক্রম করে এক মনোরম ছায়ার সৃষ্টি করেছে। প্রথমদিকে বনটি ছিল নবীন, ঘন এবং সম্পূর্ণ দুর্ভেদ্য। ইউরোপের অরণ্যের মতো এখানে মাটি ঘাস কিংবা ঝোপঝাড়ে ঢাকা নয়; সর্বত্র বিছিয়ে রয়েছে লাইকোপোডিয়ামের (ফার্নসদৃশ মস) সবুজ আস্তরণ।

ক্রমে দৃশ্যপট বদলে যেতে লাগল। আমরা একটি উঁচু, শুকনো ও বালিঘেরা অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে নিচু জলাভূমির দিকে নামতে থাকলাম। শীতল বাতাস মুখে এসে লাগল, আর পচনশীল গাছগুলোর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ যেন আমাদের অরণ্যের গভীরে আহ্বান জানাল। সেখানে গাছগুলি আরও উঁচু, আর ঝোপঝাড় তুলনায় কম ঘন। ফলে চারদিকের বনের গভীরের অংশ খানিকটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। গাছগুলির পাতার মুকুট এত উঁচুতে যে মনে হচ্ছিল যেন তারা অন্য কোনও জগতের বাসিন্দা। পাশাপাশি একই প্রজাতির দুটি গাছের মাথাও প্রায় দেখা যাচ্ছিল না। কোথাও উপরের পাতার আচ্ছাদনে সামান্য ফাঁক থাকলে তবেই নির্মল নীল আকাশের আলোয় পাতার সূক্ষ্ম নকশা চোখে পড়ছিল। কোথাও পাতাগুলি হাতের তালুর মতো প্রশস্ত ও খণ্ডিত, যেন প্রসারিত দুই হাত; কোথাও আবার মিমোসার পাতার মতো সূক্ষ্ম, পালকের মতো ছেঁড়া ছেঁড়া।

নিচের দিকে গাছের কাণ্ডগুলি সর্বত্র পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সিপো (sipó) লতার সাহায্যে। এগুলি মূলত লতানো গাছের শক্ত অথচ নমনীয় কাষ্ঠল কাণ্ড। এদের পত্রপল্লব অনেক ওপরে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠা উঁচু গাছগুলির পাতার সঙ্গে মিশে থাকে। কোনও কোনও লতা মোটা তারের মতো পাকিয়ে রয়েছে; কোনওটির মোটা কাণ্ড অদ্ভুতভাবে বেঁকে সাপের মতো গাছের কাণ্ড জড়িয়ে উঠেছে, কিংবা বৃহৎ শাখাগুলির মধ্যে বিশাল বিশাল পাক ও বৃত্ত সৃষ্টি করেছে। আবার কিছু লতার আকৃতি আঁকাবাঁকা, অথবা সিঁড়ির ধাপের মতো খাঁজকাটা; তারা মাটি থেকে এমন উচ্চতা পর্যন্ত উঠে গেছে, যার দিকে তাকালে মাথা ঝিমঝিম করে।

পরে আমার কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল এই যে, এইসব লতানে গাছ কোনও একক উদ্ভিদ-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং পরস্পরভিন্ন উদ্ভিদ-পরিবারের কিছু কিছু প্রজাতি আছে, যাদের অধিকাংশই আরোহী না হওয়া সত্ত্বেও পরিবেশগত প্রয়োজনে এই অবস্থার সাথে মানিয়ে নিয়েছে। এমনকি তালগাছেরও একটি আরোহী গণ (Desmoncus) রয়েছে। টুপি ভাষায় এদের বলা হয় জাসিতারা (Jacitára)। এদের কাণ্ড সরু, ঘন কাঁটায় ভরা এবং অত্যন্ত নমনীয়। এক উঁচু গাছ থেকে আর-এক উঁচু গাছে জড়িয়ে উঠে বলে এরা দৈর্ঘ্যে অনেক বড় হয়। তালজাতীয় উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এদের পাতাও পক্ষাকার, কিন্তু অন্যান্য তালগাছের মতো মাথায় ঘন মুকুট তৈরি না করে কাণ্ড বরাবর অনেকটা ব্যবধান রেখে বের হয়। প্রতিটি পাতার অগ্রভাগে থাকে লম্বা, পেছনের দিকে বাঁকানো অসংখ্য কাঁটা। গাছে ওঠার সময় নিজেদের দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার জন্য এহেন গঠন অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু পথচলতি মানুষের জন্য এগুলি বেশ সমস্যার কারণও বটে। পথের উপর ঝুলে থাকে বলে অনেক সময় এগুলি টুপি কিংবা পোশাকে আটকে যায়। ফলত এরা কখনও টুপি টেনে খুলে ফেলে, কখনও বা কাপড় ছিঁড়ে দেয়। অ্যামাজনের অরণ্যে এই আরোহী বৃক্ষগুলির বিপুল সংখ্যা ও বৈচিত্র্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয় কারণ এখানকার প্রাণীরাও এইসব গাছে খুব সাবলীলভাবে চড়তে পারে।

(ক্রমশ)

Leave a Reply