কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ১৬। শোভন সরকার
গত পর্বে: রামনগর ও মগহরের কথার পর তুলসী ঘাটের কুস্তি ও আখড়া দেখলাম। সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে তুলসীদাসের লড়াইয়ের ও হাল আমলের পাণ্ডুলিপি চুরির ঘটনা জানলাম।
মুঘল আমল চলছে তখন। কাশীর ব্রাহ্মণ সমাজ একেই সর্বদা তটস্থ হয়ে রয়েছে যাতে তাদের সযত্নে রক্ষিত ধর্মে কোন রকম ম্লেচ্ছের ছোঁয়া না লাগে, তার উপর কোথাকার কোন এক বৈষ্ণব বামুন এসে জাত-ধর্মের সমস্ত নিয়ম কানুন গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে। তাদের ধর্ম যখন সঙ্কটে, কাশীর ব্রাহ্মণ সমাজ তার রক্ষণাবেক্ষণে অত্যন্ত কাতর ও তৎপর হল। তুলসীদাস অসি ঘাটের কাছেই থাকেন। পথে-ঘাটে, চলার পথে তাঁকে দেখলেই তাঁর দিকে পাথর ছোঁড়া শুরু হল, বর্ষিত হল হুমকি, পরুষবাক্য ও গঞ্জনা। তুলসীদাসের বাসস্থানের কাছের সেই পথ দিয়ে তাঁর চলতে ভয় হতে লাগল। তিনি বললেন যে সেই ঘাট তাঁর কাছে ‘ভয় দেয়ানি’ — এই ঘাটকেই আমরা আজকাল ‘ভদৈনি ঘাট’ বলে জানি। পণ্ডিতদের আরও অভিযোগ, অবধি ভাষায় কেন লেখা হবে রামায়ণের মত পবিত্র গ্রন্থ? মুড়ি-মুড়কি এক হলে তো হিন্দু ধর্মে সংকট এসে উপস্থিত হবে।
কথিত আছে, এই অপরাধে তুলসীদাসকে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর রচিত পাণ্ডুলিপি ফেলে দেওয়া হয় গঙ্গায়। তবে পরের দিকে এরূপ অবস্থার পরিবর্তন হয় মধুসূদন সরস্বতীর সাহায্যে। তিনি তৎকালীন কাশীর এক অত্যন্ত স্বনামধন্য ও মান্য সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। তিনি উদার কণ্ঠে তুলসীদাসের লেখনীর অত্যন্ত প্রশংসা করেন, বলেন, ‘সোনার পাত্র বা মাটির পাত্র, মধু যেখানেই রাখা হোক না কেন, তা মধুই থাকে।’ এর পরেই কাশীর অন্যান্য পণ্ডিতরা তাঁর কাজকে ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করে।
তবে এই নিয়ে ভাবতে বসলে আমার বেশ অবাক লাগে, যে শহরের এক দল লোক যে পাণ্ডুলিপি এক সময় নষ্ট করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল, কয়েকশ’ বছর পর সেই শহরেরই মানুষ লোভের পাকে পড়ে সেই পাণ্ডুলিপিই চুরি করল।
কিন্তু কালচক্রে ঠিক কীভাবে এই রচনা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? তুলসীদাসের সময়ে সামাজিক অবক্ষয়, প্লেগের প্রাদুর্ভাব, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় টালমাটাল অবস্থা সহ নানা কারণে সাধারণ মানুষ জর্জরিত হয়ে পড়ে। ঠিক সেই অবস্থায় তুলসীদাসের সহজবোধ্য ভক্তিমার্গ তাদের বেঁচে থাকার রসদ যোগায়। ঐতিহাসিকতার দিক থেকে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ, সাহিত্যগুণে অত্যন্ত উঁচুদরের এই ‘রামচরিতমানস’ যতটা প্রভাব ভারতীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের উপর বিস্তার করেছে, তা এ দেশে বিরল। রামায়ণ, রাম বা হনুমানের লোকপ্রিয়তার যে সূর্য আমরা এখন মধ্যগগণে দেখি, তার ভোর হয়েছিল তুলসীদাস এবং তাঁর ‘রামচরিতমানস’-এর আহ্বানেই। সেই গ্রন্থ চুরি হয়ে যাওয়া অকল্পনীয় ক্ষতি তো বটেই। কিন্তু আনন্দের বিষয় এই যে, পুলিশ এই চুরির প্রায় সাত মাস পর গ্রন্থটির সঙ্গে সঙ্গে তুলসীদাসের ব্যবহৃত অন্যান্য সমস্ত চুরি যাওয়া সামগ্রী উদ্ধার করে। এখন এই অমূল্য সম্পদগুলি বিশেষ ধরণের সুরক্ষাব্যবস্থা সম্বলিত সিন্দুকে সংরক্ষিত আছে। সংকটমোচন মন্দির কর্তৃপক্ষই এর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে কেবলমাত্র তুলসীদাসের জন্ম তিথিতে এই সামগ্রীগুলো জনসমক্ষে আনা হয়।
চলতে চলতে আপন মনে ইতিহাসের কোন গলিঘুঁজিতে মগ্ন হয়ে ছিলাম। তারই সম্মোহনের অতল থেকে বর্তমানে উঠে এলাম একটা প্রশ্ন শুনে, ‘তুমি কখনও নাগনাথৈয়া দেখেছ?’
শিবম হঠাৎ জিজ্ঞেস করল। আমরা তখন হেঁটে হেঁটে তুলসীঘাট পেরোচ্ছি। ঘাটে আরতি চলছে। বাতাসে মিশে রয়েছে গঙ্গার মেটে গন্ধ, ধূনোর সুবাস, গাঁদা ফুলের ঘ্রাণ। ওদিকে ভোরের আকাশে সূর্যের লালিমা যখন গাঢ় নীলের সাথে মিশে গিয়ে কোন অমোঘ চিত্রশিল্পীর সত্ত্বাকে উজাগর করে দিচ্ছে, তখন কোথা থেকে নদীর জলে ভেসে আসে বেনারসের মাঝি ভূমি নিষাদরাজের ঠুমরি, উদাস করে দেয় মনকে। কে ভূমি নিষাদরাজ? ওই যে বললাম, মাঝি। নিষাদরাজ ঘাটের কাছে নাকি তার বাস, গঙ্গা তার গানের গুরু, তিনিই নদীর জলে ভেসে বেড়ান, কণ্ঠে জাগে গান। ভোরের ভৈরব বা বেলার চৈতি, বছরের পর বছর ধরে গঙ্গার আশ্রয়ে থেকে বেনারসের স্থানমাহাত্ম্য এইসব মানুষদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পূর্বদিকের আকাশে লাগতে শুরু করেছে গোলাপের আভা। আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে পায়রার দল। মনে পড়ে যায় সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’র সেই কাব্যময় শোকদৃশ্য – শয্যাশায়ী হরিহর তার মুখে গঙ্গাজলের স্পর্শ পাওয়া পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, এবং সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্য বদলে যায় সেই শ’য়ে শ’য়ে পাখির ঝাঁকে, মুক্ত আকাশে আত্মার বিমুক্তি। ঠিক এই দৃশ্যের অনুসরণ করে আমিও একবার পায়রার ঝাঁকের ছবি তুলতে গিয়েছিলাম চেত সিং ঘাটে। ভাবলে অবাক লাগে, সেই কতকাল আগে তিনি বেনারসের বুকে দাঁড়িয়ে আমাদের যে সব ছবি তুলে দেখিয়েছেন, তার মৌলিক পরিবর্তন বিশেষ হয়েছে বলে মনে হয়না।
‘নাগনাথৈয়া? না তো। নামও শুনিনি। একটু খুলে বল,’ আমি বললাম।
‘আমিও যে সবই জানি তা নয়, আমাকে আমার হোস্টেলের একজন বলেছে পারলে দেখতে। এই তুলসীঘাটেই হয়।’
পরে কোন একবার আমার এই নাগনাথৈয়া উৎসব দেখার সুযোগ হয়। এই উৎসবের সঙ্গেও বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে গোস্বামী তুলসীদাসের নাম। প্রতি বছর কার্তিক মাসের শুক্লা চতুর্থীর বিকেল বেলায় তুলসী ঘাটের চেহারাই বদলে যায়। অগণিত মানুষ এসে জড়ো হয় তুলসী ঘাট ও সংলগ্ন ঘাটগুলিতে; তুলসী ঘাটের সামনে মাঝগঙ্গা অবধি বহু নৌকা, বজরা তুলসী ঘাটের সামনে মাঝগঙ্গা অবধি অর্ধবৃত্তাকারে ঘিরে থাকে, তাতে প্রতিটি কোণে কত যে মানুষ তার হিসাব করা মুশকিল — সকলের চোখ তুলসী ঘাটে অস্থায়ী ভাবে বাঁধা এক বনকদম গাছের দিকে। তাতে চড়েছে বংশীধারী কৃষ্ণ, হাসিমুখে বাজিয়ে চলেছে বাঁশি। কাতারে কাতারে মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আপ্লুত হয়ে বিজয়ঘোষ করে চলেছে, ‘বৃন্দাবনবিহারী কানহাইয়া লাল কি জয়’, ‘হর হর মহাদেব’ রবে। সেই রব ঢেকে যায় বহু সংখ্যক বিশালাকারের ডমরু নিনাদে — দলে দলে ভাগ হয়ে ছেলেরা কেউ ঘাটে দাঁড়িয়ে, কেউ বজরায় দাঁড়িয়ে গঙ্গার দিক থেকে উদ্দাম তালে বাজিয়ে চলেছে তাদের ডমরু। কৃষ্ণরূপী ছেলেটি তখন জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জল ভিতর থেকে আবির্ভূত হয়, দেখা যায় বংশীবাদনরত কৃষ্ণ দাঁড়িয়ে রয়েছে সাত ফণার কালীয় নাগের শিষে।

মাত্র কয়েক মিনিটের এই লীলাদৃশ্য প্রদর্শনের জন্য নিবিড় প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। কাঠের তৈরি ফণা, প্রায় দশ-কুড়ি ফুট লম্বা দেহের কালীয় নাগের প্রতীক বানাতে অসি-ভদৈনীর মাঝি ও যদুবংশীয়রা বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। লীলা দর্শনের জন্য যে বিপুল জনসমাগম হয় তার নিয়ন্ত্রণ, তাদের এবং লীলার সমস্ত কলাকুশলীদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বিশাল পুলিশ তৎপর থাকে।
কাশীর বিশ্ববিখ্যাত রামলীলার মতই এই কৃষ্ণলীলা কোন মঞ্চে নয়, বরং প্রাকৃতিক পরিবেশে উন্মুক্ত স্থানে সকলের সামনে কোন রকম অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়াই নিতান্ত দেশজ উপায়ে চমৎকার ভাবে সম্পন্ন হয়। তুলসী ঘাটে বনকদম গাছ স্থাপন করে গঙ্গাকে সেদিন কালীয় নাগের বিষে দূষিত যমুনা রূপে কল্পনা করা হয়। এই বনকদম গাছ সেদিন ভোরে কেটে আনা হয় সংকট মোচন মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই গাছ এই স্থান ছাড়া কাশীর অন্য কোথাও পাওয়া যায়না।
নাগনাথৈয়ার প্রদর্শনের সমস্তটাই জলের মধ্যে হওয়ার কারণে তা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য হয়। এর কলাকৌশলগত দিকগুলির দিকেও বিশেষ নজর দিতে হয়। লীলার মূল প্রদর্শন শুরুর আগেই কালীয় নাগের প্রতীকটিকে জলের মধ্যে ঠেসে ধরে লুকিয়ে রাখা হয়। এই কাজের দায়িত্ব থাকে গঙ্গাপুত্র নিষাদ শ্রেণীর বলশালী, শক্ত-সামর্থ্য যুবকবৃন্দ। প্রায় জনা তিরিশ যুবক দেড়-দু’ ঘন্টা ধরে জলে থেকে যায়। তারাই কৃষ্ণকে কালীয় নাগের শিষে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে। দর্শনার্থীরা যাতে কৃষ্ণের স্বরূপকে কাছ থেকে দেখতে পায় তার জন্য তারাই কৃষ্ণকে নিয়ে জলের মধ্যে ভাসতে ভাসতে চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করে। এই সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধান করে সংকট মোচন মন্দির কর্তৃপক্ষ।
কাশীর রাজপরিবারের বর্তমান প্রজন্মও নিজস্ব বজরায় সপার্ষদ উপস্থিত থেকে কৃষ্ণলীলার এই বিশেষ দৃশ্য উপভোগ করেন। প্রচলিত আছে যে, বেশ কয়েকবার তুলসীঘাট ছাড়া অন্যত্রও এই নাগনাথৈয়ার লীলা আয়োজন করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু প্রতিবারই কোন না কোন অঘটন ঘটেছে। স্বয়ং কাশী নরেশও কোন একবার রামনগরে একই চেষ্টা করেন। কিন্তু কালীয় নাগ ভেসে যায়, কৃষ্ণ-স্বরূপ জলে ঝাঁপ দিতেই অদৃশ্য হয়ে যায়। এত কাণ্ডের পর তিনি নিরস্ত হন। তাই এখনও অবধি নাগনাথৈয়া লীলাদৃশ্য এত জাঁকজমক ভাবে বেনারসের তুলসী ঘাট ছাড়া ভারতবর্ষের আর কোথাও অভিনীত হয়না। শোনা যায়, এই লীলা প্রদর্শন এত বিখ্যাত যে একবার স্বয়ং মুঘল বাদশাহ্ আকবর এলাহাবাদ (বর্তমানে প্রয়াগরাজ) থেকে গঙ্গাপথে কাশীতে আসেন তা উপভোগ করতে।
কার্তিকের শুক্লা চতুর্থীর এই নাগনাথৈয়া লীলা প্রকৃতপক্ষে প্রায় এক মাস ধরে চলা কৃষ্ণলীলার অংশবিশেষ। প্রতি বছর কার্তিক মাসের কৃষ্ণ সপ্তমীতে মুকুট পূজা দিয়ে এই লীলা অভিনয়ের শুরু হয়, অগ্রহায়ণের কৃষ্ণ প্রতিপদে উগ্রসেনের রাজ্যাভিষেকের মাধ্যমে এর সমাপন হয়। ঠিক কবে এই কৃষ্ণলীলার শুরু হয় তা বলা কঠিন, তবে কিংবদন্তি এই যে গোস্বামী তুলসীদাস সর্বপ্রথম কাশীর রামলীলার মতই কৃষ্ণলীলা প্রচলণ করেন। তাঁর রচিত ‘কৃষ্ণগীতাবলী’ এক সময় অবধি এই লীলা অভিনয়ের উৎস ছিল। অষ্টাদশ শতকে সন্ত ব্রজবাসী দাস একবার তুলসীদাসের এই বিখ্যাত কৃষ্ণলীলা দেখতে এসে মোহিত হয়ে যান। উৎসাহিত হয়ে তিনি নিজস্ব শৈলীতে রচনা করেন ‘ব্রজবিলাস’। সংকট মোচন মন্দিরের এক সময়ের মোহন্ত ধনীরামের সময় থেকে আজও এই কৃষ্ণলীলা ব্রজবাসী দাসের ‘ব্রজবিলাস’ অনুসরণ করে হয়ে আসছে।
কাশীক্ষেত্রে গোস্বামী তুলসী দাসের অবদান কেবল এই নয় — যে সংকট মোচন মন্দিরের কথা বারবার আমাদের আলোচনায় উঠে এল, তা স্থাপনের গল্প বলতে বসলে তাঁরই নাম প্রথমে চলে আসে। যে বিশ্ববিখ্যাত রামলীলার কথা পূর্বে উল্লেখ করেছি, সেখানেও তুলসী দাস স্বয়ংপ্রভ। তাই তাঁর নামে তাঁর বাসস্থান সংলগ্ন ঘাটকে নামকরণ করলে যথাযথই মনে হয়। এখন মনে প্রশ্ন আসে, পূর্বে কী ছিল এই ঘাটের নাম?
ঘাট থেকে সামান্য পশ্চিমে এগিয়ে গেলেই দেখা যায় কাশীর আরও এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আশ্চর্য স্থান — ‘লোলার্ক কুণ্ড,’ এর নামেই এই ঘাটকে আগে বলা হত ‘লোলার্ক ঘাট’। এই কুণ্ডের ব্যাপারেই বলি এবার।
(ক্রমশ)
