কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ১২। শোভন সরকার

গত পর্বে: কাল ভৈরবের রাস্তা ছেড়ে এবার এলাম বেনারসের ঘাটে। কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার সুবাদে অসি ঘাট এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ে আছে আমার মনে। বেনারসের ইতিহাস ও লোককথায় এর গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। 

ঠিক অসি সঙ্গমে না হলেও আজও বহু মানুষ পঞ্চতীর্থ যাত্রায় এসে অসি ঘাটে গঙ্গাস্নান করে। অসি ঘাটের গঙ্গায় নামতে গেলে পাকা সিঁড়ি ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতে হয়। নদীর কিনারা বরাবর অনেকটা জায়গা কাঁচা, পলিমাটিতে ঢাকা, অন্যান্য সমস্ত ঘাটের মত জলের ধার অব্দি বাঁধানো ঘাট নয়। অসি ঘাটে স্নান করে কাপড় বদলে তীর্থযাত্রীরা উঠে আসে কাছেই অবস্থিত অসিসঙ্গমেশ্বর শিব মন্দিরে। ঘাটের উঁচু সিঁড়ির সারি ছাড়িয়ে উঠে গলিতে ঢুকলেই দেখা যায় এই মন্দির। মন্দিরের গায়ে সরকারী এক ফলক। তাতে লেখা যে ‘এই মন্দিরের চূড়া বেলে পাথরে তৈরি। মন্দিরের ভেতরে আছে সঙ্গমেশ্বর মহাদেব। তার অন্য নাম ‘ময়ূরেশ্বর’। এ ছাড়াও এই মন্দির প্রাঙ্গণে আছে বাণেশ্বর লিঙ্গ ও অমরেশ্বর লিঙ্গ।’ না জানলে মন্দিরের দরজার উপরে ‘সীতা-রাম’ লেখা দেখে অনেকে বিভ্রান্ত হন। শ্বেতপাথরের এক ফলকে ‘কাশীখণ্ড’ থেকে উদ্ধৃতিও খোদাই করা রয়েছে ছোট্ট এই মন্দিরের গায়ে। 

যে কথা বলতে গিয়ে এতখানি গৌরচন্দ্রিকা করে ফেললাম তা এই যে, সামান্য সংখ্যক ট্যুরিস্ট ছাড়া প্রায় সমস্তটাই ছাত্রছাত্রীদের দখলে এই অসি ঘাট। ঘাটে পৌঁছে দেখলাম ভিড়ের জোয়ার এসেছে। গঙ্গা আরতির সময় এখন, তাই এই সময় ভিড়টা সবচেয়ে বেশি হয়। সাইকেল নিয়ে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে গেলাম ভিড়ের সাথে, পাশে পেরিয়ে এলাম প্যালেস অন গ্যাঞ্জেস, হারমোনি বুক শপ। দেখলাম ঘাটে যাওয়ার গলির পাশে সেই বাঁদরওয়ালা তার বাঁদরটিকে কাঁধে নিয়ে বসে রয়েছে। বাঁদরটা একটা ছোট বাচ্চার মত, যেন আদর পাওয়ার জন্য লোলুপ দৃষ্টিতে পথচারীদের দিকে চেয়ে আছে। সাইকেলটা নির্দিষ্ট স্থানে তালা দিয়ে রেখে দিতে দিতেই বুঝলাম যে অসি ঘাটে সন্ধ্যার গঙ্গা আরতি শুরু হয়ে গেছে। ভিড় ঠেলে একটু এগিয়ে গেলাম। দূর থেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। আগে অনেকবার এসেছি এখানে। সন্ধ্যায় ও সকালে আরতি হয় নিয়মিত। কয়েক বছর আগেও ঘাটে ঘাটে আরতির এত জাঁকজমক ছিলনা যতটা না বর্তমানে দাঁড়িয়ে দেখা যায়। তবে সেই তুলনায় ইদানিংকালে গঙ্গা আরতি দেখার জন্য সবচেয়ে বেশি মানুষের ভিড় হয় দশাশ্বমেধ ঘাটে। দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়াও অনেক সময় মুশকিল হয়ে যায়। কথা বলে জানতে পারি, দশাশ্বমেধে আরতির সূত্রপাত ১৯৮৫ সাল নাগাদ কোন এক বিশেষ উৎসবে। এই প্রসঙ্গে কিশোরি রমন দুবে তথা বাবু মহারাজ এবং মুণ্ডন মহারাজের নাম উঠে আসে। তবে নিয়মিতভাবে আরতির সূচনা ১৯৯১ সালে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে বেনারসের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে এই আরতি। হরিদ্বারের আদলে শুরু হলেও বেনারসের গঙ্গা আরতি নিজেই নিজের তুলনা। অসি ঘাটের আরতি তো আরও নতুন। ২০১৪ সালে উত্তরপ্রদেশ সরকারের উদ্যোগে শুরু হয় সুবহ্‌-ই-বানারস। ভোরের আরতির সূত্রপাত তাদেরই আয়োজনে। এখন তো আরও অনেক ঘাটে ছোটবড় আকারে গঙ্গা আরতি করা হয়।

আরতির বহুধারা শব্দ একটু মলিন হতেই সুবহ্‌-ই-বানারসের মঞ্চের দিক থেকে ভেসে এল এক ছন্দললিত সুরের আবেশ, গমগমে ভিড়ের আভাস। পা যেন আমার আপনা থেকেই ঘুরে গেল সেদিকে। একটু এগিয়ে যেতেই দূরত্ব আর ভিড়ের আবরণ পাতলা হয়ে এল। দেখতে পেলাম মঞ্চের উপর কোন একজন কত্থক শিল্পী তার অনিন্দ্যসুন্দর ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে সবে তার নাচ শেষ করে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুহূর্তক্ষণ সেই ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকার পর দর্শকের দিকে নমষ্কার করে, একটু ঝুঁকে মঞ্চে প্রণাম করে সে মঞ্চ থেকে বেরিয়ে গেল।

যাঃ দেখা হলনা নাচটা। কে ছিল সে? সুগঠিত ঋজু লম্বা ছেলেটি। নিয়মিত তালিমের কঠোরতা তাকে করেছে কোমল, মঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসাও যেন এক শিল্প হতে পারে তার কাছে। 

মঞ্চের ঘোষক মঞ্চের একপাশ থেকে সবাইকে তালি দিয়ে উৎসাহিত করতে বললেন সেই শিল্পীকে। জানতে পারলাম তার নাম শিবম কুমার সিং। ঘোষক জানালেন এর পর রয়েছে বিশেষ কত্থক শিল্পীর পরিবেশনা। যাক, দেখতে পারব কিছু তাহলে। শিবমের নাচের পরপরই বেশ অনেক দর্শক চলে গিয়েছিল চেয়ার খালি করে। দেখলাম সামনের কোনার দিকে দু-চার খানা সিট খালি আছে। দেরি না করে বসে পড়লাম। ততক্ষণে ঘোষক দর্শকদের জানালেন এরপর মঞ্চে আসছেন বিশাল কৃষ্ণা। কে তিনি? আমি তখনও জানতাম না। আমার নিজের হিন্দুস্তানী ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর পরিচয় থাকার কারণেই হয়তো বিভিন্ন ভারতীয় সঙ্গীত বা নৃত্যের ধরণের সঙ্গে একটা আত্মিক যোগ অনুভব করি। তাই আমার আগ্রহের সীমা নেই। 

বেনারসে এসে বিভিন্ন ধরণের শিল্পকলা বা তার প্রদর্শন উপভোগের সুযোগ হয়েছে নানা সময়ে। কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার সুবাদে ক্যাম্পাসের ভেতরেই বিভিন্ন স্থানে চিত্রকলা প্রদর্শনী, ভাস্কর্য, নাটক প্রভৃতি বহুবার আয়োজিত হতে দেখেছি। আমাদের ইংরেজি বিভাগের ছেলেমেয়েরাই বিভিন্ন উপলক্ষ্যে বেশ কয়েকটি নাটকের উপস্থাপনা করেছি। তাছাড়া আমাদের ভারত কলা ভবন তো আছেই। সে এক অনন্য আশ্চর্য সংগ্রহ। এ তো শুধু ভেতরের কথা। ক্যাম্পাসের বাইরে এলেই সংকট মোচন মন্দিরের বার্ষিক ‘সংকট মোচন সঙ্গীত সমারোহ’, ঘাটে ঘাটে নিত্য দিনের নানা রঙ-বেরঙের উপস্থাপনা, কবীর চৌরার নাগরী নাটক মণ্ডলীর আয়োজন — এ যেন বলতে বসলে শেষ করে উঠতে পারিনা। বেনারসের মাহাত্ম্যকে তাই কেবল ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতার ঘেরাটোপে বেঁধে রাখা যায়না, নইলে পক্ষপাতিত্বের দুষ্টতায় দোষী হতে হয়।     

চটকা ভাঙল আমার ঠিক পাশের খালি চেয়ারটায় কেউ একজন এসে বসায়। আমি তাকে চিনি। একটু আগেই চিনেছি। শিবম, সেই কত্থক শিল্পী। এবার আমার মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত ভয় ও আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করলাম। কোন গুণী মানুষের খুব কাছে এসে পড়ে অসাবধানে তাকে লঙ্ঘন করে ফেলার ভয় অথচ তাকে কাছ থেকে দেখার, কথা বলার, ছুঁয়ে দেখার অদম্য টান — এ অনুভূতি বুঝি সকলের। যদিও এই ছেলেটির নৃত্যপ্রদর্শনের এক ঝলক ছাড়া তা উপভোগের সুযোগ আমার হয়নি সেদিন সন্ধ্যায়, তবুও শিল্পীর সত্ত্বাই আমার কাছে শ্রদ্ধার। এও হয়তো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গতে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার ফল। 

এবার যিনি মঞ্চে এলেন তাঁর বয়সও বিশেষ নয় — কত হবে? খুব করে পঁচিশ কি ছাব্বিশ। ঝাঁকড়া, কোঁকড়ানো চুল, গোলগাল মুখ, মাথায় ময়ূরের পালক, পায়ে কত্থক শিল্পীর ঘুঙুর, সংবিদিত, পরিশীলিত পদক্ষেপে ও দেহ-মুখ ভঙ্গিমায় এসে দাঁড়ালেন মঞ্চের মাঝে। শুরু করলেন গঙ্গার বন্দনা। আমার পাশের মানুষটির মধ্যে একটা উত্তেজনা অনুভব করলাম। আড়চোখে দেখলাম সে এক বাচ্চাছেলের মত সাগ্রহে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। হঠাৎ সে কিছু একটা বলে উঠল নিচুস্বরে, এবং আমার দিকে তাকাল তৎক্ষণাৎ! আমি যে আড়চোখে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে, সেটা সে বুঝে নিয়েছে? ঘুরে তাকালাম তার দিকে আমিও। কাছ থেকে দেখে বুঝলাম এর বয়স খুবই কম। উনিশ-কুড়িই হবে। হিন্দিতে উত্তর দিলাম, 

আমাকে বললে?

মুখ পুনরায় মঞ্চের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, চেনো এঁকে?

তার কণ্ঠে উত্তেজনা ভরপুর। তবুও দারুণ দক্ষতায় সেই উত্তেজনা চেপে রেখে নিচুস্বরে প্রশ্ন করছে আমায়। সেই উত্তেজনার আভাস যেন আমাকেও গঙ্গার শীতল বাতাসের ন্যায় ঝাপটা দিয়ে গেল। বললাম,

না, শুধু নাম জানি। বিশাল কৃষ্ণা।
বেনারস ঘরানার তারকা শিল্পী ইনি। সিতারা দেবীজীর নাতি! — ‘সিতারা দেবী’ নাম উচ্চারণ করার সময় সে তার ডান হাত দিয়ে কান ছুঁল আলতো করে। 

সত্যি?
তবে আর বলছি কী!

মুখে তার এক অদ্ভুত বিজয়ের গর্ব যেন। কপাল ছাড়িয়ে চোখের পাতা পর্যন্ত এসে পড়েছে তার কোঁকড়ানো লম্বা চুল, কানের পাশ দিয়ে বেয়ে নামছে ঘামের ধারা, মুখের মেক আপ এদিক ওদিক মুছে গিয়েছে, তবে সেসবের দিকে তার নজর নেই যেন, কারণ সে মনোযোগ দিয়ে মঞ্চের পরিবেশনা দেখতে ব্যস্ত, ছন্দের তালে তালে ঘাড় দুলে চলেছে, মৃদুস্বরে ছন্দের বোল আবৃত্তি করতে করতে হাত দিয়ে উরুর উপর তালের অলি-গলি সন্ধান করে চলেছে। কিন্তু সেই মুহুর্তে আমার একটু অস্বস্তির কারণও ঘটেছিল। সিতারা দেবীর নাম তো কোথাও শুনেছি বা পড়েছি, কিন্তু তার বেশি কিছুই আমি তখন মনে করতে পারলাম না। ফোনটা পকেটেই ছিল। সেটা বের করে গুগল করে আমার মনের প্রশ্নের উত্তর জেনে নিতে ইচ্ছে হল, কিন্তু মঞ্চের একদম সামনে বসে সেটা করা মানে মঞ্চে উপস্থিত শিল্পীকে অপমান করা। কাজেই চুপচাপ শিল্পীর অপূর্ব কত্থক উপস্থাপনা উপভোগ করতে লাগলাম।

(ক্রমশ)

পরবর্তী পর্ব

প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Author

Leave a Reply