হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ২০। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(গত পর্বের পর)

লখুনানা ফরসা, খুব লম্বা। তার চুলগুলিও বেশ লম্বা। সারাক্ষণ একটা আয়না মুখের কাছে ধরে চিরুনি আর চুলের লড়াই চলে। বালক ভাবে, জি টাইপ কোয়ার্টারে দুটো শোয়ার ঘর ভাগ্যিস! নইলে একটা ঘরের মধ্যে আশালতার মুখের সামনে এমন নিশ্চিন্তে কি তিনি চুল-চিরুনির খেলা চালিয়ে যেতে পারতেন!

বালক ইস্কুল বেরোলে লখুনানাও তার সঙ্গে রাস্তায় নামেন। বালক বাসে উঠে গেলে তিনি কী করবেন সেটা গত রবিবার জানা হয়ে গেছে। হর্সু মার্কেটের দিকে যাওয়ার রাস্তায় তিনি খানিক হেঁটে পৌঁছে যাবেন ভোলাদের বাড়ির কাছাকাছি যেখানে রাস্তাটা সবচেয়ে উঁচু জায়গাটায় উঠে গেছে। তার পাশে একটা অশ্বত্থ গাছ। গাছের তলায় চারটে খুঁটির উপর শালপাতার ছাউনি। ছাউনির নীচে বসে একটা হিব্দুস্তানি বউ কয়লার আঁচে বালি-ভর্তি মাটির খোলায় ছোলা ভাজে, চিনাবাদাম ভাজে, জনার ভাজে। বউটার বয়েস আশালতার মতোই কিন্তু খুব হাসিখুশি। চোখ দুটো খুব কালো, ছটফটে আর খুব সুন্দর করে অন্যদের চোখের দিকে চায়। তার ছাউনির পাশে একটা সরু বাঁশের মাচা। সেখানে তার খদ্দেররা বসে। বউটার কাছে ছোলা-বাদাম-জনার ভাজা ছাড়াও ছাতু পাওয়া যায়। বেশির ভাগ লোক জল দিয়ে ছাতু মেখে কাঁচা পেয়াজ আর লঙ্কার আচার দিয়ে খায়।

লখুনানা সেখানে গিয়ে বাঁশের মাচায় বসবেন। একে একে ছোলা, বাদাম আর জনার ভাজা খাবেন আর বউটার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে মুচকি হাসবেন। কোয়ার্টারে ফিরবেন সেই ভাত খাওয়ার বেলা হলে। বালক ভাবে, তিনি কি আর বাড়ি ফিরবেন না? তিনদিন বাদে ফেরার কথা ছিল, সাতদিন হয়ে গেছে। তবে এবার তাঁকে যেতেই হবে। বালক খেয়াল করেছে তাঁর জামার পকেট থেকে ঝনঝন শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। মধ্যম কত্তার দেওয়া দশ টাকার ‘অমিতব্যয়’ সারা হয়ে গেছে।

ঠিক তাই। পরের দিন সন্ধেবেলায় গোস্বামীবাবু নাইট শিফট করতে বেরবেন, লখুনানা পা ঘসতে ঘসতে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। গোস্বামীবাবু বললেন, –কিরে লখু কিছু বলবি?

লখু বললেন, — বলছিলম কি – কাইলকে ঘর যাত্যেই হবেক – কলেজ খুল্যে গেছে।

–তো যা। কখন বেরবি?

–সকালেই –

–ঠিক আছে। আর, বাবুয়ানি করার অভ্যাসটা ছাড়। চুলগুলা ছোট ছোট করে কাট্যে ফেল। সারাদিন চুল নিয়ে পড়্যে থাইকলে পড়াশুনা করবি কখন। আর্টস হলেও বিএ পাস করাটা সোজা নয়। গোস্বামীবাবু বারান্দায় বেরলেন, এবার ফিতে দেওয়া কাবুলি চটিতে পা গলাবেন। লখুনানাও পিছু পিছু বারান্দায়।

–বলছিলম কি –

গোস্বামীবাবু মুখ তুললেন, জিজ্ঞাসা করলেন, –ভাড়ার টাকা আছে?

লখুনানা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, বললেন, –নাই।

গোস্বামীবাবু ঘরের দিকে মুখ বাড়িয়ে বললেন, –শুনছো –

আশালতা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এলেন। গোস্বামীবাবু বললেন, –লখু কাল সকালে চলে যাবে। ওকে দু’টাকা দিয়ে দেবে।

বালক বুঝল গোস্বামীবাবু তাঁর বাবার মতো অমিতব্যয়ী নয়। বালক আরও বুঝল, কিছু মানুষ আছে যারা সব সময় সকলের কাছে নিচু হয়ে থাকে। লখুনানার জন্যে তার বুকের ভেতরে একটা কষ্ট হতে থাকল। এই কষ্টটাই ক্রমশ সম্মানজ্ঞানহীন লোকের প্রতি ক্রোধে পরিণত হবে।

 

গোস্বামীবাবু বালকের হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার মার্কস শিট সামনে নিয়ে বসে আছেন। তাঁর টাকরা থেকে চটাস চটাস আওয়াজ বালকের কানে বাজি ফাটার আওয়াজ হয়ে ঢুকছে। মার্কস শিটে গার্জেনের সই করিয়ে ইস্কুলে জমা দিতে হবে। বালকের এখন ভয় হচ্ছে, যে মার্কস শিটে সব সাবজেক্টের মধ্যে অঙ্কের নম্বর সবচে কম, সেই মার্কস শিটে এই অঙ্কপ্রিয় গার্জেন আদৌ কি সই করবেন!

–ইতিহাসেও ৬৮ আর সেখানে অঙ্কে মাত্র ৬২!

বালকের ভাগ্য ভালো এই সময় বিশ্বাসবাবু এসে হাজির হলেন। ভলিবলের মাঠে গোস্বামীবাবুকে না দেখতে পেয়ে তিনি কোয়ার্টারে চলে এসেছেন। গোস্বামীবাবু তাঁকে দেখে যেন কূল পেলেন। টাকরায় আওয়াজ বন্ধ করে তাঁর দিকে মার্কস শিটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, — দেখুন তো এমন ভয়ংকর মার্কস শিট কারোর দেখেছেন?

বেশ কিছুক্ষণ সেটা ভালো করে দেখলেন বিশ্বাসবাবু। তারপর চোখ তুলে হাসিমুখে বললেন, –ভয়ংকর কী দেখলেন? অঙ্কে তুলনামূলক কম পেয়েছে। সেটাই কি?

গোস্বামীবাবু বললেন, — বলছেন কি বিশ্বাসবাবু, আমরা তো বরাবর দেখে এসেছি অঙ্কে ৯০-১০০, বিজ্ঞান টিজ্ঞানে ৭০-৮০ ইংরাজি-বাংলায় ৫০-৬০ আর ইতিহাসে ৪০-৪৫ একটা ভালো ছেলের স্ট্যান্ডার্ড নম্বর। আর এর নম্বর দেখুন – ইতিহাসেও অঙ্কের চাইতে বেশি পেয়েছে! কী হবে ইতিহাসের নম্বরে? কিচ্ছু হবে না এ ছেলের। অঙ্কে ১০০ না পেলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

সে-বিষয়ে কিছু বললেন না বিশ্বাসবাবু, শুধু তাঁর মুখটা চাপা হাসিতে ভরে উঠল। তারপর বালকের দিকে অভয়-চাউনি হেনে গোস্বামীবাবুকে বললেন, –চলুন চলুন, আপনি না গেলে খেলাই তো শুরু হবে না।

খেলার টানে সই না করেই উঠে যাচ্ছিলেন গোস্বামীবাবু। বালক বলল, –সই?

–হুঁ সই!

মার্কস শিটটা তুলে নিয়ে খসখস করে যেমনতেমন একটা সই করে দিয়ে বিশ্বাসবাবুর সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

(ক্রমশ)

অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
লেখক | + posts

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আগরবাঁধ গ্রামে জন্ম। সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে এখন পূর্ণ সময়ের লেখক, সম্পাদক এবং তন্নিষ্ঠ পাঠক। বিচিত্র বিষয়ে সন্ধিৎসার স্মারক তাঁর লেখা স্মৃতিগদ্য, গল্প ও উপন্যাস। এর আগে আমাদের ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিগদ্য 'স্মরচিহ্ন'। যা পরবর্তীতে বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছে একপর্ণিকা প্রকাশনী থেকে। এছাড়া গত বছরে তাঁর সম্পাদনায় সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে 'বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া'। এ বছর কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই 'গরিলার ঘরকন্না'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed