সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ২৩। বরুণদেব
গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি বুঝলেন, শাসন কার্য ও ফুলে ফেঁপে ওঠা ব্যবসা বাণিজ্য সামাল দিতে ইংলণ্ড থেকে আসা সিবিলিয়ানদের এ দেশের ভাষা, রীতি নীতি, স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে অবহিত হওয়া দরকার। ১৮০০ সালে কলকাতায় স্থাপিত হলো ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ। ফারসীবহুল বাংলা পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হলো ।উইলিয়াম কেরী লিখলেন ‘বাঙ্গালা ব্যকরণ’, রামরাম বসু লিখলেন ‘প্রতাপাদিত্য চরিত’ ও ‘লিপিমালা’, মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার লিখলেন ‘বত্রিশ সিংহাসন’। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিছুদিন শিক্ষকতা করলেন ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে। বাংলা ভাষার চর্চা চলতে লাগল। বাংলা শিক্ষার জন্য পাঠশালা গড়ে উঠল। ওদিকে কলকাতা শহরের ধনী ও সম্ভ্রান্ত বংশীয় বাঙালিদের মধ্যে ইংরাজি শিক্ষার চাহিদা তৈরী হওয়ায় ফিরিঙ্গি কলকাতায় গড়ে উঠল ইংরাজি স্কুল। চিৎপুর রোডে সেরবোর্ন সাহেবের স্কুলে ভর্তি হলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, আমড়াতলার মার্টিন বাউলের স্কুল থেকে শিক্ষালাভ করলেন মতিলাল শীল, কলুটোলার কানা নিতাই সেন ও খোঁড়া অদ্বৈত সেন পড়াশুনা করলেন আরটুন পিট্রাস সাহেবের স্কুলে। কিন্তু সরকারিভাবে ইংরাজি স্কুল স্থাপনের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখা দিল না পাছে এ দেশের লোকের সঙ্গে সংঘাত বাঁধে এই ভয়ে।
স্কটল্যাণ্ড থেকে ভ্যাগ্যাণ্বষনে কলকাতায় আসা ডেভিড হেয়ার তাঁর ঘড়ির দোকানে আসা ক্রেতাদের কাছে সবসময় বলতেন এ দেশে ইংরাজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা। রামমোহন রায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরী হয়ে গেল তাঁর। রামমোহনের ‘আত্মীয় সভা’-য় এসে আলোচনা করলেন কলকাতায় একটি ইংরাজি কলেজ খোলার ব্যাপারে। পাশে পেয়ে গেলেন বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়কে, যাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল ইংরেজ রাজপুরুষদের ভবনে ভবনে। পাশে পেয়ে গেলেন সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার হাইড ইস্টকে। এ উদ্যোগে কলকাতার সম্ভ্রান্ত বংশীয়দের উৎসাহ ও আগ্রহের খবর দিলেন বৈদ্যনাথ মুখার্জী। গোল বাঁধল রাজা রামমোহন রায়ের এই প্রস্তাবিত কলেজ কমিটিতে থাকা নিয়ে। কলকাত্তাই হিন্দু ভদ্রসমাজের মনোভাব ততদিনে রামমোহনের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ। তাঁরা সরাসরি বলে দিলেন, রামমোহন কমিটিতে থাকলে তাঁরা সেখানে নেই। রামমোহন একটুও বিচলিত না হয়ে কমিটি থেকে নিজের নাম তুলে নিলেন। নাম চাই না, কাজ চাই। ১৮১৭ সালের ২০শে জানুয়ারি সম্ভ্রান্ত ধনী হিন্দুদের দানে গরাণহাটায় গোরাচাঁদ বসাকের বাড়িতে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলো।
কিন্তু গভর্নর জেনারেল ও তাঁর পারিষদবর্গ সংস্কৃত ও আরবী গ্রন্থের মুদ্রণ এবং সংস্কৃত কলেজ স্থাপনের জন্য আগ্রহী। কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলো। রামমোহন রায় প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি লিখলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে- এ দেশীয়দের উন্নতিসাধন যদি সরকারের লক্ষ্য হয় তবে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে গণিত, জড় ও জীব বিজ্ঞান, রসায়ন, শারীর বিদ্যা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক। এর জন্য একটি কলেজ স্থাপন করলে ও বইপত্র, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি, এসব দিলেই সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হতে পারবে।
হিন্দু কলেজ স্থাপনের সময় যে ১১,৩১,১৭৯ টাকা সংগৃহীত হয়েছিল, তা রাখা ছিল জোসেফ বেরেটো নামে এক ইটালিয়ান ব্যবসাদারের হাতে। ১৮২৪ সালে বেরেটো কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেলে হাতে থাকে মাত্র তেইশ হাজার টাকা। নিরুপায় কলেজ কমিটির সরকারের স্মরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজের সম্মিলিত ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হলো সঙ্গে ১৮২৪ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারী। সরকারি সাহায্য এলো হিন্দু কলেজে, প্রথমে মাসে ৯০০ টাকা, পরের দিকে মাসে ১২৫০ টাকা করে। হিন্দু কলেজ হয়ে গেল উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণে ইয়ং বেঙ্গল মুভমেণ্টের আঁতুরঘড়। সে আন্দোলনের জন্ম দিলেন হিন্দু কলেজের শিক্ষক লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও।
ক্লাইভ, হলওয়েল, হেস্টিংস, কর্ণওয়ালিসদের কলকাতা আঠারো শতক পার করে উনিশ শতকে পড়ল যখন, গোবিন্দরাম মিত্র, রাজা নবকৃষ্ণ, গোকুল ঘোষাল, অক্রূর দত্ত, রামদুলাল দে সরকার, হৃদয়রাম ব্যানার্জী, রারাণসী ঘোষ, মদন দত্তদের মতো বাঙালি মুন্সি, মহারাজ, দালাল, গোমস্তা, ইজারাদার, বেনিয়ানদের স্বর্ণযুগ কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে গিয়ে তাঁদের উত্তরাধিকারীদের বাবুসমাজের অঙ্কুরোদ্গমের সময় এসে গেল। পৌত্তলিকতা বহুবিবাহ সতীদাহ কৃতদাসের কলকাতায়, শাস্ত্রকার ও স্মৃতিকারদের লৌহশৃঙ্খলের সাথে উনিশ শতকের কলকাতার ব্যক্তি ও সমাজের প্রবল সংঘাতের যে ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছিল রাজা রামমোহনের প্রভাবে, হিন্দু কলেজের এক সতেরো বছর বয়সের শিক্ষকের শিক্ষাদানে তা ব্যাপক আকার নিল। মাত্র পাঁচ বছর হিন্দু কলেজে শিক্ষকতা করে তিনি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে বীজ পুঁতে দিলেন যুক্তি ও বিজ্ঞানের। গতানুগতিক পদ্ধতিতে চর্বিত চর্বনের শিক্ষাদান না করে শাস্ত্রবচনকে যুক্তি তর্কবিতর্কের আতসকাঁচের নিচে রেখে দেখতে শেখালেন। যা কিছু বুদ্ধিগম্য নয়, যুক্তির আতশকাঁচের নিচে যার অস্তিত্ব নেই, তা গ্রাহ্য ও বিবেচ্য নয়, সে বেদ হতে পারে, কোরাণ হতে পারে, বাইবেল হতে পারে। লর্ড বেন্টিঙ্কের সতীদাহ নিবারণ আইন, পাদ্রিদের খৃস্টধর্ম প্রচার, রামমোহনের ব্রাহ্মসমাজ, ডিরোজিওর সংস্কারমুক্ত শিষ্যকুল, কলকাতার শাস্ত্র ও নীতিকারদের নাগরিক সমাজের শিরদাঁড়ায় কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। ধর্ম গেল, জাত গেল কলরবে ধর্মধ্বজীদের কলকাতা বিলাপ করতে লাগল। বিলাপ থেকে জন্ম নিল আক্রোশ। সে আক্রোশের লক্ষ্য রামমোহন, ব্রাহ্মসমাজে প্রার্থনা শেষে ঘোড়ার গাড়িতে ওঠার পথে ইঁট পাথর পাঁক কাদা ধেয়ে আসতে লাগল তাঁর পাগড়ি লক্ষ্য করে। সে আক্রোশের লক্ষ্য ডিরোজিও। হিন্দু কলেজ থেকে ছেলেদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসার হুমকি। ছেলেরা কেউ কলেজ ছাড়তে না চাইলেও ১৮২৯ থেকে ১৮৩২ এর মধ্যে দ্রুতহারে কলেজের ছাত্রসংখ্যা কমলো। ফলতঃ ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়ন।
কিন্তু ডিরোজিও তাঁর ছাত্রদের যে যুক্তি, বিচারবুদ্ধি, স্বাধীন চিন্তা, সমাজের সংস্কার, জাতিভেদ ও শাস্ত্রের নাম করে অমানবিক আচার বিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর গুরুমন্ত্র দিয়েছিলেন, তা ছড়িয়ে পড়ল কলেজের উঁচু ক্লাস থেকে নিচু ক্লাসে, ছড়িয়ে পড়ল সমাজে। তারুণ্যের উদ্দীপনায় কৃষ্ণমোহন, দক্ষিণারঞ্জনের দল ব্রাহ্মণের বাড়ি গোমাংস ছুঁড়ে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের প্রাচীরে করলেন আঘাত। রামমোহনের বিলাত যাত্রা ও মৃত্যু, ডিরোজিওর অকাল মৃত্যু, ডেভিড হেয়ারের চিরবিদায়, শূন্যস্থান তৈরী করল বটে কিন্তু ততদিনে ডিরোজিওর কবিতার লাইনের মতো দৈত্যাকার মেঘেদের সরিয়ে ধীরে ধীরে ভোরের আলো উজ্জ্বলতর হতে লাগল কলকাতায়।
প্রাচ্য-প্রতীচ্য দ্বন্দ্ব যখন তুঙ্গে তখন কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন লর্ড মেকলে। তাঁর ইংরাজি শিক্ষার প্রচলন ও প্রসারের উদ্যোগে পাশে পেয়ে গেলেন ডিরোজিও শিষ্যদের। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাচাঁদ চক্রবর্তী, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, প্যারিচাঁদ মিত্র, রামতনু লাহিড়ী, রামগোপাল ঘোষদের কাছে মেকলে হয়ে গেলেন গুরু। কালিদাসের জায়গা নিল সেক্সপিয়ার, বেদ বেদান্ত গীতার জায়াগা নিল বাইবেল। ১৮৩৫ সালে কলকাতায় মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হলে, ডেভিড হেয়ারের ছাত্র মধুসুদন গুপ্ত প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করতে এগিয়ে এলে, গোঁড়া হিন্দু সমাজপতিদের দুয়ারে আছড়ে পড়ল প্রবল ঢেউ। শিক্ষিত সমাজ প্রতীচ্য অনুরাগী হয়ে এ দেশের প্রাচীন জ্ঞান ঐতিহ্য থেকে মুখ ফেরাল। রামমোহন রায় পরবর্তী সময়ে ধুঁকতে থাকা ব্রাহ্মসমাজ তখনই জেগে উঠল হিন্দু কলেজেরই প্রাক্তনী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেনের স্পর্শে। হিন্দু কলেজের ছাত্ররা তখন অন্ধ ইংরেজভক্ত হয়ে সুরাসক্ত। গোলদিঘির ধারে প্রকাশ্যে সুরাপান, গোমাংস ভক্ষণ, জুতোর ওপর সন্দেশ রেখে সেবন। ষোলো সতেরো বছরের ছেলেদের কাছে এসব শ্লাঘার বিষয়, সেটাই তাদের বাহাদুরি। অতিরিক্ত মদ্যপান ডেকে আনল ভগ্নস্বাস্থ্য ও অকাল মৃত্যু। তাদের মধ্যে স্বজাতি বিদ্বেষ প্রবল। সুযোগ বুঝে খ্রীস্টিয় প্রচারক ডাফ সক্রিয় হয়ে উঠলেন। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, গুরুদাস মৈত্র, উমেশচন্দ্র সরকার, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের মতো ভদ্রঘরের ছেলেরা খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা নিতে লাগল। হিন্দু কলেজে তখন মধুসূদন দত্ত, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসুদের ছাত্রবেলা।
সরস্বতী পুজোয় লক্ষাধিক টাকা খরচ করা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মসমাজের প্রতি আকৃষ্ট হলে ব্রাহ্মসমাজ নবজীবন পেল। রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মসভা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে হয়ে গেল ব্রাহ্মধর্ম। প্রকাশিত হলো তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। কেশবচন্দ্র সেন নেতৃত্ব দিলেন ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে। ব্রাহ্মদের নব উত্থান, দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ, প্যারিচাঁদ মিত্রের আলালী ভাষা, হুতোম পেঁচার নক্সা, কেশবচন্দ্র সেনের বক্তৃতা, বিদ্যাভূষণের সোমপ্রকাশ, মহেন্দ্রলাল সরকারের হোমিওপ্যাথি, শিক্ষিত সমাজের মননে বুনে দিচ্ছিল জাতীয়তার বীজ। নবগোপাল মিত্রের সাপ্তাহিক ‘ন্যাশনাল’ পেপারে তার অঙ্কুরোদ্গম। ওদিকে ফাটল ধরল ব্রাহ্ম সমাজে। কেশবচন্দ্র অবিসংবাদিত নেতা রইলেন না আর। নবগোপাল মিত্রের ‘জাতীয় সভা’-য় হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বক্তৃতা দিলেন আদি ব্রাহ্ম সমাজের রাজনারায়ণ বসু। হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বক্তৃতা দিলেন কবি ও নাট্যকার মনোমোহন বসু। নবগোপাল মিত্রের হাত ধরে এলো হিন্দুমেলা। হিন্দু মেলার হাত ধরে এলো বাঙালির প্রাতিষ্ঠানিক শরীরচর্চা। এবং এই সামাজিক পরিবেশে জাতীয়তাবাদের হাত ধরে এলো সার্কাস।
(ক্রমশ)
