রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ২০। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

এই ব্যাপারটা পুরোপুরি বোঝানোর জন্য তোমাদের বলি, এই সমস্ত মফঃস্বল কোর্টে ফৌজদারী মামলার বিচার হয় মুসলিম আইন অনুসারে। একজন ইউরোপীয়ান মানুষ দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে এই সমস্ত মফঃস্বল কোর্টে সুপ্রিম কোর্টের সমান সুবিচার পেলেও পেতে পারে।  কেননা, যতই মিথ্যে সাক্ষীর ভয় থাকুক, এইসব মামলায় সে তার কোনও আইনী বা নাগরিক অধিকার হারাচ্ছে না। তার মামলাটি এক সমদর্শী আর দয়ালু আন্তর্জাতিক বিচার ব্যাবস্থার দ্বারা বিচার করা হচ্ছে। স্থানীয় আদালতের সমস্ত রকম জটিলতা ছেঁটে ফেলে। ফলে সে বিচার প্রক্রিয়া অনেক সরল হয়ে যাচ্ছে। আর এতে করে সমস্ত ধর্মের লোককে, তা সে খ্রীস্টান হোক, মুসলমান হোক বা হিন্দু হোক, সবাইকে প্রয়োজনীয় সম্মান দেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা মোটেই সেরকম নয়। এই সব মামলার ক্ষেত্রে বিচার ব্যাবস্থার অন্যতম স্তম্ভ, জুরিদের মাধ্যমে বিচার, একজন মামলাকারী বা অভিযুক্ত তার সুবিধা নিতে পারে না। এক্ষেত্রে একজন অভিযুক্তর বিচার একজন জাজ একাই করবেন। খুব বেশী হলে তাকে সাহায্য করার জন্য একজন মুসলিম ল অফিসার থাকবেন।

যখন আমি মিথ্যে সাক্ষীর বিপদের কথা বলছি, আমি বলতে চাইছি এই মফঃস্বলের জীবনে এই ধরণের মামলা ঘটেও বেশী। যখন কোনও একটা বিবাদ নিয়ে একাধিক ব্যাক্তি এসে উপস্থিত হয়। তখন তাদের সাক্ষ্যকে প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্নে বিদ্ধ করে সত্যিটাকে বের করে আনার মত দুঁদে উকিল এই সমস্ত কোর্টে একটিও নেই। আমাদের ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টে সে সাক্ষী দেওয়ার কাঠগড়া, তার ভয় একেবারেই অন্যরকম।

জাজের পরেই থাকে একজন কালেক্টর। তার কাজ হল কর আদায়ের দেখভাল করা, কর আদায় ও জমির দখলদারি সংক্রান্ত কোনওরকম প্রশ্ন উঠলে তার জবাব দেওয়া ও সিদ্ধান্ত নেওয়া। আর যেগুলো মূল স্টেশন বা ঘাঁটি, সেখানে থাকেন একজন কমিশনার। তিনি আবার জাজ এবং কালেক্টার, দুজনেরই ওপরে। তিনি কর আদায় সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় দেখাশোনা করেন। আবার ম্যাজিস্ট্রেট যদি কোনও ফৌজদারী মামলা তার কাছে পাঠান, সে মামলা বিচার করার আইনী অধিকারও তার আছে। কোনও ম্যাজিস্ট্রেট যদি কোনও আমলাকে তার কাজ থেকে বহিস্কার করেন, তার বিরুদ্ধে আপিল মামলাও কমিশনারের কাছেই আসে।

তারপরে আছেন ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি একটি বিশাল জেলা শাসন করেন। তাকে সহায়তা করে একজন জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট। এদের নীচে থাকেন একজন সহকারী ম্যাজস্ট্রেট, যে সদ্য কাজ শিখছে। কখনও কখনও সে কালেক্টরের অফিসেও ছোটখাট কাজ করে থাকে। এই সমস্ত দপ্তরের কর্তারা সে সব ছোটখাটো মামলা তার কাছে পাঠায়, সেগুলো সমাধান করা এনার কাজ। এরা সকলেই অসামরিক ব্যাক্তি।

আইন ব্যাবস্থায় দেশী লোকেদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছেন প্রধান সদর আমীন বা নেটিভ বিচারক। সদর মানে হল প্রধান আর আমীন হল একাধারে কমিশনার, আম্পায়ার, সালিসী সভার মোড়ল, যা বলবে। এই পদে সাধারণত কোনও অত্যন্ত প্রতিভাসম্পন্ন ইউরোপীয় বা পূর্ব ভারতীয় ভদ্রলোক বসেন যিনি এদেশের মানুষদের ভাষা, আচার আচরণ, নানারকম প্রথা ইত্যাদির সঙ্গে খুব ভালো ভাবে পরিচিত। এই পদে যিনিই বসবেন, তার জন্য এই সব জিনিসগুলো জানা অত্যন্ত জরুরী। কেননা যে মানুষগুলোর বিচার করার ক্ষমতা ও দায়িত্ব এনারা পেয়েছেন, বিচার করার আগে তাদের সাক্ষ্যর গুরুত্ব, কত বহুবিধ ও বিচিত্র রকমের প্রভাব তাদের আচরণের ওপর পড়ে, এই সমস্ত দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচারকদের বুঝতে হবে। প্রধান সদর আমীন একজন সিভিল জাজের সমকক্ষ। কিন্তু প্রতিটি মামলা, তা সে যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, প্রথমে তার আদালতে শুনানি হবে। তার রায়ে কেউ সন্তুষ্ট না হলে সিভিল জাজের কাছে আপিল করতে পারে। কিন্তু কোনও মামলায় দাবীর পরিমান যদি ৫০০০ টাকার বেশী হয় ততক্ষনাৎ তাকে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সর্বোচ্চ আদালত, যাকে সদর দেওয়ানী আদালত বলে, সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রধান সদর আমীনের মাইনে মাসে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা হয়।

একজন সদর আমীনের ক্ষমতা ও অধিকারের ক্ষেত্র প্রধান সদর আমীনের থেকে কম। তার বিচার করার ক্ষমতার সীমা যে সমস্ত মামলায় দাবীর অঙ্ক ১০০০ টাকার কম, সেই পর্যন্ত। ১০০০ টাকার থেকে বেশি কিন্তু ৫০০০ টাকার চেয়ে কম, এরকম দাবী সংক্রান্ত সমস্ত মামলা তার ওপরওয়ালার কাছে যাবে। একজন সদর আমীনের মাইনে মাসে ৪০০ টাকা।

এর পরেই সম্ভবতঃ আসবে ডেপুটি কালেক্টর। ডেপুটি কালেক্টরের পদ ও অফিস মূলতঃ সৃষ্টি করেছিলেন লর্ড বেন্টিঙ্ক। উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় লোকেদের কিছু সুযোগ সুবিধে দেওয়া। সুতরাং, শুনলাম, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই পদটি দেশীয় লোকেরাই অধিকার করে থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যোগ্য ইউরোপীয় মানুষ বা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এই পদে বসেছে, এরকম উদাহরণও রয়েছে। তারা কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর চুক্তিবদ্ধ কর্মচারী নন। ডেপুটি কালেক্টরের কোনও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে তার ওপরওয়ালার কাছেই করতে হবে। মাঝে মাঝে এই অফিসারকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এরকম সাধারণতঃ করা হয় পয়সা বাঁচানোর জন্য অথবা অন্যদের মতে বিচার পদ্ধতিতে আরও গতি আনার জন্য।

একইভাবে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটও বেশীরভাগ ক্ষেত্রে, তবে সবসময় নয়, একজন দেশী অফিসারই হন।

বিচার বিভাগের আর একজন কার্যনির্বাহী অফিসারের কথা বলব তাহলেই বিচারকদের ‘বেঞ্চ’ সম্পুর্ণ হবে। সে হল মুন্সেফ— একজন ছোট জাজ। যে সমস্ত মামলার দাবীর পরিমান ৩০০ টাকা পর্যন্ত, সেগুলোর বিচার করার মধ্যেই তার কর্তৃত্ব সীমাবদ্ধ। তার ওপরের মূল্যের মামলা সদর আমীনের আদালতে যায়। মুন্সেফের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও সেই আদালতেই করা যায়। বলাই বাহুল্য, এই সমস্ত ভদ্রলোকদের প্রত্যেকের নিজস্ব আদালত বা দপ্তর রয়েছে, নানাবিধ আমলা ও সহায়ক নিয়ে একটা রীতিমত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার মধ্যে রাইটার, পিওন, ম্যাসেঞ্জার ইত্যাদি সমস্তই রয়েছে।

যদিও সবার শেষে উল্লেখ করছি, কিন্তু এই ভদ্রলোকটিকে কিন্তু কোনও ভাবেই অন্যদের থেকে কম সম্মান করা হয় না, বরং অনেক বেশি করা হয়। তিনি হলেন কোনও সিভিল স্টেশনের ডাক্তার। তিনি সাধারণতঃ একজন সরকারী সামরিক কর্মচারী হন। এবং তিনি যে শুধুমাত্র তার সহকর্মী অফিসারদের স্বাস্থ্যের দেখভালের দায়িত্বে থাকেন তা নয়, জেলের কয়েদিদের শরীরের ভালোমন্দের দায়িত্বও তার। এই দায়িত্বের সাথে সাথে তিনি আরও কিছু অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করে থাকেন। যেমন আমাদের কৃষ্ণনগরের গৃহকর্তা। তিনি ডাক্তার হওয়ার সাথে সাথে, স্থানীয় পোস্টমাস্টার, দলিল চুক্তি ইত্যাদির রেজিস্ট্রার, কলেজের পরিদর্শক এবং নদীপথে কর আদায়কারী দপ্তরের অধিকর্তা। এখানে আমি তোমাদের বলে রাখি, এখানে নদীপথে বছরে মোটামুটি আন্দাজ ধরলে কর আদায় হয় দুই লক্ষ আঠারো হাজার টাকা, প্রায় ২১,৮০০ পাউন্ড। আর সে সমস্ত নৌকা কর দেয়, তার সংখ্যা মোটামুটি ৮০,০০০। এবার আশাকরি আন্দাজ করতে পারছ এদেশে নদীপথে কী পরিমান ভীড়টা হয়!

বিষয়ে ফিরে আসি। এই সিভিল স্টেশনে আশেপাশের চল্লিশ মাইলের ভেতর যত রকমের অপরাধ, অভিযোগ, বিবাদ সবকিছুর আপিলের শুনানি এখানেই হয়। ফলে যখন বিচারব্যবস্থার মহান অনিশ্চয়তা ও ন্যায়বিচারের ক্রমাগত পিছিয়ে যাওয়ার ছিদ্র দিয়ে আরও বৃহত্তর শয়তান ‘দুর্নীতি’ প্রবেশ করে আশেপাশের দরিদ্র মানুষ বিচার ব্যবস্থার দ্বারস্থ হওয়ার চেয়ে প্রথমেই হেরে যাওয়া পছন্দ করে। নয়ত তারা তাদের অসংখ্য বিবাদ-কলহ মেটানোর দায় প্ল্যান্টারদের হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়। কেননা দিনের পর দিন কাজকর্ম বন্ধ রেখে বিচারের আশায় সদর শহরের চক্কর লাগিয়ে জুতোর শুকতলা ক্ষইয়ে মামলা হেরে ধনেপ্রাণে শেষ হয়ে যাওয়ার থেকে এ ঢের ভালো।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply