কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ১৫। শোভন সরকার
গত পর্বে: অসি ঘাটের আশেপাশে ঘুরে বেড়ালাম, স্মৃতিতে, কথায় ভ্রমণ করলাম গঙ্গামহল ঘাট, রীবা ঘাট, রানী লক্ষীবাঈ জন্মস্থান। গেলাম গঙ্গার ওপাড়ে, দেখলাম বেনারসের দুই বিপ্রতীপ চেহারা। দেবেশ বলল বেদব্যাসের গল্প।
‘ব্যাস যখন রামনগরে এসে থাকতে শুরু করলেন, তখন এর নাম ‘রামনগর’ বা ‘ব্যাসকাশী’ ছিল না, ছিল ‘মঘার’,’ দেবেশ বলল।
‘মঘার? মানে ‘মগহর’? সে তো আলাদা, গোরক্ষপুরের ওদিকে। কবীরের সমাধি।’
‘যা শুনেছি, সেটাই বলছি। হতেই পারে দুই জায়গার একই নাম।’
‘কিন্তু কবীরের সাথেও কিন্তু কাশীর কানেকশন আছে। লোকে বলে…’
‘লোকে বলে, তাইনা? আমিও তো বলছি।’ আবার হাসে দেবেশ।
‘হ্যাঁ, ওই আর কী। আমি কোন এক বইতে পড়েছি। তিনি নাকি কাশীতে মরতে চাননি। ‘কাশীতে মরলেই মুক্তি’ এসব কথায় বিশ্বাস করতেন না। তাই তিনি এক রকম চ্যালেঞ্জ নিয়ে মৃত্যুর ঠিক আগে চলে যান মঘারে, সেই গোরক্ষপুরের কাছে। সেখানেই কেন? কারণ কাশীর ব্রাহ্মণরা বলত যে, মঘারে মৃত্যু হলে পরজন্মে গাধা হয়ে জন্মায়। উনি এইসব গোঁড়ামিকে একদম সহ্য করতে পারতেন না। এরই প্রতিবাদে মঘার যাত্রা।’
‘হ্যাঁ, আর তারপর ওখানে মৃত্যু হলে তাঁর হিন্দু ও মুসলিম শিষ্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেঁধে যায় তাঁকে কবর দেওয়া হবে নাকি দাহ এই নিয়ে। কিন্তু হঠাৎ দেখা যায় কবীরের দেহই সেখানে আর নেই, তার বদলে পড়ে রয়েছে ফুল। শুনেছি গল্পটা। কিন্তু সেই গল্পে আমি যাচ্ছি না। আমার মনে হয় এপাড়ের এই ব্যাসকাশীকেও তার ঊষরতা বা অন্য যে কারণেই হোক এত নিচু নজরে দেখা হত যে একে ওই মঘারের সমানই অপবিত্র বলে মনে করা হত।’
‘হবে হয়তো। তুমি তারপর বল ব্যাসের কী হল?’
‘বিশেষ কিছু নয়, গল্প-পুরাণে যেমন হয় আর কি। উনার দুঃখ হল এই মনে করে যে মানুষ এপাড়ে মরলে গাধা হবে। উনি তাই তপস্যা করে এই পাড়কেও করে তুললেন পবিত্র তীর্থ। এখানে তাই অনেক লোকজন আসে পুজো-আচ্চা করতে, বিশেষ করে মাঘ মাসে।’
‘হ্যাঁ, রামনগরের কেল্লায় তো ব্যাসদেবের এক মন্দিরও আছে।’
স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এলাম। সেখানে ডুব দিলে কত কী উঠে আসে, হিসেব রাখা দায়। তবে স্মৃতি কি কেবল আমার একার? এই যে শিবমের সাথে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলেছি ঘাট ধরে ধরে, স্মৃতি তো সেইসব ঘাটেরও। অসি ঘাট, গঙ্গামহল ঘাট, রীবা ঘাট ছাড়িয়ে তখন তুলসী ঘাট পেরোচ্ছি। সেদিন জানতাম না, অনেক পরে জেনেছি যে কত স্মৃতি নিয়ে সেই কতকাল ধরে গল্পের পাতা হলদে করে সাদা চুলে গঙ্গার কিনারে বসে আছে এই ঘাট। প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগের কোন এক চৈত্রের ভোরে নবারুণের লালিমা মেখে এই ঘাটে বসেই তুলসীদাস ভক্তিরসে বিহ্বল হয়ে সাশ্রু নয়নে লিখে চলেছিলেন ‘রামচরিতমানস’ —
‘মতি অতি নীচ উঁচি রুচি আছি।
চহিয় অমিয় জগ জুরৈ ন ছাছী।।’
অর্থাৎ, ‘মতি অতি নীচ, রুচি উচ্চ অতি বক্র। / চাহিতেছি সুধা, বিশ্বে মিলে নাহি তক্র (ঘোল)।।’ সূত্র: তুলসীদাস। রামচরিতমানস। অনুবাদ মদনমোহন চৌধুরী, খণ্ড বালকাণ্ড, কালীচরণ ত্রিবেদী, ১৯১৫।
ঘাট থেকে সিঁড়ি বরাবর উপরে উঠে গেলে একপাশে ঘেরা জায়গার মধ্যে দেখা যায় নানা বয়সের বালক-পুরুষের দল। প্রায় নগ্নদেহে শুধুমাত্র একটা ল্যাঙট পরে পেটা শরীরে তারা ভারী ভারী গদা, জোড়ী, নাল, সন্তুলন ইত্যাদি শরীরচর্চার উপকরণ নিয়ে কসরত করছে। টিনের চালে ছাওয়া কোপানো ঝুরো নরম মাটির উপরে কুস্তি করছে আরও কয়েকজন পালোয়ান। এইটিই হল আখড়া গোস্বামী তুলসীদাস বা আখড়া স্বামীনাথ। ওখানে কুস্তি করতে আসা মানুষদের জিজ্ঞাসা করে জানলাম যে স্বয়ং তুলসীদাস তাদের আখড়ার ভিত্তি স্থাপন করেন। ভেবে অবাক হই যে কত শত বছর ধরে এরকম আখড়ার চেহারা-চরিত্র আজও প্রায় একই রয়ে গেছে। এক সময় বেনারসে এখানে ওখানে শতাধিক আখড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, কিন্তু এখন কেবল কুড়ি-পঁচিশটির মত হাতে গোনা কয়েকটি চালু রয়েছে। তুলসী ঘাটের আখড়া ছাড়াও বেনারসের অন্যান্য কিছু আখড়া এখনও বেনারসের এই অনন্য সাংস্কৃতিক সম্পদকে বাঁচিয়ে রেখেছে, যেমন কালি বাড়ি আখড়া, ফিদা হুসেইন আখড়া, অঘোরনাথ তাকিয়া আখড়া, পাণ্ডে ঘাট আখড়া, শ্রী মহামৃত্যুঞ্জয় ব্যায়ামশালা আখড়া (যার পূর্বে নাম ছিল ‘আখড়া বৃদ্ধকাল’), শেরওয়ালী কোঠি আখড়া ইত্যাদি।
সাধারণত দিন শুরু হয় আখড়ার সাফ-সাফাইয়ের কাজ দিয়ে। তারপর যত্ন করে কুস্তির জমি প্রস্তুত করা হয়। প্রথমে মাটি কুপিয়ে তোলা হয়। তারপর হাত দিয়ে একদম ঝুরো ঝুরো করে নরম করা হয়। বিশেষ দিনগুলিতে সে মাটিতে মেশানো হয় দুধ-ঘি। এরপর সংলগ্ন হনুমান মন্দিরে পুজো দিয়ে, কুস্তির জমিকে পুজো দিয়ে, গায়ে তেল মেখে, কপালে মাটি লেপে তবেই সেখানে কুস্তির অনুশীলন শুরু হয়। নাগ পঞ্চমীর দিন এই আখড়াগুলোর বিশেষ দিন। হনুমানের বিশেষ পুজো হয়, সাজানো হয় চারপাশ। সেদিন আখড়ার প্রায় সমস্ত সদস্য উপস্থিত থাকে তাদের নিজেদের কৌশল প্রদর্শনের জন্য। দেখবার মত দৃশ্য সে এক। এখানে গুরুর তীক্ষ্ণ নজরদারি ও অনুশাসনে থেকে শিষ্যরা এই শারীরবিদ্যা আয়ত্ত করে থাকে।
শরীর চর্চার এই আখড়াগুলো বহুকালের ঐতিহ্য আর পরম্পরা বহন করে চলেছে। তুলসী ঘাটের আখড়া সেদিক থেকে ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এই ঘাটের ঐতিহ্যের ইতিহাস গৌরব একবার মলিন হয়ে গিয়েছিল মানুষের নির্লজ্জ লোভের কারণে। এই আপাতঃ শান্ত তুলসী ঘাটে সমস্ত কুস্তিবীরের চোখের আড়ালে ঘটা সেদিনের ঘটনা সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায়। ২০১১ সালের ২২শে ডিসেম্বর। আখড়া গোস্বামী তুলসীদাসের হনুমান মন্দিরের দেখভাল সংকট মোচন হনুমান মন্দিরের ট্রাস্টি বীরভদ্র মিশ্রের তত্ত্বাবধানেই সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়ে আসছে। সেদিন বৃহস্পতিবার সকালের পুজো হয়ে গিয়েছিল। দুপুর ১২ টা থেকে ৩ টে অবধি মন্দিরটি যথারীতি বন্ধ থাকে। তারপর বিকেলে তিনটের পর মন্দিরের পুরোহিত মন্দিরের দরজা খুলতেই বিস্ময়াহত হন — মন্দিরের অমূল্য এক সম্পদ সেখান থেকে উধাও হয়ে গেছে। কী সেটা? তুলসীদাসের লেখা ‘রামচরিতমানস’ গ্রন্থটির মূল পাণ্ডুলিপি। পুরোহিত খুঁজতে গিয়ে বুঝলেন খোয়া গেছে রূপোর তৈরি আরও কিছু জিনিস। ঘটনাটি আমি প্রথম শুনি এক স্থানীয় মাঝির কাছে। সে বলে, কারও এত সাহস হবে সেটাই ভাবা যায়নি। লালশালুতে মোড়া পুঁথিটি মন্দিরের ভেতরেই থাকত, লোকজনের চোখের সামনেই।
কিন্তু কেন এই অমূল্য সম্পদ এখানে রাখা ছিল? আসলে এটিই হল তুলসীদাসের বাড়ি। তুলসীদাস তাঁর শেষ জীবন তুলসীঘাটে তাঁর এই বাড়িতে অতিবাহিত করেন, এখানে বসেই সম্পন্ন করেন তাঁর অমর কীর্তি ‘রামচরিতমানস’ সহ আরও কিছু লেখা। তুলসীদাসের এই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে সংকট মোচন মন্দির কর্তৃপক্ষ। ঘাটের উপরেই এই সাদা রঙের বাড়িটি দেখতে অনেকে আসেন। সেখানে গেলে এক আশ্চর্য অনুভূতি ঘিরে ধরে — ভাবলে বিস্ময় জাগে যে এখানে, ঠিক এখানে বসেই তুলসীদাস লিখে গেছেন, এখানেই বাস করেছেন। আশেপাশের দেওয়াল, জানালা, দরজা (অবশ্যই এগুলো হাল আমলের তৈরি) যেন তাঁরই গল্প বলার গল্প করে চলেছে।
রামচরিতমানসের পাণ্ডুলিপিটি তুলসীদাসের মৃত্যুর প্রায় চব্বিশ বছর পর খুঁজে পাওয়া যায়। ১৭০১ সাল থেকে এটি এই মন্দিরে সযত্নে রাখা ছিল। কেউ কেউ বললেন যে এই পাণ্ডুলিপি তুলসীদাসের নিজের হাতে লেখা নয়, তাঁরই কোন শিষ্যের তৈরি প্রতিলিপি। সে যাই হোক, এত প্রাচীন একটি পাণ্ডুলিপি এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে এত যার প্রভাব, সেটি চুরি গেলে চাঞ্চল্য ছড়ানোই স্বাভাবিক।
তবে তুলসীদাসের কৃতিত্ব কেবল বাল্মিকী রামায়ণের পুনর্লিখন নয়, তাঁর এই রচনা তৎকালীন ভাষাজগৎ, লোকসংস্কৃতি এবং কাশীর জনমানসেও এক শোরগোল ফেলে দেয়। প্রথমতঃ তুলসীদাস নিজে ছিলেন এক বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ। বিশ্বনাথের প্রিয় শহর যেখানে শৈব ধর্ম বাড়াবাড়ি রকম প্রভাবশালী, সেখানে এক বৈষ্ণব এসে বিষ্ণুর অবতারের মহিমার কথা বলতে শুরু করেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে অবশ্য তিনি এক বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন। তাঁর ‘রামচরিতমানস’-এ রামের কাহিনির কথক হয়ে উঠলেন স্বয়ং শিব, আর তাঁর পাশে বসে গল্প শুনলেন দেবী ঊমা। শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের এমন সহাবস্থান তৎকালীন কাশীর গোঁড়া ধর্মান্ধতায় ছিল বিরল। এক্ষেত্রে একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে তুলসীদাস বৈষ্ণব হলেও তা নিয়ে তিনি রক্ষণশীলতা দেখাননি, বরং তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে বিষ্ণু ও শিব একে অন্যের পরিপূরক — তাঁর লেখায় এই দৃষ্টিভঙ্গী নির্দ্বিধায় উঠে আসে বারবার। দ্বিতীয়তঃ তুলসীদাসের পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত সংস্কৃত ভাষায় রচিত বাল্মিকী রামায়ণ কাশী সহ প্রায় সমগ্র উত্তর ভারতে কেবল জাতিগতভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর মানুষের কাছেই অভিগম্য ছিল, অর্থাৎ, সেই রামায়ণ পড়ার অধিকার কেবল ব্রাহ্মণ ও সমশ্রেণীর মানুষের ছিল, অন্য কারও নয়। তুলসীদাস স্থানীয় চলতি অবধি ভাষায় সংস্কৃত রামায়ণের অনুবাদ করে সেই শৃঙ্খল ভেঙে দেন। তিনি স্বয়ং সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ হয়ে বিশ্বনাথের শহরে রামের কাহিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন — কাজটা এই আলোচনায় যতটা মনে হচ্ছে, বাস্তবে তুলসীদাসের পক্ষে তা একেবারেই সহজ ছিল না। কাশীতে এক সময় তাঁকে যে এতটা হেনস্থা হতে হয়েছিল, তা জেনে অবাক হতে হয়।
(ক্রমশ)
