হাফ প্যাডেলের কাল । পর্ব ১৭। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(গত পর্বের পর)

গ্রীষ্মের ছুটি পড়েছে ইস্কুলে। প্রায় দেড় মাসের ছুটি। কতদিন পরে বাড়ি যাবে বালক। মন আনন্দে নাচছে, কিন্তু কে নিয়ে যাবে বালককে? গোস্বামীবাবুর ছুটি পাওনা নেই। তবে কি তিনি বাড়িতে চিঠি পাঠাবেন যদি কেউ এসে নিয়ে যায়? চিঠি পৌঁছতে কতদিন যাবে কে জানে! অস্থির অস্থির লাগছে। সে কি একা যেতে পারবে না? দুর্গাপুর থেকে বাসে চাপলেই বাঁকুড়া। বাঁকুড়া স্টেশনে নেমে টিকিট কেটে রেলে চাপলেই গড়বেতা। মধ্যিখানে চারটে মাত্র স্টেশন। বাড়ি থেকে দাদার সঙ্গে আসার সময় সেই স্টেশনগুলোর নাম মুখস্থ করে নিয়েছে বালক। রেলের টিকিট কাটার ব্যাপারটাই খালি জানে না। নইলে গড়বেতা স্টেশনে নেমে বাসে চেপে হুমগড়, হুমগড় থেকে এক দৌড়েই দেড় মাইল রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি পৌঁছে যেত সে।

বেকার এত ভাবছিল বালক। ব্যবস্থা হয়ে গেল আপনা থেকেই। যেন ম্যাজিক! ওন্দায় বাড়ি যে দুধওয়ালা, দুধ দিতে এসে বলল,–কি খোকা, ইস্কুল ছুটি হয়নি? দেশে যাবে না?

মুখ চুন করে বালক বলে, –যাবো তো। দাদার ছুটি নাই।

দুধওয়ালা বলল, –আমার ব্যাটা কাল বাড়ি যাচ্ছে। উয়ার সঙে চলে যাও। উ ওন্দায় নামবে। তার দুটা ইস্টিশন পরেই তো গড়বেতা। উখেন থিকে একা একা যেতে পারবে না?

বালক মনে মনে লাফিয়ে উঠল। পারব খুব পারব। কিন্তু দাদা?

গোস্বামীবাবু বাড়িতেই ছিলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আলো দেখল বালক।

–ভালোই তো হয়। কিন্তু তুই গড়বেতায় নেমে হমগড়ের বাসে চাপতে পারবি তো?

অনেকবার ঘাড়টা হেলিয়ে নাচাল বালক। ঠিক হলো, কাল সকালে দুধওয়ালার ছেলে মন্টু এসে বালককে সঙ্গে নিয়ে যাবে। তাকে রেডি হয়ে বসে থাকতে হবে।

আশালতা ওঠার অনেক আগেই সেই কোন ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে বালক। ইস্কুল ব্যাগে বইপত্তর ভরা হয়ে গেছে। তার মধ্যে জামা-প্যান্টও ধরে গেছে। বালকের তাড়া দেখে আশালতার মুখে হাসি। দই দিয়ে চিড়ে মেখে গুড়ের সঙ্গে দুটো মর্তমান কলা দিয়ে খেতে দিয়েছেন বালককে। তবু তেমন স্বাদ লাগছে না আজ। মন পড়ে রয়েছে দাদা কখন ডিউটি থেকে ফিরবেন। নাইট ডিউটি চলছে তার। ডিভিসির বাস এলেই আওয়াজ শোনা যাবে। সেদিকেই কান বালকের। দাদা ফেরার আগেই মন্টু দাদা যদি চলে আসে?

দাদা ফেরার অনেক পরে মন্টুদাদা এল। দাদা ততক্ষণে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। শোয়ার আগে বারবার করে বালককে বলেছেন সে যেন বাড়ি গিয়ে পড়াশুনার কথাটাও মাথায় রাখে। রোজ নিয়ম করে অন্তত দশটা অঙ্ক করতে হবে। তার তলায় তারিখ লিখে রাখবে। ফিরে এলে তিনি চেক করবেন সেসব।

দাদা ঘুমিয়ে পড়তেই চিন্তায় পড়ে গেল বালক। মন্টুদাদাকে তাহলে তার গাড়িভাড়ার পয়সা কে দেবে?

পয়সা দিলেন আশালতাই। বালক একটু অবাকই হলো। দাদা ঠিক খেয়াল করে কখন যেন আশালতাকে সব হিসাব বুঝিয়ে দিয়েছেন। বালকের হাতেও এক টাকা দিলেন তিনি। গড়বেতা থেকে হুমগড় যেতে বাসের ভাড়া তো তাকেই দিতে হবে। আশালতা বললেন, –বাসের ভাড়া চার আনা কি ছয় আনা হতে পারে। তুমি আট আনা সঙ্গে রাখবে। বাকি আট আনা দিয়ে খিদে পেলে কিছু কিনে খেয়ে নেবে ট্রেনে।

খিদে লাগছিল ঠিকই কিন্তু বালক কিচ্ছু কেনেনি। কে জানে বাবা, বাসে যদি আট আনার বেশি ভাড়া হয়! বাঁকুড়ায় রেলগাড়িতে চেপে মন্টু দাদা অবশ্য তাকে খানিকটা চাঁছি দিয়েছিল খেতে। মন্টুদাদার বাবা আর তারা দু’ভাই দুর্গাপুরে থাকে। সঙ্গে অনেকগুলো গরুমোষ। নিজেরাই রান্না করে খায় আর দুধ, ঘি, চাঁছি বিক্রি করে। চাঁছিকে শহরের লোকরা ক্ষীর বলে। খুব ভালো খেতে। দেশে মন্টুদাদার মা, দাদু-ঠাকুমা, আরও অনেকগুলো ভাইবোন থাকে। ট্রেনে সেসব কথা বলতে বলতেই ওন্দা স্টেশন এসে গেল। মন্টুদাদা নেমে গেল। আরও দুটো স্টেশন পেরিয়ে গড়বেতায় নেমেই বালকের মনে হলো সে অনেক বড়ো হয়ে গেছে। এখন সে যেভাবে খুশি বাড়ি যেতে পারে। কেউ কিছু দেখতে আসবে না, বলতেও পারবে না। এমনকি, দুর্গাপুর থেকে সে একাই চলে এসেছে বলে দাবি করতে পারে।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা বিশাল বটগাছ। তার ছায়ায় দুটো রিকশা, একটা ফাঁকা, অন্যটায় গুটিসুটি মেরে রিকশাওয়ালা শুয়ে আছে। বালক তাকিয়ে দেখল, তার খোলা চোখ আকাশের দিকে মেলা। রিকশার পাশে দাঁড়িয়ে বালক রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, –হুমগড় যাওয়ার বাস যে কখন আসবে?

রিকশাওয়ালা উঠে বসে গামছা দিয়ে গায়ের ঘাম মুছল। তারপর বলল, –কুথায় যাবে খোকা? হুমগড় যাওয়ার বাস আসতে আসতে সেই সন্ধে।

বালক বলল,–অনেক দূর। হুমগড় পেরিয়ে আরো দেড় মাইল রাস্তা।

রিকশাওয়ালা বলল, –অতখন বসে থেকে কী হবে। ভাত খাওয়ার বেলা তো পেরিয়েই গেল। খিদা লাগবে তো। তাচ্চেয়ে চলো আমার রিকশায় চেপে। ঘরে যেয়ে ভাত পাবে দুটো।

বালক বলল, –কত ভাড়া?

রিকশাওয়ালা বলল, –হুমগড় তক তিন টাকা ভাড়া। ওই ভাড়াতেই তুমাকে ঘর তক লিয়ে যাব। বেশি লিবনি কো। ছোট ছেল্যা, বাড়ি যেয়ে দুটো ভাত পাবে তো।

বালকের মনে হলো, রিকশাওয়ালা বোধ হয় ভাত খেতে খুব ভালবাসে। তাই কথায় কথায় ‘দুটো ভাত, দুটো ভাত’ বলে যাচ্ছে। রিকশায় গেলে তো ভালোই হয় কিন্তু তার পকেটে মাত্র এক টাকা। জমা এক, খরচ তিন। জটিল অঙ্ক। সহসা তার মাথার মধ্যে অঙ্কের উত্তর মিলে গেল। খুব সহজ সমাধান। রিকশা গিয়ে থামবে তো তার বাড়িতেই। বাড়িতে দুটো টাকা নিশ্চয়ই থাকবে ছা-এর আঁচলে কিংবা বাবার ফতুয়ার পকেটে। বাস থাকতে বড়মানষি দেখিয়ে রিকশায় চাপার জন্যে হয়তো একটু বকুনি খেতে হতে পারে, এই যা। রিকশায় উঠে বসল বালক।

হুমগড় পেরিয়ে বনকাটার খাল পেরোতেই রিকশা ভাড়ার ভাবনা বাড়ি আসার আনন্দটাকে খানিক ফিকে করে দিল। যদি রিকশা থেকে নেমেই সেই দাদার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়? ছায়ের ছেলে সেই যে দাদা নম্বর দুই, যাকে ছোটরা সবাই খুব ভয় পায়। বড়োরাও তাঁকে খুব মেনে চলেন।

যে ভয়টা পাচ্ছিল সেটাই সত্যি হলো। বাইরের দরজার কাছে রিকশা গিয়ে দাঁড়াতেই বালক দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে সেই দাদা, যার নাম হরিশঙ্কর।

(ক্রমশ)

 

অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
লেখক | + posts

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আগরবাঁধ গ্রামে জন্ম। সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে এখন পূর্ণ সময়ের লেখক, সম্পাদক এবং তন্নিষ্ঠ পাঠক। বিচিত্র বিষয়ে সন্ধিৎসার স্মারক তাঁর লেখা স্মৃতিগদ্য, গল্প ও উপন্যাস। এর আগে আমাদের ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিগদ্য 'স্মরচিহ্ন'। যা পরবর্তীতে বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছে একপর্ণিকা প্রকাশনী থেকে। এছাড়া গত বছরে তাঁর সম্পাদনায় সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে 'বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া'। এ বছর কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই 'গরিলার ঘরকন্না'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed