কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ১৪। শোভন সরকার

গত পর্বে: কত্থক সম্রাজ্ঞী সিতারা দেবীর কথা মনে করলাম। তারপর একদিন শিবমের সাথে চললাম গঙ্গার ঘাটে। শুরু হল ঘাটে ঘাটে লুকিয়ে থাকা কাশীর কাহিনি শোনার পালা। 

অসি ঘাটের পিজ্জেরিয়া বাটিকা ক্যাফে বা কাশী অন্নপূর্ণা বুক হাউস ছাড়িয়ে উত্তরের দিকে এগোলেই দেখি গঙ্গামহল ঘাট। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেনারসের রাজা প্রভু নারায়ণ সিংহ এই ঘাটে এক মুঘল ও ইংরেজ স্থাপত্য শিল্পের এক অপূর্ব মিশেলে এই মহল নির্মাণ করেন। গঙ্গার ঘাটে অবস্থিত মহলের জন্যই এই ঘাটের এরূপ নাম হয়। গঙ্গাবক্ষে কোন এক সকালে নৌকাবিহারের সময় তাকালে এই মহলকে নতুন সূর্যের সোনালী আলোয় অত্যন্ত মনোহর দেখায়। বর্তমানে এই গঙ্গামহলের এক তলায় আছে এক টেক্সটাইল স্টুডিও। তারই উপর তলায় আছে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও কার্লস্টাড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ প্রয়াস ‘দ্য সুইডিশ স্টাডি সেন্টার’। ১৯৯৫ সাল থেকে চালু এই শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা ও বসবাসের সমস্ত আধুনিক সুবিধা রয়েছে।  

 গঙ্গামহল ঘাটের গায়েই রীবা ঘাট। অনেকে বলে, পাঞ্জাবকেশরী রাজা রঞ্জিৎ সিংহের পুরোহিত লালা মিশ্র এই ঘাট বাঁধিয়ে দেন বলে এই ঘাটের নাম এক সময় ছিল ‘লালা মিশ্র ঘাট’। হয়তো এই ঘাটকেই জেমস প্রিন্সেপ তাঁর বর্ণনায় ‘কাঁচা ঘাট’ বলে উল্লেখ করছেন। পরবর্তীকালে এর নাম হয় ‘লীলারাম ঘাট’। ১৮৭৯ সালে মধ্যপ্রদেশের রীবা প্রদেশের রাজা এই ঘাট কিনে নিয়ে অনেক সংস্কার করেন। তার থেকে এর নাম হয়ে যায় ‘রীবা ঘাট’। শীতকালে অনেক সময়েই এই ঘাটের উঁচু রোয়াকে নাচ-গানের আসর বসে। দৃশ্যকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের চিত্রপ্রদর্শনী এখানে প্রায় নিত্যদিনের উৎসব। রীবা ঘাটেই রয়েছে রীবা কুঠি। এটা আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের হোস্টেল। ঘাটের ওপরেই এত অসম্ভব সুন্দর ইমারত, তার ওপর থেকে সদা বহমান গঙ্গার পূর্বমুখী শোভা, এমন হোস্টেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সমস্ত হোস্টেলের অধিবাসীদের হিংসার কারণ হতে বাধ্য। 

একবার সঙ্গীত বিভাগের বন্ধুবর বিনয়ের সাথে সেই হোস্টেলে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। গোধূলিয়া-লঙ্কা রোড হয়ে তুলসী ঘাট গলি দিয়ে একটু হেঁটে এগিয়ে গেলে একদিকে রয়েছে রানী লক্ষীবাই জন্মস্থল। ‘ঝাঁসির রানী লক্ষীবাই’ পরিচয়ে সবাই তাঁকে চেনে বলে অনেকের স্মৃতিতে থাকেনা যে মনিকর্ণিকা তাম্বে অর্থাৎ লক্ষীবাই (বিবাহ পরবর্তী নাম) তো আসলে কাশীরই ঘরের মেয়ে। গাছপালা ঘেরা পরিসরের মধ্যে রয়েছে লক্ষীবাইয়ের বিশাল আকারের এক অশ্বারোহী মূর্তি। আশেপাশে দেওয়ালে চিত্রিত রয়েছে তাঁর জীবন কাহিনি। লক্ষীবাইয়ের জন্মস্থলী থেকে বেরিয়ে সামনের অপরিসর রাস্তা পেরোতেই যে বাড়িখানি দেখা যায় তা হল রীবা কুঠি। বন্ধু বিনয় বাড়িটির বাঁ দিকের অপরিসর এক গলি দিয়ে নিয়ে গেল দরজায়। দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেখা গেল এক চতুষ্কোণ উঠোন, চারপাশ ঘিরে রয়েছে দ্বিতল সেই বাড়ির দালান, প্রত্যেক তলায় একাধিক ঘর। আশ্চর্য শান্ত পরিবেশ সেদিন, হয়তো হোস্টেলের বেশিরভাগ বাসিন্দা অনুপস্থিত বলে। সেই মায়াবী, শান্ত পরিবেশে আসল নেশা লাগাচ্ছিল দু’টি অনুঘটক — এক, হোস্টেল ঘরের বন্ধ দরজার আড়ালে অনুরণিত হয়ে চলেছিল তবলার অক্লান্ত বোলরাজি, কোন এক অধ্যবসায়ী অনুশীলকের তবলার ঠেকায় মাদকতা ছড়িয়ে পড়ছিল সমস্ত বাড়ির নৈঃশব্দে; পুরোনো সেই কুঠির রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাশীর সঙ্গীতের দৃশ্যময়তা যেন কত যুগ আগের অপর পাড় থেকে অমলিন ধারায় আজও মুগ্ধ করে চলেছে বাড়িটির প্রতিটি কোণকে। সেই ঘোর থেকে বেরোতে না বেরোতেই বিনয় পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল বাড়ির পূর্ব দিকে, সেখানেই ছিল নেশা লাগার দ্বিতীয় উপাদান। সামান্য এগোতেই চোখে পড়ল প্রশস্ত অলিন্দ, সেখানে পূর্বদিকের দেওয়ালে উন্মুক্ত এক ঝরোকা। শ্বেতশুভ্র সেই ঝরোকা দিয়ে বাইরে তাকালেই দেখা যায় সামনে বহমান গঙ্গা। এখানে দাঁড়িয়ে গঙ্গার যেমন রূপ দেখতে পাওয়া যায় তাতেই বোধ হয় মুগ্ধ হয়েছিলেন মির্জা গালিব, বেনারসের প্রশংসায় গেয়ে উঠেছিলেন —

“বী-গঙ্গশ অক্‌স তা পরতৌ ফি᩿গন শুদ

বনারস খুদ নজী᩿র-এ-খী᩿শতন শুদ”  

অর্থাৎ, বেনারস যখন গঙ্গার কিনারে দাঁড়িয়ে জলের ধারায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল, সে প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল অনুপম, অতুলনীয়। 

বেনারসের আকাশে যদি শীতের পরিযায়ী পাখি হয়ে উড়ে বেড়ানো যেত, তবে দেখতে পেতাম গঙ্গা নদী ত্রিভঙ্গ মূর্তিতে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণের কোমরের ন্যায় বেঁকে গিয়েছে বেনারসের পাশ দিয়ে যাবার সময়, নদী এখানে এসে উত্তর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বয়ে চলেছে ধীরে ধীরে। গোমুখ কিংবা হরিদ্বারের চাঞ্চল্য এখানে নেই, বরং যেন নদী এখানে সংলগ্ন শহরকে সমীহ করে নিজের বেগ সংবরণ করেছে। নদীর পশ্চিম পাড়ে যুগে যুগে যেমন গড়ে উঠেছে শহরের বৈভব, অন্যদিকে নদীর পূর্বদিকে পড়ে রয়েছে বালুকাময় বৈরাগ। মৃত্যু সেই শহরে অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, মৃত্যু সেখানে উদ্‌যাপিত হয়। নদীর এই দুই পাড়ের মধ্যে বাস্তবে দূরত্ব বেশি নয়, কমবেশি ৩০০ থেকে ৬০০ মিটার, কিন্তু রূপকার্থে এদের দূরত্ব অনেক। খেয়াল করলে দেখা যায় গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে এই বেনারস শহর যতটা বিকশিত হয়ে এসেছে প্রাচীনতার নিরিখে, পূর্ব পাড়ে ততটা নয়। একবার দেবেশের সাথে নৌকায় করে গঙ্গার পূর্ব পাড়ের চরে ঘুরতে গেছিলাম। তখন কথায় কথায় দেবেশেকে সেটাই জিজ্ঞেস করলাম। ও বলল, ‘এই পাড়ে কেউ মরতে চায়না। মরলেই তো পরজন্মে গাধা হয়ে জন্মাবে।’ 

‘মানে?’ আমি অবাক হয়ে বললাম। 

‘মানে আবার কী? এরকমই হয়। আমার দাদী ওরকমই বলেন।’

‘আর কী বলেন দাদী?’

‘আগে হত। এখন আর কেউ মানে না।’ দেবেশ আকর্ণ হেসে বলল। 

‘কলি যুগের প্রভাব?’

‘না না, ব্যাসদেবের কারণে।’

‘সেই মহাভারতের ব্যাসদেব? কী রকম ব্যাপারটা?’

ভোরবেলায় এসে এই বালুর চরে আমরা খালি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি আর কথা বলছি। নৌকায় করে এসেছে আরও মানুষ। কেউ কেউ ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে চরের উপর চলে ফিরে বেড়াচ্ছে ঘোড়ার মালিকের সাহায্যে। তখন সূর্য উঠেছে পূর্ব আকাশ জুড়ে, তারই রক্তাভ সোনালী আলো এসে রঞ্জিত করে ফেলেছে ওপারের দৃশ্যমান চরাচরকে। বেলে পাথরের উঁচু উঁচু ইমারত, ঘাটগুলি বোধ হয় ভোরের সোনালী আলোয় এপারে দাঁড়িয়ে দেখার জন্যই তৈরি। পাকা সোনা রঙে সেজে শহরটি হয়ে উঠেছে মনমোহিনী। মনে পড়ে যায় রামকৃষ্ণদেবের কথা। এই একই রকম দৃশ্য দেখেই হয়তো তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন কয়েকশ’ বছর আগেও।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব দুইবার বেনারস ভ্রমণে আসেন – ১৮৬৩ ও ১৮৬৮ সালে। সেবার প্রথম কাশীতে এসে নৌকায় করে গঙ্গায় ভ্রমণে বেরোন। সে সময় কাশী শহরের দিকে তাকিয়ে ভাববিভোর হয়ে পড়েন — তিনি দেখেন সেই শহর যেন সোনায় মোড়া, কোথাও কোন ইট-কাঠ-পাথরের চিহ্ন নেই। এই দৃশ্য রামকৃষ্ণদেবকে এতই প্রভাবিত করেছিল যে তিনি নাকি শুরুর ক’দিন শৌচকার্যের জন্য গঙ্গার অপর পাড়ে চলে যেতেন, তাঁর ভয় ছিল যে অন্যথায় সেই সুবর্ণময় শহর প্রদূষিত হবে। 

‘সামনে দেখে!’ দেবেশ হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে উঠল, হাত দিয়ে আমার পায়ের ঠিক সামনেই নির্দেশ করছে। সামনে বালির উপর পড়ে রয়েছে মনুষ্য-বর্জ্য। আমি সামলে নিয়ে কোনমতে এড়িয়ে গেলাম সেই বর্জ্য-বিপর্যয়।  

এখানে এরূপ বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রতি পদক্ষেপে। আমরা তো সামলেই চলতে থাকলাম। কিন্তু বেদব্যাস কাশীতে এসে আমাদের চেয়েও এক বড়সড় বিপর্যয়ে পড়েছিলেন। দেবেশ শোনাল কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাসের সেই কাহিনী। 

ব্যাসদেব সেবার সশিষ্যে কাশীতে এসে ভিক্ষায় বেরোন। কিন্তু অনেক ঘোরাঘুরির পরেও কাশীর কোথাও ভিক্ষা না পেয়ে অত্যন্ত হতাশ ও ক্ষুব্ধ হলেন। ‘এত গর্ব এই কাশীর মানুষের? জ্ঞানের গর্ব, ধনের গর্ব ও নিশ্চিত মুক্তির গর্বে অন্ধ হয়ে এরা যাচ্ঞাকারীকে বঞ্চিত করে?’ এই বলে তিনি শাপ দিলেন যে তিন পুরুষ ধরে কাশী জ্ঞান, ধন ও মুক্তি থেকে বঞ্চিত হবে। হতোদ্যম হয়ে ব্যাসদেব যখন নিজের আশ্রমে ফেরার উদ্যোগ করতে লাগলেন ঠিক তখনই পথের ধারে এক গৃহের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক ছাপোষা গৃহিণী। অত্যন্ত ভক্তিভরে ব্যাসদেবকে প্রণাম করে জানালেন যে তাঁর স্বামী বৈশ্বদেব অতিথি সৎকার না করিয়ে নিজে ভোজন করেন না। তাই তাঁরা চান ব্যাসদেব যেন অতিথি হয়ে তাঁদের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। ব্যাসদেব অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি এও বললেন যে তিনি তাঁর দশ হাজার শিষ্যর সঙ্গে ভোজন গ্রহণ করতে চান। ব্যাসদেবকে অবাক করে দিয়ে সেই গৃহিনী এতটুকুও বিচলিত হলেন না, বরং সাগ্রহে সমস্ত শিষ্য সহ ব্যাসদেবের খাবারের ব্যবস্থা করে দিলেন। সমস্ত মিটে যাবার পর খুশিমনে ব্যাসদেব ফিরে যাবার উদ্যোগ করতেই গৃহিণী প্রশ্ন করলেন, ‘যাঁরা তীর্থে বাস করেন, তাঁদের কী করণীয়?’ ব্যাসদেব বলেন, ‘কটু কথা না বলা, অন্যের ও নিজের শুভচিন্তা করা, ভেবে কাজ করা — এই হল তীর্থবাসীর কর্তব্য।’ গৃহিণী কটাক্ষ করে বলেন, ‘মহর্ষি, এর মধ্যে আপনি কোনটি মেনে চলেন?’ 

ব্যাসদেব এর উত্তরে আর কিছুই বলতে পারলেন না। এবার গৃহস্বামী ব্যাসদেবকে তিরস্কার করে মনে করিয়ে দিলেন যে তিনি ক্রোধিত হয়ে কাশীকে শাপ দিয়ে তাঁর নিজের বাক্যই লঙ্ঘন করেছেন। বললেন, ‘নিরপরাধ মানুষকে শাপ দিয়ে আপনি অপরাধী। আপনি এখনই আমার এই কাশী ত্যাগ করুন, এবং এখানে আপনার প্রবেশ চিরতরে নিষিদ্ধ হল।’ 

এবার ব্যাসদেব বুঝলেন যে এই দম্পতি আর কেউ নয়, স্বয়ং কাশীপতি শিব এবং অন্নপূর্ণা। নিজের ভুল বুঝতে পেরে দেবীর কাছে ক্ষমাভিক্ষা করলেন। প্রার্থনা করলেন যেন অন্ততঃ প্রতি অষ্টমী (অন্নপূর্ণার দিন) এবং প্রতি চতুর্দশী (শিবের দিন) তিথিতে তাঁর কাশীপ্রবেশে কোন বাধা না থাকে। তাঁর এই প্রার্থনা মেনে নেওয়া হল। সেই থেকে ব্যাসদেব মাসের দু’দিন ছাড়া কাশী থেকে নির্বাসিত। কিন্তু বেশী দূরে না গিয়ে তিনি গঙ্গার অপর পাড়েই রামনগরে গিয়ে বাস করতে শুরু করলেন। এই কারণেই একে অনেকে ব্যাসকাশীও বলে থাকেন। 

‘কিন্তু আমি আমার প্রশ্নের উত্তর এখনও পেলাম না। এপাড়ে গাধা হয়ে জন্মানোর যে ব্যাপার ছিল সেটার কথা কই বললে?’ আমি দেবেশকে জিজ্ঞেস করলাম। 

‘কাহিনি এখনও শেষ হয়নি, শোভন।’

(ক্রমশ)

পরবর্তী পর্ব

প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Author

Leave a Reply