রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ৩২। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

বর্তমান সময়ে নীলের চাষ দুইভাবে হয়ে থাকে। এক ধরনের চাষকে বলে রায়তি চাষ, আর একটা হল নিজাবাদ (নিজ-আবাদ)। প্রথম ক্ষেত্রে, অর্থাৎ রায়তি  চাষের ক্ষেত্রে দেখা যায় রায়ত নিজের জমিতে চাষ করছে। সেই জমি সে জমিদার বা প্ল্যান্টারের থেকে পেয়েছে। কিছু আগেই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছি। আর এই চাষটা সে করছে জমিদার বা প্ল্যান্টারের হয়ে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, অর্থাৎ নিজাবাদ- এর ক্ষেত্রে (নিজাবাদ কথাটার মানেই হল ব্যাক্তিগত চাষাবাদ) চাষী নিজের জমি নিজে চাষ করে থাকে। এর জন্য লোকজন যা লাগানোর, সে নিজেই লাগায়। স্বাভাবিক ভাবেই, চাষ থেকে লাভ ক্ষতি যা হয়, তা তার নিজের থাকে।

রায়তি ব্যবস্থার চাষটাকেও এরকমই করার চেষ্টা চলছে। সুদখোর মহাজনের কাছে যাওয়ার বদলে চাষী প্ল্যান্টারের কাছ থেকে বোনার জন্য প্রয়োজনীয় বীজ পাবে, তার কাছ থেকে এক বিঘা মানে এক একরের এক তৃতীয়াংশ জমিতে বপন করতে যত বীজ লাগে তার জন্য সমান হারে চার আনা (মোটামুটি ছয় পেন্স) করে মূল্য নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে প্ল্যান্টারের খরচ সবসময়ই দ্বিগুন বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে তিনগুনও হতে পারে, কিন্তু রায়তের কাছ থেকে আদার করা টাকা কখনও পরিবর্তন হয় না [1]। এর সাথে সাথে যে ফসল এখনও হয়নি, কিন্তু হবে, তার জন্যেও চাষী অগ্রিম টাকা পায়। উভয় পক্ষই লিখিত চুক্তি বা সাট্টা –য় সই করে। জমি চাষ করার জন্য যে পরিমান বীজ রায়তকে দেওয়া হয়, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্ল্যান্টার নিশ্চিত করে যে চাষী একটা নির্দিষ্ট দাম পাবে আর চাষী নিশ্চিত করে যে সে প্ল্যান্টারকে একটা নির্দিষ্ট টাকা দেবে। কিন্তু এর ফলাফল বিভিন্ন রকম হতে পারে। সবটাই নির্ভর করে ঋতুচক্রের ওপরে। একজন ভালো রায়ত, যদি মরশুম তার অনুকূলে থাকে, তাহলে শুধু যে তার অগ্রিমের টাকা ফেরত দেয় তাই নয়, তার চেয়ে অনেক বেশী কিছু দেয়। আর যদি মরশুম খারাপ চলে, তাহলে সে তার অগ্রিমের টাকাও ফেরত দিতে পারে না। কিন্তু এর সাথে এই তর্কও উঠে আসে, রায়ত যদি জমি চাষ করতে বা আগাছা নিড়োতে কম যত্নবান হয়, অথবা অন্য ভাবে তার ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না করে, আর সবচেয়ে বড় কথা অসততা, এই শয়তানকে তো হামেশাই সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে কী হবে! এক্ষেত্রে প্ল্যান্টারকে আর তার প্রতিষ্ঠানকে কড়া হাতে এই সব বদমায়েশি আটকাতে হবে।

এরকম পরিস্থিতিতে, এখুনি যেটা ভাবলাম আরকি, যে রায়ত এমনকি তার অগ্রিমের টাকাটাও ফেরত দিচ্ছে না, এই ঘাটতিটা তার ঋণের সাথে যোগ হয়, যাতে করে সে, যদি সম্ভব হয়, পরের বছর চাষের সময় ফিরিয়ে দিতে পারে। সে আবার নতুন করে অগ্রিম টাকা পায়। যদিও সে টাকা থেকে কিছুটা অংশ তার ঋণের কিস্তি হিসেবে কেটে নেওয়া হয়। এটাও করা হয় শুধুমাত্র তার ওপর থেকে ঋণের বোঝা কিছুটা কমানোর জন্য, যাতে করে সে তার চাষাবাদ চালিয়ে যেতে পারে এবং আশা করতে পারে যে পরের মরশুমে তার পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবে। কিন্তু একে ভাগ্যের দোষ বলবে, না ক্লান্তি বলবে, না কি সিস্টেমের ত্রুটি, যাই হোক না কেন, দেখা গেছে, এই ঋণের স্বভাবটা নাছোড় আঠার মত। সকলের গায়েই লেগে আছে। খুব দুঃখের সঙ্গেই আমাদের পাশের একটি নীল কারখানা থেকে আমাকে একটা হিসেব দেখানো হয়েছিল। তাতে দেখা গেছে, এই খারাপ ঋণ মানে শুধুমাত্র এই না ফেরত দেওয়া অগ্রিম, বহু বছর থেকে জমে জমে দু লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে- প্রায় ২০০০০ পাউন্ড!

 

এই যে সিস্টেমের কথা এখুনি বললাম, এতে করে রায়তকে মহাজনের কাছ থেকে ধার নেওয়ার দরুন যে ক্ষতি, তার হাত থেকে বাঁচানো যায়। কেননা প্ল্যান্টার স্বাভাবিক ভাবেই কোনও সুদ নেয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, এমন পরিস্থিতিও হয়েছে, যেখানে একজন অসৎ রায়ত উভয় পক্ষের কাছ থেকেই টাকা নিয়েছে। ফলে নানারকম ঝামেলা ঝঞ্ঝাটের উদ্ভব হয়েছে ও যে শান্তি একসময় আশেপাশের প্ল্যান্টারদের অধীনস্থ এলাকায় পরিব্যাপ্ত ছিল, সেই শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে। এ সমস্ত কিছুর মূলে রয়েছে সেই অগ্রিম দেওয়ার ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থা এদেশে ইংরেজ প্ল্যান্টারদের চরিত্র সম্পর্কে এমন খারাপ ধারণা তৈরি করেছে, যে তার চরিত্রের ছবি এদেশের মানুষের মনে দাঁড়িয়েছে লড়াকু ডাকাত বা সীমান্তের আইনভঙ্গকারী নিষ্ঠুর শিকারী যেন। অথচ সতিটা হল, এরা, ওথেলো থেকে ধার করে বলতে হয়, যাকে বলে ‘চরম বিভ্রান্ত’। আর আমার বিশ্বাস, যেটুকু আইন টাইন নিজের হাতে তুলে নেয়, যদি আদৌ নেয় আরকি, তা তাকে নিজের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্যই নিতে হয়। কেননা দেশের শাসনব্যবস্থা ত্রুটিপুর্ণ আর এই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনও উপায়ও থাকে না।

এই সমস্ত ঝামেলাগুলো এখন বিরল হয়ে গেছে। কোনও কোনও জেলায় তো সম্পুর্ণ মুছেই গেছে। কিন্তু যখন ছিল, তখন সাধারণত এই ভাবে শুরু হত— একজন অসৎ রায়ত প্ল্যান্টারের কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমান নীলের জমি চাষ করার জন্য নিত। যখন ফসল পেকে কাটার সময় এসে উপস্থিত, তখন দেখা যেত, রায়ত একই ফসলের জন্য দুজন প্ল্যান্টারের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়ে বসে আছে! ফসল কাটার সময় এসে যাচ্ছে, এমন সময় একজন প্ল্যান্টারের কাছে খবর যায়, তার স্বার্থ, অর্থাৎ তার দেওয়া অগ্রিমের টাকা ডুবতে বসেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে জেলার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করে। ম্যাজিস্ট্রেট সম্ভবত বসে আছেন অকুস্থল থেকে তিরিশ চল্লিশ মাইল দূরে। কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গে দারোগা, মানে জেলা পুলিসের আধিকারিককে আদেশ দিয়ে দেন ঘটনাস্থলে যেতে এবং তদন্ত করে যা ব্যবস্থা নেওয়ার নিতে। এবারে একশোটার মধ্যে নিরানব্বইটা কেসে দেখা যায় এই পুলিস ভদ্রলোকটি কিন্তু তার নিজের সুবিধে মতন কাজ করেন এবং ব্যাপারটাতে মাথা গলানোর জন্য যে পক্ষ তাকে বেশী মোটা ভেট দেয় তার হয়েই তিনি কাজটি করেন। আবার এও হতে পারে, স্থানীয় জমিদার বা তার নায়েব ব্যাপারটার মধ্যে ঢুকে পড়ল, এবং প্রস্তাব দিল যে রায়তদের ওপর তাদের প্রভাব খাটিয়ে পুলিস বা প্ল্যান্টারকে তারা সাহায্য করবে, তার বদলে তারও কিছু স্বার্থ এদেরকে দেখতে হবে। প্ল্যান্টার খুব সম্ভবতঃ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে এবং তখন এই সাহায্যের প্রস্তাব চলে যাবে বিরোধী পক্ষের কাছে। প্ল্যান্টার এবার পুলিস ডাকবে তার নিজের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে এই ভয়ানক দুর্নীতিগ্রস্থ পুলিস, তার মধ্যে দারোগা মানে প্রশাসনিক প্রধান রয়েছে, তারা অপরপক্ষের কাছ থেকে যা যা সুযোগ সুবিধে পাওয়ার পেয়ে গেছে। ফলে এখন তাদের এই পুরো বিষয়টাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গী সম্পুর্ণ পালটে গেছে। ফলে এখন প্ল্যান্টারকে (আমি ধরে নিচ্ছি বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে সে বেশি স্বাধীনচেতা ও সোজাসাপটা লোক) তার নিজের হকের সম্পত্তি রক্ষা করতে অস্ত্রধারী চাপরাসী পাঠাতে হয়। গোলমাল বাঁধে, মারামারি হয়, প্রাণহানি হওয়াও খুব অসম্ভব ব্যাপার কিছু নয়।

কিছু ঝামেলার ক্ষেত্রে দেখা যায় দুই প্রতিপক্ষ প্ল্যান্টারের উভয়েই ইউরোপীয়ান। কিন্তু বেশী ঝামেলা বাঁধে যখন একজন প্ল্যান্টার এদেশী হয়। এখনকার থেকে আগে এদেশী প্ল্যান্টার বেশি দেখা যেত। আর এরকম ক্ষেত্রে ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে শান্তিপূর্ণ সমাধান পাওয়ার রাস্তা আরও বেশী কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু বর্তমানে, অন্ততঃ অধিকাংশ জেলাতেই সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে যাতে এরকম বিবাদ আর না বাধে। শুধু তাই নয় এত বেশী পরিমান ভূসম্পত্তিতে ইউরোপীয়দের অধিকার নিশ্চিত করা গেছে যে রায়তরা তাদের নিজেদের জমিতেই ভাড়াটে হিসেবে থাকছে— আর এরকম বিবাদ উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য হয়ে যাচ্ছে।

আমি ইতিমধ্যেই বলেছি, নিজাবাদ চাষের ক্ষেত্রে প্ল্যান্টারের অধীনে কোনও রায়ত বা তার ও জমি চাষ করার মাঝখানে কোনওরকম মধ্যসত্ত্বভোগী থাকে না। সে চাষের কাজে সম্পুর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের শ্রমিক নিয়োগ করে। ফলে এই ব্যবস্থা সর্বদাই ঝামেলা ঝঞ্ঝাটের ভয় থেকে মুক্ত থাকে।

টীকা

[1] ১৮৫৮। বেশ কয়েক বছর ধরে নীলের বীজের দাম চলছে আঠেরো থেকে চল্লিশ টাকা প্রতি মন (পরেরটা বর্তমান দাম)। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় বীজের খরচই পড়ে পাঁচ টাকা। এই বিপুল পরিমান খরচ বেড়ে যাওয়ার একমাত্র কারন হল ‘বিদ্রোহ’— এর ফলে বহু খেতখামার ধ্বংস হয়েছে, আর আপার প্রভিন্স, যেখান থেকে বেশ বড় পরিমানে বীজ আনা হত, তার সাথে যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply