রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ৩৯। অনুবাদে অর্ণব রায়
ব্যাক্তিগত ডাক পালকি আর সরকারী ডাক পাল্কির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হল, সরকারী ডাকের ক্ষেত্রে যাত্রাপথে প্রতি আট মাইল অন্তর অন্তর আটজন করে নতুন বেহারা মজুত থাকে। ফলে যতদূর ইচ্ছে যাওয়া যায়। কিন্তু ব্যাক্তিগত ডাকের ক্ষেত্রে যেহেতু এত লোক জোগাড় করা স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব নয়, তাই যাত্রাগুলোও, যদি সীমিত নাও হয়, অন্ততঃ সম্ভবপর দূরত্বের মধ্যে হয়ে থাকে, কেননা সীমিত সংখ্যক লোককেই পুরো যাত্রাটা কাঁধে করে পালকিটা বয়ে নিয়ে যেতে হয়। যেমন আমার আজকের যাত্রাটা, আমি বোধহয় আগেও বলেছি, ঠিক বাইশ মাইল পথ। একটা ব্যাপার ভেবে খুব আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়, যে এই লোকগুলোর আকার প্রকার দেখে, এদের খাওয়া দাওয়া বা এদের অন্যান্য অভ্যাস দেখে বা যে জলবায়ুতে এরা বড় হয়েছে সেসব দেখে হতবাক হয়ে যেতে হয় যে কীভাবে এই রোগাভোগা চেহারার দরিদ্র মানুষগুলো, যাদের কাঠামো কোনওভাবেই কোনওরকম কঠিন কাজের জন্য তৈরি নয়, তারা কীভাবে এই কঠোর পরিশ্রমের কাজ দিনের পর দিন করে চলেছে, সহ্যও করছে। তাও আবার এতগুলো লোক! আমার মনে হয় তাদের এই অসম্ভব সহ্য করার মানসিকতা আসে তাদের দায়িত্ব না এড়িয়ে যাওয়ার মানসিক গঠন থেকে। এদেশে রেলওয়ের আশীর্বাদ একবার এসে উপস্থিত হলে শুধু যে ব্যবসাবানিজ্য বা মালপত্র এদিক ওদিক করার সুবিধে হবে তাই নয়, মানবিকতার দিক থেকেও অনেক উপকার হবে।
হুঁকো এদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইংল্যান্ডে একজন শ্রমিকের দিনের কাজ শুরু করার আগে যেমন একগ্লাস গ্রগ (১) বা এক পাঁইট পোর্টার ওয়াইন দরকার হয়, এদেশে হুঁকোয় টান মারাকে ততটাই মুল্য দেওয়া হয়। কোথাও যাওয়ার সময় হুঁকোবরদার পালকির সঙ্গে সঙ্গে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে চলে। কিন্তু যে লোকটা সদ্য সদ্য শহরের ইঁট কাঠের জঙ্গল প্রাণান্তকর কোলাহল থেকে গ্রামে এসেছে, চারিদিকে শুদ্ধ শান্ত বাতাস সবুজ মাঠ, তার পক্ষে নিজেকে ঠিক রাখা কীভাবে সম্ভব? যাই হোক, মাইলখানেক হাঁটতে না হাঁটতে একখানা বড় পুকুর এসে উপস্থিত। তাতে হাঁটুজল, কিন্তু আমাকে পালকিতে গিয়ে উঠতে হল। আরও কয়েক মাইল না গিয়ে আমি পালকির বাইরে বেরোতে পারলাম না। প্রতি পাঁচশো ইয়ার্ড যেতে না যেতে রাস্তার ওপর হয় একখানা বড় জলভরা গর্ত নয় বইতে থাকা জলের ধারা আমাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অপেক্ষাকৃত খোলা জায়গায় এসে পড়লে বোঝা যায়, বন্যার প্রকোপ কতটা ব্যাপক! যেদিকেই তাকাও শুধু বড় বড় জলের চাদর বিছানো। কোনও কোনওটা এতই বড় যে দেখে আস্ত একটা নদী বলে ভুল হয়ে যাবে। এর মধ্যেই মাঝে মাঝে ছোট ছোট দ্বীপের মত, টিলার মত ডাঙা উঁচু হয়ে আছে। সেখানে জলের মধ্যে থেকে সবুজ ধানের গাছ বন্যার জলের ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। দেখতে অপূর্ব লাগছে! এই সমস্ত চিহ্ন দিয়েই যে সামান্য কিছু ডাঙা অবশিষ্ট আছে সেগুলোকে জলের থেকে আলাদা করা যাচ্ছে। আমাদের পালকিটা যদি দুদিকে ডান্ডা দেওয়া একটা নৌকা হত, তাহলে আমাদের বেহারাদের খাটনি অনেকটা কমে যেত। চারিদিকেই ডাঙার থেকে জলের অংশ অনেক বেশী।
কিছু গ্রাম আছে যেগুলো সাধারণ উঁচু ডাঙার থেকেও আর একটু উঁচুতে অবস্থিত। বন্যার জলের ওপরে থাকার কারনে এরা নিজেদের অস্তিত্ব এবং আকারপ্রকার বজায় রাখতে পেরেছে। এই ধরণের গ্রামের পাশ দিয়ে গেলে বা কাছাকাছি এসে উপস্থিত হলে ভারতীয় গ্রামজীবনের একটি অপূর্ব বৈশিষ্ট্য চোখে না পড়ে থাকে না। সেটা হলে এখানকার মাটির কুঁড়েঘর। সবখানেই এই কুঁড়েঘরগুলি এমন সুন্দর জায়গায় অবস্থিত হয় যে দেখে মনে হয় কোনও বড় শিল্পী তাঁর ছবিটিকে নায়নাভিরাম বানানোর জন্য চারিদিকের গাছপালা পত্ররাজির মধ্যে কুঁড়েঘরটিকে অত্যন্ত হিসাব করে সূক্ষ্ম মাপে বসিয়েছেন। এর মাঝে দড়ি বাঁধা ভীতু গরু আর তার অবাক বাচ্ছা, হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে। জীবনে প্রথমবার বোধহয় সে সাদা দোপেয়ে জানোয়ার দেখছে। আর রয়েছে এক কালো ছাগল। সে দুনিয়ার কোনও কিছুরই পরোয়া করে না। কার গায়ের রঙ সাদা কার রঙ কালো, তার কিছুতেই কিছু যায় আসে না। কেবলমাত্র যে ঘাস সে এত পরিশ্রম করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে, সেই ঘাস ছাড়া দুনিয়ার আর সব কিছুই তার কাছে অসাড়। পুরুষ মানুষেরা সেলাম দিচ্ছে, মেয়েরা আমাদের দিকে পেছন করে বা পাশ ফিরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের মুখ ঘোমটায় আধখানা ঢাকা আধখানা খোলা। তার আড়াল থেকে তারা পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ‘সাহেব’ দেখছে। ছোট বাচ্চারা ছুটে পালাচ্ছে, কেউ দাঁড়িয়ে ড্যাবডেবে চোখ করে দেখছে, কেউ বা আবার পালিয়ে গিয়ে নিজের কুঁড়ে ঘরের নিরাপদ আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে এই মহান দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে থাকছে। রাস্তার প্রতিটি মোড়ে, যেখানেই চলা জলের ধারাকে একটু আটকানো যাচ্ছে বা মাটি দিয়ে বাঁধের মত তৈরি করে জলধারার গতি সরু খালের মধ্যে দিয়ে বইয়ে দেওয়া গেছে, ছোট বাচ্চা বড় মানুষ যে পেরেছে সেগুলোর মুখে একখানা করে ঘুনি জাল পেতে রেখে দিয়েছে। ঘুনি জাল হল বেতের তৈরি এক ধরণের মাছ ধরার জাল (সে জাল নানা আকারের হতে পারে)। এই জাল দেখতে জাল কম সুন্দর করে বানানো পাখির খাঁচা মনে হয় বেশী। সে জাল এইসব জলধারার মুখে পেতে তারা ধৈর্য্য ধরে তাকিয়ে বসে থাকে। অজস্র ছোট ছোট মাছ, কুচো চিংড়ি যেগুলো বাংলার নদীনালায় হামেশাই দেখতে পাওয়া যায়, নদীর দুপাড় উপচে যাওয়ায় তাদের বাসস্থান আরও প্রসারিত হয়ে গিয়ে সহস্র জলধারায় মিশে গিয়েছে [1]। এর উল্টোদিকে ধানক্ষেতে ঘুরে বেড়ানো অপূর্ব সুন্দর বক একই কাজে ব্যস্ত। তার সাদা লম্বা গলা একবার তুলে একবার নামিয়ে ধানক্ষেতের জলের মধ্যে লম্বা ঠোঁট ডুবিয়ে পা ফেলে ফেলে আরও নিরাপদ জায়গার দিকে সরে যাচ্ছে। একদিকে হাজার হাজার সোয়ালো পাখির শিষের শব্দ মাটি থেকে উঠে আসছে অন্যদিকে বকেদের ধানখেতের ওপর ছোঁ মারার সময় নীচু স্বরে চিৎকার, তার ওপর বন্য ঘুঘু পাখির কু কু শব্দ, এই সমস্ত মিলে চারিদিকের বাতাসের শান্তভাবকে খানখান করে দিচ্ছে।

ঘুনি জাল
পরের পুরো দশ মাইল পথে জল কমার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। কোনও কোনও জায়গায় তো জলে পথের সমস্ত চিহ্ন এমনভাবে মুছে দিয়েছে যে আমার পালকির বেহারাদের মাঝে মাঝেই থেমে যেতে হচ্ছিল। একজন বা দুজন এগিয়ে লাঠি হাতে দেখে ঠুকে ঠুকে জলের শব্দ শুনে বুঝে নিচ্ছিল জল কতটা গভীর, তারপর এগোনোর সাহস করছিল। অধিকাংশ জায়গাতেই জল হাঁটুসমান ছিল।
মূলনাথে আমরা পৌঁছোলাম বেলা দুটো নাগাদ। সবদিক বিচার করে দেখলে একথা মানতেই হবে আমরা খুব একটা খারাপ আসিনি। এখানে এসে চারিদিকে নানারকম ক্ষয়ক্ষতির দুঃখজনক চিহ্নই চোখে পড়ল। শুধু তো বন্যা নয়, সাম্প্রতিক হারিকেন ঝড়েও সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে। গাছ উড়ে গেছে অথবা ভেঙে মুচড়ে গেছে। কেউ যেন তাদের শরীরের বিপুল অংশ কেটে বের করে নিয়েছে। চারিদিকে যত কুঁড়েঘর আছে, সব ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা তাদের মাথার ওপরের চাল উড়ে চলে গেছে। তাও যদি এই ঝড়ের তান্ডব এখানেই শেষ হত! হায়, ষাট জন দরিদ্র মানুষ, অধিকাংশই বৃদ্ধ আর মহিলা, আশেপাশের এলাকার রায়ত আর গ্রামবাসী, এতই দুর্বল যে এই নিষ্ঠুর ঝড়ের সামনে না অন্য কোথাও সরে যেতে পেরেছে না এর ঝাপটা সহ্য করতে পেরেছে, তারা সবাই কুঁড়েঘরের মাটির দেওয়াল চাপা পড়ে মারা গেছে। ঝড় এসে সব বাড়িঘরের দেওয়াল ছাদ সব একেবারে ধুয়েমুছে সমান করে দিয়ে গেছে।
প্রকৃতির এই ধ্বংসলীলার পর দুমাস কেটে গেছে। এইসব গ্রামদেশ, অন্তত বহিরঙ্গে নিজেকে কিছুটা সামলে নিতে পেরেছে। গরীব মানুষের মুখে কিছুটা হাসি ফিরে এসেছে। আশেপাশের বনজঙ্গল কিছুটা খানিক পাতলা হয়ে এসেছে। কিছু কিছু অসাধারণ গাছে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। গাছপালা পড়ে যাওয়ায় কিছু কিছু দিক খালি হয়ে নতুন দৃশ্যের উন্মোচন হয়েছে যেগুলো আগে কখনও দেখা যায় নি। যদি সময়ের সাথে সাথে এই ক্ষত পূরণ না হয় তো চোখ এই নতুন দৃশ্যে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। এছাড়া মূলনাথের প্রকৃত সৌন্দর্য্যের খুব একটা ক্ষতি হয়নি। এখনও গবাদি পশু ও পার্কে ঘুরে বেড়ানো হরিণদের আশ্রয় দেবার মত যথেষ্ট জঙ্গল আশেপাশে রয়েছে, যে সমস্ত পাখিদের দল সকাল থেকে সন্ধ্যে কিচিরমিচির করে মাথা খারাপ করে দেয় তাদের বাসা বাঁধবার মত যথেষ্ট ঝোঁপঝাড় রয়েছে, প্রচন্ড দুর্যোগের দিনেও খেয়েপরে টিকে থাকের মত যথেষ্ট শাকসব্জি আশেপাশে ফলে,– চারপাশের ভূভাগের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করার জন্য যতটুকু জলভাগের দরকার তার বেশী একটুও জল কোথাও জমে নেই, আকাশে বাতাসে পরিপূর্ণ শান্তি, যেন সাবাথের দিনের (২) নীরবতা বজায় আছে সবদিকে—
“এত গভীর ও পবিত্র, প্রগাঢ় ও শান্ত,
স্বর্গের সুরভিতে এত আমোদিত
পীড়িত হৃদয়ে ঘু্মপাড়ানি গানের মত,
যেভাবে কোনও কিছু পুর্ণ বিশ্রামে যায়,
কপালে যত্নের হাত বুলিয়ে সমান করে দেয়
দুঃখের যন্ত্রণা আরাম করে দেয়,—” [2]
সত্যি, এও মনকে কম আরাম দেয় না। মনের থেকে বোঝা নামিয়ে তাকে আনন্দের প্রতি উন্মুখ করে তোলে।
টীকা
১। গ্রগঃ সপ্তদশ শতকের ব্রিটিশ রয়্যাল নেভি-র জনপ্রিয় পানীয়। জলের সাথে অল্প পরিমান রাম মিশিয়ে তার সাথে অল্প চিনি আর লেবুর রস মিশিয়ে প্রস্তুত হত। রয়্যাল নেভিতে এই পানীয় দৈনিক খোরাক হিসেবে নাবিকদের দেওয়া হত। এতে নেশাও কম হত, পানীয়ের তৃষ্ণাও মিটত।
[1] আমি নিজের চোখে দেখেছি যেখানে নদীর পাড় বা বাঁধ সদ্য সদ্য ভেঙেছে সেখানে লোকে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আর হাতের কাছে আর কোনও জাল বা কিচ্ছু না পেয়ে তাদের পরণের কাপড়ের অংশ বা রুমাল সেই জলধারার মুখে পেতে দিয়েছে আর তিরিশ সেকেন্ড যেতে না যেতে একটা হাফ পাঁইট মাপের পাত্র পূর্ণ হয়ে যাবে, এত কুচো মাছ ধরে ফেলেছে। সেসব মাছ লম্বায় এক ইঞ্চির তিন চতুর্থাংশ থেকে শুরু করে দুই ইঞ্চি পর্যন্ত হয়।
২। সাবাথঃ সপ্তাহের সপ্তম দিন, রবিবার। খ্রীস্টান মতে ঈশ্বর ছয় দিনে দুনিয়া তৈরী করে সপ্তম দিনে বিশ্রাম করেছিলেন। এই দিনটা সাধারণ মানুষের জন্য তাই কাজ থেকে বিশ্রামের, চার্চে যাবার, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর, প্রার্থনা করার, ধর্মচিন্তা ও ঈশ্বরচিন্তায় কাটানোর।
[2] “সাবাথের নীরবতা”। “ম্যাডোনা পিয়া ও অন্যান্য কবিতা”। জেমস গ্রেগর গ্রান্ট।
(ক্রমশ)
