কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ১৯। শোভন সরকার

ত পর্বে: লোলার্ক ষষ্ঠীতে কত শত মানুষ আসে লোলার্ক কুণ্ডে স্নান করে সন্তান প্রাপ্তির জন্য। কিন্তু কোথায় গেল মেলায় সেই কাজরী গাওয়ার চল? গেলাম তুলসী ঘাটের ধ্রুপদ মেলায়।

শিবম আর আমি ততক্ষণে ভদৈনী ঘাট ও জানকী ঘাট পেরিয়ে আনন্দময়ী ঘাটে গিয়ে বসেছি, একেবারে গঙ্গার ধারে। 

কী সুন্দর, তাইনা? 

আমি কখন নিজের মনে বলে উঠলাম পূর্ব আকাশে তাকিয়ে থাকতে থাকতে। সামনে গঙ্গার জলে যেন ধীরে ধীরে জবার রঙ ফিকে হয়ে সোনার রঙ মিশে যাচ্ছে, তার উপর দিয়ে বেনারসের সৌন্দর্যে মশগুল যাত্রীদের নিয়ে ধীর লয়ে ভেসে যাচ্ছে নৌকাগুলো। দূরে কোথাও থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে ঘন্টা-শঙ্খের শব্দ। ওদিকে নানা বয়সের লোক গঙ্গায় ডুব দিয়ে সূর্যের তর্পণ করতে শুরু করেছে। এই দৃশ্য কেবল বেনারসেই দেখা যায়। মনে করুন, আপনি স্নান করছেন সুশীতল গঙ্গায়, সামনে ভোরের উদীয়মান সূর্য, পেছনে পড়ে রয়েছে সমস্ত সাংসারিক পিছুটান আর কোলাহল, সামনে টলমল স্বর্ণিম গঙ্গার বিস্তৃত বক্ষ, ওপারে ঝাপসা বৈরাগের বালুকাবেলা — আপনি আর আপনার একান্ত অনুভূতির মাঝে আর কেউ নেই, কিছু নেই। এই অনুভূতিও কেবল বেনারসের একান্ত। চোখে পড়ে কোথাও সিঁড়ির এক ধাপে বসে কোন এক বিদেশি বেনারসি আধ্যাত্মিকতায় মুগ্ধ হয়ে আপন মনে ধ্যান করছেন, তাঁরই সামনের এক ধাপে বসে রয়েছে এক কুকুর। আবার অন্য এক পাশে একজন বয়স্ক লোক পান চিবুতে চিবুতে চায়ের জোগাড় করছেন, একরাশ ধোঁয়ার মাঝে দাঁড়িয়ে সারাদিনের অসংখ্য চা-পিপাসুর ফরমায়েশ পূরণের আনন্দ তার চোখে মুখে ঝলমল করছে। 

এসব দেখতে দেখতে কোন ভাবের দুনিয়ায় হারিয়ে গেছিলাম। সকালের রোদের উজ্জ্বলতা তখন অনেকটা বেড়ে গেছে, সূর্য গঙ্গার ওপাড় থেকে এবার উঁকি দিচ্ছে। গঙ্গার জলে যেন সোনা তরল হয়ে মিশে গিয়েছে। হঠাৎ আট-দশ বছরের এক বাচ্চা ছেলে এক হাতে অ্যালুমিনিয়ামের গরম কেটলি আর অন্য হাতে ছোট বালতি নিয়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে একরাশ হাসি মুখে মেখে বলল, ‘ভাইয়া, মসালা চায় হ্যায়।’ কেটলিতে গরম জল,আর সঙ্গের বালতিতে চা বানানোর যাবতীয় উপকরণ ও চায়ের কাপ ঠাসা।

সকালের নরম রোদের দিকে পিঠ করে ছেলেটি আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। বড্ড মায়া ছেলেটির মুখে। আর এতটুকু একটা ছেলে সামান্য কিছু পয়সা উপার্জনের জন্য বাবা-মায়ের আদেশে ভোরবেলায় চা বিক্রি করতে বেরিয়েছে। হয়তো সে ছোট আর তার মুখে নিষ্পাপ সারল্য মাখা আছে বলেই বাবা-মা পাঠিয়েছে, তার প্রতি করুণার বশেই যেন লোকে চা কিনে নেয়। সে যাই হোক, চা খেতে আপত্তি নেই। আমরা নিলাম দু’কাপ লেবু দেওয়া মশলা চা। পয়সা নিয়ে ছেলেটি হাসি মুখে চলে গেল অন্য খদ্দেরের সন্ধানে। 

শিবমের সাথে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার দেখা হচ্ছে, প্রথমবার অসি ঘাটে সেই তার নাচের সন্ধ্যায়। আজকে মেক আপ ছাড়া বেশ আলাদা দেখাচ্ছে, স্নিগ্ধ। ওর কোঁকড়ানো চুলগুলো বারবার ঘাটের হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে। 

‘কত্থক শেখার ইচ্ছে কেন হল?’ আমি চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম শিবমকে। 

শিবম হেসে ফেলল। তারপর হঠাৎ গুনগুন করে উঠল, ‘চলতে চলতে, ইয়ুঁহি কোই মিল গয়া থা…’

‘প্রেমে পড়েছিলে?’ 

শিবম আবার হেসে উঠল, কিন্তু পরিষ্কার করে কিছু বলল না।  আমি বললাম, ‘তাহলে?’

‘চলতে চলতে’ গানের দৃশ্যে মীনা কুমারী। ‘পাকীজা, ১৯৭২’

‘মীনা কুমারী। ছোট বেলায় টিভিতে মীনার নাচ, অভিনয়, চেহারা দেখে পাগল হয়ে গেছিলাম। কেউ এক সাথে এত গুণী কী করে হতে পারে!’

‘পাকীজা?’

‘না, আবার হ্যাঁ-ও বলতে পারো।’

‘আরে, এত কেন রহস্য বাড়াচ্ছ! খুলে বল না।’

শিবম চা শেষ করে ফেলেছে। উঠে গিয়ে পাশেই একটা ডাস্টবিনে কাপটা ফেলে এসে বসল। 

‘আসলে ‘পাকীজা’ সিনেমাটায় মীনার যে নাচগুলো আমরা দেখি, তা ঠিক কত্থক নয়, ‘মুজরা’। লখনৌ, বেনারসের তাওয়াইফরা এ ব্যাপারে খুবই দক্ষ ছিলেন। হ্যাঁ, কত্থকের প্রভাব অবশ্যই রয়েছে এই সিনেমায়। সেই সময়ের লচ্ছু মহারাজ, গৌরী শঙ্করের মত বড় বড় কত্থকের গুরু এতে নাচের কোরিওগ্রাফি করেন। তবে আমি ছোট বেলায় অত শত বুঝতাম না, ন্যাচারালি। মীনার একটা প্রভাব অবচেতন মনে থেকেই যায়। অনেক পরে, একবার এক বন্ধুর জোরাজুরিতে জামশেদপুরেই এক শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীর একক অনুষ্ঠান দেখতে যাই। আমার অন্যায় যে তাঁর নাম মনে রাখিনি, তবে এটুকু মনে পড়ে যে তিনি এই বেনারস থেকেই গিয়েছিলেন। কত্থক শিল্পী, এবং পুরুষ।’

‘তিনি পুরুষ বলেই কি তুমিও কত্থক নিয়ে আগ্রহী হলে?’ 

‘এক রকম সেটাই। তাঁকে না দেখলে হয়তো সাহস হত না।’

‘কেন? বন্ধু-বান্ধবরা হাসি-ঠাট্টা করে তোমাকে?’

‘একদম না, বরং তারা আমার নাচ নিয়ে বেশ কুল ছিল। কিন্তু প্রবল বাধা পাই বাড়ি থেকে।’

‘এই জন্যই কি বেনারসে আসা?’

‘বললে যে খুব একটা ভুল হবে তা নয়। আবার আমার মনে হয়, মনের অবচেতনে থেকে যাওয়া সেই পুরুষ কত্থক শিল্পী যেহেতু বেনারস থেকে ছিলেন, তাই এখানে নাচ শিখতে আসার একটা ইচ্ছে তীব্র হয়ে ওঠে। তাছাড়া কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর নৃত্যকলা বিভাগের নামডাক তো আছেই।’ 

‘ঠিকই বলেছ। এখানে ভর্তি হওয়ার আগে আমিও এর নামডাক শুনেই বেশি আগ্রহী হয়েছিলাম।’

‘তুমি এখানে কেন এলে? কোলকাতাতেই তো কত ভাল নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় আছে।’ 

‘আছে হয়তো, তবে অন্ধ রাজনীতির পাল্লায় পড়ে সেসব জায়গায় যে কাজ প্রাধান্য পাওয়া উচিত, তা তালিকার একেবারে তলানিতে এসে পড়ে থাকে।’ 

‘কোথায় নেই সেটা, বল?’ 

‘সব জায়গাতেই আছে, তবে ওখানকার মত শিক্ষার ক্ষেত্রে উৎকট রাজনীতির সরাসরি প্রভাব এখানে এসে অন্ততঃ এখনও দেখিনি।’

‘তুমি বি এইচ ইয়ু-তেই কেন এলে?’ 

‘চাকদহ কলেজে গ্র্যাজুয়েশন করার সময় প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনি — আমাদের প্রফেসর মধুমিতা ম্যাম কোন একবার কথায় কথায় কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ক্লাসে উল্লেখ করেন। উৎসাহিত হয়ে তারপরই আমি এই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি। মনে মনে তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইরের জগৎটা দেখার অদম্য ইচ্ছে চাগাড় দিয়ে উঠেছিল। তারপর একটা সময় এসে সেটা একরকম জেদে পরিণত হয় — বিশেষ করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। তারপরই মাস্টার্স-এ চান্স পেয়ে বেরিয়ে এলাম চেনা গণ্ডী ছেড়ে, বেনারসের টানে। তারপর দেখ, আজ এই আনন্দময়ী ঘাটে বসে বেনারসের গঙ্গার উপর সূর্যের রূপ উপভোগ করতে করতে লেবু চা খাচ্ছি — নিজেকে সত্যি ভাগ্যবান বলেই মনে হয়।’ 

কথাগুলো অঞ্জলী হয়ে ঝরে পড়ল পায়ের সামনে নদীর উচ্ছ্বল জলে, তারপর ঢেউয়ের মৃদু তালে দুলতে দুলতে সূর্যের আলোর মাঝে মিশে গেল। মনটা বড্ড হালকা লাগতে শুরু করল। মনে হল, এই বিশ্বে এমন তৃপ্তি বোধ হয় আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। বোধ করি, এরই টানে কত সহস্র বছর ধরে জগতের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসছে বেনারসে, থেকে যাচ্ছে, কিছু একটা খুঁজে চলেছে, কেউ তা পাচ্ছে আবার কেউ পাচ্ছে না। তারপর একদিন সময় হলে হারিয়ে যাচ্ছে গঙ্গার ঢেউয়ে দুলতে থাকা সেই আলোর রোশনাইতে।  

শিবম পাশে বসে পায়ে তাল ঠুকছে আর গুনগুন করে আবার গাইতে শুরু করেছে পাকীজার সেই গান — ‘সারে রাহ চলতে চলতে, ওয়হি থমকে রেহ গই হ্যায়…।’ লতা মঙ্গেশকর কী অসাধারণ দরদ ভরা কণ্ঠে এক তাওয়াইফের বিষণ্নতা তুলে এনেছেন এই গানে। মীনা কুমারীও সমান দক্ষতায় তাঁর অভিনয় দিয়ে সাহিবজানের চরিত্রে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু কারা এই তাওয়াইফ? জিজ্ঞেস করলাম শিবমকেই। 

‘শিবম, তুমি তাওয়াইফদের কথা উল্লেখ করলে একটু আগে। এর মানে… উম… কীভাবে বলি… প্রস্টিটিউট — বেশ্যা, তাইনা?’

‘এই মন্তব্যে আমার কিছু আপত্তি আছে। সত্যি বলতে গেলে, বেশির ভাগ মানুষ তোমার মতই তাওয়াইফদের ‘বেশ্যা’ বলে অত্যন্ত সরলীকরণ করে। কিন্তু প্রকৃত বিষয়টা বিস্তারিত বললে তবেই ধারণাটা পরিষ্কার হয়।’

‘কী রকম, বল বল। আমাদের হাতে এখনও অনেকটা সময় রয়েছে।’

‘আমিও যে বিষয়টা নিয়ে সমস্ত কিছু জানি, তা নয়।’ 

‘যেটা জানো সেটাই আমার কাছে অনেক, তুমি বল এত ভূমিকা না করে।’

(ক্রমশ)

 

প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Author

Leave a Reply