কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ১৮। শোভন সরকার
গত পর্বে: কাশীতে সূর্যোপাসনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? লোলার্ক কুণ্ডের কথা বলতে গিয়ে অনেক গল্প, কথা, ইতিহাস উঠে আসে, সেসব আমাদের আজও অবাক করে দেয়।
গবেষকদের মতে, কাশীর প্রাচীনতম স্থানের মধ্যে একটি হল এই লোলার্ক কুণ্ড। অন্যতম প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারতেও এর উল্লেখ রয়েছে। এমনকী বেশ কিছু পুরাণে কাশীর অন্যান্য স্থানের নাম গুরুত্ব না পেলেও লোলার্ক কুণ্ড পেয়েছে। পূর্বে ‘অসি-সঙ্গম’ তীর্থকে কেউ এই নামে চিনত না, বরং সম্ভবতঃ লোলার্ক কুণ্ডের নামেই একে ‘লোলার্ক সঙ্গম’ বলে উল্লেখ করা হত। এই কুণ্ডের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় দ্বাদশ শতকে গহড়ওয়াল রাজা জয়চন্দ্র এখানে স্নান করেন এবং প্রভূত দানধ্যান করেন। পরবর্তীতে এই কুণ্ড যে আরও বেশ কিছু রাজবংশের কৃপাদৃষ্টি লাভ করে তা আমরা আগেই দেখেছি।
এক দল গবেষক বলছেন যে, এই লোলার্কাদিত্য কুণ্ড বুদ্ধের সময়ের আগে থেকেই লৌকিক আচার পালনের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। আবার, শৈব বা বৈষ্ণব ধর্ম নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার বহু আগে সূর্যোপাসনার সাথে সাথে অব্রাহ্মণ্য আচারে এখানে নাগপূজাও করা হত বলে অনুমান করা হয়। এই বহুপ্রাচীন কুণ্ডের নানা চিরাচরিত লৌকিক রীতিনীতির সাথে পরবর্তী কালে পৌরাণিক ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পূজা পদ্ধতি মিলেমিশে যায়। তারই সাক্ষ্য আমরা খুঁজে পাই যখন আজও বহু মানুষ নিজেদের মনোষ্কামনা পূর্ণ করতে লোলার্ক ষষ্ঠীর দিন এই কুণ্ডে স্নান করতে আসে।
লোলার্ক ছঠের দিন যে সমস্ত মানুষ লোলার্ক কুণ্ডে স্নান করে, তাদের বেশির ভাগই এখানে আসে সন্তান-কামনায়। অন্যান্য যারা আসে তাদের মধ্যে কেউ সন্তান-প্রাপ্তির পর দেবতাকে ধন্যবাদ-জ্ঞাপনের জন্য আসে, বা কেউ শিশুদের মুণ্ডন ক্রিয়ার জন্য, কিংবা রোগমুক্তি এবং পাপমুক্তির জন্য। বিশ্বের নানা লোকসংস্কৃতিতে সূর্যের সাথে রোগমুক্তির এক নিবিড় যোগ রয়েছে। এই যোগসূত্রের সন্ধান আমরা যেমন আমাদের কাশীখণ্ডে পাই, তেমনি দেখি বিশ্বসাহিত্যের নানা শাখায় সূর্য হয়ে ওঠে আশা, পুনর্জীবন বা বিপন্মুক্তির প্রতীক। আমাদের দেশে সূর্যোপাসনা অন্যান্য দেবদেবীর উপাসনার মত কেবল এক মূর্তি বা প্রতীকে আবদ্ধ নয়, বরং উপাসকেরা বাস্তবের উদীয়মান সূর্যকে তাদের প্রার্থনায় আহ্বান করছে, অথবা অস্তাচলে মিশতে থাকা সূর্যের ধ্যানে বিভোর হচ্ছে। ঐতিহাসিক ই. বি. হ্যাভেল বেনারসে ঊষালগ্নের গঙ্গার ঘাটকে বলছেন ‘সুবিশাল এক সূর্য-মন্দির।’
কোন দম্পতি লোলার্ক কুণ্ডে এলে প্রথমেই তাদের মুখোমুখি হয় স্থানীয় মাল্লা শ্রেণির মানুষ। ‘মাল্লা’ অর্থাৎ মাঝি শ্রেণির মানুষ এইদিন তৎপর থাকে মূলতঃ দু’টি কাজে, এক, কুণ্ডে অর্পণ করা সমস্ত আচার-সামগ্রী জল থেকে তুলে আনা, এবং দুই, আগত মানুষদের প্রয়োজন অনুসারে যথাযথ পাণ্ডা বা পুরোহিতের হাতে তুলে দেওয়া। পাণ্ডা সেই দম্পতির ‘সমস্যা’ জেনে নিয়ে সেই অনুসারে নির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ ও সংকল্প করিয়ে দেয়। সংকল্প নিয়ে সেই দম্পতি এবার তাদের কাপড়ের প্রান্ত একে অন্যের সাথে বেঁধে কুণ্ডের জলে গিয়ে স্নান করে একসাথে। স্নানের পর তারা পরনের কাপড় কুণ্ডের সিঁড়িতেই ছেড়ে নতুন কাপড় পরে উঠে আসে। স্নানের সময় কুণ্ডের জলে কুমড়ো বা লাউ জাতীয় কোন সব্জিও বিসর্জন দেয় তারা — বিসর্জন মানে সারা জীবনের মত, সেই সব্জি সেই দম্পতি আর কোনদিন স্পর্শ করবে না। ব্রাহ্মণ্য রীতিতে স্নান সারলেও যুগপরম্পরায় এতে মিলেমিশে গিয়েছে স্থানীয় লোকাচার। এমনই এক লোকাচারে দেখা যায় সব্জি (বা ফল) বিসর্জনের আগে তাতে অনেকগুলো সূঁচ বিধিয়ে দেওয়া হয়। কেউ বলেন এই ‘টোটকা’ আসলে বন্ধ্যা নারীর গর্ভে সূর্যকিরণের আশীর্বাদের প্রতীক। আবার কেউ বলেন যে এভাবে সব্জিতে সূঁচ বিধিয়ে তা ত্যাগ করলে সেই নারী সমস্ত অপদৃষ্টির প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে গর্ভধারণে সক্ষম হয়।
এই কুণ্ড সূর্যের হলেও এখানে শিবের প্রভাব কালে কালে যে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে তা লোলার্ক ছঠের উৎসবে স্পষ্ট দেখতে পাই। সন্তানপ্রাপ্তির জন্য চিরাচরিত প্রথা অনুসারে কেবল সূর্যকুণ্ডে স্নান করাই যথেষ্ট হওয়ার কথা কিন্তু বাস্তবটা আলাদা। কুণ্ডে স্নানের পর মহিলাটি কাপড় ছেড়ে তার বিবাহের সমস্ত চিহ্ন ত্যাগ করে ফেলে — হাতের চুড়ি ভেঙে ফেলে, সিঁথির সিঁদুর ধুয়ে ফেলে। নতুন কাপড়, নতুন লাল চুড়ি, নতুন সিঁদুর পরে সে এবার কুণ্ডের পাশেই অবস্থিত লোলার্কেশ্বর শিব বা ‘লোলার্ক বাবা’-র মন্দিরে গেলে সেখানে সেই স্ত্রীলোকটির সাথে লোলার্ক বাবার প্রতীকি বিবাহ হয়। বিবাহে স্ত্রীলোকটি শিবলিঙ্গকে পাঁচবার প্রদক্ষিণ ও আলিঙ্গণ করে। সূর্যস্নান ও লোলার্ক বাবাকে বিবাহ — এই দুইয়ে মিলে অভ্যার্থীরা সন্তানপ্রাপ্তির ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়।
লোলার্কেশ্বর মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে মহিলাটি আবার সেই প্রতীকি বিবাহের চুড়িগোছা ভেঙে নতুন চুড়ি পরে নিজের স্বামীর কাছে ফিরে যায়। তারপর প্রতিজ্ঞা করে যে সন্তানপ্রাপ্তির পর লোলার্ক বাবাকে ধন্যবাদ জানাতে তারা আবার সপরিবারে লোলার্ক কুণ্ডে আসবে, সন্তানের মুণ্ডন করিয়ে বাবার আশীর্বাদ গ্রহণ করবে।
এই সমস্ত লোকাচার, রীতিনীতি নিয়ে যখন ভাবতে বসি, দেখি সন্তান অপ্রাপ্তির দায় যেন সমস্তটাই সেই স্ত্রীলোকটির, সমাজের চোখে সঙ্গী পুরুষটি বন্ধ্যাত্বের ঊর্ধে। নইলে এই ধরণের আচারব্যবস্থা কেবলমাত্র স্ত্রী-আচার হয়ে থাকত না। আমাদের লোকাচার অনেকাংশেই বৃহত্তর সমাজের বিশ্বাস, রুচি, রীতিনীতি, সংস্কারের প্রতীকি প্রতিফলন — এই আচার-সংস্কারই আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গীর অলিখিত দলিল হয়ে থাকে। আর তাতে বন্ধ্যাত্বের মত পরিস্থিতির জন্য পুরুষ কোনদিনই কাঠগড়ায় দাঁড়ায় না, তা বহন করা ও তা থেকে বেরিয়ে আসার দায় কেবল স্ত্রীলোকটির।
তবে সমাজের চোখে স্ত্রীলোক কেবলমাত্র সামাজিক সংস্কারের একপাক্ষিক ধারক ও বাহক নয়, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সে লোকসংস্কৃতি-কৃষ্টির সংরক্ষকও বটে। বলা বাহুল্য, লোলার্ক ষষ্ঠীর বিরাট উৎসবে মহিলাদের সংখ্যাই বেশি। বহু দূর-দূরান্তের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে তারা আসে বিশ্বাস আর আশা নিয়ে, সঙ্গে থাকে নিজেদের কথাকাহিনি আর গান।
উত্তরপ্রদেশের একটি লোকসঙ্গীতের ধারা হল ‘কাজলী’ বা ‘কাজরী’। একটা সময় ছিল যখন বেনারস ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মহিলারা পরিবার সহ দল বেঁধে লোলার্ক ষষ্ঠী পালন করতে আসত। ব্রতের আচার শেষ করার পর বিকেল বেলায় একসাথে বসে তারা নিজস্ব ভঙ্গীতে নিজেদের সুখদুখের গান গাইত। এই আসরে গাওয়া লোকসঙ্গীতের মধ্যে অন্যতম ছিল কাজলী বা কাজরী গান। মূলতঃ মহিলাদের গান, বর্ষা ঋতুতে গাওয়া প্রেম-বিরহের গান এই কাজরী। অনেকেই এই লোলার্ক ষষ্ঠীর মেলায় আসত গান শোনাতে, আর অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করত স্থানীয় পয়সাওয়ালা পুরুষেরা। মেলা উপলক্ষ্যে আসা গাইয়েদের আলাদা করে ব্যক্তিগত পরিসরে আমন্ত্রণ জানিয়ে বসত গানের আসর। দুঃখের বিষয় বর্তমানে এই ধরণের লোকগীতির চর্চা এই মেলার পরিসর থেকে এক রকম উঠেই গেছে।
কেবল লোলার্ক কুণ্ড নয়, এই ধরণের লোকগীত চর্চার প্রভাব এসে পড়ে রবীন্দ্রপুরীতে অবস্থিত বাবা কীনারামের আশ্রমেও। লোলার্ক ষষ্ঠী উপলক্ষ্যে এখানে এক সময় জমজমাট সঙ্গীত-নৃত্য উৎসব মনোরঞ্জনের রসধারা বইয়ে দিত। তবে এরও অস্তিত্ব আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় — এর ছায়া হয়তো নানারূপে থেকে গেছে কিন্তু এর পুরোনো জৌলুষ আর নেই। স্থানীয় বেনারসীরা দিনের বেলায় লোলার্ক মেলা শেষে বিকেলে গিয়ে হাজির হত বাবা কীনারামের আশ্রম ‘অঘোরপীঠ’ সংলগ্ন ক্রীংকুণ্ডে, সেখানেই বসত সঙ্গীতের আসর। মোটামুটি পঞ্চাশের দশকে ক্রীংকুণ্ডে এই ধরণের আসর বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সমাজের নানা স্তরের মানুষ এখানে আসতে পারত, কোন নিষেধাজ্ঞা ছিল না। মনে করা হয় লোলার্ক ষষ্ঠীর দিনেই বাবা কীনারামের জন্মসংস্কার সম্পন্ন হয়েছিল। সেই উপলক্ষ্যে আজও আশ্রমে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। বিশ্বাসীরা একই দিনে লোলার্ক কুণ্ডের পর ক্রীংকুণ্ডে নিজেদের সন্তানের মঙ্গল কামনায় স্নান করতে আসে। কয়েক দশক আগেও এরকমই লোলার্ক ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় শহরের রূপোপজীবিনীরা বাবা কীনারামের সম্মানে বিনা পারিশ্রমিকে এখানে নিজেদের সঙ্গীত-নৃত্যকলা প্রদর্শন করত। পরে নানা কারণে এই ধরণের আসর বন্ধ হয়ে যায়।
লোলার্ক ষষ্ঠীর মত লোকাচারে ঋদ্ধ উৎসবে আজ স্থানীয় লোকসঙ্গীতের প্রভাব ক্ষুণ্ন হতে থাকলেও বেনারসে ধ্রুপদী সঙ্গীতের শ্রোতা বরাবরই রয়ে গেছে। তুলসী ঘাটের বার্ষিক ধ্রুপদ মেলার সরগরম আসর দেখে এই বিশ্বাসই দৃঢ় হয়। আমি এই ধ্রুপদ মেলার ব্যাপারে জানতে পারি সম্পূর্ণ কাকতালীয় ভাবে।
আমি আমার মাধ্যমিকের আগে পর্যন্ত কয়েক বছর হিন্দুস্তানী ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নিই শ্রদ্ধেয়া রেখা চ্যাটার্জির কাছে। অন্যান্য ছাপোষা মধ্যবিত্ত বাঙালী পরিবারের ছেলের মতই পড়াশোনার অজুহাতে গান শেখা ছেড়ে দিই। এই নিয়ে এত বছর পর আজও আমার গভীর আফসোস হয়, এবং মাঝে মাঝে তা তীব্র হয়ে ওঠে। এরকমই এক মানসিক স্থিতি নিয়ে এক সন্ধ্যায় আমি মন ভাল করার জন্য ঘাটে চলে আসি যথারীতি — এবং তখনই আকস্মিকভাবে খুঁজে পাই তুলসীঘাটের এই ধ্রুপদ মেলাকে।
প্রতি বছর শিবরাত্রির ঠিক আগে তুলসী ঘাটে ধ্রুপদ সঙ্গীত নিয়ে আয়োজন করা হয় ধ্রুপদ মেলা। ধ্রুপদ বা ‘ধ্রুবপদ’ হিন্দুস্তানী ধ্রুপদী সঙ্গীতের এক বহু প্রাচীন ধরণ। ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্রেও ধ্রুবপদী সঙ্গীতের বিবরণ আছে। মূলতঃ শিবের গুণগান করে ভক্তি অঙ্গের এই সঙ্গীতধারা নিয়ে তুলসী ঘাটে উৎসবের প্রথম সূচনা হয় ১৯৭৫ সালে। সংকট মোচন মন্দিরের ভূতপূর্ব মহন্ত অধ্যাপক বীরভদ্র মিশ্রের উদ্যোগে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কেন্দ্রীয় সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির আর্থিক সহায়তায় এই ধ্রুপদ মেলার আয়োজন শুরু হয়। তারপর কাশীর রাজপরিবারের উত্তরসূরী ডঃ বিভূতি নারায়ণ সিংহের সহায়তায় দ্বিতীয় বার ধ্রুপদ মেলা আয়োজিত হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে নানা জনের পৃষ্ঠপোষকতায় মেলাটি আয়োজিত হয়ে চলছিল। ১৯৭৮ সাল থেকে ‘মহারাজ বানারস বিদ্যামন্দির ন্যাস, রামনগর’ বা ‘ধ্রুপদ সমিতি’ পাকাপাকিভাবে এই মেলার দায়িত্বভার তুলে নেয় এবং আজও সেই ধারা অক্ষুণ্ন রয়েছে।
সেবার আকস্মিক ভাবে ধ্রুপদী সঙ্গীতের এই রসধারার সন্ধান পেয়ে আমি আরও বেশ কয়েকবার নানা অজুহাতে পৌঁছে গেছি গোস্বামী তুলসী দাসের স্মৃতি বিজড়িত এই ঘাটে। দেশ-বিদেশের নানা বর্ণের মানুষের সাথে এক পংক্তিতে বসে শিল্পীর ভক্তি আর সাধনার সুরে ডুবে গিয়েছি কত সন্ধ্যায় — এদিকে কখন রাত গভীর হয়ে পাখোয়াজের সঙ্গতে রুদ্রবীণায় মালকোষ বেজে উঠেছে তা ঠাহর করিনি।
(ক্রমশ)
