কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২৭। শোভন সরকার
গত পর্বে: নৌকায় বসে ঘাট দেখতে দেখতে এগোচ্ছি। চেত সিং ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
আপাতদৃষ্টিতে এই ক্ষমতা হস্তান্তরে ইংরেজ সরকারের ভূমিকাকে তাদের উদারতা মনে হলেও ইংরেজদের ব্যবসায়ী মনোবৃত্তিকে ভুলে গেলে আমাদের মূর্খতা হবে। ১৭৭৫ সালের মধ্যেই বেনারসের প্রকৃত ক্ষমতা চলে এল তাঁদের হাতে। রাজা চৈত সিংহকে তারা বেনারস স্টেটের দেওয়ানি ও ফৌজদারি শাসনের দায়িত্ব দিল কিন্তু ক্ষমতার চাবিটি রেখে দিল নিজেদের হাতেই, চেষ্টা করল রাজাকে তাদের হাতের পুতুল বানিয়ে রাখতে। বিনিময়ে তারা সময়ে সময়ে বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আদায় করতে থাকল। সত্যি বলতে কি, রাজা চৈত সিংহকে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস সোনার ডিম পাড়া হাঁস বলেই মনে করত — যখনই তার মনে হয়েছে, রাজার কাছে নানা অজুহাতে সে অন্যায়ভাবে অর্থ শোষণ করতে থেকেছে। চৈত সিংহ শান্তি রক্ষার্থে তাকে যথাসাধ্য মেনেও চলছিলেন।
সেই সময়ে ইংরেজদের পরিস্থিতি বেশ ঘোরালো হয়ে উঠতে থাকে। একদিকে দক্ষিণের টিপু সুলতান এবং অন্যদিকে স্থানে স্থানে ডাচ, মারাঠা, ও ফরাসিদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তারা বেশ পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। এই সমস্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য হেস্টিংস ১৭৭৮ সালে রাজা চৈত সিংহের কাছে দাবি করে বসে যে প্রতি বছর কোম্পানিকে পাঁচ লাখ করে টাকা দিতে হবে। রাজা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন সেই অর্থের পরিমাণ কম করতে, কিন্তু হেস্টিংস আমল দিল না। বাধ্য হয়ে রাজা তার দাবি পূরণ করলেন সে বছর। পরের বছর হেস্টিংস আবার অর্থ দাবি করে বসে। রাজা এবারেও কাতর অনুরোধ করেন যে এত পরিমাণে অর্থ প্রদান করা তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। কিন্তু হেস্টিংসের এসব শোনার মত কানই ছিল না। রাজার এরূপ ধৃষ্টতায় সে খেপে গিয়ে পাঁচ লাখের দাবির সাথে আরও কুড়ি হাজার জরিমানা করল, হুমকিও দিল সৈন্য দিয়ে আক্রমণ করার। রাজার কোনো উপায় ছিল না, তিনি সেই অর্থ ও জরিমানা হেস্টিংসকে দিলেন। তার পরের বছর সত্যি সত্যিই সেনা পাঠিয়ে আবার অর্থ আদায় করা হল।
এদিকে নানা কারণে হেস্টিংস অভ্যন্তরীণ বিবাদেও জড়িয়ে পড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে তার সন্দেহ হতে থাকে যে রাজাও তার শত্রুদের সাথে হাত মেলাচ্ছেন। অবশ্য হেস্টিংস-এর এই অনুমান ভুল ছিল না। চৈত সিংহ তার অন্যায় শোষণে অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, উপায় তিনি খুঁজেই চলেছিলেন তার কবল থেকে বেরিয়ে আসার। হেস্টিংস এসব জানতে পেরে রাজাকে বিপাকে ফেলার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে রাজার লোকেরা ইংরেজ অফিসারদের হেনস্থা করছে, লুটপাট করছে। রাজাকে হুমকি দিয়ে চিঠি লেখে হেস্টিংস।
অপরদিকে, ১৭৮০ সালে হেস্টিংস মাদ্রাস নিয়ে ভীষণই গলদঘর্ম অবস্থায় পড়ে। আরও সৈন্য চাই তার, চাই যুদ্ধের খরচের জন্য বিপুল অর্থও। তখন সে চৈত সিংহের কাছে অর্থের সাথে সাথে দু’হাজার ঘোড়সওয়ার দাবি করে বসে। পরে সেই দাবি কমিয়ে এক হাজার করা হয়। রাজা আড়াইশো ঘোড়সওয়ার দিতে সম্মত হন কিন্তু বাস্তবে তাঁর পক্ষে সেটাও দেওয়া সম্ভব হয় না। স্বাভাবিকভাবেই হেস্টিংস খুশি হয়নি।
অবশেষে আর ধৈর্য রাখতে না পেরে ১৭৮১ সালের জুলাই মাসে হেস্টিংস নিজেই সসৈন্যে বেনারসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। উদ্দেশ্য — রাজার কাছ থেকে পঞ্চাশ লাখ টাকা আদায়, এবং অনাদায়ে তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তা আওধের নবাবকে হস্তান্তর।
ততক্ষণে চৈত সিংহ এ খবর পেয়ে গেছেন। তিনিও বেরিয়ে পড়লেন। সঙ্গে বেশ কিছু সৈন্য। বক্সারের কাছে রাজা হেস্টিংসের সম্মুখীন হলেন। সঙ্গে সৈন্য দেখে তো হেস্টিংস ভীষণ চটে গেল। রাজা যথাসম্ভব নিজের আনুগত্য দেখালেন। এমনকি নিজের পাগড়ি খুলে হেস্টিংসের পায়ের কাছে রাখলেন। হেস্টিংস তার অবস্থান থেকে এতটুকুও নড়ল না, উলটো রাজাকে অপমান করল, লাথি মেরে ঠেলে দিল।
হেস্টিংসের এতখানি স্পর্ধা, ভেবে অবাক হই! অবশ্য তার এই অহংকারের ফল ভাল হয়নি। তখনকার মত রাজার সাথে যুদ্ধে জিতে গেলেও পরবর্তীতে নিজের দেশে ফিরে গিয়ে তাকে এক দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, হেনস্থা হতে হয়। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের মধ্যে চৈত সিংহের সাথে তার এই দুর্ব্যবহারের প্রসঙ্গও উঠে আসে। যাই হোক, আমরা কাহিনিতে ফিরি।
হেস্টিংস কয়েকদিনের মধ্যেই বেনারস পৌঁছাল। রাজার বিরুদ্ধে বেইমানি, চুক্তিভঙ্গ ইত্যাদি নানা অভিযোগ এনে তাঁকে লম্বা এক চিঠি লিখল। রাজাও তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন করে জবাব দিলেন। রাজার জবাবে হেস্টিংস সন্তুষ্ট তো হলই না, বরং শিবালাতে অবস্থিত মহলে তাঁকে বন্দী বানানোর আদেশ দিল।
১৬ই আগস্ট ১৭৮১। রাজাকে তাঁরই শহরে, তাঁরই প্রজার সামনে, তাঁরই নিজের মহলে নজরবন্দী করে রাখা হল। রাজা আনুগত্য স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত কিন্তু তখনই খবর এল যে শহরের মানুষ খেপে উঠেছে, রামনগরে সশস্ত্র লোকজন জমা হচ্ছে। রাজাকে বন্দী করে রেখেছে আর তারা হাত গুটিয়ে বসে রইবে, এমন প্রজা তারা নয়।
রাজার ঘরের দরজায় পাহারা দিচ্ছে কিছু ইংরেজ সৈন্য। এ ঘরে কে ঢুকবে আর কে ঢুকবে না সে ব্যাপারে ভীষণই কড়া নজর তাদের। মহলের সমস্ত কর্মচারীদের ভাল করে চিনে রেখেছে, তাদের ছাড়া অন্য কারও ঢোকার অনুমতি নেই। এমন সময় হঠাৎ কীসের শব্দে পাহারাদারদের কান সতর্ক হয়ে উঠল — প্রথমে মনে হল যেন মৌমাছির চাকে কেউ ঢিল ছুঁড়েছে, তাতেই ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি গুঞ্জন করছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই গুঞ্জন তীব্রতর হতে হতে কোলাহলের চেহারা নিল। মহলের বাইরে প্রচণ্ড চেঁচামেচি হচ্ছে, একসঙ্গে অনেক লোকের কণ্ঠে হারে-রে-রে-রে-রে রবে মহলের ভিতর-বার গমগম করতে শুরু করেছে। কয়েকটা গোলাগুলির শব্দ শোনা গেল এবার। চঞ্চল হয়ে উঠল রাজার পাহারায় থাকা ইংরেজরা। ইন্ডিয়ায় এসে নেটিভদের আক্রমণে প্রাণ দিতে হবে — হে প্রভু যিশু, তা যেন না হয় — মনে মনে সকাতরে প্রার্থনা করতে লাগল তারা। এরপর হঠাৎ কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইরে পাহারায় থাকা ইংরেজ সৈন্যরা ছুটে ভেতরে চলে এল, তাদের মুখ চোখ আগুনের মত লাল হয়ে গেছে উত্তেজনায়। জানা গেল তাদের উপর হামলা হয়েছে। নেটিভরা ঘিরে ফেলেছে সমস্ত মহল, পাহারার বেষ্টনী ভেঙে তারা ভেতরে চলে এসেছে। বাঁচার উপায় বোধ হয় আর নেই।

চিত্রঋণ: ক্যাসেল্স হিস্ট্রি অফ ইংল্যাণ্ড, ৪র্থ খণ্ড
বাইরে এবার ভীষণ গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। খিড়কি দিয়ে বেরোনোর উপায় নেই, বর্ষায় গঙ্গা ফুঁসে উঠেছে। মহলের গোড়ায় গঙ্গার প্রবল স্রোত আছড়ে আছড়ে পড়ছে, ঘূর্ণি উঠছে জলে। বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকলে ধাঁধা লাগে। রাজার সঙ্গে রয়েছে বিশ্বস্ত মনিয়ার সিংহ আর সদানন্দ। আরও যারা ছিল তারা লড়াইতে নেমেছে। এরই মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে বেশ কিছু বিশ্বাসঘাতকের দল, মশার দলের মত তারা এতদিন রাজাকে অতিষ্ঠ করে এসেছে, ইংরেজদের নাম করে নিজেকে তারা প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী মনে করে এসেছে।
ততক্ষণে গোলমালটা বেশ ভীষণ হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে খবর এল যে আরও ইংরেজ সৈন্য প্রাসাদের দিকেই আসছে। চৈত সিংহ এবার কেঁপে উঠলেন। কী করবেন এবার? যুদ্ধে যোগ দেবেন বলে ঠিক করলেন। কিন্তু মনিয়ার সিংহ বাধা দিলেন, তাঁর মাথায় অন্য চিন্তা। এই মুহূর্তে হেস্টিংস মাধোদাসের বাগানবাড়িতে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন। ঠিক এখন যদি তাকে গিয়ে আটক করা যায় তাহলে? পাশা তো পাল্টে যাবে!
রাজা চৈত সিংহ হেস্টিংসকে আটক করার পরামর্শ মানলেন না। হেস্টিংসকে বন্দী করা অতটা সহজ হবে না, প্রক্রিয়াগতভাবে বেশ জটিল পরিস্থিতি। এখান থেকে বেরিয়ে আপাতত কোনো নিরাপদ স্থানে যেতে পারলে তবেই তিনি ভবিষ্যতের জন্য কোনো উপায় ভাবতে পারবেন।
বকশি সদানন্দ রাজার বেশ প্রিয় পাত্র। সে নিজেও পূর্বে রাজার দূত হয়ে হেস্টিংসের সাথে সাক্ষাৎ করেছে, পরিস্থিতি সামলেছে। দুর্দান্ত কূটনৈতিক বুদ্ধি তার। সে রাজাকে পরামর্শ দিল পালিয়ে যেতে।
রাজা নিজের মহলকে এই বিপদে ফেলে পালাবেন? মনের ভিতর থেকে বিদ্রোহ করে উঠল। এ কেমন পরামর্শ সদানন্দের? তাছাড়া চারিদিকে ইংরেজ সৈন্য ঘিরে রেখেছে। পালাতে গেলেই ধরা পড়বেন রাজা। এ তো জেনেশুনে মরণকূপে ঝাঁপ দেওয়ার শামিল। কিন্তু এক অভিনব উপায় বের করা হল।
(ক্রমশ)
