রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ২১। অনুবাদে অর্ণব রায়

অ্যাসিস্টেন্ট ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলো, কৃষ্ণনগর
সদর শহরে ঢুকেই আমাদের সাথে ডঃ এ ও মিঃ এ-র দেখা হল। একজন অ্যাসিস্টেন্ট ম্যাজিস্ট্রেট আর একজন অ্যাসিস্টেন্ট কালেক্টার। ওনারা একটা বগি গাড়িতে ছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে প্রথম জনের তখুনি ডাক পড়েছে, একজন মহিলা রোগীকে আঠারো মাইল দূরে দেখতে যেতে হবে। আমাদেরকে তিনি সেদিনের মত তার তরুণ বন্ধু মিঃ এ-র তত্বাবধানে ছেড়ে দিলেন। আমরা ওনারই বাংলোতে গিয়ে উঠলাম। সেখানে আমাদের যতভাবে সম্ভব যত্নআত্তি করা হল।
বাইরে থেকে দেখতে গেলে একটা বাংলো আর একটার থেকে খুব আলাদা নয়। কিন্তু ভেতরের আরাম ও সুখসুবিধার ব্যাবস্থাপনা তাদের ভেতরে বসবাসকারী মানুষদের সামর্থ্য ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী কখনও কম কখনও বেশী। আর যেহেতু এখানে শহুরে জীবনের উপযোগী যন্ত্রপাতি কিছু পরিমানে পাওয়া যায়, তাই এই সমস্ত বাংলোতে সাধারণ ইঁট আর ছাদের ‘পাকা বাড়ি’-র থেকে জিনিসপত্রের চাহিদা কিছু কম। কৃষ্ণনগরের বেশীরভাগ বাড়ি এই দ্বিতীয় প্রকারের। সব বাড়িগুলিই খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং বাইরে থেকে খুব আরামদায়ক দেখতে।

কৃষ্ণনগর চার্চ
কৃষ্ণনগর সত্যিই মনোরম স্থান। স্বাস্থ্যকর হিসেবেও এর খ্যাতি প্রচুর। একমাত্র ত্রুটি যা আমার চোখে পড়ল তা হল জায়গা হিসেবে একটু এলোমেলো, মানে ঘরবাড়ির বিন্যাস একটু খাপছাড়া ধরণের। তবে এখানে প্রতিটি বাড়ির সামনে একটা করে চওড়া বাগান দেওয়া আছে। তাই আগের ত্রুটিকে ঠিক ত্রুটি বলা যাবে না। শহরে একটা ছোট্ট কিন্তু খুব সুন্দর চার্চ রয়েছে। রেভারেন্ড মিঃ ইনিস [1] এখানকার পাদ্রী। শহরে একটা সরকারী কলেজও আছে। প্রফেসর রকফোর্ড[2] তার অধ্যক্ষ। কলেজে ৪০০ ছাত্র। কলকাতার কলেজে যা যা শেখানো হয়, এখানকার ছাত্ররাও সেই সবকিছুই শেখে এখানে।

কৃষ্ণনগর কলেজ
কৃষ্ণনগর তাদের একটা পার্ক নিয়ে অহংকার করে। এই পার্ক একটা সত্যিই সুন্দর জায়গা। এক টুকরো ইংল্যান্ড যেন। ঠিক মাঝখানে ঘোড়দৌড়ের জন্য একখানা রেসকোর্স, তাকে ঘিরে অপূর্ব সুন্দর সব টিক গাছ লাগানো। এই গাছগুলো সরকারের নির্দেশে লাগানো হয়েছিল। আর আছে শিশু গাছ। যেদিকেই চোখ যায়, পথের কিনার ধরে বড় বড় গাছ, যেন পথগুলিকে জড়িয়ে ধরে আছে। এই গাছগুলো প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন ছায়াঘেরা উদ্যানের অংশ।

কৃষ্ণনগর ডাক বাংলো
আচ্ছা, এখানে আমি যে ছোট্ট ডাকবাংলোটা দেখেছি, সেটাকে লক্ষ্য করতে ভুললে চলবে না। ডাকবাংলো কী জিনিস তা তো আমি ইতিমধ্যেই বলেছি। ডাকবাহক গাড়ি ও তার সাথের লোকজনের বিশ্রাম নেওয়া ও রাত কাটানোর জন্য জায়গায় জায়গায় যে ব্যবস্থা করা আছে, সেগুলো। আমাদের মফঃস্বল যাত্রায় আমরা এরকম কয়েকটা ডাকবাংলো দেখেওছি। কৃষ্ণনগরের যে সরাইখানা সেটা কিন্তু সাধারণ সরাইখানা নয়। এখানে অতিথি আপ্যায়ন করার জন্য একজন স্থায়ী লোক রয়েছেন— একজন অত্যন্ত ভদ্র, বুদ্ধিমান ও কর্মঠ ছোট্টখাট্টো মানুষ। ওনার সবচেয়ে বড় গর্ব হল, তার যাত্রীদের সবরকম পরিতৃপ্তি দেওয়া। আর এ কাজে যে উনি চুড়ান্ত সফল তার প্রমাণ ওনার কাছে যত্ন করে রাখা অসংখ্য প্রশংসাপত্র, যেগুলো কিনা বিভিন্ন বড় বড় পদে থাকা মানুষজন বিভিন্ন সময়ে ওনার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে ওনাকে দিয়েছেন। কোথাও লেখা আছে, “মিঃ পিটার্স, তার বাংলো, তার ভৃত্যকুল, সবাই সমান প্রশংসার যোগ্য।” আবার কোথাও কোনও এক এনসাইন পপকিসন তার বালখিল্য মন্তব্য লিখে রেখেছে, “পিটার একটা ইঁট!” মিঃ ক্যাডেট ব্রাউন উচ্ছসিত হয়ে কয়েক লাইন কবিতাই লিখে ফেলেছেন,
“ আমি যেখানেই যাব পিটারের প্রশংসা করব
তার ডাকবাংলো নিয়ে ভালো কথা বলব
যদি সর্বদা এমন খাবার পাই যেমনটা সে দেয়
তাহলে আমার শরীর মোটা না হয়ে কোথায় যায়!”
ডাক্তারবাবু তার রোগী দেখে তার পরের দিন সকালে ফিরে এলেন। সেদিনটা আমরা তার সঙ্গেই ঘুরলাম। আর অন্যান্য জায়গার সাথে সাথে তার গতানুগতিক জেলখানা পরিদর্শনেও তার সঙ্গী হয়ে পড়লাম। এই জেলে ৪৫০ জন কয়েদি রয়েছে। কয়েকজন ধার শোধ করতে না পেরে জেলে এসেছে। কিন্তু বেশীরভাগই আরও বড় অপরাধ করে এখানে এসেছে। তার মধ্যে হত্যা আর ডাকাতি থেকে শুরু করে চুরি-জোচ্চুরি মারামারি— সবই আছে। বিরাট বড় ওয়ার্ডটায় ঢোকার সময় আমাদের সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল, যেন আমরা কাছাকাছি ঘেঁসাঘেঁসি করে থাকি। এখানে প্রায় সমস্ত কয়েদিরাই তাদের সেলের বাইরে খোলা অবস্থায় রয়েছে। যদিও বেশীরভাগ কয়েদিকেই শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। ডঃ এ— অত্যন্ত দয়ালু মানুষ। কিন্তু এইসব ক্ষেপে থাকা মানুষগুলোর ওপর তার খুব একটা ভরসা নেই। আর আমাকে স্বীকার করতেই হবে, এই সমস্ত লোকগুলোর আকার প্রকার মোটেই তাদের হয়ে ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। দেখে একবারও মনে হচ্ছে না তাদের মধ্যে সেই সুবুদ্ধি আছে যে কোনও কাজ করে বসার আগে শোক দুঃখ যাই পেয়েছে সেসব মেপে দেখে তারপর কিছু করবে, বা প্রতিশোধ নেবার আগে একবারও দ্বিধা করবে। কয়েক বছর আগে কলকাতার আলিপুর জেলে বেচারা মিঃ রিচার্ডসনকে তো দেশী কয়েদিরা মেরেই ফেলল। উনি তাও ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন! তার পরপরই মিঃ স্যামুয়েলস-কে ওই একই জেলে মারধোর করা হল। এই সব ঘটনাই ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ নয় কি?
মোটামুটি জেলের সমস্ত অংশ পরিদর্শন করার পরে ডাক্তারবাবু কয়েদিদের প্রতিটি ছোটখাটো অভাব অভিযোগের কথা খুঁটিয়ে শুনলেন। তাদের পানীয় জল চেখে দেখলেন। তাদের খাবার চালের নমুনা পরীক্ষা করলেন। তাদের সুখ-সুবিধার বিভিন্ন দিক দেখে নেওয়ার পর আমরা ওখান থেকে চলে এলাম।
দুটো গোটা মনোরম দিন ওনার সাথে কাটিয়ে আমরা আমাদের ডাক্তারবাবু আর তরুণ ভদ্রলোক মিঃ এ-কে বিদায় জানিয়ে আবার বগাডাঙার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। জায়গাটা এখান থেকে ঘোড়ায় চেপে গেলে ঘন্টা দেড়েকের দূরত্ব (আমার বন্ধুর অভ্যেস হল প্রত্যেকবার শেষ কয়েক মাইল একবারে ঘোড়া দাবড়িয়ে ছুটে যাওয়া)। আমরা সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ সেখানে পৌঁছলাম। মফঃস্বলের জীবনের সুবিধের প্রমান দেখো, যে আমি সপ্তাহখানেক আগে বাইশ মাইল ঘোড়ার পিঠে যেতে পাঁচ ঘন্টা সময় নিয়েছি, তার শক্তি ও ঘোড়সওয়ারী করার ক্ষমতা কতোটা বৃদ্ধি পেয়েছে! পরের দিন সকালে একই ভাবে ফুর্তি করে আনন্দ করে প্রায় একই সময়ে আমরা মূলনাথ ফিরে এলাম। যদি আমি এরকম দেশ পাই, এরকম সঙ্গী পাই আর তাদের কলকাতার কাছে পাই, তাহলে বোধহয় আমার এই নির্বাসনের জীবনের দুঃখ ভোলাতে আমার দেশের কয়েকজন লোক পেলেই আর কিছু চাই না।
টীকা
[1] এখন (১৮৫৮) রেভারেন্ড মিঃ ডাইসন রয়েছেন।
[2] পরবর্তীকালে এখানে এসে দেখি আর একটা কলেজ খাড়া করা হয়েছে। ছবিতে দেখানো আছে। মিঃ এ স্মিথ তার অধ্যক্ষ।
(ক্রমশ)
