হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ১৮। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(আগের পর্বের পর)

লম্বা, কালো, দুগ্‌গা ঠাকুরের ছেলে কাত্তিকের মতো নাক, পাতলা ঠোট কিন্তু সব সময় গম্ভীর মুখ, কড়া চাউনি – সেই দাদার চোখ রিকশায় বসা বালককে দেখে এক নিমেষেই কেমন পালটে গেল! বালক অবাক হয়ে দেখে, দুর্গাপুরের রাস্তায় সন্ধে হলেই যেমন টিউব লাইট জ্বলে ওঠে, তেমনই আলো ফুটল তাঁর মুখে। তিনি এগিয়ে এসে হাত ধরলেন বালকের – একাই চলে এসেছু!

সাহস পেয়ে বালক বলে, — রিকশা ভাড়া –

বালকের মুখের কথা না ফুরোতেই তিনি রিকশাওয়ালাকে ভাড়া জিজ্ঞেস করে নিয়ে বালকের হাত ধরে ঘরে ঢোকালেন। তারপর তাকে নীচে ছেড়ে দিয়ে তরতর করে উপরে উঠে গেলেন ভাড়ার টাকা আনতে। বালক ব্যাগ রেখে শানপেড়্যা(শান বাঁধানো বারান্দা)-য় গিয়ে দিদিগোসাঁইকে প্রণাম করে। গোপেশ্বরী মুখ শুকনো করে বালকের চিবুক থেকে চুমু নিয়ে নিজের ঠোঁটে ছোঁয়ান। বিদেশে চাকরি বা পড়াশুনা করতে যাওয়া কোনটাই পছন্দ নয় তাঁর। কিন্তু আজকাল তাঁর কথাকে অচল পয়সার মতো ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বালককে দেখে সেই অভিমানটাই উথলে ওঠে নতুন করে। বালকের সঙ্গে বাক্যালাপ না করে তিনি তক্তপোশের উপর কাঠের দাঁড়াটি মেলে কাশীদাসি মহাভারত চাপান তাঁর উপর। তাঁর ভাত খাওয়া হয়ে গেছে। এখন তিনি সুর করে মহাভারত পড়বেন। শ্রোতাও জুটে যাবে দু-চার জন।

ছোটরা আর পুরুষমানুষদের বাদ দিলে কেবলমাত্র দিদিগোঁসাইয়েরই খাওয়া হয়েছে। মুনিষমেন্দারদের খেতে দিয়ে বউ আর গিন্নিরা নিজেদের পাতে ভাত বাড়তে যাবেন, তখনই বালক এসে উপস্থিত। তাঁদের খাওয়ার তোড়জোড় থমকে গেছে, বালকের মা, মধ্যম গিন্নি ছোট ছোট আলু বেছে শিল পেতেছেন, সেগুলো থেঁতো করে বাটবেন। তাওয়ায় অল্প তেলে কড়া করে ভাজা আলুবাটা খুবই প্রিয় বালকের। মধ্যম গিন্নির ধারণা, তাঁর কোলের ছেলে এতদিন ভালোমন্দ খাবার না খেতে পেয়ে একবারে ‘কাহিল’ হয়ে পড়েছে।

হরিশঙ্কর রিকশাওয়ালাকে টাকা দিয়ে এসে বালকের ছা-কে বললেন, –মা, রিকশাওয়ালা খিদে পেয়েছে বলছে। মুড়িটুড়ি কিছু দিয়ে দাও।

শুনেই ছা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, –এখন কি বাইরের মানুষকে মুড়ি দেওয়ার সময়! গৃহস্থ বাড়ির অকল্যাণ হবে না! যাও বাবা ওকে ডেকে লিয়ে এসে রান্নাঘরের দাওয়ায় বসাও। আমি ভাত বাড়ছি।

হরিশঙ্কর পা বাড়াবার আগেই বালক ‘আমি যাচ্ছি’ বলেই একছুটে সদর দরজা পেরিয়ে রাস্তায়। দেখে, রিকশাওয়ালা রিকশায় বসে গামছা দিয়ে হাওয়া করছে নিজেকে। বালক বলে, –চলো চলো, ছা ডাকছেন, দুটো ভাত খাবে চলো।

বালকের কথা শোনামাত্র কেমন একটা অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়ল মানুষটার মুখে। তাকে দেখে তার দাদা নম্বর দুইয়ের মুখে যে টিউব লাইটের আলো জ্বলেছিল, তার থেকে একেবারেই অন্য রকম আলো এটা। বালক মনে মনে এই আলোর নাম দিল ‘দুটো ভাতের আলো’, আর সেই সঙ্গে ‘দুটো ভাত’ কথাটি তার মাথায় গেঁথে গেল পরিচিত অর্থ ছাড়িয়ে এক অব্যাখ্যাত ব্যঞ্জনা নিয়ে।

মুনিষমেন্দারের খাওয়া শেষ। তারা এঁটো থালা উঠিয়ে পুকুরে মাজতে চলে গেছে। রিকশাওয়ালা বালকের পেছন পেছন ব্যগ্র পায়ে এসে বসে পড়ল দাওয়ায়। ছা তার সামনে কাঁচা শালপাতার থালা পেতে দিলেন। নতুন বৌদি ঘোমটা মাথায়, শালপাতার ছোঁয়া বাঁচিয়ে থপলাস করে এক থালা ভাত ঢেলে দিলেন তার উপর। নতুন বৌদি এই বাড়ির তিন নম্বর বউ, আশালতার এক নম্বর উপরে। তাও তাঁকে নতুন বউ বলেই ডাকে সবাই। সামনে দাঁড়িয়ে বালক তৃপ্তি সহকারে সব লক্ষ করে যাচ্ছে। যেন সে-ই খাওয়াচ্ছে ‘দুটো ভাত’-চাওয়া এই মানুষটাকে।

ছড়িয়ে যাওয়া ভাতগুলোকে পরম যত্নে শালপাতার মধ্যিখানে জড়ো করে হাতের তালু দিয়ে চাপতে চাপতে সলজ্জ স্বরে রিকশাওয়ালা বলল, –একটু নুন –

বালককে মা ডাকছেন, –খাবে আইস্য ধন, কোন সকালে খায়েছ্য, মুখটা শুকাই গেছে –

বালক রান্নাঘরে ঢুকে দেখে, তার ভাত কাঁসার থালাবাটিতে সাজিয়ে তার সামনে বসে আছেন মা।

–একটু পরে মা – বলেই নুনের জায়গা থেকে এক খাবলা নুন নিয়ে বাইরে আসে বালক। এসে দেখে, ছা এক বাটি ডাল নিয়ে এসে রিকশাওয়ালাকে বলছেন, –ভাতের মাঝখানে একটা গর্ত কর –

সেই গর্তে কালো রঙের খোসাসহ পাতলা বিরির ডাল ঢাললেন ছা। বালক পাতের পাশে নুন রাখল আলতো করে। ডালের জল গড়িয়ে এসে নুন ভিজিয়ে দিতে না দিতেই রিকশাওয়ালা ডালে-নুনে-ভাতে মেখে হুস হুস শব্দ করে মুখে তুলছে। ছা তাকে বললেন, –দাঁড়াও বাছা, তরকারি আইন্যে দি আগে। বালকের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন ছা, বললেন, — তুমাকে অত তরস্তরি করতে হবেনি, তুমি যাইয়্যে খাত্যে বসো।

বালক তবু দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ছা হাতায় করে অনেকটা তরকারি এনে ঢেলে দেন ডালভাতের উপরে। তরকারিও ঘোর কালো, তারই মাঝে সাদা সাদা কয়েকটা আলতি(গোল, ছোটো ছোটো কচু)উঁকি দিচ্ছে। বেগুন ঝাল এই তরকারিটার নাম। বালকের বাড়িতে বারো মাস, প্রায় প্রতিদিন এই তরকারিটা হয়। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছে সে। বেগুনের সঙ্গে কখনও আলু থাকে, কখনও আলতি। যখন যেটা চাষে হয়। তরকারিটাও ডালভাতের সঙ্গে মেখে নিল রিকশাওয়ালা। খেতে খেতে চোখ বুজে আসছে তার। বালকের মনে হলো, সারা শরীর দিয়ে খাচ্ছে মানুষটা। দেখতে দেখতে তার নিজেরও খাওয়ার ইচ্ছে তীব্র হয়ে উঠল।  রান্নাঘরে ঢুকে খেতে বসে গেল সেও।

বালক খাচ্ছে কিন্তু তার মনটা ছটফট করছে। বহু কিছু একসঙ্গে টানছে তাকে, কোনদিকে যাবে? ভালুকখুন্যার ফুটবল মাঠ, খালবাঁধ, না কি ঝর্নাডাঙ্গার রায়দের বাড়ির কাছে, রাস্তার ধারের সেই প্রিয় জামগাছ?

শেষ পর্যন্ত কোনোটাই হলো না। খেয়ে উঠে কুয়োতলায় হাত ধুতে গেছে। সেখানেই বাতাবিলেবু গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে ছিলেন হরিশঙ্কর, যার ডাকনাম পচাই। তিনি এই বাড়ির সবচেয়ে দামি মানুষ, বাঁকুড়া-পুরুলিয়ায় গ্রামের পর গ্রাম নিয়ে যে শিষ্যমহল, তাদের তিনি গুরুদেব। বালকসহ তাঁর অন্য ভাইরা তাকে ঠাকুরনানা বলে। বালকের বাবা কাকাও তাকে পচাই না বলে পচাইবাবু বা পচুবাবু বলেন। ছোটরা তাঁর দিকে তাকাতেই ভয় পায়। তিনি ডাকলে সেটা কি অগ্রাহ্য করা যায়!

(ক্রমশ)

অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
লেখক | + posts

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আগরবাঁধ গ্রামে জন্ম। সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে এখন পূর্ণ সময়ের লেখক, সম্পাদক এবং তন্নিষ্ঠ পাঠক। বিচিত্র বিষয়ে সন্ধিৎসার স্মারক তাঁর লেখা স্মৃতিগদ্য, গল্প ও উপন্যাস। এর আগে আমাদের ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিগদ্য 'স্মরচিহ্ন'। যা পরবর্তীতে বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছে একপর্ণিকা প্রকাশনী থেকে। এছাড়া গত বছরে তাঁর সম্পাদনায় সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে 'বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া'। এ বছর কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই 'গরিলার ঘরকন্না'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed