কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২৪। শোভন সরকার

গত পর্বে: আনন্দময়ী মা আর বেনারসের নিবিড় যোগ। চন্দ্রাবলীর মাধ্যমে জুড়ে গেলাম আমিও। 

শিবম এবার বুধোয়া মঙ্গলের খুবই প্রাণবন্ত এক দৃশ্য বর্ণনা করে আমাকে শোনাল। ওর শব্দের নৌকায় ভাসতে ভাসতে আমিও যেন কোন সুদূর অতীতে পৌঁছে গেলাম এক লহমায়। চলুন আপনাদেরও সঙ্গে নিয়ে চলি কয়েকশো’ বছর আগে বসন্তের এক বিকেলে — ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কোন এক বছর।

হোলির পর চৈত্র মাসের প্রথম মঙ্গলবার। বছর শেষ হতে চলেছে। কিন্তু কাশীর মানুষদের আনন্দোৎসবের কোন কমতি নেই। বরং ঘরে ঘরে আজ সাজ সাজ রব, প্রস্তুতি চলছে এক বিশেষ উৎসবের। শহরের সমস্ত মানুষ, বিশেষতঃ পুরুষেরা, সারারাত বাইরে থাকবে, হয় ঘাটে বা ডিঙ্গিতে। তবে তারও আগে নিজেদের সবচেয়ে সেরা বেশভূষায় সেজে কেউ পালকি, কেউ হাতি, কেউ বা আবার ঘোড়ায় করে যাবে অসির দুর্গামন্দিরে।

দুর্গার দর্শন সেরে সবাই এসে উপস্থিত অসি ঘাটে। দল বেঁধে তারা নৌকায় চাপছে। এদিকে দিনের আলো কমে আসছে, অথচ অন্ধকার নামার সাথে সাথে তাদের উৎসাহ যেন বেড়েই চলেছে। একটা দু’টো নয়, অসংখ্য নৌকা যাত্রী বোঝাই করে হেলতে দুলতে চলছে পঞ্চগঙ্গা ঘাটের দিকে। সেখানে শুরু হয়ে গেছে এক বিশেষ উৎসব, সারা রাত ধরে চলবে সেই উৎসব — বুধোয়া মঙ্গল।

ঘাটের একপাশে বড় বড় বজরা বাঁধা। কাশীর যত রাজা-রইস, সামন্তপ্রভুরা নিজেদের সেরা বজরা গঙ্গায় ভাসিয়েছেন আজ। কে কত খরচ করে সেগুলোকে কতটা দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে পারেন এ যেন তারই এক অব্যক্ত প্রতিযোগিতা। বজরাগুলো তার মালিকের সাধ্যমত সেজে উঠেছে — সারি সারি আলোর সঙ্গে সঙ্গে নানা বর্ণ ও গন্ধের ফুলের মালায়। বাতাসে ফুলের ঘ্রাণ আর আনন্দের মোহ ভেসে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে ঘোলাটে অন্ধকারের মায়াজাল ভেদ করে ঝিলিক দিয়ে উঠছে আতশ বাজির ফুলকি। বজরাগুলোয় টাঙানো হয়েছে নকশাকাটা শামিয়ানা, পলকাটা ঝাড়বাতি। এ-কোণ ও-কোণ সাজানো হয়েছে নানা কারুকাজ করা বহুমূল্য মোমদানি, আর বিচিত্র বর্ণের ধ্বজা দিয়ে। বজরার মেঝেয় পাতা পুরু গালিচার মাঝে আলো করে বসে রয়েছেন কোন তাওয়াইফ, শ্রোতাদের ফরমাইশ মত একের পর এক পরিবেশন করছেন ‘হোরি’, ‘চৈতি’, ‘ঠুমরি’, সঙ্গতে রয়েছে পাখোয়াজের গম্ভীর বোল, সারেঙ্গীর মায়াঝরা ঝঙ্কার।

এই দৃশ্য কেবল একটা বজরাতেই নয়, পঞ্চগঙ্গা ঘাট থেকে শুরু করে, চৈত সিংহ ঘাটের বিরাট মহলের সামনে বা অসি ঘাট পর্যন্ত গঙ্গার বুকের উপর হাজার হাজার সংখ্যায় নানা প্রকারের নৌকা একে অন্যের গায়ে ঘেঁষে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রয়েছে বুধোয়া মঙ্গলের জাদুতে। কত রকমের নৌকা আনা হয়েছে আশেপাশের নগর-বন্দর থেকে, কী মিষ্টি তাদের নাম — পাটলা, বজরা, পিনিস, ডিঙ্গি, সোনামুখী, ময়ূরপঙ্খি, ঘোড়দৌড় এবং আরও কত।

বড় বড় নৌকাগুলিতে চলছে মেহফিল, সেখানে কাশী ও আশেপাশের এলাকা থেকে বিখ্যাত সব তাওয়াইফ, বাইজিরা নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন। কোন কোন নৌকায় আবার ছোট ছোট ছেলেরা ভাঁড়ামো করে লোকের মনোরঞ্জন করছে, কোথাও আবার কবিরা মুশায়রা জমিয়ে নিজেদের শায়েরী পড়ে শোনাচ্ছেন। গঙ্গার মুক্ত বাতাসে খোলা আকাশের নীচে তাঁরা নৃত্য-গীতে, হাসিঠাট্টায় মেহফিল জমিয়ে রাখবেন রাতভর। ছোট-বড় নৌকায় ঠাসা মানুষ, তারা সবাই এসেছে আজ বিনি পয়সায় স্বর্গীয় আনন্দের রসাস্বাদন করতে। বড় বড় বজরায় ওঠার অনুমতি নেই এদের, ওগুলো সবই কাশীর পয়সাওয়ালা শৌখীন মানুষদের জন্য। তাই বলে আনন্দপ্রিয় কাশীবাসীকে কি আটকে রাখা যায়? তারা তাদের নৌকাগুলোকে বড় বড় নৌকাগুলোর যথাসাধ্য কাছে ঘেঁষে বেঁধে রেখেছে — সেখান থেকেই তারা সারারাত নাচ-গান-মুশায়রা উপভোগ করে তৃপ্ত মনে, অফুরান সুখস্মৃতির ভাণ্ডার নিয়ে পরদিন বাড়ি ফিরে যাবে। অনেক নৌকা আবার নদীর উপর ভেসে ভেসে একের পর এক বিভিন্ন বজরার মেহফিল উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চলেছে। বহু মানুষ যারা নৌকার পয়সা দিতে পারেনি বা জায়গা পায়নি, তারা ভিড় জমিয়েছে ঘাটের উপরেই, সেখান থেকেই তারা তাদের চক্ষু-শ্রবণ সার্থক করছে।

জেমস প্রিন্সেপের ‘বুরওয়া মঙ্গল ফেস্টিভ্যাল, অ্যাট বেনারস’ চিত্রের অনুকরণে

এত মানুষ যখন জমেছে, তখন ব্যবসা জমবে না তা কী করে হয়? কত মানুষ কত রকমের সং সেজেছে — দেব-দেবী, যোগী-ফকির থেকে শুরু করে কবি-নর্তকি — এরা সবাই ঘুরে ঘুরে নানা রকম অঙ্গভঙ্গী বা কবিতা পাঠ করে লোকের বাহবা কুড়োচ্ছে আর সঙ্গে দু’-চার পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে। সারা রাত লোকজন নদীর বুকে আর ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়াবে, খিদে তো তাদের পাবেই। তাদের রসনা তৃপ্তির সুযোগে রমরমিয়ে উঠেছে নানা রকম খাবারের নৌকা। পুরি-কচৌরি, হরেক রকম মিষ্টি, ঠাণ্ডাই তো আছেই, সঙ্গে আছে পান-সুপারির নৌকা। এত কিছু থাকার পর যদি গাঁজা-ভাঙ না পাওয়া যায় তো শিবের শহরের অপমান। কাজেই অনেক নৌকায় সেসবও দেদার বিক্রি হচ্ছে। এই সব ছাড়াও নানা খেলনা, মনিহারি সামগ্রীর বিক্রি কোন কালেই যে কম হয় না তা বলাই বাহুল্য।

রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল তাঁর ‘কাশী পরিক্রমা’ বইতে বুধোয়া মঙ্গল উৎসবের এক নান্দনিক বর্ণনা দিয়েছেন —

“এই সকল নৌকা মধ্যে করিয়া বিছানা।

গঙ্গাসিসঙ্গমে নৌকালয় সর্ব্বজনা।।

পরন্তু ডাঙ্গার লোক জানিয়া আপন।

লইয়া নৌকাতে সভে করে আরোহণ।।

অন্য লোক পদব্রজে ভবনে আগত।

এই মত নৌকা হয় চারি পাঁচ শত।।

সকলে ভাটিয়া চলে সহর পর্য্যন্ত।

পঞ্চগঙ্গা-ঘাট যথা তত দূরে অন্ত।।

এই মত সর্ব্ব নিশি উজান ভাটাল।

তাবৎ পর্য্যন্ত যাবৎ নহে প্রাতঃকাল।।

বড় বড় পাটলিতে পাঁওরিয়া[1] নাচে।

ভাউয়া ছোকরা[2] ভাঁড় কত কাচ কাচে।।

তবলা সারঙ্গী বাঁশী সেতার মুচঙ্গ[3]

মন্দিরা রবাব বীণা তম্বূরা মৃদঙ্গ।।

ডিণ্ডিম খঞ্জনী বাজে ঢোলকের চাটি।

গুণিগণ গান করে কিবা পরিপাটী।।

কোন কোন পাটলিতে লোক কাশীবাসী।

টিকারা বাজাইয়া নাচে ভণ্ড[4] হেন বাসী।।

যেমত আশ্বিন মাসে বাঙ্গালা দেশস্থ।

কবিওয়ালা গান করে নাচিয়া সমস্ত।।

কোন পাটলির[5] পরে বৈসে হালোআই[6]

চুলা চাকি লইয়া পাক করয়ে মিঠাই।।

জিলেবি এলাচিদানা ঘিওর বাতাসা।

মতিচূর পাণিতুয়া খাজা আন্দরসা।।

মগদল[7] বেসন লাড়ু সঙ্গত পছন্দ।

পেঁড়া বরিফি বুন্দিয়া মিছিরি চিনি কন্দ।।

ছোহেরি কচোরি পুরি সর্ব্বদ্রব্য তাজা।

মোরব্বা আচার শাক তরকারি তাজা।।

যখন যাহার ক্ষুধা হইল উদয়।

নৌকা নৌকা লাগাইয়া যা চাহে তা লয় ।।

কোন কোন নৌকাতে তাম্বূলী[8] বাস করে।

দিব্য সাঁচিপান ছুটা কেহ বিড়া ধরে[9]।।

ছোট ছোট নৌকাতে তামাকু ভাঙ্গ গাঁজা।

বিকিকিনি করিয়া অনেকে করে মজা।।

এইরূপে কেহ নিশি করে জাগরণ।

অপর দিবস দেড়প্রহর যখন।।”

 

‘বুধোয়া মঙ্গল’ বা ‘বুঢ়ওয়া মঙ্গল’ নামটা ইঙ্গিতবাহী। ‘বুঢ়ওয়া’ অর্থাৎ ‘বৃদ্ধ’ শব্দটি ইঙ্গিত করছে বছরের শেষ সময়কে। চৈত্র মাসের মঙ্গলবারে এই উৎসব, তাই এর নাম ‘বুঢ়ওয়া মঙ্গল’। শেরিং যদিও বলছেন যে মঙ্গলবার শুরু হয়ে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত বলে এর নাম ‘বুধুয়া মঙ্গল’, পরে অপভ্রংশে ‘বুরওয়া মঙ্গল’। অনেকে আবার একে ‘বড়া মঙ্গল’-ও বলে থাকেন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, লখনৌ ও তার আশেপাশে জ্যৈষ্ঠ মাসে হনুমানের উপাসনাকে কেন্দ্র করে যে ‘বড়া মঙ্গল’ পালন করা হয়, তার সঙ্গে কাশীর এই উৎসবের চরিত্র একেবারেই আলাদা।

এই উৎসবের সূত্র-সন্ধান করতে গিয়ে দেখি যে তুলসীদাসের সময় থেকেই কাশীতে প্রতি বিক্রম-সংবৎ শেষে মঙ্গলবারে কাশীবাসী নৌকা করে অসিঘাট হয়ে দুর্গামন্দির ও সংকটমোচন মন্দিরে পুজো দিয়ে আবার নৌকা করে দল বেঁধে ফিরত। সঙ্গীত স্বাভাবিকভাবেই এই যাত্রাপথের অংশ হয়ে ওঠে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে আওধের নবাব রাজস্ব সংগ্রহের জন্য নাজিম হিসেবে মীর রুস্তম আলীকে জৌনপুর, গাজীপুর ও কাশীর দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। রুস্তম আলী নিজে ছিলেন দক্ষ কলাবিদ্যাবিশারদ আর ‘আয়েশ-পসন্দ’ (বিলাসী) মানুষ। লখনৌ ও কাশীর ‘গঙ্গা-যমুনি’[10] তহজিব বা হিন্দু-মুসলিম মিশ্র সংস্কৃতির বড় সমঝদার রুস্তম আলী কাশীতে ১৭৩৫ সাল নাগাদ হোলির উৎসবকে বুধোয়া মঙ্গলের মোড়কে এক নতুন, জমকালো মাত্রা দেন। তিনি নিজে হোলি, দশেহরা, দিওয়ালি প্রভৃতি উৎসব অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে পালন করতেন। ভারত কলা ভবনে আজও তাঁর হোলি খেলার একটা চমৎকার চিত্র সংরক্ষিত আছে। এখনও বেনারসে একটা পুরনো ‘হোরি’ গাওয়া হয়, ‘কাহাঁ গয়ো মেরো হোলি কি খেলাইয়া, সিপাহি রুস্তম আলী বনকো সিপাহিয়া’, অর্থাৎ, ‘কোথায় গেলে আমার হোলি খেলার সখা, ওহে রুস্তম আলী, ওহে সুপুরুষ সিপাহি’।

ঐতিহাসিকদের এক বড় অংশ মনে করেন বুধোয়া মঙ্গল উৎসবের জৌলুষ শিখরে পৌঁছায় তাঁরই উৎসাহে। কেউ কেউ আবার বলেন এর কৃতিত্ব মহারাজা বলবন্ত সিংহ এবং মহারাজা চৈত সিংহের এবং তাঁর পর একে জনপ্রিয় করে তোলেন কবি ভারতেন্দু হরিশ্চন্দ্রের প্রপিতামহ ফতেহচাঁদ। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, এই উৎসবকে বেনারসের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়ে পরিণত করার পেছনে সেই সময় ও পরবর্তীকালের কাশীনরেশদের ভূমিকা ছিল অনবদ্য।

 

টীকা:

[1] পামরী অর্থাৎ নীচ নারী। এক্ষেত্রে শব্দটি অবশ্যই গাইয়ে-বাজিয়ে নারীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

[2] নৃত্য-গীত করা ছোট ছেলে

[3] এক প্রকার তারবাদ্যযন্ত্র

[4] ভাঁড়

[5] এক ধরণের নৌকা

[6] হালুইকর বা যে মিষ্টি প্রস্তুত করে

[7] মুগ ডাল

[8] যারা পান বেচে

[9] ‘ছুটা’ অর্থাৎ এক একটা পান আলাদা; এক ‘বিড়া’ অর্থাৎ পাঁচ গণ্ডা বা কুড়িটি পান একসাথে

[10] প্রতীকার্থে, হিন্দু-মুসলিম সৌহার্দ্য।

 

(ক্রমশ)

পরবর্তী পর্ব

প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Author

Leave a Reply