চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর। পর্ব ১১। দুর্লভ সূত্রধর
— ‘চলে যাবেন! কোথায় চলে যাবেন?’ বিমলদার কথা শুনে আমি আঁতকে উঠেছিলাম।
সেই শেষ বিকেলের আলোয় বিমলদাকে বেশ আনমনা দেখাচ্ছিল। বললেন— ‘ঠিক করিনি। এ-ব্যাপারে তোমার বউদির একটা মতামতের ব্যাপার আছে— এখনও তাঁর মতামত নেওয়া হয়নি।’
— ‘আর আপনার ছেলেমেয়েরা?’
— ‘সিদ্ধান্তটা আমার ও তোমার বউদির। এর মধ্যে ছেলেমেয়েদের জড়াইনি। এবং তাদের মতামত নেওয়ার কোনো প্রয়োজনও মনে করিনি।’
— ‘তারা যদি যেতে না দিতে চায়?’
এইবার বিমলদার মুখে একটা স্বভাববিরুদ্ধ বিষণ্ণতা দেখা দিল, ম্লান হেসে বললেন— ‘ছেলেমেয়েরা! কোনো গভীর অভ্যন্তরীণ অঙ্ক ছাড়া তারা কেউ বাধা দেবে বলে তো মনে হয় না। তারা তো ছোটোবেলা থেকেই যাবতীয় অপ্রাপ্তির জন্য আমার ক্যালাসনেস আর সেই ক্যালাসনেসে মদতদাতা তোমাদের বউদিকেই দায়ি করে এসেছে। তিন ছেলেমেয়ের সবাইকেই আমরা বাংলা মিডিয়ামে, স্থানীয় স্কুলে পড়িয়েছি। কিণ্ডারগার্টেন স্কুলের পরিবর্তে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রাইমারি স্কুলে— মডেল বা পাবলিক স্কুলের বদলে বাড়ির কাছের সরকারি মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে। এই কঠিন বাজারে চাকরি-বাকরি পাবার পরও তাদের সেই ক্ষোভ যায়নি। তুমি তো জানো গত পে-কমিশন লাগু হবার আগে পর্যন্ত আমাদের কী পরিমাণ কম টাকা বেতন ছিল। ঋণ না নিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ি বানাতে গিয়ে হাতে টাকাও থাকত না তেমন। ভাত-কাপড়ের চেহারা ছিল নিতান্তই অপটুরকমের মোটা অথচ শীর্ণ। বেশ কয়েক বছর কয়েক বছর এমন চলেছিল। তখন আমাদের জামাকাপড়ের একটা বড়ো অংশ কেনা হতো গুঁটরোর কাপড়ের হাট থেকে। অবশ্য তোমাদের বউদি প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংসার চালাতেন। সেখানে জামাকাপড় যেমনই হোক না কেন ছেলেমেয়েদের বই খাতা কলমের ঘাটতি কখনও হতো না। পাঠ্য বইয়ের বাইরের কত প্রয়োজনীয় বই যে তাদের কিনে দেওয়া হতো তার ইয়ত্তা নেই। এইভাবেই সমস্ত বিষয়ের আকরগ্রন্থ— এনসাইক্লোপিডিয়া বা ডিকশনারি ওদের জন্য কেনা হয়েছিল। অনেক নামিদামি ইংরেজি বইও কিনে দেওয়া হতো। জামাকাপড় কিনতে গুঁটরোর হাটে গেলেও বই কিনবার জন্য আমরা যেতাম খোদ কলেজ স্ট্রীটে। এমন-কী এরই মাঝে অফিস ছুটির পর এক বিল্ডার্সের দোকানের হিসেবের খাতা, স্টক ইত্যাদি দেখে দিয়ে অতিরিক্ত টাকা রোজগার করে ছেলেমেয়েদের জন্য সেই প্রথম যুগের একটা কম্পিউটার এবং বেসিক কম্পিউটার শেখানোর জন্য একজন মাস্টারমশাইও জোগাড় করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এর মধ্যেই নিজেদের সহপাঠীদের যাদের বাবা সাধারণ কনিষ্ঠ কেরানি তাদেরও পরনের দামি হাল ফ্যাশনের জামাকাপড়, বছর বছর রঙিন বেলুন টাঙিয়ে তাদের জন্মদিন পালন, টিফিনের সময় তাদের পকেটে ঘুগনি, আলুর দম, চটপটি ভাজা খাওয়ার মতো দেদার পয়সা, কায়দার সাইকেল কিংবা বাবার মোটর সাইকেলের পেছনে চেপে স্কুলে আসা— পয়সাওয়ালা ছেলেদের প্রতি মাস্টারমশাইদের পক্ষপাত— এসবের নেতিবাচক নির্দেশনা ওদের রক্তে কীভাবে যেন প্রবেশ করেছিল। আমার কিংবা তোমার বউদিকে দেখে কিংবা বাড়িভর্তি বই পেয়ে ভালো রেজাল্ট ও তার জোরে এই খরার যুগে চাকরিবাকরি পেয়েও তারা খুশি হয়নি। প্রাচুর্যহীন স্বাচ্ছল্যে বড়ো হওয়ার প্রহসনও তারা ভোলেনি। বিশ বছর পর, এখনও ইংলিশ মিডিয়ামে না পড়ানোর জন্য তারা তাদের মাকে অভিসম্পাত দিয়ে চলেছে। এবার জ্বর-সর্দি নিয়ে মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে অভিযোগ করেছে যে, ছোটোবেলায় তাদের হরলিকস খাওয়ানো হয়নি বলেই এখন জ্বর-টর হচ্ছে! বিয়ের পর ছেলে আমাকে বা তোমার বউদিকে কিচ্ছু না জানিয়েই ই এম আইয়ে জিনিস কিনে কিনে তার ঘর ভরে ফেলেছে। অথচ ওরা ছোটোবেলা থেকে দেখেছে— আমি বা তোমার বউদি কখনও ধার করিনি, মুদিখানায়, স্টেশনারি দোকানে, কাপড়ের দোকানে, বাজারে মাছ বা তরকারিওয়ালার কাছে কোনোদিন খাতা খুলিনি! বড়ো, ছোটো ছেলে কিংবা মেয়ে— কেউই চাকরি পাবার পর কোনোদিন মায়ের হাতে দশটা টাকাও দেয়নি। টাকার আমাদের দরকার নেই, একান্ত বন্ধুবান্ধব ভিন্ন কারও কাছ থেকে আমি কখনও এককাপ চা-ও খাইনি। কিন্তু…..তবুও… ছেলে মাকে বলবে— টাকার দরকার লাগলে বলবে, টাকা দিয়ে দেব! টাকার দরকার লাগবে আমাদের! আমরা ওদের কাছ থেকে চেয়ে টাকা নেব!’
বিমলদা ক্ষণিকের জন্য থামলেন জনহীন ক্যাম্পাসের প্রধান রাস্তাটি প্রস্থানবিন্দু হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে বাসরাস্তায়। সেদিকে দৃষ্টি মেলে দিয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের গ্লাসটা বেঞ্চের পাশে নামিয়ে রেখে বললেন— ‘দিন-কয় আগে মেয়ে তো তোমাদের বউদিকে বলেই বসেছে— তোমরা তো সারাজীবন টাকাপয়সা গুণে গুণেই গেলে— তোমাদের টাকা তোমাদেরই থাক!’
কথা থামিয়ে বিমলদা একটা বিড়ি ধরালেন, বললেন— ‘আমরা টাকা-পয়সা গুণেছি! বাইরে কার কার সঙ্গে লড়াই করব ভাই, সেকশন অফিসার? এক্সকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার? চিফ ইঞ্জিনিয়ার? কনট্রাক্টর? সমাজ, রাষ্ট্র?— নাকি আমার ছেলেমেয়েদের বিরুদ্ধে?— কার বিরুদ্ধে! আমাদের মেয়ে তো মাকে সরাসরি বলে— তুমি কী জ়ানো, কী বোঝ়ো! বাবা-মাকে বলে পরগাছা!— কার কার বিরুদ্ধে লড়াই করব ভাই!’ খুকখুক করে হাসলেন বিমলদা।
অস্তগামী সূর্যের লাল আভা বিমল ঘোষের কপোল ছুঁয়ে পিছলে যাচ্ছিল।
আমিও হাসলাম— ‘আপনার মেয়ে নির্ঘাৎ পরগাছা শব্দের অর্থ জানে না— নইলে আপনাকে পরগাছা বলে! অফিসে নিরাপদ দপ্তরিকে দিয়ে আপনি কখনও এক গ্লাস জলও আনাননি, বরাবর নিজে উঠি গিয়ে অ্যাকুয়াগার্ড থেকে জল ভরে খেয়েছেন, নিজের চায়ের গ্লাস নিজে ধুয়ে রেখেছেন। আপনিই অফিসের একমাত্র মানুষ যিনি নিজে উঠে গিয়ে আলমারি থেকে ফাইল বের করে এনেছেন, আবার কাজ শেষে নিজেই ফাইল যথাস্থানে সাজিয়ে রেখে দিয়েছেন! নিজের জুনিয়ারদের পর্যন্ত কখনও আপনি হুকুম করেননি— বরং তাদের না-পারা কাজ জরুরিভিত্তিতে আপনিই করে দিয়েছেন! কথাগুলো বলার সময় আপনার এসব দিক না-জানুক আপনি কীভাবে একাই নিজের জীবন, এই সংসার গড়ে তুলেছেন সেকথা তারা না-জানুক বা চোখ মেলে না দেখুক— ‘বউদিকে কী জানো কী বোঝো’ বলার আগে অন্তত মিনিমাম বউদির সেই পুরাকালে পাওয়া এমএ ডিগ্রিটার কথা মনে রাখা উচিত ছিল। ’
বিমলদা একটা নিঃশ্বাস ফেললেন, বললেন— ‘সো দিস ইজ রাইট টাইম টু ক্যুইট। দেখো ভাই, আমার এখন আটান্ন বছর বয়স। দু-বছর পর আমাকে এমনিতেই রিটায়ার করে চলে যেতে হবে।’
— ‘তারপরও তো পাঁচ বছর এক্সটেনশন পেতে পারেন, সকলেই তো পায়!’
বিমলদা হেসে উঠলেন— ‘পাগল হয়েছ ভাই! এই অফিসে আমার প্রায় চল্লিশ বছর হলো। আবার! আর বাজাবি ক্যানেস্তারা, আর বাজাবি ভেঁপু! প্রাণটা হাঁপিয়ে উঠেছে, ভাই। তাছাড়া এক্সটেনশনের জন্য তো অ্যাপ্লিকেশন করতে হবে। বলেছি না, আর কারও কাছে কোনো আবেদন-নিবেদন করব না।’
— ‘তাহলে অন্তত আর দু-বছর করে ষাট কমপ্লিট করে যান। তাহলে সম্পূর্ণ রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট পাবেন। নইলে অনেক টাকা ক্ষতি হবে আপনার।’ বললাম আমি।
সন্ধ্যার প্রথম ছায়া নেমে আসছিল দ্রুত।
আমরা বেঞ্চি ছেড়ে উঠলাম, শিবুকে দোকান গোটাতে হবে।
রাস্তায় নেমে বিমলদা বললেন— ‘তোমার হিসেবটা ঠিকই আছে। আবার আমাদের হিসেবটাতেও ভুল নেই। ছেলেমেয়েরা ঠিকই বলে টাকা গুণে গুণে, রেজগি গেঁথে গেঁথে আমাদের জীবন কেটেছে। আর কেন! আরও দু-বছর পর আরও বয়স বাড়বে, শরীর আরও একটু অশক্ত হবে। ভেতরের জোরও কমে আসবে। ডাক্তার-বদ্যি করতে করতে ছেলেমেয়েরাও অস্থির হয়ে পড়বে— মানে আরও বেশি করে পরগাছা হওয়া— ইহকাল এইভাবে ঝরঝরে করে তারপরে কোনোদিন বুড়োদের দলে মিশে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করবার জন্য ফস্ করে ভাগ্যে বিশ্বাস করে ফেলব এবং মঠে-মন্দিরে গিয়ে ধর্না দেব বা ‘ওহে দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো’ বলে খঞ্জনি বাজাব! তার চেয়ে এখনও শরীরে শক্তি আছে, ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায় নিয়ে একটু জেদ আছে। এর পরে আর নিজেদের জীবন বলে কিছু থাকবে বলে মনে হয় না। তার চেয়ে সেই যে গীতার কর্মযোগের পঁয়ত্রিশ নম্বর শ্লোকে বলা আছে না—
‘শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরোধর্ম ভয়াবহঃ॥’
শ্লোকটার মানে জানো তো? স্বধর্মের অনুষ্ঠান দোষযুক্ত হলেও সুচারুরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম থেকে উত্তম। স্বধর্মে স্থিত থেকে মৃত্যুও পরধর্ম অবলম্বন অর্থাৎ নিজের স্বভাবধর্ম থেকে সরে যাওয়া থেকে ভালো বা মঙ্গলজনক। সুতরাং সর্বক্ষেত্র থেকে পরিত্যক্ত ও নির্বাসিত আমাদের পক্ষে, মানে আমার আর তোমাদের বউদির পক্ষে সাবলম্বনের মধ্যে স্বেচ্ছানির্বাসনই সবচেয়ে ভালো হবে বলে মনে হয়।’
প্রথম সন্ধ্যার অস্বচ্ছ কাঁচের মতো আলোয় একবার বিমলদার মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। েসই মুখে রাগ, দুঃখ বেদনা কিছুই ছিল না— নির্বেদ প্রজ্ঞাময় এককত্বের দ্যুতি অস্বচ্ছ অন্ধকারের সেই জ্যোৎস্নাপূর্ব আলোয় এক অন্যতর আত্মবোধের জন্ম হচ্ছিল যেন।
— ‘তা-ও কথাটা তোমাকে বিশ্বাস করে বললাম আশা করি শুকনো, ঝিম-ধরা ডালপালায় ঝিমন্ত মানুষের মধ্যে কথাটা ফাঁস করবে না। তাতে অবৈধ কৌতূহলীদের নেহাৎই একটা রগড়ের উপাদান হবে, আর পরচর্চায় ভরে যাবে অফিস ক্যাম্পাস।’
আমি মাথা নেড়েছিলাম।
(ক্রমশ)
