কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২৫। শোভন সরকার

গত পর্বে: কাশীর এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘বুধোয়া মঙ্গল’। সে এক বর্ণময় ইতিহাস।

বুধোয়া মঙ্গল উৎসব তিন দিন ধরে চলত। তিনটি দিনের তিন আলাদা আলাদা নামও ছিল — মঙ্গল, দঙ্গল ও ঝিলঙ্গা। প্রথম দিনে মেলার বিস্তার প্রধানত দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে সিন্ধিয়া ঘাটের মধ্যে থাকত। প্রতিদিন ধীরে ধীরে সরতে সরতে তৃতীয় দিনের শেষে শিল্পীসহ সকল নৌকাবহর ও দর্শকেরা পৌঁছে যেত রামনগরে। ঊনবিংশ শতাব্দীর ষষ্ঠ দশকে কাশীরাজের উৎসাহে শুরু হয় ‘দঙ্গল উৎসব’। বুধোয়া মঙ্গল উৎসব শেষ হতেই সমস্ত নৌবহর যখন আরও দক্ষিণে সরে এসে রামনগরে পৌঁছাত, সেখানে বুধোয়া মঙ্গলের অনুকরণে এই উৎসব রামনগর কেল্লার বিপরীতে অসি ঘাটের জগন্নাথ মন্দিরে অনুষ্ঠিত হত। 

কুবেরনাথ সুকুলের লেখায় তিনদিন ধরে চলা বুধোয়া মঙ্গল উৎসবের সমাপ্তি কীভাবে হয় তার এক নাটকীয় বর্ণনা পাই — ‘শেষ দিনে সন্ধ্যার কিছু পূর্বে মহারাজা তাঁর সুসজ্জিত নৌকায় এসে উপস্থিত হন। মেলায় এদিক ওদিক ঘুরে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর পর তিনি হাতের ইশারায় মেলার সকলকে তাঁকে অনুসরণ করে রামনগরে যেতে আহ্বান করেন। রাজার ডাকে সাড়া দিয়ে সমগ্র নৌবহর মেলার শেষ রাতে গঙ্গার রামনগর ঘাটে এসে উপস্থিত হয়। হাজার হাজার মানুষ সেই বিশাল সমাবেশকে স্বাগত জানায়।’

বুধোয়া মঙ্গল ও অনুরূপ উৎসব ছিল মূলতঃ কাশী ও আশেপাশের অঞ্চলের ‘রইস’ তথা সম্ভ্রান্তবংশীয় ব্যক্তি, রাজা-মহারাজা, সামন্তপ্রভু, এবং বড় বড় পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র উৎসব। এদের বিলাসপ্রিয়তা এবং আনন্দোৎসবের পেছনে যথেচ্ছ খরচ করবার ক্ষমতা ও উৎসাহই ছিল এর মূল চালিকাশক্তি। 

সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে ব্রিটিশ রাজ ধীরে ধীরে দেশীয় রাজাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে থাকে। বহু ক্ষেত্রেই এই সমস্ত প্রকৃত ক্ষমতাহীন রাজা-বাদশাহদের কাশীতে এসে বসবাস করার জন্য উৎসাহিত করা হত। কেন? কারণ কাশীর মত শহরে এসে এই সমস্ত রাজারা ধর্মীয়-সামাজিক পরিমণ্ডলে নিজেদের প্রভাব ও মর্যাদা রক্ষার এক স্থান খুঁজে পেতেন — এ যেন ছোট শিশুকে খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখার মতই ব্যাপার। তবে এটা সত্যি যে কাশীতে স্থানান্তরিত হবার পর এই সমস্ত উঁচু সমাজের মানুষেরা স্থানীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে নিজেদের জায়গা বানিয়ে নেন। এর সুফল অনেকাংশেই লাভ করেছিল বুধোয়া মঙ্গলের মত উৎসব। 

সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। যে সমস্ত সামন্ত প্রভুরা এই মেলা বা উৎসবের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের দৈন্য ফুটিয়ে তুলতে থাকে। ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের পথ বন্ধ হয়ে গেলে বুধোয়া মঙ্গল উৎসব সাদা হাতি পুষে রাখার মতই ব্যাপার হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মেলায় রাজার নৌকা আসা বন্ধ হয়ে গেল। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মেলার উজ্জ্বল রোশনাই ফিকে হয়ে এল। 

১৮৮৪ সালে সর্বপ্রথম বুধোয়া মঙ্গলের ইতিহাসে তার ছন্দ কাটল। কাশীর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের অর্থপুষ্ট হলেও এই উৎসবের উপর সাধারণ মানুষদের এক বিশেষ প্রভাব ছিল — এ কথা অস্বীকার করা যায় না। সেই বছর নানা কারণে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি হয়। স্থানীয় বুনকর বা তাঁতিরা আর্থিক দিক থেকে প্রবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা মহাজনদের কাছে অনুরোধ করে যেন এই পরিস্থিতিতে বুধোয়া মঙ্গলের পেছনে অযথা খরচ করে অপচয় না করা হয়। রাজাও এ বছর অনুপস্থিত থাকেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, কাশী নরেশ এই উৎসবের প্রাণভোমরা, কাজেই সে বছর তাঁর অনুপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গেই এই উৎসবের গুঞ্জন স্তিমিত হতে শুরু করল। 

পরের বছর থেকে মেলা আবার চালু হলেও কয়েক দশকের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির আবির্ভাব হয়। জাতীয়তাবাদ আন্দোলন তখন তুঙ্গে। মেলার পৃষ্ঠপোষকেরা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন। তাছাড়া দেশের এমন সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে বুধোয়া মঙ্গলের মত বিলাসিতাকে অবাঞ্ছিত বলে তীব্র সমালোচনা করা হতে লাগল নানা মহল থেকে। পরবর্তী সময়ে এই মেলাকে ঘিরে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠতে শুরু করে — যেমন মেলার ভিড়ের অজুহাতে যথেচ্ছ মদ্যপান, ‘লোফার’-দের উৎপাত, গুণ্ডামির বাড়বাড়ন্ত ইত্যাদি। ইংরেজরাও প্রকাশ্যে তাওয়াইফদের নাচ-গান ‘কুরুচিকর’ বলে দাগিয়ে দিতে শুরু করে। এসব ছাড়াও নানা কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে মেলার পেছনে টাকা-পয়সা ঢালা বন্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই, এক সময় বুধোয়া মঙ্গলের ধুঁকতে থাকা সুর স্তব্ধ হয়ে পড়ে চিরতরে। 

কাশীবাসী আমোদপ্রিয় — ‘মৌজ-মস্তি’ তাদের রক্তে মিশে। তাদের স্মৃতিতে থেকে যাওয়া এক সময়ের গৌরবময় বুধোয়া মঙ্গল উৎসবকে তারা চাইল ফিরে পেতে। এগিয়ে এলেন কাশীর বিখ্যাত সব মানুষজন — তবলাবাদক কিষেণ মহারাজ, সানাই-বাদক বিসমিল্লাহ্‌ খান, এবং সেতার-বাদক রবি শংকর। পূর্বের সময়ের রাজা-রইসদের মত অর্থের জোগান তাঁদের কাছে ছিল না, কিন্তু উৎসাহ কমেনি। তাঁদের অদম্য প্রচেষ্টায় এবং কাশীর পৌরসভার সহায়তায় ১৯৮২ সালে গঙ্গার উপর এক বজরার উপর সামান্য কিছু নিমন্ত্রিত মানুষদের উপস্থিতিতে পুরোনো স্মৃতিকে আবার বাস্তব রূপ দেওয়া গেল। পরবর্তীতে, ১৯৯৬ সাল থেকে বুধোয়া মঙ্গল এখন তার পুরোনো খোলনলচে বদলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। সানাই, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, লোক সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা-পাঠ, রক-ব্যাণ্ড, হাস্য-রসের অনুষ্ঠান এর অঙ্গ হয়ে গিয়েছে। মূলতঃ উত্তর প্রদেশ সরকারের সংস্কৃতি ও পর্যটন বিভাগই এর ব্যয়ভার বহন করে থাকে। এক সময় রাজেন্দ্রপ্রসাদ ঘাটে হলেও এখন তা সরে এসেছে অসি ঘাটে। 

 

শিবমের কাছে বুধোয়া মঙ্গলের এই সব গল্প শুনতে শুনতে খেয়ালই করিনি সূর্য বেশ অনেকটা উপরে উঠে গেছে। এবার গায়ে সূর্যের তাপ অনুভব করতে শুরু করেছি। কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখে চমকে উঠলাম। এবার উঠতে হবে। আমরা দু’জনেই যেন কোনো ঘোরের মধ্যে ছিলাম সেই সকাল থেকে। বেনারসের বৈরাগ্য পরোক্ষে প্রভাব ফেললেও আমাদের দু’জনেরই পিছুটান রয়েছে। অতএব, আমরা আনন্দময়ী ঘাট ছেড়ে আবার অসিঘাটের দিকে হাঁটা দিলাম। 

খেয়াল হল যে বেশ খিদেও পেয়েছে। হোস্টেলে গিয়ে দুপুরের খাবার পেতে দেরি আছে। ঘাট থেকে বেরিয়ে অসি রোড ধরে হেঁটে আসতে আসতে চোখে পড়ে কত রকমের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল — দু’পাশে চোখে পড়ে ‘দাদা কি চায়’, ‘কারকি রেস্তোরাঁ’, ‘বানারস হাভেলি’ ইত্যাদি ছাড়াও কত অস্থায়ী ঠেলা। বিক্রি হচ্ছে ফুচকা, চাট, আইসক্রিম, ফলের রস, শরবত। প্রচুর ভিড়, কোলাহল, জীবনের ব্যস্ততা এখানে প্রায় সবসময়ের চালচিত্র। 

বেনারসে থাকার সময় এই রাস্তা দিয়ে বহুবার যাতায়াত করেছি। ভিড় ঠেলে এইসব দোকান-স্টল ছাড়াও প্রতিবারেই আমার নজর আটকে যেত মূর্তির দোকানগুলোতে। খুব ছোট্ট থেকে শুরু করে কোমর বা বুক সমান উঁচু আকারের দুর্দান্ত সব মূর্তি — পিতলের, পাথরের ভীষণ সুন্দর সুন্দর ভাস্কর্য। কিনতে ইচ্ছে হলেও আমার মত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পক্ষে সেগুলোতে হাত দেওয়া মুশকিল। এদের খরিদ্দার প্রধানত বিদেশি পর্যটক। কাজেই ধীর পায়ে চলে দূর থেকে সেইসব শিল্পের কেবল দর্শন করেই মন ভরাতাম। এবারেও তাই হল, কিন্তু দাঁড়ালাম না।

সামান্য এগিয়ে আমরা দাঁড়ালাম একটা খাবার দোকানে। কচুরি-জিলিপি পাওয়া যাচ্ছে। বেনারসের মানুষের সঙ্গে কচুরি-জিলিপির আলাদাই সম্পর্ক। শালপাতার বাটিতে গরম গরম কচুরি আর আলুর তরকারি — আহা, রসনা তৃপ্তির এমন সাদাসিধে চেহারার খাবারও খিদে পেটে সঞ্জীবনী মন্ত্রের কাজ করে। 

খাবার খেয়েই বোধ হয় তৎক্ষণাৎ আমার মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠল। মনে পড়ল, শিবমকে আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। এ কথা সে কথায় সেটা চাপা পড়ে গেছে। 

‘শিবম?’

‘কী হল, কচুরি ভাল লাগছে না?’

‘সেটা নয়, তোমার কাছে তো আমি বেনারসের সঙ্গীত ঘরানার কথা জানতে চেয়েছিলাম। সেটা তো শোনার সুযোগই হল না। কত বেলা হয়ে গেল আজকে।’

‘ও হ্যাঁ, তাইতো। কিন্তু কী জানো তো, আমি নই, তার জন্য আমি তোমাকে অন্য এক জনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। আমার চেয়ে সে আরও ভালোভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারবে।’ 

‘কে?’

‘আমাদের এক পিএইচডি স্কলার। কত্থক নিয়েই ওর কাজ। দারুণ একজন মানুষ, কথা বলে ভালো লাগবে, দেখো। তবে হ্যাঁ, আমরা আবার কোনো দিন ঘাটে আসব। হাতে সময় রেখো।’ 

‘নিশ্চয়ই, অপেক্ষা করব।’

কোনো কোনো অপেক্ষার শেষ হয় না। সত্যি বলতে গেলে সেদিনের পর শিবমের সঙ্গে আর কখনোই হাতে সময় নিয়ে ঘাটে বসা হয়নি। ফোনে মেসেজে যোগাযোগ হয়ে এসেছে, মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখাও হয়েছে — এই পর্যন্তই। ধীরে ধীরে জীবনের ব্যস্ততা আমাদের দু’জনকেই আঁকড়ে ধরতে শুরু করল। এক সময় আমি বিএইচইউ-এর পাঠ চুকিয়ে বেনারস ছেড়ে চলে গেলাম। সেও চলে গেল নিজের পথে। বেনারসের বাইরে যোগাযোগ আজও অক্ষুণ্ন, কিন্তু ঘাট আর আমাদের আড্ডায় যোগ দিল না কখনও। আর সেই যে স্কলার যার সঙ্গে শিবম আমার পরিচয় করিয়ে দেবে বলল? শীঘ্রই তার কথায় আসব, অন্য প্রসঙ্গে।

(ক্রমশ)

পরবর্তী পর্ব

প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Author

Leave a Reply