সময় ভ্রমণে দার্জিলিঙ : পাহাড় ও সমতল। পর্ব ৫৭। লিখছেন সৌমিত্র ঘোষ

(গত পর্বের পর)

রাজা থিব ৪: রাজত্বের শেষ, নির্বাসনশুরু

থিব-র কথায় ফিরি। মাত্র ছ’ বছরের রাজত্বকালে থিব ব্রিটিশদের আরো চটাতে থাকলেন। ১৮৫২-র ইঙ্গ-বার্মা যুদ্ধের অন্যতম ফল হিসেবে পেগু এলাকার সেগুন বন ব্রিটিশদের হাতে যায়। সেসময় ভারতের বড়লাট লর্ড ডালহৌসি, তিনি স্বয়ং নির্দেশ দেন, সন্ধির শর্ত হিসেবে সেগুন বনের ব্যাপারটাকে রাখতেন হবে। ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তর জায়গায় সেগুন বন ছিলো, কিন্তু বর্মার সেগুন বা বার্মা টিক হচ্ছে সেরার সেরা, ডালহৌসির লোভ হবার পর্যাপ্ত কারণ ছিলো। লাট ডালহৌসি  এর কিছুদিন পরেই ডিক্রি জারি করে জানাবেন, যে বনে কাগজেকলমে ব্যক্তিমালিকানা নেই, তা রাজসম্পত্তি বা রাষ্ট্রসম্পত্তি বা এমিনেন্ট ডোমেইন, অন্য কারুর সেখানে কোনরকম অধিকার নেই। বলাই বাহুল্য, এক্ষেত্রে রাজা অর্থে ব্রিটিশ রাজ, রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক সায়েবরাষ্ট্র, বর্মা ও তার রাজা এলেবেলে আব্বুলিশ, গোটা বর্মাদেশটা সায়েবসাম্রাজ্যে ঢুকে যাবে যে কোনদিন। ১৮৫২-র যুদ্ধপরবর্তী সন্ধির অন্য শর্ত ছিলো, বর্মা সরকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বছরে এক লাখ টাকা করে খাজনা দেবে। সে টাকা ঠিকমতো আদায় হচ্ছিলো না, তদুপরি, রাজা থিব-র আমলে ব্রিটিশ কোম্পানিদের, বিশেষত সবচাইতে বড় কোম্পানি বার্মা-ব্রিটিশ ট্রেডিং কর্পোরেশনকে, ইচ্ছামতো কাঠচালান করতে নানাভাবে বাধা দেওয়া হতে থাকলো। থিব কাঠের ওপর ট্যাক্স বাড়িয়ে দিলেন, এমন কী রাজার সিপাইপেয়াদারা রীতিমতো জোর খাটিয়ে মান্দালের বন্দর থেকে কাঠ বেরুনো বন্ধ করে দিলো। এর পরের ঘটনা বহুচর্চিত। কী করে ব্রিটিশ সরকার মান্দালে সুদ্ধু অবশিষ্ট বর্মাদেশ গিলে ফেললো, ঠিক কী কী অজুহাত দেখিয়ে দশ হাজার ব্রিটিশ সৈন্য ঢুকে এলো কার্যত রাজা থিবর ঘরের আঙিনায়, তা নিয়ে সমসাময়িক ও পরবর্তী বহু ঐতিহাসিক ও লেখক লিখেছেন, এখানে সে গল্প অধিকন্তু ঠেকতে বাধ্য। মোদ্দা, সায়েবদের বর্মাদখল ছিলো পূর্বনির্ধারিত, আজ না হোক কাল সেটা ঘটতোই। থিব এখানে নিমিত্তমাত্র, নিয়তি তাঁকে নেহাতই ভুল সময়ে ভুল জায়গায় এনে ফেলেছিলো, সাদা বাংলায় যাকে বলে, রং পার্সন অ্যাট দি রং প্লেস। রাণি সুপাইলায়াত এবং মন্ত্রীদের কূপরামর্শ শুনে(বস্তুত, রাজ্যটা চালাতেনও রাণি) তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলেন, ফল যা হবার হলো, চোখের নিমেষে তাঁর কষ্টার্জিত রাজত্ব উবে গেলো বেমালুম, স্রেফ এক দিনের মধ্যে তাঁকে সপরিবার চালান করে দেওয়া হলো রেঙ্গুনে, সেখান থেকে মাদ্রাজ এবং অবশেষে রত্নগিরিতে।

ফলে, থিব-র বছর ছয়েকের রাজত্ব অকালে শেষ হচ্ছে। শিশুকন্যা ও রাণি সুপাইলায়াত সহ থিব চলে আসছেন অজানা অচেনা বিজন রত্নগিরিতে, যেখানে না যায় রেলপথ না অন্যকিছু, নির্বাসনের প্রথম কুড়ি বছর কাটাচ্ছেন রত্নগিরি মালভূমির প্রান্তে, ব্রিটিশ সেনানায়ক জেমস আউট্রামের(যাঁর নামে কলকাতার আউট্রাম ঘাট) প্রাক্তন বাসস্থান আউট্রাম হল লাগোয়া বেকার্স বাংলোয়। দুই বাংলোই যত্নে সাজানো, তবে রত্নগিরি জায়গাটা বা থিব-র থাকার জায়গা, কিছুই তাঁর পছন্দ হয়নি। তাতে ব্রিটিশদের কিছু যায় আসে না, থিবকে তাঁর জীবদ্দশায় এমন কী মৃত্যুর পরেও রত্নগিরির বাইরে বেরুতে দেওয়া হয়নি। তবে প্রচুর চিঠিচাপাটির পর, তাঁর জীবনের শেষ কয়েক বছর কাটছে ব্রিটিশদের তৈরি করে দেওয়া তথাকথিত প্রাসাদে। বর্মী-ব্রিটিশ ধরণ মিলিয়ে লালচে রঙের ল্যাটেরাইট পাথরে তৈরি, দোতলা ‘থিব প্রাসাদ’ এখনো আছে, রত্নগিরিতে বেড়াতে গেলে লোকে দেখতে যায়। নির্বাসনবাসের পুরো সময়টাই থিব ও তাঁর পরিবারকে ব্রিটিশদের দেওয়া ভাতার ওপর উপায়হীনভাবে নির্ভর করে থাকতে হয়েছে। বর্মার সঙ্গে রাজপরিবারের সমস্তরকম রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ করে রাখা হয়েছিলো। ব্রিটিশদের দেওয়া ভাতা এবং দেশ থেকে তাঁদের বিপুল বৈভবের যতটুকু(রাজার রাজকীয় খরচার অভ্যাসের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল, শেষমেশ গয়না ইত্যাদি বন্ধক রেখে টাকা তুলতে হতো)সঙ্গে করে আনতে পেরেছিলেন, এ ছাড়া তাঁদের অন্য কোনরকম আয় ছিলো না।

থিব মারা যাবার পর রত্নগিরিতেই তাঁকে দাহ করা হয়, চিতাভস্মও পুঁতে রাখা হয় ওখানেই। রাণি সুপাইলায়াত তখনো জীবিত, তিনি চাইছিলেন থিব-র দেহ বর্মায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে, তাঁর ইচ্ছা ছিলো, উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে সেখানেই রাজাকে সমাহিত করা হোক। জীবিত বা মৃত, কোন অবস্থাতেই থিবকে দেশে ফেরাতে ব্রিটিশ সরকার রাজি ছিলো না, সুপাইলায়াতের কথা গ্রাহ্য করা হয়নি। থিব ছাড়াও তাঁর পরিবারের অনেকেই রত্নগিরিতে মাটি নেন। ব্রিটিশরা বর্মা ছেড়ে যাবার অনেক আগেই সুপাইলায়াত সহ রাজপরিবারের বেশির ভাগ লোকজন দেশে ফেরেন। যাঁরা ফেরেন নি, তন্মধ্যে অন্যতম, থিব ও সুপাইয়ালাতের দ্বিতীয় কন্যা, রাজকুমারী মায়াত ফায়া লাত। তিনি এবং তাঁর দিদি, দুজনেই তাঁদের বাবামায়ের অমতে, প্রথা ভেঙে, রাজপরিবারের বাইরে বিয়ে করেন। মায়াত ফায়া লাতের স্বামী, কিন মাউং লাত বা লাথাকিনের তিন কূলে কারুর রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো না। এই মানুষটিই পরে কালিম্পং-এ গিয়ে বাসা নেন, এবং বর্মারাজা নামে পরিচিত হন।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply