কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ১৩। শোভন সরকার
গত পর্বে: আরতির পেছনের কথা জানা গেল। তারপর সুবহ্-ই-বানারস এর মঞ্চে উপভোগ করলাম অপূর্ব কত্থক নৃত্য। কথা হল শিবমের সাথে।
‘কত্থক’ শব্দটিই এসেছে ‘কথা’ থেকে। তাই কত্থকের পরিবেশনায় পৌরাণিক গল্পের আনাগোনা। বিশাল কৃষ্ণা একের পর এক ঠাঠ, চলন, আমদ, আকাশ ভ্রামরী, গৎ নিকাস পরিবেশন করে তাঁর উপস্থাপনা শেষ করলেন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে গোপীদের হোলিখেলার অভিনয় দিয়ে। কী অপূর্ব তাঁর ছন্দ, লয় ও পরিমিতি বোধ। তাঁর যথাযথ অভিনয় ও রসজ্ঞান দিয়ে বেনারস ঘরানার নব্যপ্রজন্মের এই শিল্পী অনায়াসে উপস্থিত সকলের মন জিতে নিলেন।
নাচের শেষে সবাই তখন প্রবল আনন্দে ও তৃপ্তিতে দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিয়ে বিশাল কৃষ্ণাকে অভিবাদন করতে লাগল। তিনি মঞ্চ থেকে নেমে যেতেই লক্ষ্য করলাম কিছু বরিষ্ঠ মানুষ তাঁর সঙ্গে ভেজা চোখে, হাসিমুখ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। আমার পাশের সেই ছেলেটিও সেইদিকে ছুট দিয়েছে। সেও হয়তো তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চায়। মনে ভালোলাগার একটা আমেজ নিয়ে আমি তখন বেরিয়ে আসব বলে উদ্যোগ করছি, কিন্তু পেছনে ঘুরতেই লোকের ভিড় দেখে মাথা ঘোরার জোগাড়। এর মধ্যে বেরোনো মুশকিল। সাইকেলও নিতে হবে। ভাবলাম একটু বসেই যাই, ভিড়টা একটু পাতলা হোক। বসেই মঞ্চের একপাশে চোখ পড়ল। বিশাল কৃষ্ণা তখনও লোকজনের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছেন, ছবির জন্য তাদের বায়না রাখছেন। কিন্তু সেই ছেলেটি এখনও এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে, যেন একটু ইতস্তত ভাব, অপেক্ষা করছে কোন একটা কিছুর। তার হাতে একটা ট্রলিব্যাগের হাতল ধরা, নিশ্চয়ই তার নাচের সাজপোশাকের সরঞ্জাম আছে তাতে। হঠাৎ মনে পড়ল সিতারা দেবীর কথা। কে তিনি। শিবম বলে ছেলেটি তাঁর কথা বলল, বিশাল কৃষ্ণাও বেশ কয়েকবার মঞ্চে তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন। ফোনটা বের করে গুগল করলাম।
বেনারস ঘরানার অন্যতম স্তম্ভ এই সিতারা দেবী। ‘কত্থক সম্রাজ্ঞী’ তিনি। ‘কত্থক কুইন’ তিনি। বেনারস ঘরানার দু’টি ধারার অন্যতম একটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন পণ্ডিত সুখদেব মহারাজ তথা সুকরে মহারাজ, সিতারা দেবী তাঁরই কন্যা। যখন মেয়েদের কত্থক পরিবেশনা ও বেশ্যাবৃত্তিকে সমতুল্য বলে ধরা হত, তখন সুখদেব মহারাজ নিজের সন্তানদের, বিশেষত মেয়েদের, তাঁর নিজস্ব ঘরানায় অনন্য করে গড়ে তোলেন। খুবই অল্প বয়স থেকে বিভিন্ন জায়াগায় নৃত্য পরিবেশন, চলচ্চিত্রে অভিনয় ও নাচের কোরিওগ্রাফি করে তিনি এক পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। এই যে আমি বসে রয়েছি অসি ঘাটে ২০১৬ সালের কোন এক সন্ধ্যায়, তার ঠিক দুই বছর আগেই ২০১৪ সালে তাঁর দেহান্ত হয়। এবার বুঝলাম কেন তাঁর নামটা বড্ড চেনা লাগল যখন শিবম বা বিশাল কৃষ্ণা তার নাম উল্লেখ করেন।
ফোন থেকে মুখ তুলেই দেখি শিবম বলে সেই ছেলেটি তার ট্রলি গড়াতে গড়াতে এদিকেই এগিয়ে আসছে। লোকজনের ভিড় ততক্ষণে ঘাটের অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। আমার হোস্টেলে ফেরার সময় হয়ে এল। বেশি দেরি করলে আবার মেসে খাবার পাবোনা। তবুও আমার কেন জানি মনে হল শিবমের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমিও একটু এগিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
কথা হল উনার সাথে?
শিবমের মুখে এখনও একটা ইতস্তত ভাব খেলে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে শেষ অব্দি আর কথা হয়নি। সে একটু মনমরা হয়ে জবাব দিল,
হয়েছে, খুবই সামান্য।
তাহলে মুখ গোমড়াথোরিয়াম কেন?
আমরা ততক্ষণ একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করেছি। ঘাটের বাইরের দিকেই চলেছি মনে হল। আমার প্রশ্ন শুনে নাক দিয়ে নিঃশ্বাস ছেড়ে হেসে উঠল। হাসলে তার সুন্দর সাজানো দাঁতের সারি দেখা যায়, দেখা যায় মাড়ির একাংশও। হাসতে হাসতে বলল,
কী থোরিয়াম?
গোমরাথোরিয়াম। সত্যজিৎ রায়, চেনো তো? তাঁর বাবা সুকুমার রায়ের কল্পনার প্রাণী।
তুমি বি এইচ ইয়ু-তে পড়? বাংলা? বি এ?
উঁহু, ইংরেজি। এম এ। তুমি?
আমি ব্যাচেলর ইন পারফর্মিং আর্টস — বি পি এ।
আমার সাইকেল নিয়ে ওর সাথেই হেঁটে এগিয়ে গেলাম অটো স্ট্যাণ্ড অব্দি। কথায় কথায় জানলাম শিবম এসেছে ঝাড়খণ্ড থেকে। এখানে কত্থকের টানে আসা। খুবই সদ্য এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকের সহায়তায় সে এখানে আজ নাচের সুযোগ পেয়েছে। তাঁর আসার কথা থাকলেও কাজের চাপে আসতে পারেননি। বন্ধু-বান্ধবও কোন কারণে আসতে পারেনি। তাই তাকে একাই ফিরতে হচ্ছে। অটো ছাড়ার আগে আমরা ততক্ষণে আমাদের নম্বর বিনিময় করে নিয়েছি। ঠিক হল একদিন আবার ঘুরতে বেরোব। তবে সেই সুযোগ আসতে আসতে আরও দু’ মাস চলে গেল।পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট এসব তৈরি করতে করতে কোন ফাঁকে সময় বেরিয়ে গেল বোঝা গেল না। পরীক্ষা ততদিনে শেষ। ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পালা এসেছে। তারই আগে শিবম আর আমি একদিন ভোরবেলায় অসি ঘাটে পৌঁছে গেলাম।
সূর্য তখনও ওঠেনি। তবে ঘাট ততক্ষণে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। দেখে শুনে মনে হয় সবাই যেন সারারাত জেগেই ছিল। থাকেও। গঙ্গার ঘাট কখনও শুয়ে থাকেনা, ঘুমোয়না। গরমের সময় দেখেছি বহু স্থানীয় মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী, বা পর্যটকেরা ঘাটে শুয়ে-বসে, হেঁটে, গল্প করে বা গঙ্গার উপর চাঁদের আলো মিশে থাকা পাকা সোনা রঙের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কাটিয়ে দেয়। সেই যেমন সেবার আমাদের কয়েকজন সিনিয়র সারারাত ঘাটে শুয়ে কাটাল। পূর্ণিমা রাতে, গঙ্গার ধারে। চন্দ্রাঘাতে জোয়ারের জলের মত উঠে এল হাসি আর কান্নার দমক। গঙ্গার শীতল বাতাস দেহের ও মনের সমস্ত ক্লান্তি যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল কোথায়, কতদূর। সে এক মজাদার ব্যাপার।
শিবম আর আমি একটু হেঁটে অসি ঘাটের জমজমাট কোলাহল ছেড়ে এগিয়ে যেতে শুরু করলাম। মাঝিরা একে একে কতবার এসে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইয়া, নাও মে জানা হ্যায়? উসপার জানা হ্যায়?’ ছোট ছোট ছেলেমেয়ে হাতে করে শালপাতা বা কাগজের বাটিতে ফুল মোমবাতি দিয়ে সাজানো প্রদীপ বিক্রি করতে চাইল আমাদের কাছে, ‘ভাইয়া, এক দিয়া লিজিয়ে, ব্যস দস্ রুপই, লিজিয়ে না ভাইয়া।’ নানা বয়সের নানা চেহারার কেউ কেউ আবার চায়ের কেটলি নিয়ে ঘুরে ঘুরে বলতে লাগল, ‘চায় চাহিয়ে, মসালা চায়, নিম্বু চায়।’ এক পাশ থেকে কোন এক চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের বাঙালি ভদ্রলোক বেশ আমেজ নিয়ে তার পরিবারের কাছে আফসোস করে বলে উঠল, ‘এ হে, দুধ চা পাওয়া যাবেনা!’ কণ্ঠে তার একরাশ অভিমানের মাখন ঝরে পড়ল। ভদ্রলোকের পরিবারের কেউ একজন স্বরে ব্যঙ্গ আর ঝাঁঝ মিশিয়ে তৎক্ষণাৎ বলে উঠল, ‘এ তো তোমার বাপের বাড়ি, যা খুশি অর্ডার করবে সব হাতের কাছে পেয়ে যাবে। ঘুরতে এসেও চায়ের নোলা গেল না তার!’ ভদ্রলোক যেন পুরোনো মুড়ির মত সেঁতিয়ে গেল। তক্ষুণি তাদের পাশ থেকে কেউ যখন বলে উঠল, ‘নাও মে চলিয়ে, ঘুমা দেঙ্গে’, লোকটা যেন হাঁপ ছেড়ে বলে উঠল, ‘কত নেবে ভাড়া? দশাশ্বমেধ তক ঘুরা দেঙ্গে না?’
ঘাটে ঘাটে তখন আরতির তোড়জোড় চলছে। ওদিকে পূবের আকাশে ধূসর-কালো রঙের মাঝে গাঢ় নীল রঙের ছোপ লেগেছে। হালকা বেগুনির আভাস যেন। পাখিরা এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে সকালের ব্যস্ততায় নিজেদের সামিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘাটের কুকুরগুলো সারারাত সমস্ত ঘাট জুড়ে নিজেদের এলাকায় খবরদারি সেরে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছে। কোন কোনটা আবার আড়মোড়া ভেঙে, মস্ত বড় হাই তুলে কোন এক পর্যটকের সাথে সাথে চলেছে বিস্কুটের আশায়।
শিবম যেন একটু তাড়াতাড়িই চলছিল, তার ওপর সে আমার তুলনায় বেশ লম্বা। ওর পায়ের গতির সাথে আমার চলার কী সাধ্য। ওর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমাকে রীতিমত দৌড়াতে হচ্ছিল। আমরা একের পর এক ঘাট পেরিয়ে আসছিলাম। এভাবে ঘাট বরাবর অসি ঘাট থেকে দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে বেশ কয়েকবার হেঁটে চলে গিয়েছি। মনে পড়ে, এরকমই একবার শীতের এক ভোরে ক্যামেরা নিয়ে দেবেশের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলাম ছবি তুলতে। সে এখানকারই মানুষ, ছোটবেলা থেকেই বেনারসের ঘাট ঘাট চেনে। কাজেই ওর সাথে ঘুরে বেড়ানো একটা লোভনীয় জিনিস ছিল; শুধু ছবি তোলা নয়, বেশ অনেক কিছু জানতেও পারা যায় কথায় কথায়।
(ক্রমশ)
